স্বাস্থ্য কুশল

পুড়ে গেলে কী করবেন

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-১০-২০১৯ ইং ০১:১৮:৫৬ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

আমাদের প্রত্যাহিক জীবনের কাজ-কর্ম করতে গিয়ে অসাবধানতার কারণে ছোট-বড় নানান দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে আগুনে পুড়া অন্যতম। আমরা যদি দুর্ঘটনা সম্পর্কে সচেতন হই, সতর্ক হয়ে, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো কিছু জানি তাহলে নানান দুর্ঘটনার পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারব। অনেক সময় মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।
কারণসমূহ : বেশি ভাগ ক্ষেত্রে সংসারে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ শরীরের নানা স্থান পুড়ে যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো : রান্না করা গরম তেল, গরম পানি, গ্রামে বাড়িতে চুলার গরম ছাই, গরম ধাতব্য লোহার ছ্যাকা লাগা, কয়েলের আগুন বিছানা থেকে শরীরে লাগা, তাছাড়া দাহ্য পদার্থ দ্বারা আগুন যেমন : কেরোসিন, পেট্রল, এসিড, গ্যাস ইত্যাদি দিয়ে শরীর পুড়ে যেতে পারে। যেকোন পুড়াই হোক না কেন প্রথমে ভাল করে খেয়াল করতে হবে পুড়া কোন ধরনের এবং পরিমাণ কত ও শরীরের কোন স্থান। চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিকভাবে পুড়া তিন প্রকার।
প্রাথমিক মাত্রার পুড়া : আমাদের শরীরের চামড়ায় দুইটি স্তর থাকে। প্রথম স্তরটি এপিডার্মিস অপরটি হল ডার্মিস। শুধু চামড়ার উপরি ভাগ পুড়ে গেলে তাকে প্রাথমিক মাত্রা পুড়া বলে। এতে চামড়া লাল হয়ে আক্রান্ত স্থান ফুলে উঠে এবং যন্ত্রনা করে। এ পুড়া প্রাথমিক চিকিৎসায় কমে যায় কিন্তু সাবধান থাকবেন, এই সামান্ন মাত্রার পুড়া যদি মুখে যৌনাঙ্গে, নিতম্বে এবং অস্থি সন্ধি স্থলে হয় তাহলে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার পরামর্শ নিতে হবে।
দ্বিতীয় মাত্রার পুড়া : শরীরের চামড়ার দুইটি স্তরই পুড়ে যায়। তাহলে এ অবস্থাকে বলা হয় দ্বিতীয় মাত্রা পুড়া। এ অবস্থায় চামড়ায় লাল হয়ে ফোসকা পড়ে এবং ফুলে ওঠে। অতিরিক্ত জ্বালা-যন্ত্রনা করে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে এ পুড়া মাত্রা যদি তিন ইঞ্চির বেশি বিস্তৃত না হয় তাহলে সামান্ন পুড়া বলে ধরা হয়। পুড়া যদি অধিক ছড়ানো হয় আর স্থানটি যদি মুখে, যৌনাঙ্গে, হাতে, পায়ে, গিরায়, শ্বাস নালীতে, নিতম্বে হয় তাহল অতি তাড়াতাড়ি রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা করানো খুবই প্রয়োজন।
তৃতীয় মাত্রার পুড়া : এ মাত্রার পুড়া অত্যন্ত বিপদজনক ও গুরুত্বর। এ ক্ষেত্রে শরীরের চামড়ার উভয় স্তর, চর্বি, মাংস পুড়ে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে দেহের হাড়ও পুড়ে যায়। এ অবস্থায় পুড়া অংশ কালো হয়ে যায়। আবার সাদাবর্ণ হয়ে শুস্ক হয়ে যায়। এ ধরনের পুড়ায় ব্যথা থাকে না। কারণ দেহের ¯œায়ুগুলো পুড়ে যায়। তাই ব্যথা করে না, এটি ভালো লক্ষণ নয়। রোগী শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কার্বন মনোঅক্সাইড নামক বাতাসের বিষাক্ত পদার্থ ফুসফুসে ঢুকে যায়। এ ধরনের পুড়াতে অতিতাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে হবে এবং বার্নইউনিটে ভর্তি করতে হবে। এসব রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা বা দেরী করা বিপদ ঢেকে আনতে পারে।
প্রাথমিক চিকিৎসায় করণীয় : উপরে আলোচনায় প্রথম ও দ্বিতীয় মাত্রার পুড়া হলে আক্রান্ত স্থানটি স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানির ধারার নিচে ধরে রাখুন। যেমন : টেপের পানির নিচে ১০-১৫ মিঃ ধরে রাখতে হবে। শরীর পুড়ে গেলে গোসলের ঝরনার পানির নিচে বা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এ ব্যবস্থা যদি করা না যায়, তাহলে আক্রান্ত স্থানটি বালতির পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। শরীরে কাপড়ে আগুন লাগলে মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে হবে। দৌঁড়াদোড়ি করা যাবে না। এতে আগুন আরো বেড়ে যেতে পারে। পোড়া শরীরে কাপড় থাকলে বা কোনো প্রকার অলংকার থাকলে তা খুলে ফেলতে হবে। কোনো প্রকার রাসায়নিক পদার্থ বা গরম তেল দিয়ে পুড়লে প্রথমে দেখতে হবে তার শরীরে যেন তা লেগে না থাকে। অগ্নি দগ্ধ হলে ব্যক্তির শরীর থেকে পোষাক খুলে প্রথমে দশ মিনিট বিশ্রাম দিয়ে আধা ঘন্টা অনবরত ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে। এতে যন্ত্রনা কমে যাবে। ত্বকের চামড়ায় ফোসকা পড়া ভালো লক্ষণ। আসলে ফোসকা পড়লে মনে করবেন দেহের কোষগুলো জীবিত আছে। তবে এ ফোসকাগুলো সাথে সাথে গলানো যাবে না। পোড়া গভীর হলে সাধারণত ফোসকা পড়ে না। এতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শরীরে আগুন লাগলে কাঁথা বা কম্বল দিয়ে গা জড়িয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করবেন না। এগুলো শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখে বা দেহের মধ্যে আটকে যায়। এতে চামড়ার পুড়ার বিস্তৃতি বেড়ে যেতে পাড়ে। এমনকি মৃত্যু ডেকে আনতে পাড়ে। পোড়া স্থানটি জীবাণুমুক্ত গজ বা ব্যান্ডেজ (তবে তুলা নয়) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। যাতে জীবাণু সংক্রমন না হয়। ব্যথানাশক ঔষধ নামক প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রফেন জাতীয় ঔষধ সেবন করা যেতে পারে।
যা করা যাবে না : চামড়া পোড়া জায়গায় বরফের পানি, ফ্রিজের পানি বা ফ্রিজের বরফ, কিংবা বরফ দেওয়া যাবে না। আবার গরম পানি ঢালা যাবে না। আক্রান্ত স্থানে ডিম, টুথপেষ্ট, মাখন, মলম লাগানো যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার মলম ব্যবহার করা যাবে না। তুলা দিয়ে ড্রেসিং করা বা পোড়া অংশ ঢেকে রাখা যাবে না। শুকনো গজ বা ব্যান্ডেজ ব্যবহার করতে হবে। পুড়া স্থানে ভেসেলিন বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করবেন না। পুড়া স্থানে কোনোভাবে ডলাডলি করা যাবে না এবং ফুসকা ফাটানো বা তুলে ফেলা যাবে না।
এডিস দগ্ধ হলে : এডিস নিক্ষেপ একটি দন্ডনীয় অপরাধ। এর ফল মৃত্যুদন্ড। তারপরেও দেশে এসিড সন্ত্রাস থেমে নেই। চিন্তা করো যে ব্যক্তি এডিস এ দ্বগ্ধ হয় তার শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক যে ক্ষতি হয় তার তুলনা নেই। এসিড পানির মতো তরল পদার্থ কিন্তু শরীরে স্পর্শ করা মাত্রই চামড়া পুড়ে যায়, জ্বলতে থাকে। এসিস এত দাহ্য পদার্থ যে মাংশ পুড়ে গিয়ে হাড়েরও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে তাই এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে প্রচুর পরিমাণে পানি আক্রান্ত স্থানে ঢালুন। এতে যত বেশি পানি ঢালা যাবে এসিডের শক্তি তত কমে যাবে। শরীরে ক্ষতির পরিমাণ তত কম হবে। তবে সাথে সাথে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন এসিডের পোড়া ব্যক্তির দ্রুত সেরে ওঠার জন্য পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন ও আলো-বাতাস সম্পন্ন পরিবেশ খুবই প্রয়োজন।
রক্ষা করার উপায় : যে কোনো চুলা সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে না রেখে প্রয়োজন শেষে নিভিয়ে রাখুন। আগুনের উপর ভেজা কাপড় বা ভেজা কম্বল দিয়ে চাপা দিন। বাড়িতে আগুন লাগার উপকরণ গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, ম্যাচ বক্স, ইলেকট্রিক সুইচ সাবধানে ব্যবহার করুন। চারদিকে আগুন থাকলে মাথা নিচু করে নাক চেপে ধরে দ্রুত স্থান ত্যাগ করুন। রান্নার চুলা মেঝেতে না বসিয়ে কোনো উঁচু স্থানে বসান এবং দাঁড়িয়ে রান্না করুন। শিশুরাও অসাবধানতাবশত গরম পানি, ডাল, চা বা চুলায় হাত ঢুকিয়ে দিয়ে এতে তারা পুড়ে যায়। এগুলো শিশুদের নাগালের বাহিরে রাখুন। মহিলারা রান্নার সময় পোশাক পরিধানে সতর্ক থাকুন। ঢিলেঢালা জামা পরে আগুনের কাছে গেলে অসাবধানতায় আগুন লেগে যেতে পারে। তাই আগ থেকে বেধে নিন। এসিডের সহজ লভ্যতা ও যত্রতত্র ব্যবহার কঠোর হাতে দমন করতে হবে। পোড়া রোগীকে প্রচুর পরিমাণ তরল জাতিয় খাবার খাওয়ান। সতর্ক হোন, সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT