ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আদিত্যপুরের গণহত্যা

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৯ ইং ০১:৪০:০৬ | সংবাদটি ২১৯ বার পঠিত

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বালাগঞ্জে বেশ কয়েকটি স্থানে নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। ঘাতকদের হাতে শহীদ হন ২ শতাধিক মানুষ। ঘাতকরা নির্বিচারে নরহত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, করে অগ্নিসংযোগ আর পাশবিক নারী নির্যাতন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানী ও তাদের দোসর স্বাধীনতা বিরোধীদের সহায়তায় বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। কোন কোন গণহত্যা ইতিহাসের অন্তরালে রয়েগেছে, কোনোটা সংরক্ষিত হয়েছে। স্মৃতিসৌধ ও হয়েছে। এরকম একটি জঘন্যতম গণহত্যা হয়েছিল বালাগঞ্জ উপজেলার আদিত্যপুর গ্রামে। আদিত্যপুর বালাগঞ্জের অজপাড়া গাঁ। তৎকালীন সময়ে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিলো। ১৯৭১ সালের ১৪ জুন আদিত্যপুর গ্রামে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয়েছিলো। বালাগঞ্জের (বর্তমান ওসমানীনগর থানা) প্রভাবশালী রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরী ছাদের নেতৃত্বে পাক বাহিনীর জল্লাদদের আদিত্যপুর গ্রামে এনেছিলো। চারটি সাঁজোয়া গাড়ি বোঝাই পাকসেনারা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আধঘন্টার মধ্যেই এদেশীয় দালালদের সহায়তায় পাক বাহিনী সমস্ত গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং ঘোষণা করে যে, শান্তি কমিটি গঠন ও প্রত্যেক গ্রামবাসীকে পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা আদিত্যপুরে এসেছে। গ্রামের মানুষের মন থেকে সন্দেহ দূর হয় না। তারা বুঝে উঠে পারছিল না, শান্তি কমিটি গঠন আর পরিচয়পত্র দেয়ার জন্য ভোরে আসা কেন? অবশেষে সবাইকে আদিত্যপুর সরকারি বিদ্যালয়ের মাঠে জড়ো হতে বলা হয়। অস্ত্রের মুখে তাঁদেরকে পাক সেনারা সেখানে নিয়ে যায়। গ্রামের ৬৫ জন কে ধরে এনে কয়েক গ্রুপে ভাগ করে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। তারপর ঘটনাস্থলে আগে থেকেই অবস্থানরত পাক বাহিনীর দোসর রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরী ছাদের সাথে পাক বাহিনীর আলোচনা হয়। আব্দুল আহাদ চৌধুরীর পরামর্শ দিতেই পাক বাহিনীর জনৈক ক্যাপ্টেনের নির্দেশে সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে পাক হানাদারের হাতে থাকা রাইফেল গুলো। গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে ৬৩টি তাজা প্রাণ। অবশ্য এদের মধ্যে কয়েকজন শেষ পর্যন্ত পালিয়ে অথবা মরার ভান ধরে পড়ে থেকে নিজেদের জীবন রক্ষা করেছিলেন। সে দিন আদিত্যপুর গ্রামের ৬৩ জন নিরীহ ব্যক্তি পাক জল্লাদ বাহিনীর হাতে মর্মান্তিকভাবে হত্যাকান্ডে যাঁরা শহীদ হন তারা হলেন, আদিত্যপুরের শিক্ষক রাধিকা রায় সেন, শ্রীশ সেন, শৈলেন চন্দ্র দেব, দীনেশ চন্দ্র দেব, ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেব, সুরেশ চন্দ্র দেব, মতিলাল দেব, সুধীর চন্দ্র দাশ, বিপুল চন্দ্র দেব, সুখেন্দ্র সেন, দক্ষিণা দেব, অতুল আচ্যার্য, নরেশ দাস, হৃদয় শুক্লবৈদ্য, কৃষ্ণ শীল, গংগেশ চন্দ্র শীল, যতীন্দ্র দাস, রাকেশ শব্দকর, সুরেশ শুক্লবৈদ্য, সুধন দাস, সত্যপুরের ধনাই রাম নমশূদ্র, বিহারী বসন্ত নমশূদ্র, ইশান নমশূদ্র, বলই নমশূদ্র, নারায়ন নমশূদ্র, সতীশ চন্দ্র দাশ, দীনেশ দেব, নরেশ ধর, দিগেন দেব, দিনেশ, যতিন্দ্র দত্ত পুরকায়স্থ, খোকন, অমর দেব, ননী দেব এবং বুরুঙ্গার কলিন শব্দকর ও পরেশ শব্দকর। (সূত্রঃ সিলেটের গণহত্যা-তাজুল মোহাম্মদ) আর অনেক নাম সংগ্রহ করা এখনও সম্ভব হয় নি। অথচ উপরোক্ত হত্যাকান্ডের পর পাক বাহিনী সদর্পে এ ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেছিল, কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতিকারী পাক বাহিনীর গাড়ি আক্রমণ করলে তাদের পাল্টা আক্রমণে এরা মারা যায়। এ হত্যাকান্ড ঘটিয়ে কেবল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ক্ষান্ত হয়নি। পর মুহূর্তেই তারা গ্রামের যুবতীদের পাশবিক অত্যাচার নির্যাতন করে। আদিত্যপুরের গণহত্যার সময় গুলির আঘাতে গুরুত্বরভাবে আহত হওয়ার পর অলৌকিভাবে মৃত্যুকে জয় করে বেঁচে যান সুশান্ত গুপ্ত পুরকায়স্থ। তাঁর সাথে আমার ফুফা বালাগঞ্জ ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মরহুম হাজী ছিদ্দেক আলীর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। সে সুবাদে বিভিন্ন সময় সুশান্ত গুপ্ত পুরকায়স্থ কাকার কাছ থেকে এ করুণ কাহিনী শুনেছি। স্বাধীনতার পর বালাগঞ্জের গর্ব, মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে লাশগুলো শনাক্ত করে আদিত্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্মুখে তাজপুর-বালাগঞ্জ সড়কের পূর্বপাশে কবর দেওয়া হয়। ‘সিলেটের গণহত্যা’ গ্রন্থের লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, তাজুল মোহাম্মদ এর প্রচেষ্ঠায় তৎকালীন বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার লতিফুর রহমানের উদ্যোগে গণকবরটির সীমানা প্রাচীর তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে প্রাক্তন জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শফিকুর রহমান চৌধুরীর আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় এ গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। আদিত্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্বে শহীদ স্মৃতিসৌধটি দাঁড়িয়ে আছে। ১৪ জুন এলে শহীদ পরিবার ও বালাগঞ্জের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এসব শহীদদের। সকল শহীদদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সুনামগঞ্জের সাচনা: ইতিহাসের আলোকে
  • বদলে গেছে বিয়েশাদীর রীতি
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ঐতিহ্যবাহী পালকী
  • স্বতন্ত্র আবাসভূমির আন্দোলন
  • ইতিহাসের আলোকে নবাব সিরাজ উদ-দৌলা
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • Developed by: Sparkle IT