উপ সম্পাদকীয়

ক্ষমা করে দিও আবরার

রাজু আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১০-২০১৯ ইং ০০:৩৩:০৩ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

আবার উঠলো এক হতভাগা পিতার কাঁধে মেধাবী এক পুত্রের লাশ। এ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভারি বস্তু। জীবন চলার পথে কত কষ্ট আর বেদনা সহ্য করে করে ছেলেকে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পার করিয়েছেন। দিয়েছিলেন দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েটে বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে। বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবি এই হতভাগা পিতা হয়তো আশা করেছিলেন ছেলে একদিন এদেশের নামকরা প্রকৌশলী হবে। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে তার সুনাম আর মর্যাদা। আর মাত্র দুতিন বছর পর হয়তো সোনা ঝরা হাসি ফুটতো এই পিতার মুখে। আর সরকারি কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষক এক মা হয়তো মনের কোনে স্বপ্ন বুনছিলেন মেধাবী ছেলে তার দেশ সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে ঘুচে দিবে মধ্যবিত্ত পরিবারের এই পিতামাতার সব যাতনা। হ্যা এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হওয়ার কথা ছিল। দেশের সেরা সুরক্ষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হবে দেশের আগামী কর্ণধার একটি সোনার ছেলে এমনটাতো হওয়ার কথা ছিলনা।
বলছিলাম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের কথা। কত নির্মম আর নির্দয়ভাবে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাকে। পিএসপি থেকে এইচ এস সি পর্যন্ত চার চারটি গোল্ডেন এ প্লাস ক্যারিয়ারে যোগ করে কতনা স্বপ্ন নিয়ে এই মেধাবী শিক্ষার্থীটি ভর্তি হয়েছিলেন বুয়েটে। সেই বুয়েট ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এমন নির্মমতায় আমরা শুধু হতবাকইনা রীতিমত ভীত সন্ত্রস্ত আর স্থম্বিত ও বটে। আর তাহলে কোথায় রইলো আমাদের ছাত্র ছাত্রীদের নিরাপদ উচ্চ শিক্ষার স্থান। সহপাঠিরা ডেকে নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের হলে পিটিয়ে হত্যা করলো তাকে। এমন নৃশংসতার শেষ কোথায়। কি ছিলো আবরার ফাহাদের অপরাধ। সংবাদপত্র পর্যালোচনা করে যতটুকু জানা গেছে, তাতে বুঝা যায়, ব্যক্তিগত ফেইসবুকে একটি মতামত পোস্ট করেছিলেন তিনি। তার সেই মতামতের কারণে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতারা ক্ষুব্ধ হন। হ্যা ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা একজনের মতের সঙ্গে অন্য জনের মতের অমিল হতেই পারে। তার প্রতিবাদ তারা করতেই পারে। তাই বলে প্রতিবাদের ভাষা তো আর হত্যা হতে পারেনা। পৃথিবী থেকে একজন মানুষকে চিরতরে বিদায় দেয়া নয়। প্রতিবাদ করতে গিয়ে যারা তাকে এত নৃশংস ভাবে হত্যা করলো তারাও কি কম মেধাবী। এই মেধাবীরা রাজনীতিতে জড়িয়েই এমন নির্দয় আর নির্মম হয়েছে। হত্যাকারীদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিস্ট। ২০০৯ সালের পর অদ্যবধি ছাত্রলীগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেখানে কোন ত্যাগের কিম্বা সাফল্যের ইতিহাস নেই। কোন ভাল কাজের জন্যে তারা তাদের অভিভাবক সংঠনের কাছে বা দেশবাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছে এমন কোন সংবাদ গত ১১ বছরে অন্তত আমাদের চোখে পড়েনি। যে টুকু চোখে পড়েছে সেটা হচ্ছে খুন, ছিনতাই আর চাদাবাজীর চিত্র। যার সর্বশেষ পরিণতি বুয়েটের মেধাবী মুখ আবরারকে নির্মম ভাবে হত্যা। ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে আরোও নির্মম ভাবে প্রাণ হারানো বিশ^জিতের কথা আমরা এখনো ভুলিনি। কত নির্লজ্জ ভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। অবশেষে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ আর সংরক্ষিত একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন হৃদয় বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো।
বুয়েট বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে দেশের সেরা আর মধোবী মুখগুলির প্রতিচ্ছবি। একটি সংরক্ষিত শান্ত সুনিবিড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবয়ব। সেই দেশ সেরা সুরক্ষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন আবরারকে হত্যা করা হবে। বিশ^বিদ্যালয়ের যে কক্ষে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে সেই কক্ষে নাকি বেশ কয়েকটি মদের বোতল আর সিগারেটের ফিল্টার পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প আর ব্যাট। মদের বোতল আর সিগারেটের ফিল্টার থাকে বিশ^বিদ্যালয়ের হলে হলে । তাও আবার দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কিন্তু কেন? এগুলো কি দেখভাল করার মত কেউ নেই। যারা এগুলো দেখার দায়িত্বে নিয়োজিত তারা কি তাহলে রাজনীতিকে ভয় পায়্। নাকি এরা রাজনীতির লেজুড়বৃত্তিতে সহায়তা করে। আর না হয় তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিয়োগ নিয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে।
বুয়েট দেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে একটি স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অনেকে অনেক কষ্ট করেন তার সন্তানকে বুয়েটে ভর্তির জন্যে কিন্তু পারেননা। দেশের অদম্য মেধাবীরাই জায়গা করে নেয় এমন সব প্রতিষ্টানে। সরকার এই বুয়েটের এক একটির শিক্ষার্থীর পেছনে দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের অর্থ ব্যয় করে তাদের মানুষ করছে। অথচ সেই বুয়েটের হল আজ রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে কেন। বুয়েটের ভিসি প্রভোস্ট প্রাধ্যক্ষ আর হল সুপারের কি কোন দায় দায়িত্ব নেই। তারা কি কেবল আসবেন যাবেন আর বেতন নেবেন। আর দেশের সাধারণ অভিভাবকদের ভরসা করার জায়গাসমূহ একে একে ধ্বংস হয়ে যাবে। আবরার ফাহাদের পিতামাতাকে কি সান্ত¦না দেবে রাষ্ট্র। একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকুরী করে কত বেতন পান আবরার ফাহাদের পিতা। আর কিন্ডার গার্টেন কতইবা বেতন দেয় তার মমতাময়ী মাকে। এমন এক সংসার থেকে উঠে এসে আবরার ফাহাদ দেশ সেরা বেস্ট অব দ্যা বেস্টদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ অসংখ্য নামি নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুয়োগও পেয়েছিলেন এই মেধাবী মুখ। কিন্তু অকালে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো তাকে। না এভাবে চলতে দেয়া যায়না। এর অবশ্যই সুরাহা প্রয়োজন। আর এই সুরাহার জন্যেই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়েছেন। নিজের ঘর থেকে শুরু করেছেন। তার সংগঠন যুবলীগের লাগাম ধরেছেন। ধরেছেন ছাত্রলীগের লাগামও। কিন্তু কতিপয় নেপথ্য পৃষ্ঠপোষকদের কারণে দেশ প্রধানের এই উদ্যোগকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশের ১৬ কোটি লোক প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে শোষনহীন সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখে এইদেশ স্বাধীন করে গেছেন আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমরা সেই বাংলাদেশ পাইনি। অবশেষে আবরার ফাহাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আর বলি ক্ষমা করে দিও আবরার আমাদের মতো দুর্ভাগা জাতিকে।
লেখক : সিলেট প্রতিনিধি বার্তাসংস্থা রয়টার্স

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • ‘জঙ্গি’ অপবাদ প্রসঙ্গে
  • ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে
  • মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাই বদলে দেবে বাংলাদেশ
  • যানজটে লোকসান ও ভোগান্তি
  • বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস
  • আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
  • আবরার হত্যা ও বুয়েট শিক্ষার্থীদের দশ দফা
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • Developed by: Sparkle IT