ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান

আবু সালেহ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০১৯ ইং ০১:১২:১৭ | সংবাদটি ২৭৬ বার পঠিত

হবিগঞ্জ জেলা লোকসাহিত্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। এখানে লোকসাহিত্যের অমীয় উপাদান, কিচ্ছা কাহিনী, কিংবদন্তি, গাঁথা, গীতিকা, উপকথা, রূপকথা, গীতিকথা, জারি, বারোমাসি, মারিফতি, মুরশেদি, ছড়া-গান, প্রবাদ-প্রবচন, লোককাহিনী, লোকগল্প, সারি গান, বিয়ে গান, ফসলের গান, ভট্ট গান ও জনপ্রিয় উপখ্যানগুলো লোকজীবনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে। এই অঞ্চলের উপখ্যানগুলোর মধ্যে রয়েছে আলাল দুলালের কিচ্ছা, আয়না বিবির কিচ্ছা, ববানীর প্রেম কাহিনী, রাজা জয় সিংহের কিচ্ছা, সুরত জামালের কাহিনী, সোনাবানের কিচ্ছা, কমলারাণীর উপখ্যান, মলাই বাবুলের কিচ্ছাগুলো দেশে বিদেশে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যানটি ময়মনসিংহ গীতিকার একটি উল্লেখযোগ্য লোককাহিনী। এখানে এই কাহিনী সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।
আলাল খাঁ ও দুলাল খাঁ নামে বানিয়াচং রাজ্যে দুই দেওয়ান ছিলেন। তারা সহোদর দুই ভাই। দেওয়ান আলাল খাঁ বড় আর দেওয়ান দুলাল খাঁ ছোট। বড় ভাই দেওয়ান আলাল খাঁ একজন সাধু সজ্জন ধার্মিক লোক। আচার আচরণে, গুণে ধনে খুবই বড় মাপের ব্যক্তি অর্থাৎ খ্যাতনামা এক ব্যক্তিত্ব। তার বিবি ফাতেমা বেগমও রূপে গুণে অতিশয় সুন্দরী। সংসার ধর্ম পালনে সমর্থ এই নারী, যেন হুরপরী।
বিবি একদিন খাব দেখলেন যে, ‘পুণ্নুমাসির চান যেন কোলেতে লইল’। অর্থাৎ শুক্লপক্ষের পঞ্চদশীর তিথিতে চাঁদ যেমনি পুর্ণতা পেয়ে রাতের আধাঁরে উজ্জ্বল আলো ছড়ায়, তেমনি কোল আলো করা একটি ছেলে ফাতেমা বিবির কোল জুড়ে আসল। এমনি একটি স্বপ্ন দেখলেন তিনি। এতে তার মনে অজানা এক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। স্বপ্নটি শুভ না অশুভ এই নিয়ে চিন্তায় পড়লেন। এই রহস্যময় স্বপ্নের কথা ফাতেমা বিবি তাঁর স্বামীকে বললেন। দেওয়ান স্বপ্নের এ ব্যাখ্যা করলেন। বিবি বললেন স্বপ্ন যেন সত্য হয়। এই নিয়ে দেওয়ান-বিবি মহা খুশি। আল্লাহর অশেষ কুদরতে ফাতেমা বিবি গর্ভবতী হলেন। দেওয়ান আনন্দে রাজ্যের নামকরা গণককে ঢাকলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে অভিজ্ঞ প্রবীণ এক গণক গুণে বলল, ‘ফাতেমা বিবির গর্ভে জন্মিবে এক পুত্রসন্তান। এ সুসংবাদের জন্য দেওয়ান নগদ অর্থে পুর®কৃত করে গণককে বললেন, দেখো তোমার কথা যেন সত্যি হয়। জবাবে গণক জানাল, কিন্তু আছে হুজুর। দেওয়ান বললেন - কিন্তু কি? গণক বলল কিন্তু রহস্য ঘেরা যে। দেওয়ান বললেন কি রহস্যের বিষয় জলদি বলো। গণক বলল,-
যদি কুড়ি বছরের মধ্যে দেখ পুত্রের মুখ/ পুত্রের কারণে তুমি পাইবা বড় শোক।
দেওয়ান শুনে হতবাক।
এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বংশধরের জন্যই এ রাজ্য আর ধন সম্পদ। এই বলে দেওয়ান আলাল খাঁ কেন্দে জার জার। বিষয়টি নিয়ে ছোট ভাই দুলাল খাঁর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। বংশধর রক্ষার্থে তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, গণকের পরামর্শ অনুযায়ী যা যা করা প্রয়োজন সকল চেষ্টাই করে যাবেন। এ নিয়ে অনেক ভেবে চিন্তে দেওয়ান জনবিহিন এক নির্জন দূর্গম অরণ্য বেছে নিলেন। স্থানটি হাইলাবন। এই বনে গর্ত খুড়ে একটি পুরি তৈরি করে সেথায় সন্তান সম্ভবা স্ত্রী ফাতেমা বিবিকে নির্জনে বসবাসের জন্য জায়গা করে দিলেন। যাতে করে নব জন্মা বংশধরকে কেউ দেখতে না পায়। লেংড়া কাবেলা বলে একজন অতি বিশ্বস্থ্য দক্ষ উজির ছিলেন। দেওয়ান আলাল খাঁ তাহাকে গোপনে হুকুম দিলেন- অতিসত্তর একটি পাতালপুরি নির্মাণ কর। বেশী সংখ্যক মজুর লাগিয়ে লেংড়া কাবেলা সুন্দর ও ঠিকসই একটি ইন্দ্র পুরী তৈরি করল। আলাল খাঁ দেখে খুশি হলেন। বকশিশ দিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে সকল শ্রমিককে বিদায় দিলেন। লেংড়া কাবেলা উজিরও বড় অংকের বকশিশ বাগিয়ে নিলো। এবার দেওয়ান হাইলাবনের এই ইন্দ্র পুরীতে বিবি ফাতেমাকে বসবাসের জন্য পাঠালেন। হিসাব করে প্রয়োজনীয় খাবার ও ব্যবহার সামগ্রী সঙ্গে দিলেন।
বনের ইন্দ্র পুরীতে ফাতেমা বিবি তাহার বিশেষ সাহায্যকারীনি ভৃত্যের সেবা যতেœ নির্বাসিত জীবন কাটাতে লাগলেন। নবজাত সন্তানের আশায় নির্বাসিত জীবনের সকল দুঃখকে সহ্য করে ইন্দ্র পুরীতে বিবি বুঝে নিলেন শান্তি পুরী হিসেবে।
এদিকে বিবিকে বনপুরীতে নির্বাসনে পাঠিয়ে পতœী বৎসল আলাল খাঁ চারদিক অন্ধকার দেখলেন। তিনি কিছুতেই মনে শান্তি পাচ্ছেন না। বিষয় আশয় এমনকি দেওয়ানগীরি পর্যন্ত তার কাছে তিক্ত হয়ে উঠলো। তার উদাসীন মনে এক শুণ্যতা বিরাজ করছে। তাই- আল্লাহর ভাবে ভাবুক ফকিরি বেশে দেওয়ান আলাল খাঁ বিষয় আশয় ছেড়ে সুদূর মক্কায় চলে গেলেন।
এরই মধ্যে চলে গেল দশমাস দশ দিন। ফাতেমা বিবির কোল জুড়ে জন্ম নিল ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান যেন, এক পূর্নমাসীর চান্দ বিবির কোলে আসল।
সন্তান পেয়ে বিবি একাকী জীবনের দুঃখের কথা ভুললেন। ভুলে গেলেন রাজ্য ও ঐশ্বর্য্যরে সুখের কথাও। দেওয়ানকে কিভাবে এ সুসংবাদ দেওয়া যায় এ নিয়ে বিবি ভাবছেন। এই পুরীর বাহিরে যাওয়া নিষেধ। কেউ সন্তানকে যদি দেখে ফেলে তবে তো সন্তানের অমঙ্গল হবে। এই ভাবনায় কাউকে কিছু মুখ খুলে বলছেন না। কেবলি ভাবছেন- আজ যদি দেওয়ান সাহেব এই কথা শুনিত/ আফসোস মিটাইয়া কত ধন বিলাইত।
হ্যাঁ, কতই না খুশী হতেন দেওয়ান। খুশী মনে রাজ্যময় ধন-দৌলত, মিঠাই বিলিয়ে দিতেন। এসব মনে এনে বিবি নিরবে কাদছেন। এরই মধ্যে কেটে গেল কয়েকটি দিন। সন্তানের নাম রাখা প্রয়োজন। মনে পড়ে গেল বিবির গণকের সেই কথা। গণক বলেছিল, ‘রূপেতে হইব পুত্র সুরত জামাল/ রাখিলেন ঠিকই নাম সুরত জামাল’।
এখন আলাল খার ছোট ভাই দুলাল খাঁ রাজ্যময় দেওয়ানগিরি করছেন। তিনি একদিন লোকলস্কর নিয়ে গহীন জঙ্গলে শিকারে আসলেন। সুরত জামাল বড় হয়ে নির্জন পুরী গুহা ছেড়ে জঙ্গলায় বেড়াচ্ছে। হঠাৎ করে তাদের দেখা হয়ে গেল। আলাল খাঁ বনেতে এই সুদর্শন ছেলে দেখে চিন্তায় পড়লেন। কে সেই ছেলে? নিশ্চয়ই কোন বড় লোকের ছেলে হবে! অনেক ভেবেচিন্তে তিনি ঠিকই চিনতে পারলেন সুরত জামালকে।
শিশু সুরত জামালের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকাতেই দুলাল খাঁর মনে কল্পনা হল, এই শিশু একদিন বড় হয়ে দেওয়ানগিরির উত্তরাধিকারী হিসাবে ভবিষ্যতের পথের কাটা হয়ে দাঁড়াবে। তাই যেভাবেই হোক পথের কাঁটাকে সরাতে হবে। দুষ্টবুদ্ধির উদয় হল দুলাল খাঁর মনে। তিনি কিছু দুষ্টলোকের সঙ্গে এ নিয়ে গোপনে শলা পরামর্শ করে নিলেন। তারা দুলাল খাঁকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল- বুড়া হইয়া তোমার ভাই বৈদেশেতে গেছে/ কি জানি এতেক কাল আছে কি মরিয়াছে।
কাজেই এখন তোমার বড় ভাই আলাল খাঁকে নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ নাই। তারা আরো বলল- সুখেতে দেওয়ানী করো বাচোঁ যতকাল। কাটিয়া উজাড় করো দুশমনিয়া শাল।
দুষ্টদের মিষ্টি কথায় দুলাল খাঁ কানে দিলেন। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন সময় সুযোগমত যে কোন কৌশলে সুরত জামালকে মেরে ফেলবেন। বিশ্বস্থ সেনাপতি লেংড়া কেবলা’কে ডেকে এনে অর্থলোভ দেখানো হল। সে সাথে চল্লিশ পুতা লাখেরাজ জমিনও দেবেন। লেংড়া কেবলা জানতে চাইল, কাজটা কি ছোট দেওয়ান? দেওয়ান দুলাল খাঁ চুপিচুপি বলল, ফাতেমা বিবি যেথা বাইন্ধা দিলা ঘর/ মাটি চাপা দিবা তার উপর। / বাহির না হইতে পারে যেন কোন পথ দিয়া / কবরের মধ্যে তারে আসিবা রাখিয়া।
বৃদ্ধ উজির লেংড়া কেবলা এ প্রস্তাব শুনে আতকে উঠল। এত বড় সর্বনাশ সে করতে পারবে না। ছোট দেওয়ান এ ভেবে বলতে হবে। এ অজুহাতে চলে আসল। কিন্তু দু’চোখের পানি সে আটকাতে পারল না। এত বড় সর্বনাশ না করে মনে মনে ভাবল যেমন করেই সুরত জামালকে বাচাতে হবে। দেওয়ানের বংশ উচ্ছন্ন যাবে তা হতে দেওয়া যায় না। গোপনে ঘোড়ায় চড়ে হাইলা বনের জঙ্গলায় এসে হাজির হল। বিবি ফাতেমাকে বলল,
দুশমন দুলাল খাঁ দেখ কি কাম না করে। পুত্রের সহিত বিবি তোমার চায় মারিবারে।
এই সংবাদ শুনে বিবি ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন। পুত্রের জীবনের সুখ শান্তির জন্য কত না কষ্ট সহ্য করে নির্বাসিত জীবন সহ্য করা হচ্ছে। তবুও জীবন কি শেষ রক্ষা পাবে না? এ ভেবে ফাতেমা বিবি অস্থির হয়ে কাঁদছেন আর লুটোপুটি খাচ্ছেন। এমনি সময় সুরত জামাল এসে উপস্থিত। মার কান্নার কারণ ও দুলাল খাঁর ষড়যন্ত্রের সমস্ত ঘটনার ইতিবৃত্তান্ত বৃদ্ধ নাজির লেংড়া কাবিলা খুলে বলল। ঘটনা শুনে সুরত জামাল সিদ্ধান্ত নিল এই নির্জন গুহাটি এখন আর নিরাপদ নয়। অন্যত্র চলে যেতে হবে।
-তাই সুরত জামাল বলল, মা কোন দেশেতে যাই। মা বললেন, আল্লা বিনে আর গতি নাই। বৃদ্ধ উজির লেংড়া কেবলা সুরত জামালকে পরামর্শ দিয়ে বলল- তোমার বাপের ছিল এক দোস্ত আছে দক্ষিণবাগ শহরে। তোমরা সেখানে যেতে পার।
উজিরের পরামর্শ অনুযায়ী বিলম্ব না করে মা-বেটা হাইলা বনের নির্জনপুরী থেকে বেরিয়ে পড়ল। ব্দ্ধৃ উজির সাথী। সাত দিন পথ চলার পর দক্ষিণবাগ দুবরাজ রাজার দেশে উপস্থিত হল। ব্রাহ্মণ রাজা দুবরাজ উজিরের মুখে ষড়যন্ত্রের সকল বিবরণ শুনে সুরত জামাল ও বিবি ফাতেমাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাদের বসবাসের জন্য বারো দুয়ারী ঘর তৈরি করে দিলেন। মা ছেলের সঙ্গে বৃদ্ধ উজিরও স্থান করে নিল। সুখে শান্তিতে নিরাপদে বসবাস করলেও সুরত জামাল যেন মনে শান্তি পাচ্ছিল না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বদেশপ্রেম জাগতে লাগল। তার পিতৃভূমি দেখতে চায়। জানতে চায় প্রজাকুলের সুখ শান্তির কথা। নির্যাতন উৎপীড়নের প্রতিবাদে প্রয়োজনে প্রজাদের স্বার্থে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে চায়। এসব চিন্তায় মন তার ব্যাকুল হয়ে উঠল। একদিন সে তার মাকে বলল- বাপের রাজত্ব আমি আইমু চক্ষেতে দেখিয়া / বিদায় দেওখাইন মা জননী হরষিত হইয়া।
জন্মের পর থেকে মা ছেলেকে কোথাও যেতে দেন না। বুকে আটকে ধরে লালন করেছেন। বড় হয়েছে এখন আর সন্তানের দাবীকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। মা অতি কষ্টে চোখের পানি সংবরণ করে সুরত জামালকে বিদায় দিলেন।
সুরত জামাল বাপের রাজত্ব বানিয়াচং আসল। এখানে কাউকে কিছু না বলে একাকী রাজ্যময় ঘুরে ঘুরে প্রজাদের খোঁজ নিল। সে জানতে পারল ছোট দেওয়ান দুলাল খাঁর অত্যাচারে প্রজাকুলের প্রাণ অতিশয় অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। এমনকি দেওয়ানের উৎপীড়নে মুলুকের কোথাও কোথাও উজাড় হয়ে গেছে।
অতিশয় ক্ষুব্ধ ও বিষাদ মনে সুরত জামাল মায়ের কাছে ফিরে আসল। সে দক্ষিণবাগের রাজা দুবরাজের নিকট নিজের মনের ইচ্ছা ও বানিয়াচঙ্গের রাজ্যের অবস্থা বর্ণনা করল। সে লড়াই বিদ্যা শিক্ষার ইচ্ছে প্রকাশ করে দুবরাজ রাজার ফৌজদারের নিকট লড়াই শিখতে শুরু করল। যুদ্ধ বিদ্যায় দক্ষ হয়ে সুরত জামাল রাজফৌজ নিয়ে একদিন বানিয়াচঙ্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
সুরত জামাল এসে নিজের পরিচয় দিয়ে অত্যাচারী রাজার পক্ষ ত্যাগ করে প্রজাকুলকে আহ্বান জানাল আর অমনি বানিয়াচঙ্গের প্রজাকুল দলে দলে দুলাল খাঁর পক্ষ ত্যাগ করে সুরত জামালের পক্ষে যোগ দিতে শুরু করল। অবস্থা বেগতিক দেখে অবশেষে ছোট দেওয়ান দুলাল খাঁ ভয়ে পালিয়ে গেলেন।
বাপের রাজত্ব সুরত জামাল দখল করে নিল। বৃদ্ধ উজির লেংড়া কেবলাকে দ্রুত সংবাদ পাঠাল ফাতেমা বিবিকে বানিয়াচঙ্গে দ্রুত নিয়ে আসতে। সবাইকে নিয়ে খুশি মনে সুরত জামাল বানিয়াচঙ্গে রাজত্ব করতে লাগল। এই শুভ সংবাদ দক্ষিণবাগের রাজা দুবরাজের নিকট পৌছল- শুইন্যা দক্ষিণবাগ রাজা খুশী হল মনে/ সুরত জামাল রাজত্ব করে অতি সাবধানে।
দক্ষিণবাগের রাজা দুবরাজ। তিনি সুরত জামাল ও তার মা ফাতেমা বিবির বিপদের দিনে নিরাপদে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই রাজার একমাত্র ষোড়শী কন্যা অধুয়া সুন্দরী। এমন সুন্দরী কন্যা দক্ষিণবাগে আর দ্বিতীয়টি নেই। সাত ভাই এক বোন অধুয়া সুন্দরীকে তাঁর সাত ভাবী রূপচর্চায় সহযোগিতা করে আবের কাঁকই দিয়ে তাঁর ঘনকালো চুলে যখন নোটন খোঁপা বেঁেধ দেয় তখন তাঁর কাজল কালো দুচোখের চাউনী ও রূপ উপভোগে প্রকৃতিও যেন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই পরমা সুন্দরী অধুয়া একদিন বাগানবাড়িতে ফুল তুলতে গেলে পথে জামাল খাঁর সঙ্গে দেখা হয়। জামাল বলল, অধুয়া আমার বাবার রাজত্বে যাইব আমি চলে, চিন্তা করিবা না তুমি কিছুকালের মধ্যে তোমাকে এসে নিয়ে যাব আমি। অধুয়া সুন্দরী চিন্তা করল।
পথ চলাতে যতদুর দৃষ্টি, অধুয়া দাঁড়িয়ে জামাল খাঁকে দেখে নেয়। তার চোখের পলকে যেন জামাল খাঁর রূপ মিশে আছে। এক নিমিষের জন্যও সে ভুলতে পারছে না। নিরন্তর শুধু একই ভাবনা। জামালের প্রেমে বিভোর অধুয়া। এরই মধ্যে দুজনের ভাববিনিময় হয়ে যায়। অনেকদিন গত হল জামালের আর দেখা নেই। বিষ্ময়কর এক কল্পনা জাগ্রত হল মনে। বিশেষ এক তাগিদ অনুভব করে তাঁর বিরহ কাতর মন। তাই এবার আগ্রহ ভরে জামাল খাঁকে অধুয়া পত্র লিখে- জামাল খাঁ পত্র পেল। পত্র পেয়ে জামাল চলে যায় দক্ষিণবাগ শহরে। একটি ভাউলিয়া ডিঙ্গায় চড়ে জামাল খাঁ আসছে। দূর থেকেই জামাল দেখতে পায় নদীর ঘাটে অপেক্ষমান অধুয়াকেÑনদীর ঘাটে জামাল ও অধুয়া দেখা হল। চারি চোখের মিলন হল, হল হৃদয়ের ভাব-বিনিময়। একে অন্যকে ভালবাসল। এরই মধ্যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা আগত। নিজ ঠিকানায় ফিরার তাগিদ, সেদিকে কারো খেয়াল নেই। অধুয়াকে দেখে জামাল অধীর হয়ে উঠল। ইত্যবসরে মাঝি মালা তাগিদ দিল হাওর পাড়ি দিতে হবে। বিলম্ব করা যাবে না। অন্তরে অন্তরে ভাব বন্ধন হল। আর এখনি প্রেম বন্ধন ছিন্ন করে যেতে হবে। এ চিন্তা মনে নিয়ে জামাল খাঁ ভাবে- চারি চক্ষু এক হল যাইবার কালে/ ভ্রমরা উড়িয়া যায় ছাইড়া যেন ফুলে।
বৈঠার টানে জামাল খাঁর ডিঙ্গি গহীন পানে ভেসে চলল। প্রেয়সী অধুয়া প্রেমাশ্রু মুছতে মুছতে দক্ষিণবাগে ফিরে গেল। প্রেম পাগল জামাল খাঁর মনে শান্তি নেই। চোখে ঘুম নেই। অধুয়া সুন্দরীকে তাঁর চাইই। সারাক্ষণ শুধু একই ভাবনা। জামাল খাঁ উজিরের সঙ্গে পরামর্শ করে বিয়ের পয়গাম পাঠাল। পয়গাম নিয়ে উজির দক্ষিণবাগ পৌছে- পয়গাম পেয়ে রাজা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। মুসলমান ছেলের সঙ্গে ব্রাহ্মণকন্যা অধুয়ার বিয়ে! না অসম্ভব! গর্জে উঠলেন রাজা। এ পয়গাম পাওয়াকে রাজা অপমানবোধ করে অগ্নি মূর্তি ধারণ করে বলল- এটা কোনমতেই সম্ভব নয়।
রাজার এই রূঢ় আচরণে উজির অপমানিত হয়ে প্রাসাদ ছেড়ে চলে আসল। জালাল খাঁ উজিরের মুখে সব সংবাদ জ্ঞাত হয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। এই নিয়ে অনেক চিন্তার পর অগত্যা কিছু সৈন্য নিয়ে দক্ষিণবাগ আক্রমণের উদ্দেশ্যে জামাল খাঁ যাত্রা করল।
ঘোড়ার উপরে জামাল সওয়ার হইল/ পাছেতে লস্কর যত কুঁদিয়া চলিল।
[চলবে]

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • Developed by: Sparkle IT