ধর্ম ও জীবন

তফসীর

প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৯ ইং ০১:০৭:৫৮ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

(৪) আলোচ্য আয়াতে মকামে-ইবরাহীমকে নামাযের জায়গা করে নিতে বলা হয়েছে। স্বয়ং রসূলুল্লাহ্ (সা.) বিদায় হজ্বের সময় কথা ও কর্মের মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন। তিনি তওয়াফের পর কা’বা গৃহের সম্মুখে অনতিদূরে রক্ষিত মকামে-ইবরাহীমের কাছে আগমন করলেন এবং এ আয়াতটি পাঠ করলেন।
অতঃপর মকামে-ইবরাহীমের পেছনে এমনভাবে দাঁড়িয়ে দু’রাকআত নামায পড়লেন যে, কা’বা ছিল তাঁর সম্মুখে এবং কা’বাও তাঁর মাঝখানে ছিল মকামে-ইবরাহীম।-(সহীহ্ মুসলিম)
এ কারণেই ফিকাহ্ শাস্ত্রবিদগণ বলেছেন : যদি কেউ মকামে-ইবরাহীমের পেছনে সংলগ্ন স্থানে জায়গা না পায়, তবে মকামে-ইবরাহীম ও কা’বা উভয়টিকে সামনে রেখে যে কোন দূরত্বে দাঁড়িয়ে নামায পড়লে নির্দেশ পালিত হবে।
(৫) আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তওয়াফ পরবর্তী দুই রাকআত নামায ওয়াজিব।-(জাস্সাস, মোল্লা আলী ক্কারী)
তবে এ দু’রাকআত নামায বিশেষভাবে মকামে-ইবরাহীমের পেছনে পড়া সুন্নত। হরমের অন্যত্র পড়লেও আদায় হবে। কারণ, রসূলুল্লাহ (সা.) এ দু’রাকআত নামায কা’বা গৃহের দরজা সংলগ্ন স্থানে পড়েছেন বলেও প্রমাণিত রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (সা.) ও তাই করেছেন বলে বর্ণিত আছে (জাস্সাস)। মোল্লা আলী ক্কারী মানাসেক গ্রন্থে বলেছেন, এ দু’রাকআত মকামে ইবরাহীমের পেছনে পড়া সুন্নত। যদি কোন কারণে সেখানে পড়তে কেউ অক্ষম হয়, তবে হরম অথবা হরমের বাইরে যে কোনখানে পড়ে নিলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে।
(৬) এখানে কা’বা গৃহকে পাক-সাফ করার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। বাহ্যিক অপবিত্রতা ও আবর্জনা এবং আত্মিক অপবিত্রতা উভয়টিই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন, কুফর, শিরক, দুশ্চরিত্রতা, হিংসা, লালসা, কুপ্রবৃত্তি, অহঙ্কার, রিয়া, নাম-যশ ইত্যাদির কলুষ থেকেও কা’বা গৃহকে পবিত্র রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশে শব্দ দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ আদেশ যে কোন মসজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ, সব মসজিদই আল্লাহর ঘর।
কুরআনে বলা হয়েছে :
হযরত ফারুকে আ’যম (রা.) মসজিদে এক ব্যক্তিকে উচ্চঃস্বরে কথা বলতে শুনে বললেন : তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ, জান না? (কুরতুবী) অর্থাৎ, মসজিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত, এতে উচ্চঃস্বরে কথা বলা উচিত নয়। মোট কথা, আলোচ্য আয়াতে কা’বা গৃহকে যেমন যাবতীয় বাহ্যিক ও আত্মিক অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রাখতে বলা হয়েছে, তেমনি অন্যান্য মসজিদকেও পাক-পবিত্র রাখতে হবে। দেহ ও পোশাখ-পরিচ্ছদকে যাবতীয় অপবিত্রতা ও দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু থেকে পাক-সাফ করে এবং অন্তরকে কুফর, শিরক, দুশ্চরিত্রতা, অহঙ্কার, হিংসা, লোভ-লালসা ইত্যাদি থেকে পবিত্র করে মসজিদে প্রবেশ করা কর্তব্য। রসূলুল্লাহ্ (সা.) পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু খেয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে বারণ করেছেন। তিনি ছোট শিশু এবং পাগলদেরও মসজিদে প্রবেশ করতে বারণ করেছেন। কারণ, তাদের দ্বারা মসজিদ অপবিত্র হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
(৭) আয়াতের শব্দগুলো থেকে কতিপয় বিধি-বিধান প্রমাণিত হয়। প্রথমতঃ কা’বা গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্য তওয়াফ, এ’তেকাফ ও নামায। দ্বিতীয়তঃ তওয়াফ আগে আর নামায পরে। (হযরত ইবনে আব্বাসেরর অভিমত তাই)। তৃতীয়তঃ বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে আগামণকারী হাজীদের পক্ষে নামাযের চাইতে তওয়াফ উত্তম। চতুর্থতঃ ফরয হোক অথবা নফল কা’বা গৃহের অভ্যন্তরে যে কোন নামায পড়া বৈধ।-(জাস্সাস)
(১২৭) স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা’বাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিল ঃ পরওয়ারদেগার! আমাদের থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই, তুই শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। (১২৮) পরওয়ারদেগার! আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহ কর এবং আমাদের বংশধর থেকেও একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর, আমাদের হজ্বের রীতিনীতি বলে দাও এবং আমাদের রক্ষা কর। নিশ্চয় তুমি তওবা কবুলকারী, দয়ালু। (১২৯) হে পরওয়ারদেগার। তাদের মধ্য থেকেই তাদের নিকট একজন পয়গম্বর প্রেরণ-যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমতওয়ালা। (১৩০) ইবরাহীমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? কিন্তু সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা পতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। (১৩১) স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন ঃ অনুগত হও। সে বলল ঃ আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম। (১৩২) এরই ওছিয়ত করেছে ইবরাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলমান না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না। (১৩৩) তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? তারা বললো, আমরা তোমার, পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদ করব। তিনি একক উপাস্য। (১৩৪) আমরা সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ। তারা ছিল এক সম্প্রদায়-যারা গত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদেরই জন্যে। তারা কি করত, সে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না।
আনুষঙ্গিত জ্ঞাতব্য বিষয়
হযরত খলীলুল্লাহ (আ.) আল্লাহর পথে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। অর্থ-সম্পদ, পরিবার-পরিজন এবং কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহ্র আদশে পালনে তৎপর হওয়ার যেসব অক্ষয় কীর্তি তিনি স্থাপন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও নজীরবিহীন।
সন্তানের প্রতি প্রতি ¯েœহ ও মমতা শুধু একটি স্বাভাবিক ও সহজাত বৃত্তিই নয়; বরং এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলারও নির্দেশ রয়েছে। উল্লেখিত আয়াতসমূহ এর প্রমাণ। তিনি সন্তানদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে আল্লাহ্র কাছে দোয়া করেছেন।
হযরত ইবরাহীম (আ.)-এ দোয়া : শব্দ দ্বারা দোয়া আরম্ভ করেছেন। এর অর্থ, ‘হে আমার পালনকর্তা।’ তিনি এই শব্দের মাধ্যমে দোয়া করার রীতি শিক্ষা দিয়েছেন। কারণ, এ জাতীয় শব্দ আল্লাহ্র রহমত ও কৃপা আকৃষ্ট করার ব্যাপারে খুবই কার্যকর ও সহায়ক। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর প্রথম দোয়া এই : ‘তোমার নির্দেশে আমি এই জনমানবহীন প্রান্তরে নিজ পরিবার-পরিজনকে রেখে যাচ্ছি। তুমি একে একটি শান্তিপূর্ণ শহর বানিয়ে দাও-যাতে এখানে বসবাস করা আতঙ্কজনক না হয় এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহজলভ্য হয়।’
হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দ্বিতীয় দোয়ায় বলা হয়েছে : পরয়ারদেগার! শহরটিকে শান্তিধাম করে দাও। অর্থাৎ, হত্যা, লুণ্ঠন, কাফেরদের অধিকার স্থাপন, বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখ।
হযরত ইবরাহীমের এই দোয়া কবুল হয়েছে। মক্কা মুকাররমা শুধু একটি জনবহুল নগরীই নয়, সারা বিশ্বের প্রত্যাবর্তনস্থলও বটে। বিশ্বের চার দিক থেকে মুসলমানগণ এ নগরীতে পৌঁছাকে সর্ববৃহৎ সৌভাগ্য মনে করে। নিরাপদ ও সুরক্ষিতও এতটুকু হয়েছে যে, আজ পর্যন্ত কোন শত্রুজাতি অথবা শত্রুস¤্রাট এর উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। ‘আসহাবে-ফীলের’ ঘটনা স্বয়ং কোরআনে উল্লেখিত রয়েছে। তারা কা’বা ঘরের উপর আক্রমণের ইচ্ছা করতেই সমগ্র বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছিল।
এ শহরটি হত্যা ও লুটতরাজ থেকেও সর্বদা নিরাপদ রয়েছে। জাহেলিয়াত যুগে আরবরা অগণিত আনাচার, কুফর ও শিরকে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও কা’বা ঘর ও তার পার্শ্ববর্তী হরমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করত। তারা প্রাণের শত্রুকে হাতে পেয়েও হরমের মধ্যে পালটা হত্যা অথবা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে না। এমনকি হরমের অধিবাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের রীতি সমগ্র আরবে প্রচলিত ছিল। এ কারণেই মক্কাবাসীরা বাণিজ্যব্যাপদেশে নির্বিঘেœ সিরিয়া ও ইয়ামানে যাতায়াত করত। কেউ তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করত না।
আল্লাহ্ তাআলা হরমের চতুঃসীমায় জীব-জন্তুকেও নিরাপত্তা দান করেছেন। এই এলাকায় শ্কিার করা জায়েয নয়। জীব-জন্তুর মধ্যেও স্বাভাবিক নিরাপত্তাবোধ জাগ্রত করে দেয়া হয়েছে। ফলে তারা সেখানে শিকারী দেখলেও ভয় পায় না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT