উপ সম্পাদকীয়

আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার ভয়াবহ পরিণাম

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৯ ইং ০১:৩৮:০৬ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত


আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলা বর্তমান সময়ের একটি আলোচিত বিষয়। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা, স্বামীর উপর অভিমান করে স্ত্রীর আত্মহত্যা অথবা স্ত্রীর উপর অভিমান করে স্বামীর আত্মহত্যা, পিতামাতার উপর অভিমান করে ছেলেমেয়ের আত্মহত্যা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়ে আত্মহত্যা, লজ্জার কারণে আত্মহত্যা, তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে বলে আত্মহত্যা অর্থাৎ আত্মহত্যার বিষয়টি আজ সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে। ইসলামের নাম নিয়ে, ইসলামী পোষাক পরে, ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থের কথা বলে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন, আত্মঘাতী হামলা করেন এবং মনে এটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই করেছেন, ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থেই করেছেন। না, কখনও না। আত্মহত্যা, আত্মঘাতী হামলা যে কারণেই করা হোক না কেন-ইসলামের দৃষ্টিতে এটা অত্যন্ত জঘন্য ও অমার্জনীয় অপরাধ। আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলা ইসলামে চিরতরে নিষিদ্ধ। আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার সাথে ইসলামের কোনোই সম্পর্ক নেই, থাকতে পারে না। আত্মঘাতী হামলা বলা হয়-যাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হামলা করা হবে তার মৃত্যু নিশ্চিত না হলেও হামলাকারীর মৃত্যু সুুনিশ্চিত। তাই এটি ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যার শামিল। আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজেকে হত্যা করা হয় আর আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে নিজেকে যেমন হত্যা করা হয় তেমনি একই সাথে অগণিত লোককে হত্যা করা হয়। আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলা চিরতরে নিষিদ্ধ করে মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন-(১) ‘তোমরা নিজদিগকে হত্যা করিও না : আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। এবং যে কেহ সীমা লংঘন করে এরূপ অন্যায় করবে তাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হবে : ইহা আল্লাহর পক্ষে সহজ’ (সূরা নিসা : আয়াত-২৯-৩০)। (২) ‘তোমরা নিজের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা বা আত্মহত্যা করোনা’ (সূরা বাকারা : আয়াত-১৯৫)। (৩) ‘নরহত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করা হেতু ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল।’ (সূরা মায়িদা : আয়াত-৩২)। (৪) ‘কেহ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম : সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন’ (সূরা নিসা : আয়াত-৯৩)। (৫) ‘যখন সে প্রস্থান করে তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্য-ক্ষেত্র ও জীবজন্তুর বংশ নিপাতের চেষ্টা করে : কিন্তু আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না’ (সুরা বাকারা : আয়াত-২০৫)।
আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলা করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে-(১) হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা:) ইরশাদ করেন-‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড় থেকে নিক্ষেপ করে ধ্বংস করে, সে জাহান্নামে যাবে এবং সব সময় সেখানে অবস্থান করবে এবং সব সময় তা থেকে পতিত হতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামেও তার হাতে বিষ থাকবে এবং তা পান করতে থাকবে এবং জাহান্নামে চিরকাল থাকবে। যে অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে সেরূপ অস্ত্র জাহান্নামেও তার হাতে থাকবে এবং সর্বদা নিজের পেটে এই অস্ত্র দ্বারা আঘাত করতে থাকবে এবং চিরকাল সে জাহান্নামে থাকবে’ (বুখারী, মুসলিম, তিরমিজী, আবু দাউদ)। (২) হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণিত হাদীসে নবী (সা:) ইরশাদ করেন-‘যে ব্যক্তি কোন বস্তু চিবিয়ে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামেও না চিবাতে থাকবে। যে ব্যক্তি নিজেকে গর্ত ইত্যাদিতে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামেও সেভাবেই করতে থাকবে। যে ব্যক্তি গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামেও সেরূপ করতে থাকবে’ (বুখারী, আহমদ, তাবারানী, বায়হাকী)। (৩) হযরত সাবিত ইবনে দাহহাক (রা:) বর্ণিত হাদীসে নবী (সা:) ইরশাদ করেন-‘যে ব্যক্তি যেকোনো বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে সে চিরদিন জাহান্নামের মধ্যে ঐ বস্তু দ্বারা শাস্তি পেতে থাকবে’ (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, মুসনদে আহমদ)। (৪) হযরত জুনদুব (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন-‘তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি আঘাতের ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। আল্লাহপাক ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন-আমার বান্দাহ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই তার নিজের জীবনের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সুতরাং আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করলাম’ (বুখারী, মুসলিম, সহীহ ইবনে হিব্বান)। আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে যেমন নিজেকে হত্যা করা হয় তেমনি অন্যকেও হত্যা করা হয়। অন্য লোককে হত্যা করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) বর্ণিত হাদীসে নবী (সা:) ইরশাদ করেন-‘একজন মুসলমানকে হত্যা করা পুরো দুনিয়া ধ্বংস করার নামান্তর’ (তিরমিজী, নাসায়ী)। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে বুরায়দা (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন-‘কোন মুমিনকে হত্যা করা আল্লাহর কাছে দুনিয়া ধ্বংস করার চেয়েও মারাত্মক’ (নাসায়ী বায়হাকী)। কোরআন হাদীসের উক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় এটাই প্রমাণিত-আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলা ইসলামে চিরতরে নিষিদ্ধ এবং সর্বোতভাবে ঘৃণিত। এ ধরনের জঘন্য অপরাধে যারা জড়িত তারা পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে।
সঠিক ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় সর্বপ্রথম আত্মঘাতী হামলা হয় রাশিয়ায়। ১৮৮১ সালে ১৩ মার্চ রাশিয়ার উইন্টার প্যালেসের সামনে দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের বহরের ওপর এই আত্মঘাতী হামলা হয়। গার্ভানুস্কি নামক ব্যক্তি এই হামলা করে। এটিই ছিল বিশ্বের ইতিহাসের সর্বপ্রথম আত্মঘাতী হামলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা আমেরিকান মেরিনের রুদ্ধযান ধ্বংস করার জন্য ব্যাপকহারে আত্মঘাতী হামলা করে। যুদ্ধ চলাকালীন সময় ৩৪৬০টির মতো আত্মঘাতী হামলা করে জাপানি সৈনিকরা। নিকট অতীতে তামিল টাইগাররাও অসংখ্য আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। বিশ্বের আনাচে-কানাচে বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিনিয়ত আত্মঘাতী হামলা ঘটেই চলেছে। এসব হামলা কে বা কারা করছে তা রহস্যজনক। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বাস্তব ঘটনা হচ্ছে-সম্প্রতি এসব আত্মঘাতী হামলার জন্য দায়ী করা হচ্ছে ইসলাম ও শান্তিকামী মুসলমানদেরকে। ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করলেও ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে আত্মঘাতী হামলার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। যারা এই আত্মঘাতী হামলার আবিষ্কার করলো, যারা সবচেয়ে বেশি আাত্মঘাতী হামলা পরিচালনা করলো, সেই বর্বর জাতি হয়ে গেল সভ্য ও শান্ত। আর দু’একজনের সন্দেহজনক সংশ্লিষ্টতার কারণে বদনাম দেয়া হচ্ছে পুরো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে। সন্ত্রাসের দায়ে কাউকে গ্রেফতার করা হলে দেখা যায়-সে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র বা কেউ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা পেশাগতভাবে কেউ ডাক্তার বা কেউ ইঞ্জিনিয়ার। অথচ বদনাম দেয়া হয় আলেম, উলামা, মাদ্রাসা ছাত্র ও মাদাসা শিক্ষা ব্যবস্থার। এটা কেন? এটা ইসলাম, মুসলমান ও মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি চরম হিংসা ছাড়া আর কিছু নয়। ইসলাম, মুসলমান ও মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি এরূপ মিথ্যা অপবাদ আর কতকাল?
ইসলামে আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার কোন স্থান নেই। আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার ভয়াবহ পরিণামের কথা কোরআন-হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। একজন মুসলমান কখনও আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলা করতে পারেনা। তাই এরূপ অপরাধ থেকে দূরে থাকা আমাদের সকলের উচিত।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT