সাহিত্য

বড় ছেলে

কবির কাঞ্চন প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-১০-২০১৯ ইং ০০:১৪:১৭ | সংবাদটি ১০৪ বার পঠিত

মুয়াদ হনহন করে ছুটে চলেছে। এ মুহূর্তে মিজানের চায়ের দোকানই তার গন্তব্যস্থল। যেখানে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোকে ভুলবার নিরন্তর চেষ্টায় মগ্ন থেকেছে সে। আজও তার ব্যতিক্রম কিছু হলো না।
দোকানে এসে হাতলওয়ালা চেয়ারটা ফাঁকা পেয়ে টান দিয়ে আরাম করে বসে পড়লো। বেশকিছু সময় ধরে চেয়ারে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ডান হাতে মাথার চুল টানতে থাকে।
আজ নিজের কাছে নিজেকে বড় অসহায় বলে মনে হচ্ছে তার। জীবনের এতো এতো পথ পাড়ি দিয়ে এসে তার কাছে সবই নিরর্থক বলে মনে হচ্ছে।
সে আনমনে ভাবতে থাকে-
হায়রে নিয়তি! এই তোমার খেলা! সংসারের বড় ছেলে করে দুনিয়ায় পাঠালে। তাও নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরে। যেখানে অভাব নামক দৈত্যের নিত্যকার ছোবলের মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়। সেই দৈত্যের ছোবল খেয়ে খেয়ে একটু সুখের খোঁজে কতো কতো কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়ালাম। মনে একটাই সান্ত¡না ছিলো- এই বুঝি পার পাব। কিন্তু না, গরীবের সুখকে স্পর্শ করার ইচ্ছা করা বড় অন্যায়। এজন্য শুধু ¯্রষ্টাকে দোষ দেয়া যায় না। ¯্রষ্টা তো সুখের সব বন্দোবস্ত করেই দিয়েছেন। শুধু আপনজনেরা তাতে বাঁধা হয়। কেউ কারো সুখের পথকে মসৃণ করে না। পারলে মসৃণ পথকে অমসৃণ করতে সেপথে কিছু কাটা রাখতে সুখ পায়।
মুয়াদ চরম অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে বড় হলেও পড়াশোনাকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে বড় হয়েছে। জীবনের কোন পরীক্ষায় সে অকৃতকার্য হয়নি। সাফল্যের সাথে পাশ করেছে। কিন্তু ছাত্রজীবনেই সংসারের চাকা সচল রাখতে হয়েছিল বলে পড়াশুনার বেশি সময় তাকে টিউশনিতেই কাটাতে হয়েছিল। সেকারণে বিসিএসের প্রস্তুতিও ভালোভাবে নিতে পারেনি সে। ফলে কখনও এম সি কিউ। কখনও আবার এম সি কিউ ও রিটেন উভয় ধাপ অতিক্রম করেছে। কিন্তু সরকারি চাকরি তার কপালে জুটেনি।
শেষমেশ একটি বেসরকারি স্কুলে ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে তার চাকরি হয়েছে। স্কুল আওয়ারের পর বাকি সময়টা টিউশনিতে কাটিয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনদের যাবতীয় খরচ মেটায় সে। কষ্টের সংসার শুধু মুয়াদের আয়ের ওপর ভালোই চলছিল। মুয়াদের বাবা সব দায়িত্ব ছেলের ওপর ছেড়ে দিয়ে ভারমুক্ত থেকেছেন।
সামনে মুয়াদের একমাত্র ছোটভাই ফুয়াদের এসএসসি পরীক্ষা। মুয়াদ সারাদিন স্কুল, প্রাইভেট টিউশনিতে ব্যস্ত থাকে। ফুয়াদের পড়াশোনার প্রতি তেমন সময় দিতে পারছে না। এসএসসি পরীক্ষা বলে কথা। এ সময় অন্তত একজন লোক তার আশপাশে থাকা উচিত।
এমন ভাবনা থেকে
ব্যাচেলর বাসায় ছোটভাইয়ের প্রস্তুতির জন্য মুয়াদ তার বাবাকে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে।
ফুয়াদ মনোযোগ দিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করছে। ছোটছেলের লেখাপড়ার প্রতি গভীর অনুরাগ দেখে বাবার মন ভরে যায়।
তিনি বসে বসে আনমনে ভাবেন-
-বিধাতার কী অপূর্ব খেলা! আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগে এই ফুয়াদকে পড়াশোনার জন্য বললে সে পালিয়ে বেড়াতো। বহুদিন ধরে এনে মারধোরও করেছিলাম। কিন্তু কোন কাজের কাজ হয়নি। তখন ধরেই নিয়েছিলাম ওকে দিয়ে আর লেখাপড়া হবে না। শেষবার স্কুলে যায়নি বলে ধরে এনে বেশ মারধোর করেছি। তার পরদিনই সে আমাদের কাউকে কোনকিছু না জানিয়ে চট্টগ্রামে আমার বড়ভাইয়ের বাসায় চলে আসে। তাকে সবজায়গায় খোঁজাখুজি করে কোথাও পাইনি। শেষে জানতে পারলাম বড়ভাইয়ের বাসায় আছে। কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও পরক্ষণে দুশ্চিন্তায় পড়ি। যখন শুনতে পাই আমার আদরের সন্তান একটি চায়ের দোকানে সহকারীর কাজ নিয়েছে। তখন ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
মুয়াদের প্রচেষ্টায় ফুয়াদ আবার নতুন করে পড়াশোনায় ফিরে আসে। অবশ্য এক্ষেত্রে সব ক্রেডিট আমার বড়ছেলেরই প্রাপ্য।
আমার সেই ফুয়াদ আজ পড়াশোনা ছাড়া কিছু বোঝে না।
ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে কখন যে তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়েছে সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই।
এরই মধ্যে মধ্যে মুয়াদ ক্লান্ত শরীরে রুমে প্রবেশ করে। বাবার চোখে পানি দেখে মুয়াদ একবার ফুয়াদের পড়ার টেবিলের কাছে এসে ফুয়াদের দিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করে।
ফুয়াদকে মনোযোগ দিয়ে পড়তে দেখে আবার বাবার কাছে ফিরে এসে বলল,
- আব্বা, তোমাকে কি কেউ কিছু বলেছে?
মুয়াদের বাবা পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন,
- না, বাবা, আমাকে কেউ কিছু বলেনি।
- তাহলে কাঁদছো কেন?
- নারে বাবা, আমি কাঁদিনি। ফুয়াদকে পড়তে দেখে আনন্দে আমার চোখ থেকে পানি পড়েছে। ভাবছিলাম, আমার ফুয়াদ তো নষ্ট হয়েই গিয়েছিল। শুধু তোর মতো যোগ্য ভাইয়ের কারণে ও নতুন জীবন পেয়েছে। তুই যাবার পর থেকে আমি ওর সাথে আঠার মতো লেগে আছি। কিন্তু ওকে একবারের জন্যও পড়তে বলতে হয়নি। সারাক্ষণ ও পড়ার মধ্যেই ছিল। জানিস, ওর মধ্যে আমি তোকে খুঁজে পেয়েছি। আজ আমি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, সান্নিধ্যই মানুষের জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। ভাই হয়ে তুই ওর জন্য, আমাদের জন্য যে দায়িত্ব পালন করে চলেছিস, তার পুরষ্কার আল্লাহর কাছে একদিন নিশ্চয়ই পাবি।
- আব্বা, এসব কি বলছো। সন্তান হিসেবে আমি তোমাদের প্রতি আমার কর্তব্য পালন করছি মাত্র।
- তবু আজকালকার ছেলেমেয়েরা ভাইবোনের জন্য এতো করে না।
- তুমিও তো করেছো। নিজে খেয়ে না খেয়ে ছোট ভাইবোনদের বড় করেছো। তোমার কাছ থেকেই আমি শিখেছি।
- কিন্তু আমার ফুয়াদও যদি বড় হয়ে ওদের মতো হয়ে যায়!
এই কথা বলে মুয়াদের বাবা চোখের পানি ছেড়ে কাঁদতে লাগলেন।
মুয়াদ বাবার সামনে এসে বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
- আবার কাঁদছো কেন? আমার চাচারা তোমার বিপদের সময় পাশ থেকে সরে গেছে ঠিক। কিন্তু আল্লাহ তো সবসময় তোমার পাশেই ছিল। আল্লাহর মেহেরবানিতে তোমার ছেলেমেয়েরা সবাই সুশিক্ষিত। সবাই মানুষের মতো মানুষ হয়ে বড় হচ্ছে। কৈ? আমার চাচাতো ভাইবোনদের মধ্যে কেউ তো স্কুলের গন্ডিও পেরুতে পারেনি।
- এটাই তো আমার দুর্ভাগ্য। ভাই হয়েও ওরা কেন আমার মতো হলো না।
- সবই আল্লাহ'র ইচ্ছা।
এতক্ষণ ধরে ফুয়াদ বাবা ও বড়ভাইয়ের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। এরপর এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে ভাইয়ের হাতে দিয়ে আবার পড়ার টেবিলের দিকে চলে যায়। মুয়াদের বাবা দ্বিতীয়বার মনে মনে হাসলেন।
দেখতে দেখতে মুয়াদের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেছে।
সেদিকে কারোর কোন খেয়াল নেই। অবশ্য মুয়াদ আগে থেকে একটি মেয়েকে পছন্দ করে রেখেছিল। মেয়েটি দেখতে খুব সুন্দরী। উঁচা লম্বা। নাদুসনুদুস ধরনের। চোখদুটো টানাটানা। ঠোঁট জোড়া যেন ফুটন্ত লাল গোলাপ। দেখলেই মায়া লাগে। মুয়াদের পছন্দের বিষয়টি ফুয়াদ হয়ে তাদের বাবামায়ের কানেও পৌঁছে যায়।
একসময় বাবা লোক মারফত মেয়ের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। মেয়ে পক্ষ সানন্দে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়। মহা ধুমধামে মুয়াদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর মুয়াদ একটি ফ্যামিলি বাসা ভাড়া করে। বাসাটিতে তিনটি কক্ষ। একটি তাদের বেডরুম। একটি ছোটভাই ফুয়াদের জন্য। আর অবশিষ্টটি গেস্টরুম হিসেবে সাজানো হয়েছে। কিছুদিন ছেলের বাসায় কাটিয়ে মুয়াদের বাবা-মা বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যান ।
মুয়াদের বিয়ের প্রথম এক-দেড় বছর খুব ভালোভাবে কেটে যায়। ফুয়াদও এখন অনার্সে পড়ছে। এরইমধ্যে মুয়াদের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হয়েছে। তাই স্ত্রীর খাওয়া-দাওয়ার দিকে একটু বেশিই মনোযোগ দিতে হচ্ছে তাকে। সীমিত আয়ের সংসারে বাড়তি খরচ যোগ হওয়ায় সংসার খরচ চালিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাতে মুয়াদকে বেশ হিমশিম খেতে হয়। নিজের পকেট খরচ কমিয়ে বাড়িতে আগের মতোই পাঠাতে থাকে সে। কিন্তু মুয়াদের বুঝতে আর বাকি রইলো না- দিনেদিনে বাবা-মা তার বিয়ের পর থেকে তাকে কেমন যেন পর পর ভাবেন। আগে যেখানে প্রতি দুই চারদিন যেতে না যেতেই বাড়ি থেকে কল করতো। এখন সেখানে মাসে একবার কি দুইবার কল করে। তাও টাকা পাঠানোর পর। আগে যেখানে কল করেই বৌয়ের খবর নিতো এখন নিজের থেকে বললেও বিরক্তিকর মুডে কথা বলে। কথায় কথায় ফুয়াদের কথা জানতে চায়। ফুয়াদের সাথে প্রায় প্রতিদিন কথা বলে। হয়তো এখনও ওর কোন চাকরিবাকরি হয়নি, সংসার হয়নি এইসব ভেবে ওকে নিয়ে একটু বেশি ভাবে।
এই ভেবে মুয়াদ নিজের মনকে সান্ত¡না দেয়।
মুয়াদের বোনদের মধ্যে তৃতীয় এবং সর্বকনিষ্ঠ হলো আলেয়া। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। এ নিয়ে বাবার ওপর খুব রাগ হয়েছিল তার। বাবাকে এতো করে বলেছে, বোনকেও শহরে নিজের বাসায় রেখে প্রাইভেট পড়াবে। ওর ভালো রেজাল্ট করাবে। কিন্তু বাবার সেই একই কথা- ওকে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। ওর পড়াশুনার সবকিছু আমি দেখবো। তুমি শুধু খরচাপাতি পাঠিয়ে দিও। বাবার কথায় ভরসা খুঁজে মুয়াদ নিয়মিত সংসার খরচের পাশাপাশি বোনের পড়াশোনার জন্য খরচাপাতি পাঠাতো। এ নিয়ে বাবাকে খুব দুশ্চিন্তায় পড়তে দেখে সে আগ বাড়িয়ে বলল,
- বাবা, যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন ওসব নিয়ে শুধু শুধু চিন্তা করার কোন দরকার নেই। আগামী বছর ও আবার পরীক্ষা দেবে। কিছুদিনের মধ্যে আমি ওকে শহরে নিয়ে আসবো।
মুয়াদের এমন আশ্বাসে বাবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই মুয়াদের বাড়ি থেকে খবর আসে তার আদরের ছোটবোন তারই চাচাতো ভাইয়ের সাথে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। এমন সংবাদে মুয়াদ হতভম্ব হয়ে যায়। কি করবে ভেবে কোন কূল পায় না সে। ওদিকে মেয়ের এমন কর্মকান্ডে বাবা-মাও কয়েক দফায় অজ্ঞান হয়েছেন। মুয়াদ নিজেকে সামলে নিয়ে বাবাকে শক্ত হতে সাহস জোগায়।
একদিন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের দিকে উদাসী চোখে তাকিয়ে আছে মুয়াদ। হঠাৎ একটি কাক তার চোখে ধরা পড়ে। কাকটি বৃষ্টির জলে ভিজে দুর্বল হয়ে গেছে। একটু আশ্রয়ের জন্য জায়গা খুঁজছে। এই বিল্ডিং ওই বিল্ডিং হয়ে অবশেষে একটি তিন তলা ভবনের ছাদের ওপরে জায়গা করে নিয়েছে। বাঁচবার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে। মুহূর্তে মুয়াদের সামনে অসংখ্য কাক এসে ‘কা কা’ শুরু করে। কাকদের এমন আহাজারিতে তার বুঝতে বাকি থাকে না-নিশ্চয় কোন কাকের বিপদ হয়েছে। কাকদের কেউ একজন বৈদ্যুতিক তারে শট খেয়ে মারা গেলে অসহায়ের মতো আশপাশের কাকেরা ছুটে এসে এভাবে আহাজারি করতে থাকে। একটু সাহায্যের জন্য এদিকসেদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। মুয়াদ আবার সেই তিনতলা ভবনের ছাদের কাকটির দিকে লক্ষ্য করে। কিন্তু কৈ? সেই ভেজা দুর্বল কাকটি সেখানে নেই। তবে কি সেও সমবেদনা জানাতে অসংখ্য কাকের ভীড়ে হারিয়ে গেছে। বিচলিত হয়ে অসংখ্য কাকের ভীড়ে ভেজা কাকটিকে খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। এরইমধ্যে তার স্ত্রী এক পা দুই পা করে তার কাছে এসে ক্ষীণ কন্ঠে বলল,
-এই, একা একা এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো?
মুয়াদ অপলক চোখে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে অনাগত সন্তানের কথা ভাবতে থাকে। সেও সংসারের বড় সন্তান হবে। হয়তো অনেক অনেক দায়িত্ব পালন করবে। সবকিছু সামলাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠবে। নিজের জীবনের প্রতি ঘৃণা জন্মাবে। আবার মূলের কথা ভেবে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে শেষ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT