উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎস

মো: লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১০-২০১৯ ইং ০১:৪৫:৩৩ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত

বিজ্ঞানীরা আশংকা প্রকাশ করছেন এবং করেই যাচ্ছেন যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হলে তা হবে পানি বিরোধের কারণে। বিশ্বব্যাপী পানির অভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে কোথাও কোথাও তা মানবিক দুর্যোগে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। পানি সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজতে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব পানি সম্মেলন। সম্মেলন উপলক্ষে ১৫ টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন দেশের নানা স্তরের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন সেখানে। আর তাঁদের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে পুরো শহরের পানি সরবরাহে রেশনিং শুরু করা হয়েছে। অথচ ব্রাজিল সুপেয় পানির জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ। তাই সুপেয় পানির যে ভয়াবহ সংকট এগিয়ে আসছে, তা নিয়ে সারা দুনিয়ায়ই নতুন করে চিন্তাভাবনা শুর হয়েছে। কিন্তু আমরা কি করছি এ বিপদ মোকাবিলায়?
নদী-নালার দেশ বাংলাদেশেও পানির সমস্যা কিন্তু কম নয়। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকাসহ কয়েকটি বড় শহরে পানির অভাব তীব্র হয়। কোথাও কোথাও তৃষ্ণার্ত মানুষকে ঘটি-বাটি নিয়ে মিছিলে নামতেও দেখা যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ অনেক স্থানে পানির অভাবে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক জায়গায় গভীর নলকূপেও পানি ওঠে না। নদী-নালা-বিল বেশির ভাগই ভরাট হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে সেগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে। জমিতে সেচ দেয়ার কোনো উপায় থাকে না। এই সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং আরো তীব্র হবে। কারণ এখন পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন কাজে প্রায় পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। নদী-নালা-খাল-বিলে সারা বছর পানি না থাকায় ভূগর্ভে পানির প্রবেশও কম হচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও পানির স্তর প্রতিবছর দুই থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। অন্যদিকে আমাদের প্রায় সব নদীর উৎস অন্যান্য দেশে হওয়ায় নদীগুলোতে পানির অভাব হচ্ছে। উজানে থাকা দেশগুলোতে বাঁধ দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ করা হয়। ফলে শুল্ক মৌসুমে আমাদের নদীগুলো দ্রুত শুকিয়ে যায়। অনেকেই
আশংকা করছেন, বাংলাদেশে সুপেয় পানির অভাব শিগগিরই চরমে পৌঁছবে। কিন্তু আমরা কি সেই পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করছি? পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাবই এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দখল,দূষণ ও ভরাটের হাত থেকে নদী ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্ষার বা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানিভরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হবে। আমাদের দেশে শুধু ঢাকা শহর নয়, নিরাপদ পানির সংকট সারা দেশেই। জনস¦াস্থ্যের জন্য নিরাপদ পানি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে বলবার কিছু নেই। সরকারিভাবে দাবি করা হয় যে, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির আওতায় এসেছে আরো চার বছর পূর্বেই। বর্তমানে এ হার আরো বেশি। ২০৩০ সালের আগেই শতভাগ মানুষকে নিরাপদ পানির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কিন্তু আমরা জানি, এ কাজটি সহজ নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগর সভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং প্রযুক্তিগত ভিন্নতায় পানি ব্যবহারের ধরনের পরিবর্তন হয়েছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ মানুষ কমবেশি সুপেয় পানি সমস্যায় ভুগছেন।
নিরাপদ পানির অভাবে পৃথিবীতে বছরে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায় , যাদের অধিকাংশই শিশু। কেবল তাই নয় , বিশ্বের প্রায় ১০৭ কোটিরও বেশি মানুষ নদী অববাহিকায় বসবাস করে ও পানির চাহিদা মিটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। মনুষ্যসৃষ্ট ৮০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত বর্জ্যপানি প্রকৃতিতে ফিরে গিয়ে সৃষ্টি করছে বড় আকারে পরিবেশ দূষণ। পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্বে এখনো সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষ বাংলাদেশেই বসবাস করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ এখনো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহ দুষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে। মলের জীবাণু রয়েছে এমন উৎসের পানি পান করছে বাংলাদেশের ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ। আবার ঘরের কল বা টিউবওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকার কারণে বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যাও প্রায় ১০ কোটির কাছাকাছি। কয়েক বছর পূর্বে তৈরি করা জরিপে নিরাপদ পানির এ চিত্রই প্রকাশ পায়। পানির অপর নাম জীবন- সবচেয়ে পুরাতন চিরায়ত এ কথাটির প্রতিফলন যেন দেশের উন্নতির গ্রাফের সঙ্গে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সামাজিক অবক্ষয় ও জননিরাপত্তার অবকাঠামো
  • শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদা
  • ১৯৭০ এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ
  • একাত্তর :আমার গৌরবের ঠিকানা
  • সড়ক দুর্ঘটনা কি থামানো যায় না?
  • চিকিৎসা সেবা বনাম ব্যবসা
  • নীরব ঘাতক প্লাস্টিক
  • সার্থক জীবন মহত্তর অবদান
  • প্রযুক্তির বিশ্বায়ন বনাম তরুণ সমাজ
  • মানবিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশ
  • খাদ্য চাহিদা পূরণে উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য
  • শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কিছু কথা
  • সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
  • বৃটিশ সাধারণ নির্বাচন-২০১৯
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রা সফল হোক
  • লক্ষ্য হোক সুষম সামাজিক উন্নয়ন
  • জননী ও জন্মভূমি
  • অপরূপ হেমন্ত
  • বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চাই
  • শ্যামারচরের বধ্যভূমি ও দিরাই-শ্যামারচর রাস্তা
  • Developed by: Sparkle IT