মহিলা সমাজ

রাতের রাজপথ

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১০-২০১৯ ইং ০১:০১:৪৩ | সংবাদটি ১৫২ বার পঠিত

গল্পটা জীবন থেকে ধার করা। আশ্বিন মাসের শুরুতে যখন শিউলিফোটা শুরু, কোনো কোনো রাতের শেষ ভাগে টুপটাপ শিশির বিন্দু জানান দেয়, দক্ষিণের বাতাসে শীত কড়া নাড়তে চায়, তেমনি এক রাতে ঢাকা থেকে সিলেট ফিরছি। ছয় জনের টিমে চার জনের ইচ্ছা দিনে ফিরি। অফিস কামাই করা যাবে না, তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাকি চার জনের মৌন সম্মতি। রাত সাড়ে দশটায় রওয়ানা হই। আকাশের চাঁদ কোথায় লুকিয়ে আছে, বুঝতে পারছি না; তবে মিটিমিটি করে হাজার তারা জ্বলছে। তারাদের সাথে গল্প শুরুর আগে রাতের খাবার খেতে হবে, টাং-এর খাবার আমাদের সবার পছন্দের শীর্ষে, ভোলতায় রাস্তার পাশের তেমনি এক রেস্টুরেন্টের খাবার যে এতো মজা হবে খাওয়ার আগে বুঝতে পারি নাই। আমাদের টিমে মন্দ না, ঠিক আছে টাইপের খাদক যেমন আছেন, তেমনি আবার খুব ভোজন রসিকও আছেন, আবার সবচেয়ে কনিষ্ট ছামি কোনো কিছু খেতে খুব আপত্তি না থাকলেও ভাতে তার খুব এলার্জি। একমাত্র খালামনি যিনি রাস্তার দু’পাশে যে কোনো খাবার দেখলেই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, ওয়াও এটা খাব, আমার এই খালামনির কাছে সব খাবারই অমৃত। খালামনির কাছে রাস্তার খাবারের রিভিউ এতো সুন্দর করে উপস্থাপনের শাক্তি রয়েছে। রুচি চলে যাওয়া যে কারোর সুরুচি ফিরে আসবে খালামনির কথায়। সবাই মহা আনন্দে আয়েশি স্টাইলে খেতে বসে বেশ সময় নিয়ে ভর্তা, ভাজি হরেক রকম মাছ দিয়ে খাবার শেষ করে রওয়ানা হলাম। ঘুম ঘুম চোখে, হেলে দুরে গাড়ি চলছে। জ্যাম খুব একটা নেই বললেই চলে। সেই হিসেবে বলা যায় অনেকটা রাজার হালে রাজপথে আমাদের গাড়ি চলছে। ব্যস্ত নগর, জনপদ পিছনে ফেলে যখন এগিয়ে যাচ্ছি সবুজ বনাঞ্চল, ঘুমিয়ে পড়া গাছপালা ঘেরা নীরব অন্ধকারে এমন সময় ধপাস করা শব্দে কাচা ঘুম ভেঙে গেলো, তাড়াতাড়ি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকানোর আগেই গাড়ি থেমে গেল। বুঝলাম গাড়ির চাকা পানচার। যদিও অতিরিক্ত চাকা এবং আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি যানে আছে, কিন্তু একা এই ছয় জনের পক্ষে চাকা পরিবর্তন করা অনেক কষ্টসাধ্য। তারপরও চালকসহ একজন গাড়ি থেকে নেমে যেই ভ্যানে খুলেছেন, নিজর্নতা ভঙ করে অমনি তিন যুবক এসে উপস্থিত।
আমি গাড়ির ভিতর থেকেই পুরো পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছি। যদিও এই জায়গা বা এর কাছাকাছি খুব একটা জনবসতি নেই, তাই মুখে মাক্স লাগানো এই তিন যুবককে দেখে অনেক অশুভ কিছু যখন মনের কোনে উঁকি দিতে যাবে, তখনই তিন যুবকের একজন বলে ওঠলো এই জায়গায় গাড়ি থামিয়ে নামছেন কেন? আপনাদের ভালোর জন্য বলছি যেভাবে যতো তাড়াতাড়ি পারেন, পিছনের বাজারে চলে যান, জায়গাটা মোটেও নিরাপদ নয়। কথা শেষ করে তিন যুবক হাওয়া। ভ্যানে টায়ার জেক তুলতে না তুলতেই ওদের আর দেখা গেলো না।
হঠাৎ হিন্দি কাল ছবির কথা মনে পড়ে গেলো। রাস্তার দুই পাশের কোপে কি কি পোকার শব্দ আর জোনাকি পোকার মায়াময় আলো কিছুটা সস্তি দিলেও ভয়ে গলার পানি শুকিয়ে কাঠ, কারো মুখে কোনো কথা নেই, শুধু শাহানা খালার নাক ডাকছে। পৃথিবীতে যদি সুনামী হয় তাহলেও তার নাক ডাকা এভাবেই চলবে। যাই হোক গাড়ি ঘুরিয়ে যখন ধীরগতিতে পিছনের বাজারের দিকে যাচ্ছি, বুঝতে পারছি বাকি তিন চাকাও বিদ্রোহ করছে। এভাবে অনেকক্ষণ চলার পর বাজারের কাছাকাছি আসলাম। বাজার ঘিরে প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ, দুই একটা গাড়ির ওয়ার্কশপে লাইট জ্বলছে, ব্যস্ত দিনের কোলাহলের বিপরীতের এই সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন যদিও কোনো দোকানের বেঞ্চে আরামে শুয়ে ঘুমের সাগর পাড়ি দিচ্ছে কিছু মেহনতি মানুষ। তাদের দেখে নিজেদের মনে কিছু শান্তি এলো। যন্ত্রের সাথে যখন কৌশল কাজ করে না, তখন যন্ত্র বিগড়ে যায়, এই মুহূর্তে তাই হচ্ছে, গাড়ি নিজে থেকেই থেমে গেছে। যাই হোক এবার সবাইকে নামতে হবে, কারণ এক্সট্টা টায়ার জ্যাক সবকিছুতে সবার সহযোগিতা চাই, আমার শাহানা খালাকে ডেকে তুলে যেই গাড়ি থেকে নামতে যাব অমনি দেখি এখানেও আর তিন যুবক দাঁড়িয়ে এবং উনারা খুব আগ্রহ নিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। এই তিন যুবক কাজ শুরু করতেই বললেন, ভাই আমাদের পুলিশ খুঁজতেছে, একজনের কথা শেষ হতে না হতেই লম্বা মতো আরেক জন বলে ওঠলো, আমাদের পুলিশ তাড়া করতেছে। ছেলেদের মুখে এই কথা শুনে মনে হলো যেন আজ এই রাজপথে কেউ কাল ছবির এডিটিং করছে, নাকি ভুতের ছবির টিকটক। ওদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অবশেষে চাকা ঠিক হয়ে যেই গাড়িতে ওঠে যাত্রা শুরু করবো অমনি পুরো টায়ার শব্দ করে ফেটে গেল। কি আর করার, মনকে শান্ত করে ঘড়ির দিকে তাকালাম, তখন রাত তিনটা বেজে পনের মিনিট। আবার খুব ধীরে ধীরে গাড়ি চলছে, এভাবে আজকের ঘটনাগুলো না ঘটলে, কখনোই রাতের রাজপথ এভাবে দেখা হতো না। যদিও রাত শুধু ঘুমানোর জন্য তারপর এই রাতেও অনেকে জেগে থাকে জীবিকার তাকিদে, জীবনের তাগিদে। যতো যাই জেগে থাকা মুখ দেখিনা কেন আমাদের এখন একটা নিরাপদ জায়গা দরকার যেখানে গাড়ি পার্ক করে রাখা যাবে। অবশেষে একটা ফিলিং স্টেশন পাওয়া গেল যার পাশে একটা ছোট কফির দোকান এতো রাতেও খোলা। নেমে কফি খেতে গিয়ে আরও অবাক হলাম। এখানে যে শুধু কফির দোকান ঘিরে মানুষজন জেগে আছে তা কিন্তু নয়, দুইটি বড়ো বড়ো ছাগলও জেগে আছে। শুধু যে জেগে আছে এমন না, ওরা দিনের বেলা ঘুরে বেড়ানো প্রাণিদের মতা বেশ আনন্দ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাইহোক এইটুকু শান্ত¦না একা একা জাগতে হবে না, আমাদের কফির সাথে অনেক সঙ্গি আছে।
মনে মনে বুঝতেছি অভিজ্ঞতা হলো দুঃখ কষ্টের নির্যাস। যাইহোক মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, এই মহান সত্যকে আবার বাস্তব রূপ দিলেন আমাদের বন্ধু। যার সহযোগীতায় সেই ফিলিং স্টেশন থেকে একটা মাইক্রো মিললো তাতে চড়ে আমাদের বাকি যাত্রা করতে হবে। গাড়িতে ঘুমন্ত সবাই জেগে এই মাইক্রোতে ওঠলেও আমার খালামনি ঘুমিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন এবং নতুন গাড়িতে ওঠলেন যদিও সবার প্রয়োজনীয় ব্যাগে এই গাড়িতে তুলা হয়েছে। কিছু দূর আসার পর হঠাৎ খালামনি চিৎকার দিয়ে ওঠলেন কারণ নষ্ট হওয়া গাড়ির ভ্যানে, উনার ঢাকা থেকে আনা সেমাই প্যাকেট, গাজীপুরের নুহাশপল্লী থেকে আনা পেপে কলা রয়ে গেছে। এখন প্রায় কাঁদো হয়ে বলতে লাগলেন আমার এই মূল্যবান জিনিসগুলো কেউ মনে করে নিয়ে আনলে না, গাড়ি ঠিক করতে গিয়ে শেষে আমার সেমাইয়ের কি হবে। আমরা তাকে যতোই বুঝাচ্ছি এতো চাকা যখন সেখানে আছে, তো এর ভিতরে সেমাই অক্ষত থাকবে। যদিও সব শুনে আধা কেজি সেমাইয়ের এক বুক ব্যাথা নিয়ে তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাতের পেট চিরে ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে আমরাও চা বাগানের ভিতর দিয়ে এসে শ্রীমঙ্গলে পৌঁছলাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT