ধর্ম ও জীবন

সত্য সুন্দরের সন্ধানে

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৯ ইং ০১:০৯:২০ | সংবাদটি ১৩২ বার পঠিত

আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে আরবের মানুষ যখন কন্যা সন্তানকে জীবিত কবর দিত তখন কোন বিচার হতো না। তারা জানত এটা ঘৃণ্য অপরাধ তারপরও জেনে শুনেই এই গর্হিত কাজটি করত। সেই সময়ে আরবে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। লুটতরাজ, ব্যভিচার, নির্লজ্জতা, মদ্যপান, জুয়াখেলার অভিশাপে সমাজ ছিল জর্জরিত। সেই ঘোর অন্ধকার হতে বেরিয়ে আসার কোন উপায় ছিল না। অন্ধকার থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে শেষ নবী করে আরব ভূখন্ডে পাঠালেন। তাঁকে দেওয়া হলো মহান ঐশিগ্রন্থ ‘আল কুরআন’। যেখানে রয়েছে মানুষের জন্য সঠিক পথের দিক নিদের্শনা। পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে আমরা আলোর পথের সন্ধান পেলাম। জীবনে স্বস্তি এল, শান্তি এল। কিন্তু অকৃতজ্ঞ মানুষ আমরা। আবারো আমরা আল্লাহকে ভুলতে বসেছি।
প্রত্যেক মা-বাবা তাদের মৃত্যুর পর সন্তানেরা যাতে আরাম আয়েশে দিন যাপন করতে পারে তার জন্য যতটুকু সম্ভব সহায় সম্বল রেখে যান। অবশ্যই যাদের সেই সামর্থ রয়েছে তারাই তা করে থাকেন যাদের নেই তারাও চেষ্টার ত্রুটি করেন না। আমাদের নবী করিম (সা.) এর ইন্তেকালের পর আমরাও যাতে সুখী সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে পারি তার জন্য তিনি আল্লাহ কর্তৃক প্রদেয় স্পষ্ট জ্যোতি মহাগ্রন্থ আল-কুরআন রেখে গেছেন। আরও রেখে গেছেন তাঁর চারিত্রিকমাধুর্য্য, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় ও পালনীয়। তিনি একজন সত্যের সাধক হিসাবে, ধর্ম প্রচারক হিসাবে, সবার ওপর একজন অদ্বিতীয় সফল আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে আমাদের মধ্যে আর্বিভূত হয়েছিলেন। তিনি ১২ লক্ষ বর্গমাইল বিশিষ্ট একটি ভূখন্ডের রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। কখনও নিজেকে বাদশাহ বলা পছন্দ করতেন না। খেজুর পাতা ছাউনি ঘরে চাটাইয়ের উপর তিনি ঘুমিয়ে রাত্রি যাপন করতেন। সেই কোমল শরীরে চাটাইয়ের দাগ ভেসে উঠত। তালি দেওয়া কাপড় তিনি পরিধান করতেন। সেই নবীর উম্মত আমরা না মানছি কুরআনের নির্দেশ না মানছি তাঁর সর্বোত্তম জীবনাদর্শন। চেষ্টাও করছি না তাঁর সমুদয় মহান চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করার। ধর্ম থেকে দূরে সরে লোভ-লালসার সরোবরে ডুবে গিয়ে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ বিচার না করে মারামারি হানাহানি করে নিজেরাই নিজেদের দ্বারা ধ্বংস করতে চলেছি। আল্লাহ সবকিছুকে দেখেন শোনেন ও অভিপ্রায় বোঝেন এই সত্য উপলদ্ধি করার শক্তি আজ অনেকেই হারিয়ে ফেলেছি। অথচ অপরাধীদের শাস্তি দেবার জন্য রাষ্ট্রে ফাঁসি আছে, যাবজ্জীবন কারাদন্ড আছে, জেল জরিমানা আছে। তারপরও তো মানুষের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। অঘোর ঘুমে যেন সবাই অচেতন। সেই অবস্থায় যেন সবকিছু ঘটে চলেছে। গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী কনফুসিয়াসের সত্য উপলদ্ধি হলো-আইন বা দন্ডের দ্বারা শৃঙ্খলাকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্টিত করা যায় না। তিনি মনে করেন মানুষের বিবেকবোধ ও নীতিবোধের উন্মেষ তখনই হবে যখন মানুষের ভেতর ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত হবে।
ধর্মীয় চেতনা ও আল্লাহর ভয় মানুষকে কিভাবে আলোড়িত করতে পারে তথা আলোকিত করতে পারে আমাদের গাউছে পাক হযরত আব্দুল কাদের জিলানীর (বড় পীর সাহেব) জীবনে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার কথা বর্ণনা করলেই তা বুঝা যাবে। বড় পীর সাহেবের ধর্মীয় মাহফিলে প্রচুর লোকের সমাগম হতো। তখনকার দিনে মাইকের প্রচলন ছিল না। কিন্তু আল্লাহর এমনই কুদরত তাঁর মাহফিলের সামনের দিকে যারা বসতেন তারা যেভাবে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার শুনতে পেতেন একইভাবে অনেক দূরে বসে থাকা ব্যক্তিবর্গও পরিষ্কারভাবে তাঁর বক্তব্য শুনতে পেতেন। বড়পীর সাহেবের এক পুত্র বাবার এই সুখ্যাতি ও বাবার প্রতি মানুষের গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা দেখে তিনি বিস্ময়বোধ করতেন। তাই তিনি ঠিক করলেন তিনিও একদিন বাবার মাহফিলে যোগ দেবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি সমাবেশের এক কোণায় গিয়ে বসলেন বাবার ওয়াজ শোনার জন্য। তাঁর পিতা বলতে শুরু করলেন ‘হে আমার প্রিয় শ্রোতাবৃন্দ শুনুন-আজ আমার বিবি আমার জন্য একটা ডিম সুন্দর করে ভেজে টেবিলের উপর রেখেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বিড়াল টেবিলের উপর উঠে সেই ডিমটি খেয়ে ফেলেছে। তিনি আরও বললেন ব্যাপরটা বুঝেছেন তো? এ কথা শুনার সাথে সাথে সব মানুষ হু হু করে কাঁদতে শুরু করলেন। ছেলে বাবার এই ডিম ভাজার কথা শুনেতো ভীষণ রেগে গেলেন। অপরদিকে বোকা মানুষগুলো বিড়াল ডিম ভাজা খেয়ে ফেলেছে শুনে কেন এত কাঁদতে লাগলেন বুঝে উঠতে পারলেন না। প্রচন্ড এক বিরক্তি নিয়ে ঘরে ফিরলেন। মাকে গিয়ে বললেন-বাবা ঘরের কথা বাইরে মজলিশে গিয়ে বলে মানুষকে উপদেশ দিচ্ছেন। আর তা শুনে বোকা মানুষগুলো হু হু করে কাঁদছে। বল মা, বাবা কি এটা ঠিক করেছেন! ‘মা বললেন-‘তাইতো তিনি এটা ঠিক করেন নি। ঠিক আছে তিনি এলেই তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবো’। যথাসময়ে বড় পীর ছাহেব ঘরে এলেন। তাঁর বিবি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন-আপনি ঘরের কথা বাইরে মজলিশে কেন বলছেন? এতে ছেলে ভীষণ রাগ করেছে ও বিরক্ত হয়েছে।’ বড় পীর (রা.) বললেন- ‘তোমার ও তোমার ছেলের এ কথার অর্থ বোঝার মতো জ্ঞান নেই’। দুঃখের বিষয় আমিও যখন আমার বাবার কাছ হতে এ ঘটনা শুনি আমিও কিন্তু তখন এর গূঢ় রহস্য বা এর অন্তর্নিহিত ভাব উপলব্ধি করতে পারিনি। কিন্তু বয়সের আলোকে এখন যে সত্যটা উপলব্ধি করতে পেরেছি তা হলো-তিনি বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের ভালো কাজগুলো লোভ লালসা নামক হুলো বিড়ালটা খেয়ে ফেলে আমাদের দেউলিয়া করে ছাড়ছে। মৃত্যুর পর কি নিয়ে তারা আল্লাহর সম্মুখে খালি হাতে দাঁড়াবেন সেই ভয়েই তাঁরা কাঁদছেন। আল্লাহ ন্যায় পরায়ণতা পছন্দ করেন, দয়া করা পছন্দ করেন। হিংসা, অহংকার পছন্দ করেন না। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ সুবিচারক তাঁর বিচারে কোনও হেরফের নেই। তাঁর কাছে ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাহীন সবাই সমান। অপরাধ করলে তিনি শাস্তি দেবেন এ ভয় অবশ্যই আমাদের ভেতর থাকতে হবে। অদেখা আল্লাহর প্রতি এ ভয়ই আমাদের অন্যায় ও অসত্যের হাত হতে রক্ষা করবে।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের সমুদ্র জয় করার ও মহাকাশে আরোহণ করার ক্ষমতা দিয়েছেন। সেই অর্জনকে আমরা কিছুতেই ধূলিসাৎ হতে দিতে পারিনা সমাজে ঘটে যাওয়া নানা অপকর্ম দ্বারা। তাই এখন সময় এসেছে নিরাপদ সুন্দর জীবন যাপন করার জন্য নিজ নিজ ধর্মে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ বা গড-যে নামেই সর্বশক্তিমানকে ডাকা হোক না কেন এই শক্তিমান বা অদেখা সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করে সঠিক পথে চললেই সমাজে ন্যায়, নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চললে সমাজের শান্তি আসবে না, নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন সম্ভব হবে না-তা আমাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে অন্যজনকে জানাতে হবে এবং শিখতে হবে। একই ভাবে বৌদ্ধ ধর্মে নিহিত সৎ উপদেশগুলি মেনে চললে দেশ সমাজে শান্তির সুবাতাস বইবে কিন্তু পরিতাপের বিষয় মায়ানমারে সেদেশের বৌদ্ধরা মুসলমানদের সাথে যে আচরণ করছে তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, তাই বিশ্বজুড়ে সমালোচিত ও নিন্দিত হচ্ছে। প্রয়োজন আমাদের সবার সদিচ্ছা। সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ উন্নত প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠন হোক এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT