ধর্ম ও জীবন

পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও মানব জাতি

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১০-২০১৯ ইং ০১:১১:২৫ | সংবাদটি ২১১ বার পঠিত

আমরা সবাই জানি, অতীতকালের প্রায় সকল জ্ঞানী ব্যক্তি মহান ¯্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁদেরই অর্জিত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে, বর্তমান সভ্যতা মাথা উঁচু করে টিকে আছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন- জগৎ শ্রেষ্ঠ পদার্থ বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন, আলবার্ট আইনস্টাইন ও মাইক্যাল ফ্যারাডে, প্রখ্যাত রসায়নবিদ চার্লস বয়েল, পারমানবিক তত্ত্বের জনক ড্যাল্টন, অনুজীব বিজ্ঞানের জনক লুই পাস্তুর, জীব শ্রেণীবিন্যাস তত্ত্বের জনক ক্যারোলাস লিনিয়াস, বংশগতি বিজ্ঞানের জনক গ্রিগর ম্যান্ডেল প্রমুখ। তাঁরা সবাই সর্বশক্তিমান ¯্রষ্টায় একান্ত বিশ্বাসী ছিলেন।
দুর্ভাগ্য! বর্তমানকালের অনেক পন্ডিত-দার্শনিক ও উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী নন, তাঁরা নাস্তিক। এর কারণ কী? এ অবস্থার অন্যতম কারণ হচ্ছে, মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব বিবর্তনবাদের প্রভাব। যার প্রধান প্রবক্তা হলেন চার্লস ডারউইন। উপরন্তু একালের শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ তাদের সমগ্র শিক্ষাজীবনে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ের গ্রন্থগুলোয় কোথাও মহান ¯্রষ্টার কর্তৃত্বের স্বীকৃতি পাঠের সুযোগ পাননি। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে যেখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কর্তৃত্বের উল্লেখ অপরিহার্য, সেখানে লেখা রয়েছে, “তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে” অথবা “তা প্রাকৃতিক নিয়মে হয়”! সমগ্র শিক্ষা জীবন ব্যাপী মানুষ তা পাঠ করতে করতে কেউ হন সংশয়বাদী, কেউ হন শূন্যবাদী, কেউ হন অজ্ঞেয়বাদী, আর কেউ হন সোজাসুজি নাস্তিক। এদের মধ্য থেকে সৌভাগ্য ক্রমে যারা হন আস্তিক অর্থাৎ মহান আল্লাহয় বিশ্বাসী, তারা পারিবারিক ও সামাজিক আস্তিক আবহের প্রভাবে হয়ে থাকেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঙ্গনের সেকুলার শিক্ষার প্রভাবে নয়। উল্লেখ্য, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার এই আস্তিক পরিম-লও বংশানুক্রমে ধাপে ধাপে আশংকাজনকভাবে ক্ষয় পাচ্ছে!
বিজ্ঞান হচ্ছে পদ্ধতিগত ও বিধিবদ্ধ জ্ঞানের সমষ্টি, যা তীক্ষè পর্যবেক্ষণ, গভীর গবেষণা ও বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। কোন বিষয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পুনঃপুনঃ পরীক্ষা করলে এই ফল অর্জিত হয়। আরো বলা হয়, বিজ্ঞান হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কি? কেন? কিভাবে ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্নের সঠিক উত্তরগুলোর সমষ্টি। কোন বিষয়ে যদি সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া না যায়, তাহলে বোঝতে হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
আধুনিক বিজ্ঞান বস্তুজগতে সীমাবদ্ধ। মহান ¯্রষ্টা, তাঁর ঐশিক ক্ষমতা এবং অলৌকিক বিষয়ের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। ¯্রষ্টা ও তাঁর ঐশিক ক্ষমতা প্রসঙ্গে জ্ঞান অর্জনের কোন পদ্ধতিগত ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞানে নেই। কিন্তু বাস্তবে বস্তুজগতের বাইরে মহাবিশ্বে দেহাতীত, অতীন্দ্রিয় ও অলৌকিক জগত রয়েছে। তাই পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে বস্তুজগতের জ্ঞান এবং ঐশিক ও অতীন্দ্রিয় জগতের জ্ঞানের সমন্বয় অপরিহার্য। পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বস্তুজগতের ও ঐশিক-অলৌকিক জ্ঞান পরম্পর পরিপূরক।
মহাবিশ্ব সৃষ্টি: মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন পি হাবল ১৯২৫ সালে তাঁর বিখ্যাত বিগ ব্যাং থিওরি উপস্থাপন করেন। এ থিওরি অনুযায়ী সৃষ্টির আদিতে পরিপূর্ণ শূন্যতায় মহাবিশ্বের সকল গ্রহ-নক্ষত্রের উপাদান সমূহ একটি আদি বস্তু পিন্ডে জমাটবদ্ধ ছিল। প্রায় ১৫-২০ বিলিয়ন বছর পূর্বে আদি পি-টি প্রচ- চাপে পতিত হয় এবং চাপের ফলে তাপ অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে যায়। প্রচ- চাপ ও তাপের ফলে পি-টিতে ঘটে মহা বিস্ফোরণ, যা বিগ ব্যাং নামে পরিচিত। অতঃপর দীর্ঘকাল ব্যাপী পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদি নিয়ে বর্তমান মহাবিশ্ব রূপ লাভ করে। বিজ্ঞানী বিগ ব্যাং-কে দুর্ঘটনা বলে মনে করে থাকেন। উল্লেখ্য, মহাবিশ্ব এখনো প্রসারমান। মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে বিশ্বের প-িতগণ বিগ ব্যাং থিওরি সমর্থন করলেও তাঁরা নি¤œলিখিত প্রশ্নগুলোর যথাযথ জবাব পাননি।
১। বিগ ব্যাং-এর পূর্বে কম্পনাতীত ঘনত্ব বিশিষ্ট আদি বস্তু পি-টি কোথা থেকে কিভাবে উপস্থিত হয়েছিল?
২। বিগ ব্যাং সংঘটনের জন্য কোথা থেকে কিভাবে প্রচ- চাপ ও তাপের উদ্ভব ঘটেছিল?
৩। অনেক বিজ্ঞানী বিগ ব্যাং-কে দুর্ঘটনা বলে বিবেচনা করে থাকেন! কিন্তু সবাই জানেন যে, দুর্ঘটনার পরিণতি হয় মূলত ধ্বংস। অথচ বিগ ব্যাং-এর পর অত্যন্ত সু সংগঠিত মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে অসংখ্য গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ও নানা জ্যোতিষ্ক নিজ নিজ অক্ষে ও কক্ষ পথে সর্বদা গতিশীল রয়েছে, কারো সাথে কারো কোনো সংঘর্ষ হচ্ছে না। পৃথিবী নামক গ্রহে জীবন্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতিও বিস্ময়কর ব্যাপার। তাই বিগ ব্যাং- কে দুর্ঘটনা বলে অখ্যায়িত করা কি যৌক্তিক?
উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর জবাব বস্তুবাদী বিজ্ঞান দিতে পারেনি, এখানেই বস্তুবাদী বিজ্ঞানের সীমাদ্ধতা! আর বস্তুবাদী বিজ্ঞান যে অসম্পূর্ণ এটি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্য উপরোক্ত যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর জবাব অত্যাবশ্যক। অন্যথায় আমাদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থাকবে। প্রশ্নগুলোর জবাব সর্বশক্তিমান আল্লাহর ঐশি ক্ষমতার স্বীকৃতির মধ্যে নিহিত।
দীর্ঘকাল ব্যাপী অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির বর্ণনা প্রধান ধর্মগুলোয় রয়েছে-
‘আদিতে ঈশ্বর আকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। পৃথিবী ঘোর ও শূন্য ছিল, এবং অন্ধকার জলধির উপর ছিল, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের উপর অবস্থিতি করছিল।’-আদি পুস্তুক ১:১, ২ পবিত্র বাইবেল ও পবিত্র তাওরাত।
মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের আয়াত বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে খুই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আদি বস্তুপি- থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তি, পানি থেকে জীবিত বস্তুর উদ্ভব এবং মহাবিশ্বের প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্ট আয়াত রয়েছে-
‘আকাশম-লী ও পৃথিবী মিশেছিল ওতপ্রোতভাবে (আদি পি-ে), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, এবং প্রাণবন্ত সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে। তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?’-পবিত্র কুরআন ২১:৩০
‘আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী।’- পবিত্র কুরআন ৫১:৪৭
আসলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর একান্ত ইচ্ছায় সৃষ্টির প্রারম্ভে আদি বস্তুপিন্ডের আবির্ভাব, অতঃপর প্রচ- চাপ ও কল্পনাতীত তাপের উদ্ভব, মহাবিস্ফোরণ ও পরবর্তী ধারাবাহিক পরিবর্তন সমূহের মাধ্যমে সুসংগঠিত মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং তা প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কর্তৃত্বের স্বীকৃতি প্রদান অত্যাবশ্যক এবং সংশ্লিষ্ট পুস্তকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা অপরিহার্য।
একজন চিত্র সমালোচকের আলোচনা চিত্রের অবয়ব, চিত্রের বিষয়, মাধ্যম, অঙ্কনরীতি ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। চিত্র সমালোচক চিত্রকরের নাম ও বিশাদ পরিচয় আবশ্যিকভাবে উল্লেখ করে থাকেন। চিত্র সমালোচনার পরিপূর্ণতার জন্য তা আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্য! প্রকৃতি বিজ্ঞানীগণ বৈচিত্র্যম-িত উদ্ভিদ ও প্রাণীর বর্ণনা করেন ও এগুলোর চিত্র অঙ্কন করেন, এসব নিয়ে টিভি সিরিয়্যাল নির্মাণ করেন; কিন্তু ঘুণাক্ষরেও এদের ¯্রষ্টার নাম উল্লেখ করেন না!
নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিস্কার অনেক ক্ষেত্রে পুরাতন তত্ত্বকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে। তখন বাধ্য হয়ে পুরাতন তত্ত্ব বর্জন করে নতুন তত্ত্ব গ্রহণ করতে হয়। তাই বলা হয় বিজ্ঞান ডায়ন্যামিক অর্থাৎ গতিশীল। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কর্মতৎপরতাকে যারা স্বীকার করতে আগ্রহী নন এবং পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের স্বার্থেও যারা তা স্বীকার করতে নারাজ, তাদের অন্তত বিজ্ঞান গতিশীল এ বিবেচনায় আল্লাহর কর্তৃত্বকে স্বীকার করে নেয়া উচিত, সাথে সাথে তারা আশা পোষণ করতে পারেন ভবিষ্যতে কোনদিন গতিশীল বিজ্ঞান তাদের পছন্দ মতো কোন ব্যাখ্যা উপহার দিতে পারে।
জীবন কী?
জীববিজ্ঞানে জীবের বৈশিষ্ট্য হিসেবে-(১) অনুভূতি, (২) চলন ক্ষমতা, (৩) খাদ্য গ্রহণ, (৪) দৈহিক বৃদ্ধি, (৫) বংশবিস্তার ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো উদ্ভিদ ও প্রাণীতে বিদ্যমান। তাই উদ্ভিদ ও প্রাণী জীব অর্থাৎ তাদের জীবন আছে। প্রশ্ন হচ্ছে জীবন কী? জীবদেহের কোথায় জীবন অবস্থান করে? জীবন কী কঠিন, তরল, নাকি বায়বীয় পদার্থে গঠিত? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব জীববিজ্ঞানে নেই।
১৯৬৯ সালে টি এইচ হাক্সলি বলেন, ‘চৎড়ঃড়ঢ়ষধংস রং ঃযব ঢ়যুংরপধষ নধংরং ড়ভ ষরভব.’ অর্থাৎ প্রোটোপ্লাজম হচ্ছে জীবনের ভৌত ভিত্তি। উদ্ভিদ ও প্রাণী দেহ প্রোটোপ্লাজম দিয়ে তৈরী। প্রোটোপ্লাজম বিভিন্ন জৈব ও অজৈব পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। প্রোটিন, লিপিড, শ্বেতসার ইত্যাদি জৈব পদার্থ এবং ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম ইত্যাদি ক্লোরাইড, সালফেট, কর্বোনেট ইত্যাদি অজৈব পদার্থ। তাছাড়া প্রোটোপ্লাজমে বিপুল পরিমাণ পানি বিদ্যমান। তাই বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং (আমি) প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে।’
-পবিত্র কুরআন ২১:৩০ ও ২৪:৪৫
বিজ্ঞানীগণ প্রোটোপ্লাজমের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পুঙ্খানু-পুঙ্খভাবে জানতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু জীবন কী? জীবন কোথা থেকে প্রোটোপ্লাজমে আসে? মৃত্যুর সাথে সাথে জীবদেহ থেকে জীবন কোথায় যায়?
তা বিজ্ঞানীগণ বলতে পারেন না।
নির্দিষ্ট জীবনকাল শেষে প্রত্যেক জীব মারা যায়। মৃতদেহ পচন ক্রিয়ার মাধ্যমে এমোনিয়া, ফসফেট, নাইট্রেট ইত্যাদি দ্রব্যে পরিণত হয়; যা মাটির সাথে মিশে গিয়ে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। উদ্ভিদ মাটি থেকে এসকল পদার্থ মূলের সাহায্যে শোষণ করে এবং হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে। তৃণভোজী প্রাণী ঘাস ও লতাপাতা ভক্ষণ করে এ দ্রব্যগুলো লাভ করে এবং দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। মাংসাশী প্রাণী অন্যান্য প্রাণী ভক্ষণ করে এসকল দ্রব্য পরোক্ষভাবে লাভ করে। অতএব দেখা যাচ্ছে, জীবদেহ গঠনের প্রয়োজনীয় দ্রব্য পর্যাক্রমে জড় ও জীবজগতে পরিক্রমণ করে চলেছে। আরো লক্ষণীয় মৃত্যুর পর সকল জীবদেহ মৃত্তিকায় বিলীন হয় এবং জীবদেহের উপাদানগুলো উদ্ভিদ মারফৎ মৃত্তিকা থেকে আসে। তা আধুনিক বিশ্বে পরিবেশ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে পলিথিন, প্লাস্টিক ও অন্যান্য দ্রব্যের বারবার ব্যবহারের রিসাইক্লিং সিস্টেমের (জবপুপষরহম ঝুংঃবস) কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে প্রকৃতিতে রিসাইক্লিং পদ্ধতি চালু রেখেছেন। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পবিত্র কুরআন, বাইবেল, তাওরাত ও পুরানে বর্ণিত, “মানুষ মৃত্তিকা দিয়ে তৈরী”, বাণীর যথার্থ প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়।
অনেকে মনে করেন প্রাণীর হৃদপিন্ডে জীবন অবস্থান করে। কিন্তু বিজ্ঞানীগণ হৃদপিন্ডে এমন কোন বস্তু পাননি, যাকে জীবন রূপে আখ্যায়িত করা যায়। জীব যদি পার্থিব বস্তু হতো, তাহলে একে শনাক্ত করা যেত, জীবদেহ থেকে এটাকে পৃথক করে পরীক্ষা করা যেত এবং বর্ণনা করা যেত।
কিন্তু জীবন বা প্রাণ পার্থিব বস্তু নয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র গ্রন্থগুলোয় রয়েছে-‘আর সদাপ্রভু ঈশ্বর মৃত্তিকার ধুলিতে আদমকে তৈরী করলেন, এবং তার নাসিকায় ফুঁ দিয়ে প্রাণ বায়ু প্রবেশ করালেন, এতে মনুষ্য সজীব প্রাণী হলো।’-আদি পুস্তক ২:৭, পবিত্র বাইবেল ও পবিত্র তাওরাত। ‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান থেকে।”-পবিত্র কুরআন ২৩ : ১২ ও ৩ : ৫৯
‘এবং আমি (আল্লাহ) তার (আদম আ.) মধ্যে রূহ (প্রাণ) ফুঁকে দিলাম।’-পবিত্র কুরআন ১৫ : ২৯
‘তোমাকে (মুহাম্মদ সা.) তারা রূহ (আত্মা/প্রাণ) সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, ‘রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত (বিষয়) এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে সামান্যই।’Ñপবিত্র কুরআন ১৭ :৮৫
অর্থাৎ জীবন বা প্রাণ আল্লাহর আদেশঘটিত ঐশী বিষয় এবং তা মানুষের জ্ঞানের উর্ধ্বে। এ কারণে বস্তুগত বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থে এ বিষয়ে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায় না। অতএব, জীবন বা প্রাণ সম্পর্কে সন্তোষজনক ধারণা লাভের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর ঐশী ক্ষমতার স্বীকৃতি দান একান্ত আবশ্যক। বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট পুস্তকগুলোয় তা লিপিবদ্ধ করা অপরিহার্য।
সৌরশক্তি, সালোকসংশ্লেষণ ও জীব জগৎ :
পৃথিবীতে বসবাসরত জীবের (উদ্ভিদ ও প্রাণী) জন্য অত্যাবশ্যকীয় শক্তির উৎস হচ্ছে সূর্য। সবুজ উদ্ভিদ সূর্যের আলো, পানি ও বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে ফটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষণ নামক প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ নামক খাদ্য উৎপাদন করে। পরবর্তী পর্যায়ে গ্লুকোজ থেকে অন্যান্য খাদ্য উৎপন্ন হয়। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সবুজ উদ্ভিদ বায়ুম-ল থেকে কার্ব-ড্রাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে; ফলে বাতাসে এ দু’টি গ্যাসের ভারসাম্য বজায় থাকে, যা জীবকুলের জন্য অপরিহার্য।
ক্ষুদ্র পোকা-মাকড় থেকে শুরু করে তৃণভোজী প্রাণী গরু, ছাগল, হরিণ, হাতী ঘোড়া ইত্যাদি খাদ্যের জন্য প্রত্যক্ষভাবে সবুজ উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। মাংসাশী প্রাণী বাঘ, ভালুক, সিংহ ইত্যাদি খাদ্যের জন্য হরিণ, বানর, খরগোস ইত্যাদি তৃণভোজী প্রাণীর উপর নির্ভরশীল। তাই মাংসাশী প্রাণীও পরোক্ষভাবে সবুজ উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। উল্লেখ্য, সবুজ উদ্ভিদ কর্তৃক সৌরশক্তি বন্ধন করে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা না থাকলে এ গ্রহে কোন জীবের অস্তিত্ব থাকত না।
বিজ্ঞানীগণ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানতে পেরেছেন এবং গ্লুকোজ অণুতে বিদ্যমান কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণুর বিন্যাস নির্ভুলভাবে আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তথাপিও বিজ্ঞানীগণ কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গবেষণাগারে এক অণু পরিমাণও গ্লুকোজ তৈরি করতে সক্ষম হননি। এতে প্রমাণিত হয় যে, সবুজ উদ্ভিদ কর্তৃক সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ উৎপাদন অলৌকিক ও ঐশিক ব্যাপার।
এতএব, সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানতে পেরেছেন এবং গ্লুকোজ অণুতে বিদ্যমান কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পুরমাণুর বিন্যাস নির্ভুলভাবে আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তথাপিও বিজ্ঞানীগণ কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে, গবেষণাগারে এক অণু পরিমাণ ও গ্লুকোজ তৈরি করতে সক্ষম হননি। এতে প্রমাণিত হয় যে, সবুজ উদ্ভিদ কর্তৃক সালোসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ উৎপাদন অলৌকিক ও ঐশিক ব্যাপার।
অতএব, সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর কর্তৃত্বের স্বীকৃতি প্রদান আমাদের অবশ্য কর্তব্য: পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্যও তা আবশ্যক এবং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থে তা লিপিবদ্ধ করা উচিত। উল্লেখ্য গ্লুকোজের ন্যায় প্রোটিন, চর্বি, লিপিড, এলকালোয়েড, সুগন্ধি তৈল ও অন্যান্য দ্রব্য সংশ্লেষণেও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কর্তৃত্ব রয়েছে এসব দ্রব্যের বৈজ্ঞানিক আলোচনায়ও আল্লাহর কর্তৃত্বের উল্লেখ আবশ্যক।
জগতের কোন কিছুই আপনা আপনি অস্তিত্ব লাভ করে না। সর্বশক্তিমান আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট উপাদান দিয়ে মানুষ হরেক রকমের জিনিস তৈরি করে চলেছে। উড়োজাহাজ, গাড়ি, টিভি, কম্পিউটার ইত্যাদির প্রস্তুতকারক হচ্ছেন মানুষ। ঠিক তেমনি পৃথিবী, সূর্য,চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে গঠিত মহাবিশ্ব সর্বশক্তিমান আল্লাহর সৃষ্টি। পৃথিবীতে বিরাজমান সকল জড়বস্তু এবং অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী তারই সৃষ্টি; এবং জীবদেহে ঘটে চলেছে নানা প্রকারের জৈবনিক প্রক্রিয়া তাঁরই ইচ্ছা

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT