উপ সম্পাদকীয়

ভিক্ষুক ও হিজড়া পুনর্বাসন প্রসঙ্গে

মো: আব্দুল মালিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০১৯ ইং ০১:১৬:০৪ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত

সুজলা, সুফলা, শষ্য শ্যামলা, জ্ঞান বিজ্ঞান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই বাংলা যুগে যুগে বিদেশিদের মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তাইতো বিশ্বের প্রায় সকল জাতি গোষ্ঠীর মানুষ এই বাংলায় এসেছিলো সম্পদের খোঁজে, জ্ঞান বিজ্ঞানের খোঁজে। শেষ পর্যন্ত বৃটিশরা থেকে যায় এবং ছলে বলে কৌশলে বাংলার শাসক হয়ে প্রায় দু’শ বছর এই বাংলাকে শোষন করে। বৃটিশরা বিতাড়িত হলে আসে পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী। তাদের ২৪ বছরের বৈষম্যমূলক শাসন শোষনে এই বাংলা হয়ে যায় তলাবিহীন ঝুড়ি। বৃটিশরা শোষন করলেও আধুনিক শিক্ষা ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে কিছু দিয়েও যায়। আর যাওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংশলীলা চালায়নি। কিন্তু পশ্চিমারা কিছু দিয়ে যায় নি বরং চলে যাওয়ার সময় গ্রহণ করে পোড়ামাটি নীতি। যার ফলে এই বাংলা বিশ্বে পরিচিতি পায় ভূখা-নাঙা-বন্যা-খরা-দূর্ভিক্ষ কবলিত এক দেশ হিসেবে।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবনের সংগ্রাম ও স্বপ্ন ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি। অবশেষে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক মুক্তি এলেও তিনি জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে পারেন নি। কারণ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় কুচক্রী মহল তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে দেশকে পিছনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। তখন মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, অবকাঠামো কোন কিছুই ছিল না। ছিল শুধু সাড়ে সাতকোটি মানুষ। কৃষি প্রধান এই বাংলাদেশে তখন প্রতি বছর ২৫/৩০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সরকার ৩৭৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় লক্ষ শিক্ষকের চাকুরী জাতীয়করণ করেছিলেন।
বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার। ২০১৯-২০ সালের বাজেট হচ্ছে ৫ লক্ষ ২৩ হাজার কোটি টাকার। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মত মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। আরো বহু মেঘা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের সকল যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০৪১ সােেলর মধ্যে উন্নত বিশ্বের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এসব উন্নয়ন-উন্নতি শুধু মাত্র সরকারের কথার কথা নয়। জাতিসংঘ সহ আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠনের সমীক্ষা ও রিপোর্টে এসবের উল্লেখ আছে। আগে যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান উন্নত দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের সাথে দীর্ঘদিন ধর্না দিয়েও সাক্ষাৎ পেতেন না, আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট সহ অন্যান্য বিশ্বনেতারা, বিল গেটস এর মত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তি বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সাথে আগ্রহভরে দেখা করেন, লাঞ্চ সারেন। এর থেকে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদার খানিকটা পরিচয় মেলে। এর প্রধান কারণ আমাদের সার্বিক উন্নতি। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ১০/১২ হাজার হিজড়া ২/৩ লক্ষ ভিক্ষুক ও ২/৩ হাজার নিবন্ধিত পতিতাকে পূর্নবাসিত করা মোটেই অসম্ভব-নয়।
অনেকে বলে থাকেন এরা পূর্নবাসিত হতে চায়না। সরকার ও একাধিকবার উদ্যোগ নিয়ে সফল হতে পারেন নি। এসব আংশিক সত্য। আসল সত্য হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় নি। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেন হিজড়া, পতিতা ও ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়বেন। তাহলে প্রথমেই একটি আইন করে এসব নিষিদ্ধও কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। যদি ভিক্ষা আদান-প্রদান, হিজড়াদের চাঁদাবাজি, পতিতাবৃত্তি, কঠোর শাস্তি যোগ্য অপরাধ হয় তাহলে বিনা পুঁজির এই ব্যবসা ৮০% এমনিতে কমে যাবে। বাকিদের অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ইউএনও, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার নির্বাহী, ডিসিদের হাতে অর্পন করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা দেয়া হলে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে পূর্নবাসিত হতে বাধ্য হবে।
যদি দেশের কোন জায়গায় ভিক্ষা করার কোন সুযোগ না থাকে, তাহলে ভাতা বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নেওয়ার জন্য ভিক্ষুকরা সরকারকে খুঁজবে, সরকারকে ভিক্ষুক খুঁজতে হবে না।
বাস্তবে দেখা গেছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা অবহেলা করে প্রথমে তালিকাভুক্ত হন নাই। এখন অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও হতে পারছেন না। তেমনিভাবে প্রতিবন্ধী জরীপের সময় ও অনেকে প্রথমে তালিকাভূক্ত হননি। পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছেন। সরকার দীর্ঘদিন বিনা ‘ফি’তে জন্মনিবন্ধন করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অনেকেই সেই সুযোগ নেন নি। যখন এটা, একটা সময় বন্ধ করে ফি লাগিয়ে বিভিন্ন কাজে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলো তখন অনেকেই ফি দিয়ে জন্মনিবন্ধন করেছেন। তেমনিভাবে যদি ভিক্ষুকের ভিক্ষা, হিজড়াদের চাঁদাবাজি, পতিতাদের পতিতাবৃত্তির শাস্তি কমপক্ষে ৩/৫ বছরের জেল বা এক/দেড় লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান করা হয় তাহলে কেউ আর এদিকে পা বাড়াবে না।
আইনে এদেরকে ধরে নিকটস্থ থানায় সোপর্দ করার ক্ষমতা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান/মেয়র/মেম্বার/কমিশনার/কাউন্সিলারদের হাতে অর্পন করা হয় তাহলে কোথাও এসব কাজ করার আর সুযোগ পাবে না। যখনই বিষয়টি বেআইনি ঘোষিত হবে তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সচেতন নাগরিক সবাই এদেরকে তাড়া করবে, ফলে এসব আপনা হতে বন্ধ হবে। তবে পূর্ণবাসন প্রক্রিয়াটা সহজ করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় যারা তালিকাভূক্ত হবে তাদেরকে প্রাথমিক যাচাই বাছাই করে সামাজিক সুরক্ষার যেকোন একটিতে অন্তর্ভূক্ত করে পূর্নবাসিত করা সম্ভব। তালিকাভূক্তির এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে, কারণ- ‘সকাল বেলা রাজারে ভাই, ফকির সন্ধ্যাবেলা’। একটি পরিবার যেকোনো সময় ভিক্ষুকে পরিনত হতে পারে। ভিক্ষুক, হিজড়া, নিবন্ধিত পতিতা যারা পূর্নবাসিত হতে চায় তাদের জন্য একটি ফরম ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, পৌরসভা, সির্টি কর্পোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলার, সমাজসেবা, ইউএনও, জেলা প্রাশাসকের অফিস এবং অনলাইনে যথেষ্ট পরিমানে রেখে ব্যাপক প্রচারনার মাধ্যমে নিবন্ধন করা হলে বেশিরভাগই নিবন্ধিত হয়ে যাবে। যারা বাকি থাকবে তারা যখন ভিক্ষা করতে পারবেনা তখন স্বউদ্যোগে নিবন্ধন করবে।
২০২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির জনকের জন্ম শতবার্ষিকী, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ তম বার্ষিকী। এই দুই বার্ষিকীকে একত্র করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা, চারবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বের সফল রাষ্ট্র নায়কদের অন্যতম জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষনা করেছেন। এই মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তব রুপ দিতে তাঁর আজীবনের লালিত স্বপ্নকে সম্মান জানাতে মাদার অব হিউম্যানেটির নেত্রী শেখ হাসিনার সরকার থেকে জাতি এই ঘোষণা শুনতে চায়, ‘মুজিববর্ষে বাংলাদেশকে হিজড়া, পতিতা ও ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হলো’।
বাংলাদেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে সরকারের যে অর্থ ব্যয় হবে তার পুরোটাই সরকারের ক্ষতি নয়, এর মধ্যে জাতীয় লাভও আছে। যারা প্রকৃত ভিক্ষুক নয়, তারা ভিক্ষা করতে না পেরে উৎপাদনশীল কাজে যাবে ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। যেসব শিশু ভিক্ষাবৃত্তির কারণে বিদ্যালয়ে যায় না তারা নিরক্ষর থেকে যাচ্ছে। এরা ভিক্ষা করতে না পারলে বিদ্যালয়ে যাবে ফলে নিরক্ষরতা দূর হবে। ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে অনেক সময় অনেক অপরাধ সংঘঠিত হয় তাও রোধ হবে। বঙ্গবন্ধু যদি যুদ্ধবিধ্বস্ত পোড়ামাটির উপর দাঁড়িয়ে প্রায় দেড় লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষকের চাকুরী জাতীয়করণ করতে পারেন তাহলে তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী শেখ হাসিনা দুই/আড়াই লক্ষ ভিক্ষুক, হিজড়া, পতিতাকে পূর্নবাসিত করতে পারবেন না কেন? অবশ্যই পারবেন। জাতি এখন হিজড়া, পতিতা ও ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ এই ঘোষনা শুনতে উদগ্রীব। এতে করে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো হবে। এ দেশ ও জাতি যতদিন থাকবে ততদিন শেখ হাসিনার সরকার, আওয়ামীলীগ সরকারকে জাতি মনে রাখবে। হতদরিদ্র ভিক্ষুকরা প্রাণভরে দোয়া করবে। সাধারণ মানুষ ভিক্ষুক বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাবেন। জাতি উন্নত বিশে^র দিকে একধাপ এগিয়ে যাবে।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT