মহিলা সমাজ

আগর-আতরের রাজ্যে

ফাহমিদা লুমা প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১০-২০১৯ ইং ০১:০৩:০৫ | সংবাদটি ৪৪ বার পঠিত

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই অবাক হতে হলো। কে বলবে ভরা শরৎ এখন; বাইরে বৃষ্টি অঝোর ধারায়। আমাদের বেড়াতে যাওয়ার কথা আতর-আগরের রাজ্য মৌলভীবাজারের বড়লেখার সুজানগরে। বাবার মুখে আতর তৈরির গল্প শুনে মেয়ে জাইমা খুবই উদ্গ্রীব পুরো প্রক্রিয়াটি নিজের চোখে দেখার জন্য। যা হোক, দ্রুত তৈরি হয়ে আমরা রওনা হলাম।
সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের দু’পাশ শরতের কাশফুলে সাদা হয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে কিছুটা জবুথবু অবস্থা। হাওরের খোলা হাওয়া চোখে-মুখে ঝাপটা মারছে। দু’চোখ আবেশে বুজে আসছিল। আস্তে আস্তে গাড়ি মৌলভীবাজারে প্রবেশ করছে। বৃষ্টি সরে গিয়ে এখন চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। গাড়ি ছুটে চলেছে কুলাউড়ার দিকে। চা বাগানের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। নাকে এসে লাগছে চা পাতার অদ্ভুত মাদকতাময় ঘ্রাণ। চারপাশ আলো করে ফুটে আছে মেঘ শিরীষ, গগন শিরীষ, শরতের কৃষ্ণচূড়া। বন অতসী দাঁতরাঙা, টগরের ছোট ছোট ঝোপ। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। ততক্ষণে গাড়ি পৌঁছে গেছে কুলাউড়ায়। একটু বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে আমরা রওনা হলাম বড়লেখার দিকে। প্রচুর জলাশয় এদিকে। লাল শাপলা, সাদা শাপলার সঙ্গে প্রচুর নীল শাপলা দেখে অবাক হলাম। আগে শুধু মাধবপুর লেকেই প্রাকৃতিকভাবে নীল শাপলা দেখা যেত।
দ্রুত দৃশ্যপট বদলে যেতে লাগল। চারদিকে শুধু আগর গাছ। গৃহস্থ বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে খোলা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে করা হচ্ছে পরিকল্পিত আগর বাগান। রয়েছে ছোট বড় মিলিয়ে ৩৫০টি আতর তৈরির কারখানা। প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। রয়েছে নারী শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। এ যেন আতর-আগরের রাজ্য।
আগর শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো উৎকৃষ্ট বা সুগন্ধি কাঠ। ইংরেজিতে বলা হয় আগর উড, অ্যালো উড বা ইগল উড; আর আরবিতে বলে উদ; সংস্কৃতে অগুরু। বৈজ্ঞানিক নাম অয়ঁরষধৎরধ সধষধপপবহংরং। আগর গাছ থেকে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুটো উপায়ে আগর সংগ্রহ করা হয়।
প্রাকৃতিক পদ্ধতি
প্রাকৃতিক উপায়ে আগর গাছ থেকে আগর উৎপন্ন হতে ২৫-৩০ বছর সময় লাগে। এক ধরনের কা- ছেদক পোকা আগর গাছে ছিদ্র তৈরি করে। ছত্রাকের আক্রমণে গাছ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে জৈবনিক প্রক্রিয়ায় আগর গাছের ওই ক্ষত স্থানের চারপাশে বাদামি-কালো রঙের আস্তরণ তৈরি করে, যা আগর উৎপাদনের মূল উপকরণ। গাছের এই কালো অংশকেই বলা হয় আগর।
কৃত্রিম পদ্ধতি
পোকায় আক্রান্ত হওয়ার এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ কৃত্রিমভাবে পেরেক মেরে ক্ষত সৃষ্টি করে ফলে গাছের সে অংশ ফেঁপে যায় এবং সেখানে আগর সঞ্চিত হয়। এ পদ্ধতিতে অনেক কম সময়ে (৮-১০ বছরে) মধ্যেই আগর সংগ্রহ করা যায়। যদিও প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন আগর গুণে-মানে উৎকৃষ্ট।
বড়লেখার সুজানগরে আগর গাছকে সুগন্ধি কাঠ প্রজ্বোলনের জন্য ও আতর তৈরির জন্য দুভাবেই প্রক্রিয়া করা হয়। এটি একটি রপ্তানিমুখী শিল্প। আগর তেল, আগর উড ও আগর ডাস্ট রপ্তানি করে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।
সুগন্ধি কাঠ হিসেবে আগরের ব্যবহার
বলা হয়ে থাকে জান্নাতবাসীরা বেহেশতে যে সুগন্ধি কাঠ প্রজ্বোলন করবে, তা এই উদ বা আগর কাঠ। তাই সমস্ত মুসলিম বিশ্বে রয়েছে এর বিশেষ কদর। আগর গাছে আগর উৎপন্ন হয়ে গেছে নিশ্চিত হওয়ার পর গাছ কেটে নিয়ে অতি সূক্ষ্মভাবে বাটালির সাহায্যে কালো অংশকে আলাদা করা হয়। যা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সুগন্ধি কাঠ হিসেবে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। প্রতি কেজি সুগন্ধি আগর কাঠ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এর আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য আরও অনেক বেশি।
সুগন্ধি আতর তৈরিতে আগর কাঠের ব্যবহার :
পৃথিবীতে গোলাপ ফুলসহ বিভিন্ন সুগন্ধি ফুল দিয়ে আতর তৈরি করা হলেও ‘আগর আতর’ উৎকৃষ্ট ও অতি মূল্যবান। তাই এই আতরকে বলা হয় ‘স্বর্ণ তরল’। আতর তৈরির জন্য প্রথমে সুনিপুণভাবে আগর কাঠের টুকরোগুলো আলাদা করা হয়, যাতে কালো অংশ অক্ষত থাকে। এবার কুঁচি কুঁচি করে কাটা টুকরোগুলো বড় ড্রাম বা হাঁড়িতে (স্থানীয় ভাষায় ডেগ বলে) ১০-১৫ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা হয়। ভিজিয়ে রাখা কাঠগুলো পানি ভর্তি স্টিলের তৈরি বিশেষ পাত্রের মধ্যে রেখে নিচ থেকে আগুনের তাপ দেওয়া হয়। পাত্রের চারদিক খুব ভালোভাবে বন্ধ করা থাকে, অনেকটা এয়ারটাইটের মতো। এভাবে ১০-১২ দিন তাপ প্রয়োগ করা হয়। পাত্রের ওপরের দিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় একটা নল সংযুক্ত থাকে এবং নলটির অপর প্রান্ত আরেকটি পাত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এখানে স্টিলের তৈরি পাত্রটি ঠান্ডা পানি ভর্তি থাকে, ফলে নলের মধ্য দিয়ে ভেসে আসা বাস্পগুলো ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এসে সহজেই ফোঁটায় ফোঁটায় তরলে পরিণত হয়। এই তরলের ওপর তেলের আস্তরণ পড়ে। তেলের এ আস্তরণই আমাদের কাক্সিক্ষত আতর। মূলত বাস্পীভবন-শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার বিশেষ পাতন প্রক্রিয়াই অনুসৃত হয়। এভাবে সংগৃহীত ‘স্বর্ণ তরল’-এর প্রতি তোলার দাম প্রায় ৬ হাজার টাকা। আর লিটার প্রতি মূল্য ৬-৭ লাখ টাকা; আন্তর্জাতিক বাজারে এ দাম আরও বেশি।
কথা হলো তিন প্রজন্ম থেকে আতর ব্যবসায়ে যুক্ত যোবায়েরের সঙ্গে। শোনা হলো আতর নিয়ে নানা আশা-নিরাশা, পাওয়া-না পাওয়ার গল্প। বললেন ব্যাংক লোন পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা ও বিপণন জটিলতার কথা। বিভিন্ন নীতিমালার ব্যাপারে নিজের মতামত তুলে ধরলেন। অত্যন্ত আন্তরিক, অতিথি বৎসল মানুষ। কারখানায় ঢুকেই অদ্ভুত সুন্দর সুগন্ধে অপূর্ব একটি স্মৃতি মনে পড়ল। পবিত্র কাবা শরীফের গিলাফে এমন অপূর্ব সুগন্ধ পেয়েছিলাম।
আগর শিল্প একটি পরিবেশবান্ধব রপ্তানিমুখী শিল্প। অন্যান্য শিল্প কারখানায় যখন পরিবেশ দূষণের বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করে, তখন আতর-আগর শিল্প সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত একটি শিল্প। এ ছাড়া কাঁচামাল হিসেবে আগর কাঠ সংগ্রহের জন্য প্রচুর পরিমাণে আগর গাছ লাগানো হয়। ফলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও সুন্দরভাবে বাস্তবায়িত হয়। এই শিল্পে নারী শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকায় সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও সুন্দরভাবে মিটছে।
আরও কিছু আগর-আতর তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা হলো। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হয়ে আসছিল। আমরা রওনা হলাম ছোট বোন ফাহিমা-দেলোয়ার সিদ্দিকী দম্পতির বাংলোর মতো চমৎকার সাজানো গোছানো বাড়িতে। মধ্যাহ্ন ভোজে ছিল দারুণ আয়োজন।
পৃথিবীর সব সুন্দর আর সৃষ্টিশীল কাজের পেছনেই থাকে নীরব কষ্ট, আর ত্যাগের না বলা গল্প। যেমন, একটি চা গাছ প্রায় ১৫-২০ ফুট উঁচু হতে পারে। কিন্তু চা চাষের প্রয়োজনে চা গাছকে বাড়তে না দিয়ে ছোট বনসাই করে রাখা হয়।
আবার সুগন্ধি তৈরি করতে একটা জীবন্ত আগর গাছে হাজার হাজার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। গাছগুলোর এত ত্যাগ ও এত কষ্টের বিনিময়ে আমরা পাই এক কাপ চা আর এক তোলা আতর।
আমার কন্যা জাইমার খুব প্রিয় ট্রেন জার্নি। ট্রেনের সময় হয়ে আসছিলো। আমরা দ্রুত কুলাউড়া স্টেশনে পৌঁছালাম। আবারও ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। সাথে টিপটিপ বৃষ্টি। ট্রেন ছুটে চলছে। মনে এক অদ্ভুত ভাবনা এলো। ‘জিন্দেগী এক সফর’। মহাবিশ্বের নিয়ন্তা গন্তব্য ঠিক করে রেখেছেন। সময় হলে বিনা নোটিশে সেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে ঠিক করে রেখেছেন। সময় হলে বিনা নোটিশে সেই নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে পড়তে হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT