ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী

ফখরূল কবির খাঁ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৯ ইং ০১:৪০:৫৯ | সংবাদটি ৫১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
অবশেষে জিন্নাহ সাহেবের বিশেষ অনুরোধে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মুসলিমলীগের কোষাধ্যক্ষ ইস্পাহানী সাহেব তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে সিলেট রেফারেন্ডামের অর্থ সরবরাহ করেন। আমরা সিলেটবাসী তার এ অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সহিত স্বরণ করি। মৌলানা সাহেব ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে পাকিস্তান বিরোধী প্রতিটি এলাকায় বৃষ্টি-বাদলা উপেক্ষা করে একের পর এক জনসভা চালিয়ে নিলেন। এই রেফারেন্ডামের সময় আসাম প্রাদেশিক মুসলিমলীগের সহ-সভাপতি মরহুম আব্দুল বারী চৌধুরী এম.এ.বি. (এল.এম.এল এ) নিজ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তান বিরোধী ঘাটিতে মৌলানা ছহুল সাহেবকে নিয়া যান, ফলে দলে দলে লোকজন মুসলিমলীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়।
জৈন্তা এলাকা তখন জমিওতে উলামা হিন্দের প্রভাবাধীন ছিল। হরিপুরের খান সাহেব শায়খুল করিম মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেবকে নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় সভা করেন। তিনি মুসলিমলীগের প্রতীক কুড়াল মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং মুসলিম জনগণকে নিয়া মুসলিম রাষ্ট্রে যোগদানের কোরআন হাদিস ও ফেকাহের আলোকে দলিলাদি পেশ করে সাধারণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিচারের জন্য আহবান জানান। তাহার যুক্তি নির্ভর বক্তৃতায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রবক্তাদের অখন্ড ভারতের এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতিয়তাবাদের যুক্তির বহুপূর্ব হতে স্থাপিত বহুব্যাপীজাল ধর্মপ্রান মুসলমানদের তাওহীদি হৃদয় হতে বিলীন হয়ে যায়। এভাবে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে একের পর একজন জনসভা করার ফলে সভা সিলেটের মুসলমানরা কংগ্রেস ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের অখন্ড ভারতের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বুঝতে পারে এবং সিলেটের পাকিস্তান ভুক্তির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় মৌলানা সাহেবকে কংগ্রেসের লেলিয়ে দেওয়া গুন্ডাদের মোকাবেলা করে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলতে হয়।
এদিকে মুসলিমলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে সিলেটের গণভোটের প্রচারনার জন্য একদল নেতৃবৃন্দ সিলেটে আগমন করেন। এদের মধ্যে শাহ আজিজ, শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। আমার খালু গ্রুপক্যাপ্টেন, সুসাহিত্যিক ও সিলেট গবেষক ফজলুল রহমান সাহেব তখন সিলেট জিলা মুসলিমলীগ ষ্টুডেন্ট ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারনা সভা হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, করিমগঞ্জ অর্থাৎ তৎকালীন বৃহত্তর সিলেটে পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সহযোগীতার জন্য ছাত্রদের টিম করে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন। মুসলিমলীগ নেতৃবৃন্দের জ্বালাময়ী যুক্তিসংগত বক্তৃতার মাধ্যমে সিলেটের মুসলমানরা তুলনামূলক ভাবে বুঝতে পারে ভারতের সাথে থাকলে তাদের কি পরিণতি হবে এবং পাকিস্তানে যোগ দিলে তাদের অবস্থান মর্যাদা ধর্মীয় স্বাধীনতা কতটুকু লাভ হবে।
কলিকাতার হিন্দুরা রায়টের মাধ্যমে কিভাবে মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এসব দেখার করুণ দৃশ্যের বর্ণনা শেখ মুজিব সিলেটের মুসলমানদের সামনে জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। এভাবে একদিকে মৌলানা সাহেবের যুক্তিসংগত বক্তৃতা ও দোয়া এবং অন্যদিকে মুসলিমলীগ নেতাদের জনসভার মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্য পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। বৃহত্তর সিলেটের মুসলিম নারীরা পুরুষের সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়লেন। সিলেটের নারীদের মধ্যে এই উচ্ছাস দেখে কংগ্রেস ও জমিওতে উলামায়ে হিন্দ উদ্ভিগ্ন হয়ে পড়ে। সিলেটের মুসলিম নারীদের কে ভোটদান থেকে বিরত রাখতে জমিওতের মৌলানারা ফতওয়া দিলেন। নারীদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া হারাম ও পর্দার খেলাপ। এই ফতওয়া সিলেটের অভিজাত রক্ষণশীল মহিলাদের মনে দারুন রেখাপাত করে। এই নাজুক অবস্থায় মৌলানা ছহুল উসমানী এগিয়ে আসেন। তিনি কুরআন ও হাদীসের আলোকে দ্ব্যের্থহীন ভাবে ফতওয়া জারি করে ঘোষণা করলেন। পর্দার মধ্যে থেকে মুসলিম নারীদের ভোট প্রদান ফরজ এবং শরীয়ত সম্মত। এ ভোটের মাধ্যমে জ্বিহাদে অংশ নেয়া প্রত্যেক মুসলিম নারীর অবশ্য কর্তৃব্য এ ফতওয়া দৃশ্যপট বদলে ফেলে। জমিওতে উলামায়ে হিন্দের কণ্ঠ স্থব্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত তারিখে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সিলেটের মুসলিম নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে স্ততঃস্ফুর্তভাবে গণভোটে অংশগ্রহন করেন। গণভোট বিপুল ভোটে সিলেট পাকিস্তানে অর্ন্তর্ভূক্তির রায় ঘোষিত হয়। উল্লেখ্য রেডক্লিফ মিশনের পক্ষপাতিত্তের ফলে ও কংগ্রেস নেতাদের গোপন যোগাযোগের কারনে এবং সিলেটের তৎকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলার মৌন সমর্থনে করিমগঞ্জ মহকুমার প্রায় ০৩টি থানা ভারতের সাথে সংযুক্ত হয়-যা প্রাচীনকাল থেকে সিলেটের অংশ ছিল।
বৃদ্ধবয়সে অসুস্থ্য শরীর নিয়ে মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেব প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারনায় সক্রীয় অংশগ্রহন করার ফলে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তৎকালীন খাসীয়া ও জৈন্তাহিলস(শীলং) এর প্রথম ভারতীয় জেলা প্রশাসক জনাব সৈয়দ নবীব আলী সাহেবের বিশেষ আমন্ত্রণে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য মৌলানা ছহুল উসমানী, তার ছেলে এবং অন্য একজন মৌলানা ডি.সি সাহেবের বাংলো তে অবস্থান করেন। প্রতি বেলা নামাজের সময় উচ্চস্বরে আজান দিতেন। ডি.সির বাংলোতে পৃথিবী সৃষ্টির পর খুব সম্ভব প্রথম আজান ধ্বনী উচ্চারিত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সৈয়দ নবীব আলী সাহেব সিলেটের জেলা প্রসাশক হিসাবে যোগদান করিতে সিলেট চলে আসেন। মৌলানা সাহেবও উনার সাথে সিলেটে চলে আসেন। সৈয়দ নবীব আলী সাহেবের সাথে মৌলানা সাহেবের পরিচয় ছিল অনেক বছর পূর্ব থেকে। ১৯৩৮ সালে সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসায় টাইটেল ক্লাস শুরু করার শর্ত হিসাবে উপযুক্ত ব্যাক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন প্রথম মৌলানা হুসেন আহমদ মদনীকে অনুরোধ জানাইলে তিনি তা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তিনি মৌলানা ছহুল উসমানী নাম প্রস্তাব করেন।
আসাম সরকার তথা সিলেটবাসী অনুরোধে মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেব সিলেট আলীয়া মাদ্রসায় প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন। মৌলানা সাহেবের অবস্থানকালীন সময়ে ১৯৪৩ইং সনে সৈয়দ নবীব আলী সাহেব সিলেটের এডিশনাল ডিষ্টিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন এবং ভাগ্যক্রমে মৌলানা সাহেবের বাসা সংলগ্ন বাসায় নবীব আলী সাহেব বসবাস করতেন। ছহুল উসমানী সাহেবের মত একজন পন্ডিত, দরবেশ ব্যাক্তিকে প্রতিবেশী পেয়ে ডি.সি সাহেব কৃতজ্ঞ ছিলেন। মৌলানা সাহেবের ব্যক্তিত্ব,জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বিশেষ করে শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর দরগা মসজিদে তার ওয়াজ এবং দোয়া ডি.সি সাহেবকে বিমোহিত করে।
মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেব বিভিন্ন মেয়াদে সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় চাকুরীর সুবাদে সিলেট অবস্থান করার কারনে তৎকালের শহরের তথা বৃহত্তর সিলেটের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। কে কার চেয়ে বেশী হুজুরের সংস্পর্শে আসবেন এ নিয়ে রীতিমত প্রতিন্ধিতা চলতো। তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি-মজদউদ্দিন চৌধুরী, (সুন্নাত চৌধুরী সাহেবের পিতা),প্রিন্সিপাল এম.সি কলেজ,খান বাহাদুর আব্দুল্লা আবূ সায়ীদ, (প্রাক্তন প্রিন্সিপাল এম.সি কলেজ), শমসুল উলামা মৌলানা আবু নছর ওহীদ (প্রাক্তন মন্ত্রী), এ জেড আব্দুল্লাহ সরকুম মতোয়াল্লী শাহজালাল দরগা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত এ.ডি.ম, জহীর উদ্দিন আহমদ অবসরপ্রাপ্ত এ.ডি.সি, সৈয়দ আওলাদ হোসেন অবসরপ্রাপ্ত মুন্সিফ, অধ্যাপক ইসহাক মোহাম্মদ, নুরুল হক সম্পাদক আল-ইসলাহ, আছাবুর রাজা চৌধুরী,সদস্য লোকেল বোর্ড সুনামগঞ্জ, মুসলিম চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় স্কুল ইনেসপেক্টর, সৈয়দ তফজ্জুল হোসেন লাইব্রেরিয়ান সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা, নজমুল হোসেন চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল ইনেসপেক্টর, হোসেন বখত মজুমদার, দেওয়ান আব্দুল হামিদ চৌ. (ইটা), ইউসুফ মাচ্র্ন্টে, আব্দুল খালিক মার্চেন্ট, কৌলার সৈয়দ বদরুল হোসেন, কানিহাঠির মান্নান চৌ., ছাতকে আব্দুল হাই আজাদ, চাউতলীর মইনউদ্দিন আহমদ চৌ. সচিব, প্রিন্সিপাল লুৎফুর রহমান গং।
মৌলানা ছহুল উসমানী সাহেবের প্রতি বৃহত্তর সিলেটের এলিট শ্রেণির আকর্ষনের অন্যতম কারণ হচ্ছে কোরআন ও সুন্নাহ আলোকে ব্যক্তিজীবনে অনুশীলনে তার নিরবধি প্রয়াস। এ প্রসংগে একটি উদাহরণ এখানে না দিয়ে পারছি না। একবার সিলেটের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মৌলভী আব্দুল করিম সাহেব (পাঠানটুলায় আব্দুল হামিদ মন্ত্রী সাহেবের চাচা) সুরমা ভ্যালী মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য সিলেট শহরে আগমন করেন। তৎকালীন সিলেটের শেখঘাটের বিশিষ্ট জমিদার খান বাহাদুর আবু নছর, এহীয়া(জিতু মিয়া) সাহেবের বাড়িতে মধ্যান্য ভোজের নিমন্ত্রণে,ক্যাভেজে চড়ে আব্দুল করিম ও মৌলানা ছহুল উসমানী গমন করেন। পথে ছহুল উসমানী সাহেব খুব অস্বস্থি বোধ করেছিলেন। করিম সাহেব এ অস্বস্তির কারণ জিজ্ঞেস করলে মৌলানা সাহেব বললেন ছাত্ররা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে তাই তিনি গাড়ী থেকে নামার অনুমতি নিয়ে পায়ে হেঁটে ছাত্রদের সাথে নিমন্ত্রণস্থলে পৌছেলেন। ছহুল সাহেবের ব্যক্তিজীবনে ইসলামের এ অনুশীলন দেখে করিম সাহেব বিমোহিত হলেন।
সিলেটের এলিট শ্রেণী মৌলানা সাহেবের নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশী উদ্বীগ্ন থাকতেন। সিলেটের ঐতিহ্যশালী সুপ্রসিদ্ধ মজুমদার পরিবারের দেশ ও সমাজসেবী সর্বজন মান্য সিলেটের কৃতিসন্তান সৈয়দ বখত মজুমদার সাহেব বিহার রায়টের পর মৌলানা সাহেবকে সিলেট স্থায়ীভাবে চলে আসার জন্য স্বয়ং ভগলপুরের পুরেয়নীতে গিয়ে নিবেদন করেন এবং রেফারেন্ডামের সময় মৌলানা সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র গিয়াছেন। রেফারেন্ডামের পর ঈদুল-আজহা উপলক্ষে আবার বিহারে রায়েটের আশংকা হওয়ায় সিলেট বাসীর পক্ষ থেকে সৈয়দ তফজুল হোসেন সাহেব কে (দরগা পাক্কাবাড়ী) মৌলানা সাহেবের পরিবারের সকল লোককে সিলেট আনয়ন করিতে গেলে মজুমদার সাহেব তাহার পুত্র আবু জর হোসেন বকত মজুমদার (বাবু মিয়া) কে তার সঙ্গী হিসেবে প্রেরণ করেন। এভাবে বৃহত্তর সিলেটের এলিট শ্রেণী বিভিন্ন সময়ে মৌলানা সাহেবের খোজখবর নিতে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সৈয়দ তফজুল হোসেন সাহেবের বিহারে পাঠান। সৈয়দ তফজ্জুল হোসেন সাহেবকে রেফারেন্ডাম সহ সর্বক্ষণ মৌলানা সাহেবের খেদমতে নিজেকে থাকার সুযোগ পান।
সিলেটের মীরের ময়দানের প্রাক্তন স্কুল ইন্সপেক্টর নজমুল হোসেন চৌধুরী রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সিলেটকে মুসলিম দেশভুক্ত করার ক্ষেত্রে মৌলানা সাহেবের ভূমিকাকে হজরত শাহজালাল (র.) এর সিলেটবাসীকে ইসলামের ছায়াতলে নেয়ার সাথে তুলনা করেছেন। নজমুল হোসেন চৌধুরী ১৯১৮ সালে কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাশ করে সিলেট এম.সি. কলেজে ভর্তি হোন। এদিকে মৌলানা ছহুল উসমানী ১৯১৮সালে হেডমৌলানা হিসেবে সিলেট আলীয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন। সৌভাগ্যক্রমে ছহুল সাহেবকে মাদ্রাসা ক্যা¤পাসে অবস্থিত সরকারী কলেজ হোস্টেলের নজমুল হোসেন চৌ. সাহেবের রোমে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে নজমুল হোসেন সাহেব ছাত্রবস্থায় এ দরবেশ তুল্য ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান।
রেফারেন্ডামের পর সিলেটের এলিট শ্রেণী সম্মিলিত ভাবে ছহুল সাহেবকে সিলেটে স্থায়ীভাবে বসতিস্থাপনের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাইলে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজী হন। হুজুরের সম্মতি পেয়ে সাথে সাথে জেলা প্রশাসক সৈয়দ নবীব আলীকে সভাপতি এবং এডভোকেট আব্দুল হাফিজ কে সেক্রেটারী করে একটি কমিটি গঠিত হয়। সিলেটের মার্চেন্ট শ্রেণী ভূমি ক্রয় ও ঘর নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিশিষ্ট মার্চেন্ট জনাব ইউসূফ ফাজিল চিস্ত মহল্লায় ভূমি দান করেন। উসমান মিয়া মার্চেন্ট ও তার পুত্র সহ অন্যান্য বর্ণাঢ্য মার্চেন্টগণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ঘর নির্মাণ করে দেন। ঘর নির্মাণের পর ছহুল সাহেবের তার ২য়পুত্র মৌলানা মাহমুদের নামে ভূমি দান করার অনুরোধ করেন। কারণ এ ছেলে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে জন্মভূমি বিহার ছেড়ে সিলেট হিজরত করতে সম্মত হয়েছেন। উনি আলীয়া মাদ্রাসায় মুদররিছের পদে কাজ করেন। নবনির্মিত ঘরে মৌলানা ছহুল সাহেব কিছুদিন অবস্থান করার পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার হেকিমগণ তাকে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য নিজ জন্মভূমিতে যেতে উপদেশ দেন। ২৪/০৪/১৯৪৮ইং তারিখে তিনি বিহারে নিজ বাড়িতে পৌছেন। ২৪/৫/১৯৪৮ ইং তারিখে এ মহাপুরুষ ৭২ বৎসর বয়সে সোমবার রাত ১১ টায় ইন্তেকাল করেন। (ইন্না... রাজিউন) তার মৃত্যুর সংবাদে সিলেটে শোকের ছায়া নেমে আসে। সিলেটের প্রতি তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ এবং তার স্মৃতিকে অমর রাখার উদ্দেশ্যে সিলেট পৌরসভা সিলেট শহরের জিন্দাবাজার থেকে লামাবাজার পর্যন্ত রাস্তার নাম 'মৌলানা ছহুল রোড' নামকরণ করেছে ইতিহাসে। বর্তমানে এ নাম মুছে গেলেও সিলেট বাসীর হৃদয়ে ও ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। আমি বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাহেব কে এর নাম ফলক পুনঃ স্থাপনের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের পূর্বসূরীরা তার প্রতি যে দায়িত্ব পালন করেছেন-তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সিলেটবাসীতো অকৃতজ্ঞ নয়। তার এ ঐতিহাসিক অবদানের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য বর্তমান সিলেটের সুধিসমাজের আরোও অনেক কিছু করার রয়েছে। রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সিলেট মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে যোগ দান করার কারণে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক, আমরা নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে নিজ ধর্মপালন সহ সব নাগরিক আধিকার ভোগ করছি। অথচ সিলেটের যে অংশ করিমগঞ্জ ভারতের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেখানের মুসলমানেরা কি ভীত সন্ত্রস্ত্র অবস্থায় ধর্মকর্ম পালনসহ দিনাতিপাত করছেন- তা যাদের আতœীয়স্বজন সেখানে রয়েছেন-তাদের বক্তব্য শুনলেই বুঝতে পারবেন।
ভারতের বুকে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র লাভ করেছি। পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। কাশ্মীর, পাঞ্জাব, আসাম, তামিলনাড়–, মিজোরাম, নাগাল্যান্ডসহ ভারতের কোন প্রদেশ কি স্বাধীন হতে পেরেছে? বরং হায়দারাবাদ, সীকিম, জুনাগড়, মানভাদর সহ বহু অঞ্চল তাদের স্বাধীনতা হারিয়েছে।
পরিশেষে পাকিস্তানের রুহানী প্রতিষ্ঠাতা ও সিলেটের গণ ভোটের অগ্রনায়ক আল্লামা হজরত মৌলানা ছহুল উসমানীর (র.) পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও সিলেটের গণভোটে অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করে এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আজকের কলাম এখানেই শেষ করছি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • Developed by: Sparkle IT