উপ সম্পাদকীয়

সত্যবাদিতা জাতীয় উন্নতির সোপান

মোঃ আবদুল আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৯ ইং ০০:৪৫:০১ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

ব্যক্তিগত উন্নতি থেকেই জাতীয় উন্নতির সূচনা হয়। যে জাতির সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকই সৎপথে পরিচালিত হয়, সে জাতিই উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হয়। এ বিশ্বব্রহ্মান্ডে যে সকল জাতি উন্নতি লাভ করেছে, তাদের প্রত্যেকেই আন্তরিক ও নিষ্ঠার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। তারা অবিশ্রান্ত পরিশ্রম সহকারে বিভিন্ন শিল্পকৌশল আবিষ্কার করে। দেশে-বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করে, নিজেদের উন্নতি সাধন করেছে। যেমন-আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জাপান প্রভৃতি জাতি সততার সাথে কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্বের বুকে আজ ক্ষমতাশালী জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। তারা যদি বিপথে চলতো, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করতো, তাহলে আজকের উন্নত অবস্থানে আসতে পারতোনা। অনেকে বলে থাকেন অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে ধনবান হয়েছেন। এ কথাটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্য হলেও এ পৃথিবীতে এ ধরণের লোকের উন্নতি খুব ক্ষণস্থায়ী এবং তাদের এ ধরণের সম্পদ দ্বারা সমাজ বা দেশের কোনো কল্যাণ সাধিত হয় না বরং কালের আবর্তে তাদের অনিবার্য পতন ঘটে।
যে সব গুণ মানব-চরিত্রকে মহিমান্বিত করে তোলে ‘সত্যবাদিতা’ তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ। আর সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। সত্যের চেয়ে বড় গুণ আর দ্বিতীয়টি নেই। এই মহাবিশ্ব চিরসত্যের উপর দন্ডায়মান। সত্য ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজেকে আবিষ্কার করে, মনুষ্যত্বকে অর্জন করে। ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, যা কিছু এ পৃথিবীতে আছে তার সব কিছুর মূলে যে চিরসত্য লুক্কায়িত, আমরা শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে সে চিরসত্যকে অর্জন করি। তাই মানুষের সাধনা সত্যের সাধনা। সত্যবাদিতার গুণ অর্জন করাই মানুষের জীবনের একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত। কোন কিছু গোপন না করে অকপটে প্রকাশ করার বৈশিষ্ট্যের নামই সত্যবাদিতা। মিথ্যা ও অসত্যকে বিতাড়িত করে সত্য চিরদিন মাথা উঁচু করে থাকে বলে এর মূল্য যুগে যুগে স্বীকৃত হয়ে এসেছে। সত্যবাদিতা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ও গুরুত্বে বিশেষ অবদান রাখতে পারে বলে আদিকাল থেকে মানুষ তার চর্চা করে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করছে এবং জীবনকে পৌঁছিয়েছে সফলতার দ্বারপ্রান্তে।
আমাদের একটি কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, সত্যবাদিতা জীবন চলার প্রতিটি পদক্ষেপেই অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ মানবচরিত্র ও সমাজ কাঠামো টিকে থাকে একমাত্র সততার উপর ভিত্তি করেই। তাই সত্যবাদিতা না থাকলে ব্যক্তির জীবন বিনষ্ট হয়, আর চরম ক্ষতি হয় সমাজেরও। এ কারণে ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনে সততার প্রয়োজন অপরিহার্য ও অনস্বীকার্য।
যারা বিবেক বিবর্জিত হয়ে অন্যায় ও অসৎ পথে পরিচালিত হয়, সমাজকে দুর্গন্ধময় ও দুর্বিষহ করে তোলে, তারা মানবতার পরম শত্রু। এই শত্রুকে নিধন করা সত্যবাদিতার পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। তার জন্য চেতনাগত আদর্শ ও মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। কারণ, মনে রাখতে হবে যে, বিদ্যাহীন ও বিবেকহীন মানুষ পশুর সমান। নবী করিম (সাঃ) এর একটি হাদীছেও ইহার উল্লেখ আছে। মানুষের মধ্যে বিচার-বুদ্ধি, ন্যায়নীতি ও সততা আছে বলেই মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব অর্থাৎ ‘আশরাফুল মখলুকাত’। মানুষের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্বকে অক্ষুণœ রাখতে, অম্লান রাখতে হলে প্রত্যেককেই সৎ হতে হবে, সত্যবাদী হতে হবে। সততার চর্চা জীবনকে মহৎ করে, সুন্দর করে। তাছাড়া, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মেই সত্যবাদিতাকে মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এক কথায়, জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করতে হলে সত্যবাদিতা চর্চার কোন বিকল্প নেই। আরো উল্লেখ্য যে, সত্যবাদিতা মানুষের জীবনে চিরমুক্তি ও কল্যাণের পথ সুগম করে। সত্যবাদীকে সবাই বিশ্বাস করে। সমাজে তাকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসে। অপরপক্ষে মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করেনা। সমাজে তাকে সবাই ঘৃণার চোখে দেখে। তবে একটি কথা অবশ্যই সবার মনে রাখতে হবে যে, কোনো মানুষই অসৎ হয়ে জন্মায় না। জন্মাবার পরে পরিবার, সমাজ ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে অসৎ পথে পরিচালিত করে।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সত্যবাদিতা থেকে বিচ্যুত হলে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। ফলে সমাজ জীবনে অবৈধ কার্যকলাপ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং মানুষের মহৎ গুণাবলীর তিরোধান ঘটে। মানুষ তখন নানা অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। সমাজে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। দেশে নানা অশান্তির সৃষ্টি হয়। ফলে ব্যাপক আকারে অন্যায়-অনাচার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। তাই মানব জীবনের স্বার্থে অন্যায়কে সমাজ থেকে বিদূরিত করতে হবে। ধর্মীয় দিক থেকেও সত্যবাদিতাকে সমাজের উচ্চ আসনে স্থান ও মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাই ধর্মবোধসম্পন্ন আদর্শ জীবন যাপনের জন্য সততা ও সত্যবাদিতা অপরিহার্য।
কিন্তু আপন আপন শিশুকে সৎ এবং সুশীলরূপে গড়ে তোলার প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো পিতামাতার। প্রথমতঃ শিশুকাল থেকেই পিতা-মাতা এই শিক্ষা দিয়ে শিশুকে গড়ে তোলা অবশ্য কর্তব্য। দ্বিতীয়ঃ পিতা-মাতার পর শিক্ষকের দায়িত্ব সর্বাধিক। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি সৎ চরিত্র গঠনের নিয়ামক আদর্শ শিক্ষা দেন শিক্ষক। কারণ, শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এই ব্যাপারে শিক্ষক সমাজকে কার্যকর ভূমিকা পালন করা বাঞ্ছনীয়। সৎ চরিত্র গঠনের নিয়ামক আদর্শ শিক্ষা দেন শিক্ষক। সৎ আদর্শ সমুন্নত রেখে যেন সারাজীবন চলতে পারে এ শিক্ষা শিক্ষক দান করেন। তৃতীয়তঃ ব্যক্তি জীবনে নিজেকে সৎ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পৃথিবীর মহামানবদের জীবনাদর্শের যথাযথ অনুসরণের কোন বিকল্প নেই। মানুষ যাতে ত্যাগী হন, নির্মোহ হন, পরোপকারী হন এবং সততা পরিপন্থী কাজের জন্য তিরস্কৃত এবং সৎকাজের জন্য পুরস্কৃত হন সেই ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।
সততা ও সত্যাবাদিতা বাস্তব জীবন চলার পথের একমাত্র আলোকবর্তিকা হলেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সে মর্যাদা পদদলিত হচ্ছে। সততা পরিহার করে মানুষ আজ সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। ফলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিকেই তারা প্রাধান্য দিয়ে হরেক রকম দুর্নীতি করে চলছে। সততা বিসর্জন দিয়ে মানুষ আজ ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষণে সর্বদা তৎপর। অর্থাৎ ব্যক্তিস্বার্থের মূলধনকে সম্বল করেই ওরা সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সম্প্রতি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত স্বনামধন্য ক্লাবগুলোর অপকর্ম সমূহই দুর্নীতির জ্বলন্ত স্বাক্ষর। তাছাড়া আরো আছে টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের লজ্জাকর ইতিহাস। এ সকল কর্মকান্ড সবই সততা থেকে বিচ্যুতির ফল। সম্প্রতিকালে সরকার তাদের বিরুদ্ধে যে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তাতে দেশবাসী আশাবাদী যে অচিরেই এ হেন দুর্নীতির মূল উৎপাটন হবে।
একটি কথা স্বীকার্য যে সত্য চিরদিনই সত্য এতে বিতর্কের কোনই অবকাশ নেই। মহৎ ও বরণীয় মানুষ চিরকালই সত্যবাদিতার মূত প্রতীক। সত্যবাদিতার জন্য যেমন তারা কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য লাভ করেছেন, তেমনি সত্যের বলে বলীয়ান হয়ে তারা প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুকেও পরাজিত করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেছেন। সর্বকালের মহামানব, মহাপুরুষ, মানবমুক্তির অগ্রদূত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর সমস্ত জীবন নানা দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে কঠোর সাধনায় মগ্ন ছিলেন। সত্যের সাধনায় তিনি ছিলেন অটল-অবিচল। হাজার দুঃখ-যন্ত্রণায়ও তিনি সত্যের পথ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। সত্যের সাধনার বলেই তিনি সবার কাছে আল আমিন বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত হন। সত্যের জন্য ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন যীশুখ্রিস্ট। সত্যকে সমুন্নত রাখতে হেমলক নামক বিষপানে বিশ্ববিখ্যাত জ্ঞানপ্রেমিক ও দার্শনিক সক্রেটিসকে জীবন দিতে হয়েছে। এমনি করে সত্যের সাধনায় মহাপুরুষগণ জীবনকে যেভাবে গৌরবান্বিত করে গেছেন তা মানুষের কাছে মহান আদর্শ হিসেবে যুগ যুগ ধরে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। আর মানব সভ্যতার ইতিহাসে এদের নাম লেখা হয়েছে স্বর্ণাক্ষরে।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • ইরান-আমেরিকা সংকট ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়
  • জোসনার শহরের কবি
  • সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি
  • প্রসঙ্গ : ট্রেন দুর্ঘটনা
  • মাদকের ভয়াবহতা
  • জাদুকাটা সেতু ও পর্যটন প্রসঙ্গ
  • বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গ
  • রাজনীতির গুণগত মান নিয়ে প্রত্যাশা
  • Developed by: Sparkle IT