উপ সম্পাদকীয়

মাওলানা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৯ ইং ০০:২০:০২ | সংবাদটি ৬৬ বার পঠিত

মানুষ মরণশীল। দুনিয়ার জীবন একেবারেই ক্ষণস্থায়ী। সময়ের ব্যবধানে সবাইকে চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে। যে জীবনের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে বলা হয় চিরস্থায়ী জীবন। কিছু কিছু মানুষের চলে যাওয়া অসংখ্য মানুষকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু তারা চলে গেলেও তাদের কর্মই তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে মানুষের অন্তরে কাল হতে কালান্তরে। তাইতো কবি বলেছেন, ‘এমন জীবন করিবে গঠন-মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন’। এমনই একজন মহান আধ্যাত্মিক রাহবার ছিলেন, সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম প্রিন্সিপাল মাওলানা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি (রহ:) (১৯৪৩-২০১৯)। শামসুল উলামা হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (রহ:) এর অন্যতম খলিফা ও জালালপুর জালালীয়া আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ, মাওলানা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব (রহ:) গত ৩ অক্টোবর ২০১৯ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তার মহান রবের ডাকে সাড়া দেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তার ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিক জীবন তথা জীবনের সকল পর্যায়েই তিনি ছিলেন্ আদর্শ মানবের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি ও সুন্নতে নববীর এক জীবন্ত প্রতিকৃতী। তিনি একদম সাদামাটা জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, বিশেষ করে ন¤্রতা,ভদ্রতা ও সদালাপীতা ছিল তার অনন্য বৈশিষ্ট্য। তার জীবনী পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, তিনি সামাজিক, আধ্যাত্মিক, ও শিক্ষকতার ক্ষেত্রে এক অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আলেম ছিলেন। নিম্নে তার বর্ণাট্য জীবনের সামান্য আলোকপাত করা হলো।
অধ্যক্ষ মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব (রহ:) ১৯৪৩ সালের ১৫ই মে সিলেট জেলাধীন জকিগঞ্জ উপজেলাস্থ ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের বালাউট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মো. রছমান আলী এবং মাতা-মোছাম্মাত জয়নব বিবি। ৩ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ২য়। প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তার পিতা-মাতার কাছেই। মক্তবে যখন তিনি কায়দা শেষ করে ‘আমপারা’ তে সবক নিলেন তখন তাঁর পীর ও মুরশিদ হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ) তাঁকে সড়কের বাজার জয়পুর গ্রামের কুতুব আলী মিয়ার বাড়িতে লজিং করে দিয়ে বললেন, ‘এই ছেলেকে তোমার দায়িত্বে দিয়ে দিলাম। তুমি মাদরাসাতে ভর্তি করে দেবে।’ সেই বছরই ১৯৪৭ সালে মাওলানা শুয়াইবুর রহমান সড়কের বাজার আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৪৯ ইং সালে বাড়ির নিকটস্থ হাড়িকান্দি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর ইছামতি দারুল উলুম কামিল (এম.এ) মাদরাসা থেকে ১৯৫৬ ইং সালে দাখিল এবং ১৯৫৮ ইং সালে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উক্ত মাদরাসা থেকে ১৯৬০ ইং সালে ফাজিল পাশ করে ভর্তি হন সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসায় এবং ১৯৬২ ইং সালে কৃতিত্বের সাথে কামিল উত্তীর্ণ হন।
ছাত্র থাকাকালীন সময়েই ১৯৬০ইং সালে তিনি বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসার খন্ডকালীন সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ইং সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানেই প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করে কর্মজীবনের সূচনা ঘটিয়ে ১৯৭৫ইং সাল পর্যন্ত দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। ১৯৭৬ইং সাল থেকে ১৯৮২ইং সাল পর্যন্ত আটগ্রাম আমজদিয়া মাদরাসায় প্রধান শিক্ষকের পদে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮২ইং সাল থেকে সিলেট সদরস্থ (বর্তমান দক্ষিণ সুরমা) আলালপুর জালালিয়া কামিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ইং সালে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৯০ইং সালে সিলেট জেলা শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং ১৯৯৩ইং সালে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমী আয়োজিত প্রশিক্ষণে ‘শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ’ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি আপাদমস্তক একজন মহান শিক্ষাবিদ ও আধ্যাত্মিক স¤্রাট ছিলেন। কুরান, হাদীস, ফিকাহ ও ইলমে তাসাউফের শিক্ষা দানে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তার ছাত্ররা বাংলাদেশ তথা বহিঃর্বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
পারিবারিক জীবনে ১১ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জনক তিনি। পুত্র সন্তানদের ৩ জন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যান্যদের মধ্যে ১জন ডাক্তার, ১জন কোরআনের হাফিজ এবং অন্যরা শিক্ষার্জনরত রয়েছেন।
মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি (রহ.) উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুজুর্গ, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) এর কাছ থেকে ১৯৬৭ইং সনে ইলমে কেরাত এবং ১৯৭১ইং সালে তরিকত বা আধ্যাত্মিক সাধনার সনদ লাভ করেন। তিনি ফুলতলী এর প্রথম স্তরের একজন অন্যতম খলিফা ছিলেন। আধ্যাত্মিকতার জগতে তার অসংখ্য ভক্ত মুরিদান রয়েছেন। তিনি মানুষের ঈমান-আমলের উন্নতির জন্য নিয়মিত তালিম-তারবিয়ত প্রদান করতেন।
মাওলানা মো. শুয়াইবুর রহমান বালাউটি ছাহেব (রহ.) একজন রুহানি ডাক্তার ছিলেন। বিশেষ করে মানুষরূপী শয়তান ও জিন্নাতের বদনজর, দুষ্টতা থেকে রক্ষার জন্য কোরআন ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে চিকিৎসা প্রদানে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। সেজন্য সিলেট তথা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ রুহানি চিকিৎসা নিতে তার দ্বারস্থ হতেন। আল্লাহর একান্ত ফজল আর করমে তিনি মানুষের কঠিন কঠিন সমস্যা সমূহকে সমাধান করে দিতে পারতেন। এছাড়াও তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ তাকে করেছে জননন্দিত আধ্যাত্মিক স¤্রাট হিসেবে। তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ কয়েকটি পুস্তিকাও রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, একজন আলেমের মৃত্যু একটি জাহানের পতনের সমতুল্য! তার মৃত্যু পরবর্তী জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণ, আহাজারি আর কান্নাকাটি প্রমাণ করে তিনি সিলেটের অসংখ্য মানুষের প্রিয়তম একজন আধ্যাত্মিক রাহবার ছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সকল খিদমাতকে কবুল করে তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT