পাঁচ মিশালী

পরপারে ভালো থেকো নিবলু-নিয়তি

বিশ্বজিত রায় প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১০-২০১৯ ইং ০১:০৩:০৯ | সংবাদটি ১৫৯ বার পঠিত

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোঝা হচ্ছে পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। লোকমুখে প্রচলিত এই প্রবাদের চেয়েও কঠিন করুণ কষ্টের মুখোমুখী জামালগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত নিবলুর বাবা-মা। আর একসাথে যদি হয় দুই মৃত্যু অর্থাৎ পুত্র ও পুত্রবধূর তাহলে সেই কষ্ট যে পৃথিবীর সকল ব্যথা বিদীর্ণতার চেয়েও বহুগুণ ভারি। জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের সত্যেন্দ্র দাস বেনুর ছেলে নিবলু দাস গত ২২ সেপ্টেম্বর সাচনা বাজারের মসজিদ সংলগ্ন দুর্লভপুর গ্রামের লিটন আফিন্দীর বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় জানালার থাই গ্লাসের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।
অন্যদিকে স্বামীশূন্য শোক সইতে না পেরে পরদিন ভোরে নববিবাহিত অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিনতি রানী দাসও গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। এখন একসাথে দুই মৃত্যুর কঠিন শোক সইতে হচ্ছে একটি পরিবারকে। সেটা কতটুকু মর্মান্তিক, মর্মস্পর্শী, বেদনাদায়ক, কষ্টকর, যন্ত্রণাদায়ক তা সহজেই অনুমেয়। আর তা মর্মে মর্মে অনুধাবন করছেন শোকাতুর বাবা-মা। সদ্যবিবাহিত এ যুগলের মৃত্যুশোক কিভাবে সামলাবেন পঞ্চাশোর্ধ পিতামাতা। জানি-এ শোক সওয়া অসম্ভব, অসহনীয়, অসহ্যকর। একজন বাবা হিসেবে দেড় বছরের কন্যা কুহেলিকার সজোড়ে কান্নার আওয়াজটুকু যেখানে পেরেক ঠোকা কষ্টের চেয়েও অধিকতর ভারি মনে হয়, সেখানে পুত্র ও পুত্রবধূ নিহতের দ্বিগুণ ধাক্কা সামলানো একেবারেই দুরূহ দুর্বিষহ।
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত নিবলু দাস পেশায় ছিলেন থাই কারিগর ও ব্যবসায়ী। সর্বদা হাস্যজ্জ্বল, কর্মঠ, কর্মযোগী এ মানুষটি নিজের কর্মদক্ষতায় গোটা জামালগঞ্জে একটা অবস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। থাই ব্যবসায়ী হিসাবে এলাকায় বেশ নামডাক ছিল তার। দুই ভাইয়ের মধ্যে নিবলু ছিল ছোট। বড় ভাই বাবলুও গুরুতর অসুস্থ। তার দুটি কিডনীই ডেমেজ হয়ে গেছে। যেকোন সময় ঘটতে পারে অঘটন। মৃত্যুমুখী ভাইয়ের চিকিৎসা করাবেন, সুস্থ করে তুলবেন ভাই বাবলুকে। সে পথেই এগুচ্ছিলেন নিবলু। একটি অস্বচ্ছল পরিবারকে একাই স্বচ্ছলতার আলোয় নিয়ে এসেছিলেন তিনি।
থাই ব্যবসায় নিজেকে একটু পরিণত করে মৃত্যুর মাত্র তিন মাস পূর্বে বসেছিলেন বিয়ের পিড়িতে। গায়ে হলুদের সাজে সেজেছিলেন, সাজিয়েছিলেন প্রিয়তম স্ত্রী নিয়তি রানীকে। হলুদরাঙা দেহজোড়া তখনও মলিন হয়নি। বরবধূবেশী অনুভূতির টাটকা রেশ কাটার আগেই দু’জনই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। অল্পদিনের দাম্পত্য সুখ নিয়েই পরপারে পাড়ি জমালেন সদ্য বিয়ের গাঁটছড়া বাঁধা এ যুগল। দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নিয়তি রানী নিহত স্বামীর ভালোবাসার নিখাদ বাঁধন থেকে ছুটতে না পেরে সবার অগোচরে আত্মহত্যা করে কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্তি দিয়ে চলে গেলেন প্রিয়জনের শেষ ঠিকানায়। এ মৃত্যুকঠিন বাস্তবতা আপনজনসহ আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, পরিচিতজন সকলকেই কষ্ট দিয়েছে।
ত্রিশ বছর বয়সী নিবলু ও তার স্ত্রী নিয়তির এমন করুণ মৃত্যুতে শোকাহত জামালগঞ্জ। এ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই। অনেকে কর্মোদ্যম নিবলুর স্মৃতি আওড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দিয়েছেন তার ছবি ও শোক স্ট্যাটাস। তেমনি একজন ইউপি সচিব অজিত কুমার রায় তাঁর স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘মনে প্রাণে একটা ভালো মানুষ আমাদের নিবলু। সদ্য বিবাহিত হাসিমাখা, সৎ ও কর্মঠ আমাদের নিবলু। সহজ সরল প্রকাশভঙ্গি ছিল তার। তাকেই বুঝি তোমার দরকার হলো নিয়ে যাওয়ার? ভগবান একি করলে তুমি? এমন কষ্টের দিনটি তার পরিবারকে উপহার দিলে?’
জানি মৃত্যু অপ্রিয় অমোঘ অসহনীয়। মৃত্যু মানুষকে ছাড় দিতে রাজি নয়। মৃত্যু শাশ্বত সত্য চিরন্তন। এর সাথে কোন হিসাব নিকাশ চলে না। কিন্তু এ মৃত্যু কি মেনে নেওয়া যায়! তারপরও মানতে হবে। বললেই কি তা সম্ভব। না, মানতে পারছেন না কেউই। এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করা এ মৃত্যু শোকের কঠিন মাত্রা ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেন এই মৃত্যু?
কপালের লেখা নিয়তিই যদি হয় এ মৃত্যুর কারণ, তাহলে বলব- নিয়তির নির্মম নিষ্ঠুর ক্ষেত্রটা আসলে তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি পরিবারের সুখ, স্বপ্ন ও সমৃদ্ধির শক্ত বাঁধনকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে সেদিন নিবলুর মৃত্যু না হলেও আরেকদিন অন্য আরেকজনের নিশ্চিত মৃত্যু হত। কারণ মৃত্যু পরবর্তী সেই অপয়া বিল্ডিংয়ের চারপাশ দেখতে গিয়ে তা অনুমান করা গেছে। তিনতলা জানালার খুব কাছ দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের মেইন লাইনটি। জানালা থেকে তার দূরত্ব সর্বোচ্চ দেড় ফুট হবে। বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে অসাবধানতাবশতঃ যে কারোরই হাত লেগে যেতে পারে সেই ভয়ঙ্কর মৃত্যুকোপে।
যদি বলেন কিভাবে? তাহলে বলব-বিল্ডিংটি ভাড়া দেওয়ার জন্য একটি সাইনবোর্ড সাটানো রয়েছে সেখানে। তাতে লেখা আছে-‘ব্যাংক, বীমা, অফিসের জন্য ২য় তলা এবং দোকানের জন্য নীচতলা ভাড়া দেওয়া হইবে।’ আর তৃতীয় তলাটি নিশ্চয় বাসাবাড়ির জন্য রাখা হয়েছে। সেখানে যে পরিবারই অবস্থান করুক, তার শিশুবয়সী ছেলেপুলে কৌতূহলবশতঃ জানালা দিয়ে অনায়াসেই ধরে ফেলতে পারবে মৃত্যু নিশ্চিত করা সেই ভয়ানক বৈদ্যুতিক তার। তখন তাদের ভাগ্যে ঘটতে পারত সেই পরিণতি।
তাই অনায়াসে বলা যায়, এ মৃত্যুর জন্য বিল্ডিং তৈরিতে অব্যবস্থাপনাই অনেকাংশে দায়ী। কেন এই অব্যবস্থাপনা? কেন এই দায়িত্বহীনতা? যার জন্য একটি সুখী-সুন্দর পরিবারের করুণ পরিণতি হল, এর দায়ভার কে নেবে? যে বিল্ডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে আজ পুত্রহারা হতে হল একটি পরিবারকে সেই বিল্ডিং তৈরিতে কতটুকু নিয়মনীতি মানা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আর বৈদ্যুতিক লাইনের কতটুকু দূরত্বে বিল্ডিং বানানো যুক্তিযুক্ত তারও কিছু বাধ্যবাধকতা অবশ্যই আছে। বিল্ডিং তৈরিতে সেটা কি মানা হয়েছে?
পরিশেষে বলব, প্রিয় নিবলু, আমরা তোমার কাজের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি বলে ক্ষমা করো আমাদের। তোমাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আর ¯্রষ্টার কাছে তোমার জন্মদাতাদাত্রীর জন্য এ শোক সহার শক্তি প্রার্থনা করছি। পরপারে ভালো থেকো প্রিয় নিবলু-নিয়তি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT