উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি

সুজয় সুব্রত প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১০-২০১৯ ইং ০০:১০:২৩ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

আবরার হত্যাকা-ের ঘটনা পরিক্রমা শিউরে ওঠার মতো। এই বর্বর হত্যাকা-ের মূল কারণ ক্ষমতার রাজনীতি, আধিপত্য বিস্তার এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা। প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশ এবং সুশাসনের অভাব থাকে, তখন বিরোধী দল/মতকে দমন করার জন্য ছাত্র-যুব সংগঠন কিংবা দলীয় অনুসারী অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের প্রায়োগিক ব্যবহারকে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। গত দুই দশকে যারাই ক্ষমতায় ছিল, তারা কেউই এই অপকৌশল থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। কাজেই আজকে যে অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এত বেপরোয়া হয়ে ধরাকে সরাজ্ঞান করছে এটা কিন্তু একটা দীর্ঘ রাজনৈতিক অপচর্চার ফলাফল। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে অন্যান্য গণতান্ত্রিক অনেক আন্দোলনে ছাত্রলীগের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। কাজেই, দলীয় প্রয়োজনে এদের অঘোষিত নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে দেওয়ার পর যদি আশা করা হয় যে, এরা নিজেদের এমপাওয়ারড ভাববে না কিংবা সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না, সেটা কিন্তু বোকামি। কারণ এই অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার ফলে এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বা নেক্সাস তৈরি হয়, যা কি না পরে আর দলীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। যখনই এই পাওয়ার রিলেশনের চেইন অব কমান্ড হাতছাড়া হওয়ার ভয় তৈরি হয়, তখনই শুরু হয় অস্ত্রের ঝনঝনানি আর পেশিশক্তির প্রদর্শন। এ জন্যই শিবিরের রগকাটা আর চাপাতি সন্ত্রাসীর বিপরীতে ছাত্রলীগের হেলমেট/হাতুড়ির উত্থান দেখা যায়, মৌলিক কোনো আদর্শিক পরিবর্তন হয় না। এখন কথা হচ্ছে, এর দায়ভার কি শুধুই ছাত্রসংগঠনের, নাকি যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এরা রাজনৈতিক চর্চা করে সেটারও?
দ্বিতীয়ত, আমাদের ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-সংগ্রামে ছাত্ররাজনীতির কৃতিত্ব অপরিসীম কিন্তু গত তিন দশকে ছাত্ররাজনীতির অর্জনটা কী আমাদের দেশে, দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, খুন, হত্যা, যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে প্রশ্নপত্র ফাঁস পর্যন্ত এমন কোনো হীন কাজ নেই যার সঙ্গে এরা জড়িত না। এখন চাঁদাবাজিকে বলা হচ্ছে ফেয়ার শেয়ার, চিন্তা করা যায়, দুর্নীতিকে কীভাবে লেজিটিমাইজ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হচ্ছে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের টর্চার সেল ভয়ংকর ব্যাপার! প্রশাসন কি এগুলো জানত না? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে অনেক আগেই এবং দলীয় ব্যানারে অপপ্রয়োগের কারণে এর প্রয়োজনীয়তাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কী? জ্ঞান বিতরণ এবং উদ্ভাবন। কজন শিক্ষক বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, তারা জ্ঞানচর্চা এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িত আছেন? কাজেই আমাদের প্রচলিত রাজনীতির খাই-খাই দর্শনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সরাসরি সাংঘর্ষিক। মোদ্দা কথা হচ্ছে, একটা দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে যখন পলিটিসাইজড করা হয়, তখনই সেখানে নৈতিক, আদর্শিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজনৈতিক পেশাজীবী সংগঠন তৈরি হয়, যেমন বিশ্ববিদ্যালয় লাল দল, নীল দল ইত্যাদি। তখন সবাই ক্ষমতার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার জন্য নিজের রাজনৈতিক বলয় ও পলিটিক্যাল আইডেনটিটি তৈরি করে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ম্যানুপুলেট করে, যার ফলে প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্র এবং ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের কারখানা, যেটাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যেতে পারে ‘ঞযব চৎড়নষবস ড়ভ ঝঃৎঁপঃঁৎব ধহফ অমবহপু।’
তৃতীয়ত, সামাজিক অসহিষ্ণুতা। আমাদের দেশের ভিন্নমতের কাউকে সহজে ভিক্টিমাইজড করা বা হত্যা করে তা বৈধতাদান করার সবচেয়ে সহজলভ্য অস্ত্র হচ্ছে তার একটা রাজনৈতিক ও রিলিজিয়াস আইডেনটিটি তৈরি করা, যা কি না রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের চেয়েও ভয়ংকর। এই প্রক্রিয়াটার গোড়াপত্তন হয়েছিল অনেক আগে কিন্তু বড় আকারে সামাজিক প্রয়োগ শুরু হয় ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হওয়ার পর। তখন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আস্তিক বনাম নাস্তিক ব্লগার ডিসকোর্স তৈরি করে একের পর এক ব্লগার, অ্যাকটিভিস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেককেই নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যত দিন আমরা এই আস্তিক বনাম নাস্তিক, লীগ বনাম বিএনপি/জামায়াত, ধর্মীয় বনাম বিধর্মী নামক ডিসকোর্সের ফাঁদে পড়ে সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে নিজেদের বিভাজিত করে রাখব, তত দিন এই অসহিষ্ণুতা থেকে মুক্তি নেই। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহিষ্ণুতা ইনহেরিটেড বিষয় না কিংবা বাই ডিফল্ট তৈরি হয় না বরং দীর্ঘমেয়াদি একটা চর্চার মধ্য দিয়ে একা আত্মস্থ করতে হয়, যা কি না আমাদের সমাজে বিরল। এমনকি, দুঃখজনক হলেও সত্য, আবরারের হত্যাকা- নিয়েও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে।
যাই হোক, এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বেশির ভাগকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবিদার, তারপরও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সুবিচার পাওয়া আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আগাছার গোড়া রেখে আগা ছাঁটাই করে যে কোনো লাভ নেই, দেরিতে হলেও বুয়েট প্রশাসন সেটা বুঝতে পেরেছে এবং দলীয় ব্যানারে ছাত্র/শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অত্যন্ত সাহসী এবং সময়োপযোগী। আশা করি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হর্তা-কর্তাদেরও একটু আত্মোপলব্ধি হবে। সেই সঙ্গে সরকারেরও এটা ভেবে দেখা দরকার যে, কেন জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন আজ আদর্শ ও নৈতিকতাবিহীন একটা সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে, যা কি না পক্ষান্তরে সরকারের অনেক ভালো ভালো অর্জনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এই দায়ভার কি ক্ষমতাসীনদের ওপর কিছুটা হলেও বর্তায় না? এখনই এদের শক্ত হাতে দমন এবং সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলে সরকারের জন্য এটা একটা বুমেরাং হবে।
লেখক : পিএইচডি গবেষক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT