উপ সম্পাদকীয়

জেগে ওঠো স্বউদ্যোগী বাংলাদেশ

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৯ ইং ০১:৪২:৪৪ | সংবাদটি ২১৬ বার পঠিত

বাংলাদেশীয় সমাজের গৌরবময় অতীতের রীতি নীতি, আচার, অনুষ্ঠান, সংহত হওয়ার ক্ষমতা, সাংগঠনিক ভাবে সামাজিক কর্মকা- পরিচালনার দক্ষতা এসব বিষয়কে আমাদের দেশের বিজ্ঞজনদের একটি বড় অংশ খুব একটা আমলে নিতে চান না, বিষয় গুলোকে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা তাদের আলাপ আলোচনা ও লেখালেখিতে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অথচ উন্নত দেশগুলো নিজেদের অতীত সামর্থ্যকে গবেষণার মাধ্যমে বের করে নিয়ে এসে এর উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের পথ চলার রূপরেখা প্রনয়ন করে থাকে। আমাদের অতীত ঐতিহ্য বলতে আমরা শুধুমাত্র হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিষয়টিকে বোঝাতে চেষ্টা করি। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবশ্যই আমরা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরব, কিন্তু আমাদের সমাজের স্বভাব নেতাদের সেচ্ছ্বাসেবা প্রদানের গৌরবময় ঐতিহ্য, সমাজের মানুষের প্রতি সমাজনেতাদের স্বতঃস্ফূর্ত দায়বদ্ধতা, মধ্যবিত্ত সমাজনেতাদের সাংগঠনিক উদ্যোগ, কিছু কিছু উচ্চবিত্ত মানুষের মহানুভবতার কারণে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য হাসপাতাল নির্মাণ, গ্রামে গ্রামে এবং মফস্বল শহরে লাইব্রেরী স্থাপন, সমাজ কল্যাণ সংগঠনের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষদের কল্যাণে এগিয়ে আসার অজস্র উদাহরণ বাংলাদেশে প্রতিটি জেলাতেই এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এসব মহৎ জনহিতকর কর্ম কা- সমাজ নেতারা নিজেদের উদ্যোগেই সেচ্ছ্বাসেবি মানসিকতা নিয়ে সম্পাদন করতেন। স্বউদ্যোগে সাধিত এরকম কর্মকা-কে পৃষ্ঠপোষকতা না দিয়ে সমাজ ও সরকার এসব মহৎ উদ্যোগের অধিকাংশকে অকার্যকর ও কোন কোন ক্ষেত্রে বিলীন হয়ে যেতে সহায়তা করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে এরকম উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা, সংগঠনকে ব্যপকহারে রাজনীতিকরণের মাধ্যমে সংস্থাগুলোর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে আমরা গলাটিপে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছি কিংবা তাদের মহৎ প্রচেষ্টাকে চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছি। এসমস্ত অপকর্ম করে আমরা শুধুমাত্র কিছু মহৎ কর্মকা-কেই থামিয়ে দেইনি, আমাদের সমাজে প্রচলিত স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতাকেও অনেকাংশে বিলীন করে দিতে সক্ষম হয়েছি। কোন কোন সময়ে আমাদের বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা এ রকম স্বেচ্ছা সেবার কাজ গুলোকে শোষণের জন্য শোষকের উদ্যোগ বলে চিহ্নিত করে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সভ্য ও উন্নত দেশে এরকম স্ব উদ্যোগে সাধিত কর্মকা-কে সমাজ ও সরকার পৃষ্ঠ পোষকতা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে আরও সফল ও কার্যকর করতে সহায়তা করেছে। আমি বলব না যে স্বউদ্যোগে সম্পাদিত সকল কর্মকা- সর্বক্ষেত্রেই সৎ উদ্দ্যেশে স্থাপিত ও পরিচালিত হতো, কিছু কিছু কর্মকা-ের উদ্দ্যেশ্য অবশ্যই বহুমুখী অসৎ মানসিকতা দ্বারা পরিচালনা হত। এ’বলে তো আমরা ব্যাপক ভাবে পরিচালিত স্বউদ্যোগের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে তাঁর পৃষ্টপোষকতা ও চলার গতিকে থামিয়ে দিতে পারিনা। এরকম প্রচেষ্টা হল বহুল কথিত, মাথা ব্যথা নিরসনের জন্য মাথা কেটে ফেলে দেয়ার নামান্তর মাত্র ।
স্বউদ্যোগে স্থাপিত ও পরিচালিত কর্ম কা-গুলোকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় কমিউনিটি লেড ডেভলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা জনউদ্যোগে উন্নয়ন কর্মকা- হিসাবে অভিহিত করা হয়। জন-উদ্যোগে উন্নয়ন কর্মকা-ের বৈশিষ্ট হল, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ন করেন জনগণ, উন্নয়নের জন্য সম্পদের যোগান দেন জনগণ, নেতৃত্বে ও বাস্তবায়নে ও জনগণের ভুমিকা থাকে প্রধান। জনগণের প্রয়োজনে যেহেতু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সাধন হয়ে থাকে তাই রক্ষনাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকা-কে এগিয়ে নিতে মুখ্য ভুমিকাও থাকে জনগণের। বাংলাদেশে প্রাচীন ও মধ্য যুগে জনউদ্যোগে গঠিত পঞ্চায়েত প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থে। পঞ্চায়েতই সাধারণত জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতেন। সমাজের অভিভাবক হিসাবে পঞ্চায়েত স্বউদ্যোগে স্থানীয় জনসংগঠন হিসাবে কাজ করে যেতো। পঞ্চায়েত ছিল পাঁচ জন সদস্য বিশিষ্ট। গ্রামীণ সমাজে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত (acceptable and respectable) ব্যক্তিরাই পঞ্চায়েতের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হতেন। জনগণের মতামতের উপর ভিত্তি করে সামাজিক প্রয়োজনে পঞ্চায়েত প্রথার উদ্ভব ঘটে। পঞ্চায়েত তাই অনানুষ্ঠানিক জনসংগঠন হিসাবে জগণের আস্থা নিয়ে কাজ করে যেত। “বৃটিশ আমলের পূর্বে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় আমলে খ্রীষ্ট পূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দে গ্রাম পরিষদের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪-১৮৩ অব্দে মৌর্য বা মৌর্য পূর্ব যুগে গ্রাম প্রশাসনের অস্তিত্বের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। বৃটিশ শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে ও বৃটিশদের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করার জন্য লর্ড মেয়ো ১৮৭০ সালে চৌকিদারী আইন পাশ করেন। এর ফলে প্রথমবারের মত আনুষ্ঠানিক স্থানীয় সরকারের উদ্ভব হয় এবং পঞ্চায়েত প্রথার পুনরাবৃত্তি ঘটে। “পঞ্চায়েতের বিষয়ে একটি পর্যবেক্ষণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, যখনই পঞ্চায়েতকে আইন দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, পঞ্চায়েত তার স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতাকে ক্রমাগত হারাতে বসেছে, পঞ্চায়েত যখন স্ব উদ্যোগে কাজ করেছে তখন তার কর্মকা- প্রাণবন্ত ও গণমুখী ছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক পঞ্চায়েত প্রথা নিয়ে এতো কথা বলার উদ্দেশ্য হল, আমাদের বাংলাদেশের সমাজে যে সর্বযুগে সামাজিক সংগঠন সমাজের অভিভাবক হিসাবে সামাজিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসাবে কাজ করে যেতো সে বিষয়টি পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা। জনউদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবা দ্বারা সমাজকল্যাণের কর্মকা- কি এখনো প্রাসঙ্গিক? আমরা কি আবার পঞ্চায়েত প্রথা দ্বারা সামাজিক কর্মকা- পরিচালিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করবো? আমার মনে হয় বিষয়টি খোলাসা করা প্রয়োজন। আমরা স্বেচ্ছা সেবা, স্বউদ্যোগ, জনগণকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকা- পরিচালনা করার গৌরবময় অতীতের সেই স্পিরিট বা অন্তর্নিহিত ধারাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চাই, আত্বনির্ভরশীলতার মূল বাণী বা কোর ম্যাসেজকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই আধুনিক সমাজের চাহিদা বিবেচনা করে। আমরা পশ্চিমা বিশ্বের উন্নয়ন মডেলকে হুবহু অনুকরন করতে চাই না, আমাদের গৌরবময় অতীতের অনুকরণীয় কর্মকা-কে অনুসরন করতে চাই যুগের চাহিদা বিবেচনা করে। এ বলে আমরা পশ্চাতপদ হতে চাচ্ছি এরকম ধারণা কেউ পোষণ করলে ভুল করবেন, উন্নয়নের আধুনিক ও যুগপোযোগী মডেলকে অবশ্যই আমরা আত্বীকরণ করতে চাই, আমাদের দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে, এ বিষয়ে আশাকরি ভুল বুঝাবুঝির কোন অবকাশ থাকবে না। আমরা অবশ্যই প্রগতিকামী, তবে অতীতের গৌরবময় অনুসরণযোগ্য উদ্ভাবন কিংবা প্রমাণিত চিরন্তন রোল মডেলকে ধারণ করে এগুতে চাই আমরা।
সম্প্রতি বহুল আলোচিত ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, স্ব উদ্যোগ ও স্বেচ্ছাসেবার প্রয়জনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায় নি, ঢাকার যে সমস্ত ক্রীড়া সংগঠন বা ক্লাবে অনৈতিক ভাবে ক্যাসিনো পরিচালিত হতো সেসব ক্লাবের কর্তা ব্যক্তিরা এখন বলছেন, ক্যাসিনো থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তারা তাদের অনৈতিক ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের সাথে সাথে ক্লাবের খেলাধুলার ব্যয়ও নির্বাহ করতেন, অনৈতিক এ অর্থ আয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে খেলাধুলা পরিচালনা এখন চরম ঝুঁকির সম্মুখিন। কেন এই অনৈতিক পথে অর্জিত অর্থ দ্বারা খেলাধুলা পরিচালনা? লোভী ও স্বার্থান্ধ কর্তা ব্যক্তিদের মানসিকতায় স্বেচ্ছাসেবার পরিবর্তে অবৈধ ও অনৈতিক পথে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যই দিনে দিনে এ বিষবৃক্ষ কে বেড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। চরম অনৈতিক পথ অনুশীলনের মাধ্যমে কেন ক্লাব পরিচালিত হত? এর একমাত্র উত্তর স্ব উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবা, জনকল্যাণের মনোবৃত্তি পরিহার করে, ক্লাব বা সংগঠনকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার বা ভ্যহিকেল হিসাবে ব্যবহার করা। ক্লাবের কর্তা ব্যক্তিদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি, রাতারাতি বিত্তশালি হওয়ার রাক্ষুসী লোভ আজ ক্লাবের মতো নির্মল ক্রীড়া সংগঠনকে পথে বসানোর উপক্রম করে, দেশের ক্লাব নির্ভর খেলা ধুলাকে চরম ঝুঁকি ও অস্তিত্ব হীনতার পর্যায়ে উপনীত করে ফেলেছে। আমাদের সংগঠন বা ক্লাবগুলো কি সদস্যদের চাঁদায় এবং বিত্তশালিদের আনুকুল্যে কখনো পরিচালিত হয়নি? ক্লাবের কর্তারা কখনো ক্লাব থেকে লাভজনক আয় হিসাবে অর্থ গ্রহণ করতেন না, বড়জোর তাদের অবদানকে মূল্য দিতে ক্লাবগুলো প্রতীকি ভাবে তাদেরকে কিছুটা সম্মানি প্রদান করতো।
ক্যাসিনো লেলেঙ্কারি ও তাঁর সাথে যুক্ত ক্লাব গুলো শুধু একটি ক্ষেত্রের উদাহরণ মাত্র, সামাজিক ভাবে সকল জনকল্যাণমুলক উদ্যোগ এখন একই রকম নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার। সময় এসেছে আমাদের পুরনো ঐতিহ্যকে জাগিয়ে তোলার, পুনুরুত্থানের জন্য সমাজে এখনো বিপুল পরিমান শুভবুদ্ধিসম্পন্ন উদ্যোগী মানুষ উৎসাহ সহকারে অবস্থান করছেন আমরা বিশ্বাস করি। স্বগউদ্যোগে যারা স্বেচ্ছাবাসেবায় কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের সমাজের সেইসব “পলান সরকার”দের একত্রিত করতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে। আমার বিশ্বাস আবার চিরায়ত বাংলাদেশ জেগে উঠবে, যে বাংলাদেশ বারবার জেগে উঠে স্ফিনিক্স পাখীর মতো, শত বাধা, শত বিপত্তিকে বুক পেতে মোকাবেলা করে। আমরা প্রত্যাশায় থাকবো জেগে ওঠার সম্মিলিত ধ্বনি শোনার জন্য, কারণ জেগে যদি না উঠে শুভশক্তিসম্পন্ন মানুষ গুলো, তাহলে আমাদের জাতীয় কবির স্বপ্নের সকাল কি করে আমরা ছিনিয়ে আনবো । প্রত্যাশায় থাকবো, আমি এবং আমরা যারা বাংলাদেশের ব্যপারে চরম আশাবাদি সাধারণ নাগরিক ।
লেখক : সমাজ গবেষক, প্রাবন্ধিক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • Developed by: Sparkle IT