ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটে ফারসি চর্চা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০১৯ ইং ০১:০৭:৫৯ | সংবাদটি ১৩১ বার পঠিত

এ উপমহাদেশে ইসলামী সংস্কৃতি তাহজিব তামাদ্দুন প্রধানত ফারসি ভাষার মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে। অত্যন্ত সমৃদ্ধ এ ভাষায় রচিত সাহিত্য আমাদের সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শুদ্ধি অভিযানের পরও এককভাবে ফারসির প্রভাব বাংলা ভাষাতে আজও অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে বেশি বলা যায়। রাজভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা এবং এর বিশাল সাহিত্য সম্ভার উপমহাদেশে ফারসি চর্চার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে চর্চা করেছেন এ ভাষা। ১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে ফারসির রাজভাষার মর্যাদা বাতিল হয়। কিন্তু ইসলামী সংস্কৃতির বাহন এবং ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থের ভাষা হওয়ার সুবাদে এর চর্চা বন্ধ হয়নি। জীবন্ত ভাষা হিসাবে ফারসির কদর ছিল পরবর্তী এক শতাব্দী পর্যন্ত। ইদানিং এর চর্চায় তেজীভাব নেই। তবে লুপ্ত হয়নি এর প্রভাব ও অনুশীলন। পাকিস্তান আমলে এমনকি এখনো প্রবীণ শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোক বিরল যিনি ফারসি দু' একটি শের জানেন না। আজকাল মনে হয় যারা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত শুধু তারাই ফারসি চর্চা করেন। কিন্তু অতীতে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে স্কুল কলেজে এ ভাষাটি শিখেছেন। সংস্কৃতের চর্চা একটি শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ফারসির চর্চা ছিল উন্মুক্ত। ফলে ব্যাপকভাবে ভাষাটি চর্চিত হয়েছে।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারে এ ভাষা ও সাহিত্যের আসন ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। অভিজাত পরিবারে ফারসি শেখা ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। সিলেট অঞ্চল উপমহাদেশের জ্ঞানচর্চার স্রোতের বাইরে কখনো ছিল না। হযরত শাহজালালের আগমনের পূর্বেও এখানে মুসলমানের বসতি ছিল। গৌড় গোবিন্দের অত্যাচারে নিষ্পিষ্ট বোরহান উদ্দিন দিল্লীর রাজ দরবারের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। গৌড় গোবিন্দের বিরুদ্ধে হযরত শাহজালালের আগেও অভিযান পরিচালিত হয়েছিল । এতে অনুমান করা যায় ঐ সময়েও ফারসি ভাষার সাথে এখানকার পরিচয় ছিল। তবে ব্যাপক চর্চা শুরু হয় মুসলমান প্রভাব রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। গৃহে শিক্ষা লাভ করা অতীতের রসুম ছিল। কেউ উস্তাদের বাড়িতে যেতেন আবার সম্পন্ন পরিবারে গৃহশিক্ষক নিয়োগ করা হত। মোগল আমলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফারসি ভাষা শেখার ব্যবস্থা সিলেটে হয়েছিল।
আনুমানিক খ্রীষ্টিয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে শ্রীহট্টের সুপ্রসিদ্ধ মুফতি পরিবারে অতি বৃদ্ধ মাওলানা জিয়া উদ্দিন সাহেব একটি মাদ্রাসা স্থাপন করিয়াছিলেন। তাহার পরবর্তীগণের যতেœ ও চেষ্টায় ১৮৩৭ ইংরেজী পর্যন্ত পরিচালিত হয়। প্রায় দুই শত বৎসরের উর্ধকাল পর্যন্ত ইহাতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকল ধর্মের লোকেই পারস্য ভাষা শিক্ষা করিতে পারিয়াছেন। ...ইহাকে কেন্দ্র করিয়া প্রথমে গ্রামের ওঝারা (গৃহ শিক্ষকরা) সকালে এবং বিকালে পারস্য ভাষা শিশুদিগকে শিক্ষা দিতেন। ওঝার নিকট হিন্দু ছাত্ররা বাংলা এবং সংস্কৃত ভাষাও শিক্ষা করিতে পারিতেন। এই কেন্দ্রীয় মাদরাসা পরিচালনার ব্যয় নির্বাহার্থে ৫৪২ হাল ভূমি মোগল বাদশাহ কর্তৃক দান করা হইয়াছিল।
মুসলমান আমলে ফারসি ভাষা চর্চা সম্পর্কে রসময় মোহান্ত লিখেছেন :
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে আরবি ফারসির চর্চা বেড়ে যায়। স্থানে স্থানে মাদরাসা ও মক্তব ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও ফারসি চর্চায় এগিয়ে আসেন বৈষয়িক কারণে। রাজনৈতিক, বৈষয়িক ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য প্রতিটি শিক্ষিত পরিবারে প্রবেশ লাভ করে। সিলেটের সুনামও ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পৃথ্বিমপাশার জমিদার রবি খাঁ মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। উপাধি পেয়েছিলেন দানিশমন্দ এবং খান বাহাদুর। এ ছাড়া হবিগঞ্জের লস্করপুরের সৈয়দ ইব্রাহিম মালিক- উল- উলামা এবং সৈয়দ ইস্রাইল ‘মুলক- উল- উলামা’ উপাধি পেয়েছিলেন দিল্লীর দরবার থেকে। এ সময়ে গ্রন্থাদিও লিখিত হয়েছে। সৈয়দ ইব্রাহিম মালিক- উল- উলামার মাদেনুল ফাওয়ায়েদ নামে একখানা গ্রন্থের রচনাকাল ৯৪১ হি. (১৫৩৪ খ্রি.)। বাংলাদেশে ফারসিতে এর আগে লিখিত কোনো গ্রন্থের প্রমাণ এ যাবৎ পাওয়া যায়নি।
এখানে কয়েকটি ফারসি গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের নাম উল্লেখ করা হলো।
লেখক : সৈয়দ ইব্রাহিম মালিক-উল-উলামা, মাদেনুল ফাওয়ায়েদ (৯৪১ হি.)। মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল কাদির, তফসিরে কাদিরিয়া। মাওলানা আবুল হাসান মো. আব্দুর রহমান, (১) মসনবী-এ দিলখুশা (১২৮৩ হি.)। (২) সয়ফুল আবরার আলাল মাসআলুল ফুজ্জার (১২৯৮ হিঃ কানপুর) শামসুল উলামা আব্দুল মুনিম জওকী ১। আখলাকে আহমনী (১২৯৮ হি. কানপুর)। শামছুল উলামা আব্দুল মুনিম জওকী, (১) আখলাকে আহমদী (১২৯৮ খ্রি. আগ্রা), (২) তাসবিরুল বয়ান ফি শারহীদ দিউয়ান মুতানব্বী (আবরী শরহে দিওয়ান এর অনুবাদ : ১৩০১ হি. কানপুর)। (৩) দাবিস্তানে দানিশ (পাঠ্য ছিল)। মাওলানা আজির উদ্দিন আহমদ, (১) আকাইদে আজিরিয়া, (২) গুল দস্তায়ে আকাইদ (১৯০৬ খ্রি., কলকাতা)। সুফী আব্দুল্লাহ চৌধুরী, কলিমাতে ওয়ায়েজ (১৩০৬ হি. কলকাতা)। এলাহী বখশ হামিদ মজুমদার, (১) দেওয়ান এ হামিদ, (২) অসিওত নামা। মাওলানা শফিকুল হক চৌধুরী বাহাদুরপুরী-আকাইদুল ইসলাম (১৯০৭ খ্রি.)। হামিদ বখশ মজমাদার, আয়না-এ-হিন্দ। মাওলানা ইব্রাহিম আলী, তানজিমুদ্দার।
এ ছাড়া আরো অনেকের প্রকাশিত অপ্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। তাদের মধ্যে মৌলভী মোহাম্মদ আরশদ, সৈয়দ রায়হান উদ্দিন, আজদ উদ্দিন কদমী, আয়াত উল্লাহ, মোহাম্মদ ইসরাইল, আবুল ফজল, মো. কামিল, খলিলুর রহমান খলিল, অধ্যাপক মো. খলিলুল্লাহ, গোলাম আম্বিয়া, সালেহ আবুল হাসান, সৈয়দ জমিলুল হক, মুন্সী জামান, হরমুজ উল্লাহ শয়দা উল্লেখযোগ্য।
তথ্য সূত্র : ১. সৈয়দ মুর্তাজা আলী, শিক্ষা অঙ্গনে সাবেক সিলেট। সিলেট কথা-সম্পাদনা কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী। ২. পূর্বোক্ত। ৩. মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর সংগ্রহ থেকে গ্রন্থ ও গ্রন্থকারদের নাম উদ্ধৃত। ৪. নরেন্দ্র কুমার গুপ্ত চৌধুরী, শ্রীহট্ট প্রতিভা পৃ. ১৪৮, সিলেট ১৯৬১। ৫. রসময় মোহান্তঃ সিলেটের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন পৃ. ১৬২ বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস, সিলেট ১৯৯৭। ৬. পূর্বোক্ত। ৭. মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর সংগৃহীত তথ্য।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • Developed by: Sparkle IT