শিশু মেলা

ছেড়া পাতার কান্না

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৯ ইং ০০:২৯:১৬ | সংবাদটি ১৮৩ বার পঠিত

নাম না জানা গাছের কচি পাতাটা ছিড়তেই মুনির আনমনা হয়ে যায়। তার পরিবারের কচি পাতাটা সেদিন ঝরে গিয়েছিল। সেই শোকে পুরো পরিবারে শোকের মাতম চলেছিল কয়েক মাস। মা খানা পিনা বন্ধ রেখেছিলেন অনেক দিন। বাবার চোখে প্রথম জল দেখেছিল মুনির। বাবা শক্ত সামর্থ পুরুষ। উনিও কাঁদতে পারেন এটা জানা ছিল না মুনিরের। শোকে পাথর পরিবারটির রূপ দেখেছিল মুনির। পাতা ছেড়ার পর আজ কি এই গাছটা শোকে মুহ্যমান?
মুনিরের মধ্যে অপরাধবোধ জাগে। মুনির ভাবে কাজটি বোধ হয় ঠিক করিনি। মুনির চঞ্চল প্রকৃতির। খেলা পাগল। প্রচলিত সব খেলাতেই সে ওস্তাদ। ডাঙ্গুলি, দাড়িয়া বাধা, হাডুডু, ফুটবল, ইত্যাদিতো খেলেই। এছাড়া তার তালিকায় মার্বেল, তাড়া, টুঙ্গা খেলা, বিচি খেলা, পাতা খেলা, বউছি ইত্যাদিও আছে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার পড়ালেখায়ও সে বেশ ভালো। শ্রেণিতে ১ম স্থানটি তার।
মুনির মা-বাবার একমাত্র সন্তান নয়। তিন ভাই পাঁচ বোন। তার মা আবারও সন্তান সম্ভবা। ভাইবোনদের মধ্যে ওর পজিশন দ্বিতীয়। ওর বড় এক বোন। কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যায় বড় বোনের সাথে। মুনির বিকেলে তো খেলতে যাবেই এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে ছুটির দিনে তার কোন অবসর নেই। সাত সকালে বেরিয়েই বন্ধুদের সাথে মার্বেল, টুঙ্গা, তাড়া ইত্যাদি খেলা শুরু করে।
সেদিন ওর মা বললেন, ‘মুনির বাজারে যা, কিছু ডাল আর একটা সাবান নিয়ে আয়। মুনির সবে ঘুম থেকে উঠেছে। ও কোন কিছুই বলল না। হাই তুলে লেট্রিনের দিকে বদনা নিয়ে চলল। গ্রামে তখনও পাকা ঘর বা বাথ রুম হয়নি। সারা গ্রামে হাতে গোনা কয়েকটা পাকা বাড়ি। আর বাকী সব ছন-বাঁশ আর টিনের। গ্রামের পুকুর পাড়ে সাধারণত লেট্রিন থাকে। বসত বাটি থেকে অনেক দূর। যাই হউক লেট্রিন সেরে পুকুরে হাত মুখ ধুয়ে এলো সে। শার্ট গায়ে দিয়ে চলল বাজারে। ডাল আর সাবান কিনে বারো আনা উদ্ধৃত্ত রইল। সে এই বারো আনা দিয়ে চকচকে সুন্দর দু’টি মারবেল কিনে আনল।
বাজার থেকে ফেরার পথে দেখল, ক’জন মারবেল খেলছিল। মুনির আর থাকতে পারল না। সে বলল, ‘আমাকে খেলায় নাও। ওরা মুনির থেকে বয়সে অনেক বড়। ওরা বলল ‘না তোকে খেলায় নিব না। তুই খেলায় হেরে মারবেল খুইয়ে পরে কান্নাকাটি করবে।
-না আমি কাঁদবো না।
জহির বলল, ‘আরে নাওনা ওকে.... ওরতো মার্বেল আছে। তাহিরও সায় দিলো। অগত্যা ওরা ওকে খেলায় নিল।
মুনির থেকে ওরা সবাই লম্বা। তিন দানেই মুনিরের সব মার্বেল শেষ। একবার জিততে পারল না। মারবেলগুলো আর ছোট ভাইকে দেখানো হলো না। মন খারাপ করে ওদের বকা দিতে দিতে চলল- বাড়ির দিকে- শালারা কান্টুস। মনে মনে নিজেকে বকা দিল দূর, কেন বা ওদের সাথে খেলতে গেলাম। টাকাও গেল কোন কিছু কিনেও খেলাম না। শালা বুদ্ধির ঢেঁকি।
মুনিরের বাবা মা চিন্তায় অস্থির। ছেলের এই চঞ্চলতা ওদের সহ্য হয় না। কখন কি করে বসে? মুনিরের বাবা ব্যবসায়ী লোক। সকালে বের হন আর ফিরেন রাত ১২ টায়। এদিকে মুনিরের মা আর কত্ত সামলাবেন? পাঁচ পাঁচটি বাচ্চা। বড় মেয়ের ২য় শ্রেণিতে পড়াশোনা শেষ। মাকে সাহায্য করতে লেগে গেছে ঘরে। এদিকে মায়ের শরীর খারাপ। দিনের বেশির ভাগ সময়ই শুয়ে থাকেন। মুনির ও পনির গরু বাছুর সামলায়। আর রোজিনা সামলায় ঘর।
মুনির ‘তাড়া’ নিয়ে ইদানিং বেশ ব্যস্ত। স্কুল বন্ধ থাকায় গরু নিয়ে মাঠে যায় সে। এই ফাঁকে বন্ধুদের সাথে তাড়া খেলে। এখন যেন নেশা ধরেছে ওর। ওর মা কতবার নিষেধ করেছেন-কিন্তু কে শোনে কার কথা। উনি মারতে আসলে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
একদিন ঘরের উঠোনে তাড়া খেলছে মুনির। ওর মা উঠোনের বাঁশ থেকে কাপড় গুছাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাড়ার গুটি এসে পড়ে ওর মার কপালে। আর অমনি কপাল ফোলে ওঠে। মুনির অতিশয় দুঃখিত হলো। সে এমন হবে ভাবতেও পারেনি। সে মাকে জড়িয়ে কান্না শুরু করে দিল আর বলল-মা আর কখনও তাড়া খেলবো না। তুমি আমাকে মাফ করে দাও।
মুনিরের মা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে অনেক বাড়ি দিলেন মুনিরকে। সে কিন্তু দৌড়ে পালাল না। বলল-মাগো মা আরও মারো। আমাকে যত খুশি শাস্তি দাও......
রাতে মুনিরের বাবা এলে ঘটনাটা বললেন। আর মুনির যে তাড়া ছুড়ে ফেলেছে তাও বললেন। সব শুনে মুনিরের বাবা বললেন-‘ঠিক আছে আর কিছু বল না। আমার মনে হয় তোমার ছেলে এমনি ঠিক হয়ে যাবে।’
পরের দিন মুনিরের মধ্যে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। সারা দিন সে কোন খেলা হাতে নেয়নি। বিকালে মাঠের দিকে চলল। কিন্তু চঞ্চল ভঙ্গিতে নয়-ধীর স্থির ভাবে। পথের পাশে একটা অদ্ভুত গাছ দেখল সে। অনেকক্ষণ ধরে সে গাছটি পর্যবেক্ষণ করল। অনেককে জিজ্ঞেসও করল। কিন্তু কেউ নাম বলতে পারল না। গাছটি অনেকটা কদম গাছের মত। পাতাও বেশ বড় বড়্ কিন্তু বেশ ভারি। হাত দিয়ে পরখ করল সে। অনেকটা প্লাস্টিক দিয়ে বানানো কৃত্রিম পাতার মত মনে হলো। ডাল থেকে কচি দেখে একটা বড় পাতা ছিড়ল সে। পাতার গোড়া থেকে কাঁঠাল পাতার মত কষ বের হচ্ছে। বেশ মায়া হলো তার। কেন বা পাতাটা ছিড়লাম..... এরকম একটা অনুশোচনা তার মধ্যে জাগল।
মুনির ভাবনায় পড়ে গেল। এই পাতাটাতো অনেক কচি। অথচ এটাই ছিড়ে ফেললাম। যে পাতাগুলোর অনেক বয়স ওগুলোতে ছিড়লাম না। মুনির একটা অপরাধ করে ফেলেছে-এরকম একটা চিন্তা তার মধ্যে কাজ করছে।
মুনিরকে আচ্ছন্ন করল আরেকটি বিষয় যা তার চোখের সামনে ঘটেছিল।
আজ থেকে পাঁচ বছর আগের কথা। মুনিরের বয়স তখন আট। বাড়ির সামনে পাতা দিয়ে খেলছিল সে। তখন ফাল্গুন মাস। সকল গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। জারুল, করচ, বট সহ নাম না জানা অনেক গাছের কচি পাতা হাত দিয়ে ছুতে বেশ আরাম লাগে। মুনির দোকান দিয়েছিল সেদিন। চালের দোকান। চাল মানে ধুলো। পথের কিছু ধুলো জড়ো করে বসেছে। আর ওর বন্ধুরা ওর কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে। বিনিময়ে দিচ্ছে টাকা। টাকা মানে গাছের নতুন গজানো, কচি পাতা।
-তারু বলল- এক সের চাল কত?
মুনির জবাব দিল- ৫০০ টাকা।
-তারু বলল- এক সের দাও বলে সে একটা ৫০০ টাকার নোট দিল মানে জারুলের বড় পাতা।
মুনির মিছেমিছি পাল্লা দিয়ে মেপে এক সের চাল দিল।
হঠাৎ উপর দিকে দেখ- দুটো বিমান ছুটে আসছে ওদের মাথার উপর দিয়ে। মুনির বলল- হেই উপরের দিকে আঙ্গুল দেখাবে না। গুলী করে দিবে। জানোই তো যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তান আর বাংলাদেশে যুদ্ধ। সবাই খেলা ফেলে মুর্তার ঝোপে গিয়ে লুকালো।
বিমান চলে গেলে আবারও ওরা যখন খেলায় মেতেছে তখন বাড়ির ভিতর হট্টগোল শোনা গেল। মুনির দৌড়ে গেল বাড়িতে। উঠানে দেখে মা গড়াগড়ি যাচ্ছেন আর বাবার মাথায় ছোট ভাই শহীদ। বাবার সারা গা ভেজা। মুনিরের বুঝতে বাকী রইল না যে, শহীদ পানিতে পড়েছিল। বাবা ওকে তুলে এনে পেট থেকে পানি বের করতে চেষ্টা করছেন। আশেপাশের পাড়াপড়শিরা ছুটে এসেছে। উঠানে শ খানেক পুরুষ মহিলার উপস্থিতি। কেউ বলছে মা-বাপ ছুইলে পানিতে পড়া বাচ্চা বাঁচেনা। ওর মাকে ছুইতে দিওনা। মায়ের তো পরাণ যায়। উনি বিলাপ করছেন-
-ও শহীদ তুই কই গেলিরে। ওকে আমার কোলে আনরে। ও শহীদ-এইমাত্র ভাত খাইয়ে দিলাম রে- ও শহীদ.....
শহীদ মা বাবার সাথে ভাত খেয়ে কোন ফাঁকে পুকুরে গিয়ে পড়েছে কেউ জানে না। অনেক চেষ্টা করা হলো- কিন্তু শহীদকে বাঁচানো গেল না। সেদিন মায়ের কষ্ট দেখে মুনির ভাবে কেন যে আল্লাহ এত তাড়াতাড়ি ছোট ভাইটাকে নিয়ে গেলেন? মুনিরের দু’চোখ ভরে জল আসে। ও কান্না থামাতে পারে না। কি থেকে কি হয়ে গেল......।
আজ পাতাটা ছিড়তেই সেই শহীদের স্মৃতিটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। পাতাটা ফেলে দিতে চাইল কিন্তু ফেলতে পারল না। মনটা ওর খারাপ হয়ে গেল। আর মাঠের দিকে গেল না মুনির। পাতাটা নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। যতেœ ওর পড়ার টেবিলে রেখে দিল পাতাটা।
কিছুদিন পর এই পুরো অথচ কচি পাতটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মুনির ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল। আমার পরিবারের ছোট্ট পাতাটি ঠিক এইভাবে- অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে.....। ওর ছোট্ট ভাই যেন বলছে.... ভাই আমাকে মারলে কেন? আমি কী অপরাধ করেছিলাম..... মুনির নির্বাক তাকিয়ে রয় শুকনো পাতার দিকে....।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT