উপ সম্পাদকীয়

পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১০-২০১৯ ইং ০০:৪৪:১৩ | সংবাদটি ৪০৮ বার পঠিত
Image

অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের স্তর উন্নত হলে মানুষ ছোট গন্ডি বা সীমা অতিক্রম করে বৃহৎ পরিমন্ডলে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। তখন সে আর খাল-বিল-নদী-নালার মতো ক্ষুদ্র স্থানে জল দেখে না, সে জলকে সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে বিশাল ক্যানভাসে দেখতে চেষ্টা করে। যখন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি হ্রাস পেতে থাকে, তখন নিজের উপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে সাঁতার কাটার জন্য নদী কিংবা সমুদ্রে যেতে চায় না। সে তখন ছোট গর্তের জলে দাঁড়িয়ে জলের স্বাদ নিতে চেষ্টা করে। অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানশূন্যতা থেকেই মানুষের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রুপ, দল, উপদলের সৃষ্টি হয়।
‘মানুষ’ শব্দ একটি বিশাল ক্যানভাসের দিকে ইঙ্গিত করে। যেমন বর্তমান পৃথিবী সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের বসতি। এই বিশাল ক্যানভাসকে কোন মানুষের পক্ষে-ই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আমরা এই বিশাল ক্যানভাসকে ভেঙে দেশ, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি- গোষ্ঠি বিভিন্ন পরিচয়ে খন্ডিত করি। এই খন্ডনগুলোকে আজ আর অস্বীকার করা যাবে না। তবে মানুষ শব্দ যে বৃহৎ অর্থ বহণ করে খন্ডিত শব্দগুলো সেখানে থাকে না, একথা আমাদের স্বীকার করতে হবে। পৃথিবীতে আমরা মানুষ, একই মায়ের গর্ভজাত এবং একই বাপের ঊরুশজাত সন্তান; বিষয়টা ভাবতেও অনেক ভাল লাগে। নিজেকে খুব স্বাধীন মনে হয়। অতঃপর যখন মানুষ বিভিন্ন পরিচয়ে খন্ডিত হলো, তখন হারাতে থাকে নিজেদের স্বাধীনতা। এখন আর যেদিকে মন চায় সেদিকে নিজের ইচ্ছে মতো চলা যায় না। প্রত্যেক সীমানা অতিক্রমকালে পাসর্পোটÑভিসার প্রয়োজন হয়। খন্ডিত মানুষের সবকিছুতে খন্ডন শুরু হয়ে যায়। মানুষ যত ছোট খন্ডে গিয়ে দাঁড়াতে থাকে, ততোই সে তার চিন্তা ও কর্মে ছোট হতে থাকে। আমরা স্বীকার করি, এই খন্ডনগুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌক্তিক প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হীনমন্যতা, মূর্খতা এবং অভিজ্ঞতাশূন্যতা থেকে তৈরি।
ব্যক্তি-মানুষ যখন এই হীনমন্যতা, মূর্খতা এবং অভিজ্ঞতাশূন্যতার গন্ডি অতিক্রম করে তখন আবার এই বিষয়গুলোর জন্য নিজেদের কর্মের প্রতি লজ্জাবোধ করে। খন্ডিত মানুষের মধ্যে ধর্ম, দেশ এবং ভাষাগত খন্ডনকে এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এরপরও নিজেদের ধর্ম, দেশ এবং ভাষাগত খন্ডনকে স্বীকার করে এবং খন্ডিত অবস্থানে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ বৃহত্তর মানবের কল্যাণের কথা ভাবেন, বলেন এবং কল্যাণের চেষ্টা করেন। সময়ের ব্যবধানে তারাই মহামানব। আমাদের শ্রদ্ধা তাদের প্রতি।
আমরা কেউ কেউ যখন নিজেকে দেওবন্দি, ফুলতলি, বেরলভি, জামায়াতি, মাজারি, সুন্নি, ওয়াহাবী ইত্যাদির উর্ধ্বে মুসলমান ভাবি, তখন এই গ্রুপগুলোর নেতাকর্মি, ভক্ত-শিষ্য আমাদেরকে বিভ্রান্ত এবং গোমরা মনে করে। আমরা যখন নিজেকে বাঙালি, পাকিস্তানী, ভারতী, আমেরিকান ইত্যাদি না ভেবে বিশ্বের নাগরিক ভাবি তখন কেউ কেউ ভাবেন আমাদের মাথা খারাপ। আর যখন আমরা বিশ্ব নাগরিক দাবী করে ভিসা ছাড়া সীমানা অতিক্রম করি, তখন হয় জেলে কিংবা বুলেটের আঘাতে প্রাণ দিতে হয়। এভাবেই আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপ্রয়োজনীয় খন্ডনসমূহকে রক্ষা করা হচ্ছে বছরের পর বছর থেকে।
আমরা বলছি না সকল খন্ডন ভেঙে ফেলা হোক, আমরা বলছি অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর খন্ডনগুলো ভাঙার চেষ্টা করা হোক। তবে প্রয়োজনীয় খন্ডনও যদি প্রতিহিংসার মনোভাব তৈরি করে তবে তাও ক্ষতিকর। ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা ভাষা যখন মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরির কারণ হয়ে যায় তখন তাও ক্ষতিকর মনে করে পরিহার করা প্রয়োজন। ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা দলের ভেতর নিজেরা যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল-উপদল তৈরি করেন তখন তা হয়ে যায় আরও মারাত্মক হীনতার পরিচায়ক। এই সব হীনতা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এখন প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি ভুল-শুদ্ধ আলোচনা করবো না? অবশ্যই ভুল-শুদ্ধ আলোচনা করবো, কিন্তু তা হবে সংশোধনের উদ্দেশ্যে, প্রতিহিংসার মনোভাবে নয়। যেমন মনে করুন, বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান তিনটি পাশাপাশি দেশ। আমাদের একের প্রতি অন্যের যে প্রতিহিংসাত্মক মনোভাব, তা কি মানবিক বা যৌক্তিক? কেন আমরা প্রত্যেক নিজেদের অবস্থানে দাঁড়িয়ে একে অন্যকে সম্মান করতে পারি না? কারণ, আমরা বৃহত্তর স্বার্থ থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি ক্ষুদ্র স্বার্থকে। আমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্ম, প্রেমের আলোকে বিচার-বিবেচনা করে বলি না, আমরা হিংসা এবং প্রতিহিংসা থেকে বলি। তেমনিভাবে ধর্মীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমরা যখন ধর্মের মূলবাণী ছেড়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তাকে ধারণ করি, তখন আমরা একে অন্যকে ধংসের জন্য সত্য-মিথ্যা কাহিনী তৈরি করি এবং সাধারণ বিশ্বাসী সরল মানুষদেরকে করি বিভ্রান্ত। একইভাবে নিজ নিজ ধর্ম কিংবা দলের ভেতরে আমরা যখন বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করি তখনও অনেক মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করি একে অন্যের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে। নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধে নিজেদের ভক্ত-শিষ্য লেলিয়ে দেই বিভিন্ন সত্য-মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে। এসব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হীনমন্যতা থেকে সৃষ্টি হয়।
আমি আদর্শিক কারণে কারো বিরোধীতা করছি, না হীনমন্যতায়, তা বুঝবো কীভাবে? বিষয়টা খুবই সহজ। যখন দেখা যাবে কারো বিরুদ্ধে আমি কাজ করছি রাগ থেকে, প্রতিহিংসা থেকে এবং আদর্শ থেকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে আক্রান্তের চেষ্টা করছি, নিজের পদ-পদবী এবং অসৎ অর্থের স্বার্থ কাজ করছে মনে তখনই বুঝতে হবে আমার মধ্যে হীনমন্যতা এসে গেছে। তা পরিহার করতে হবে। হযরত আলী (রা.) এক যুদ্ধে শত্রুকে মাটিতে ফেলে যখন গলায় তলোয়ার চালাতে যাচ্ছিলেন, তখন শত্রু রাগে তাঁর গায়ে থু থু দিয়ে বসে। হযরত আলী শত্রুকে ছেড়ে দিলেন। শত্রু জানতে চাইলো, আপনি আমাকে ছেড়ে দিলেন কেন? তিনি বললেন, এতক্ষণ তোমার সাথে আমার যুদ্ধ ছিলো আদর্শিক এবং শুধু আল্লাহ ও রাসুলের সন্তোষ্টির জন্য আর এখন তুমি থু থু দেওয়ায় তা হয়ে গেছে ব্যক্তিগত, কারণ আমার মনে তোমার প্রতি রাগ ও ঘৃণা এসে গেছে। শত্রু এই জবাব শুনে মুসলমান হয়ে যায়। এই ঘটনা থেকে আমরা আদর্শিক এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার একটা সীমা নির্ণয় করতে পারি।
মানুষের প্রধান শত্রু তার নিজের হীনমন্যতা, অথচ মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা বুঝতেই পারে না। হীনমন্যতা থেকেই মানুষের মধ্যে অহংকারের সৃষ্টি হয়। আর অহংকার মানুষকে মানুষ থেকে দূরে নিয়ে ছোট ছোট খন্ডে ভাগ করে ফেলে। যেমন মুসলমানরা এক আল্লাহ, এক রাসুল, এক কোরআন মেনেও দেওবন্দি, ফুলতলি, বেরলভি, জামায়াতি, মাজারি, খেলাফতি, জমিয়তি, সালাফি-আহলে হাদিস, সুন্নি, ওয়াহাবী ইত্যাদি বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত। এই সব ফেরকাগুলো বিভিন্ন আদর্শিক মতানৈক্যের কারণে তৈরি হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হীনমন্যতা থেকে লালিত-পালিত হচ্ছে। অনেকে জ্ঞান-বুদ্ধির অভাবে এই হীনমান্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। আবার অনেক মনে মনে বেরিয়ে আসলেও নিজের মনোশক্তির অভাবে ঘোষণা দিতে পারছেন না। তবে সবাই এমন নয়। অনেক বেরিয়ে আসেন এমন বিষয়াদি থেকেও। যেমন মুফতি মুহাম্মদ তকি, যিনি দেওবন্দী সিলসিলার একজন আলেম। তাঁর বাবা মুফতি মুহাম্মদ শফি; যিনি বিশ্ববিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ মাআরিফুল কোরআনের লেখক। তাঁর মূল বসতবাড়ি ভারতের দেওবন্দ এলাকায় এবং তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান মুফতির দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পাক-ভারত বিভক্তির সময় তিনি পাকিস্তান চলে আসেন এবং পাকিস্তানের মুফতি-এ আযম ছিলেন। আধ্যাত্মিকতায় মুফতি শফি ছিলেন হাকিমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (র.)-এর খলিফা। মুফতি তকি উসমানী যখন জ্ঞান-বুদ্ধি, কর্মে নিজের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গন্ডিতে পা রাখেন তখনই ঘোষণা দিলেন; ‘নিজেকে দেওবন্দী মাসলাকের লোক বলতে ও লিখতে আমার দ্বিধা বোধ হয়। দ্বিধাবোধ হয় এ কারণে যে, এ পরিচয় থেকে ফেরকাবন্দীর গন্ধ আসে। দেওবন্দী মাসলাক শব্দবন্ধ দ্বারা অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। তারা মনে করে দেওবন্দী এমন কোন ধর্মীয় উপদল ও ফেরকার নাম, যে ফেরকা উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত থেকে সরে গিয়ে স্বতন্ত্র কোনও পথ তৈরি করে নিয়েছে। অথচ দারুল উলূম দেওবন্দের চিন্তাধারা সেরকম কিছু নয়।’ (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী : আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘ইয়াদে’। বাংলা অনুবাদ : আমার জীবনকথা)।
মুফতি তকি উসমানী এই ঘোষণা দিয়েছেন বলে তিনি দেওবন্দিদের চিন্তা- চেতনা ছেড়ে দেননি। তিনি মূলত নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে-ই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সমুদ্র, আকাশ কিংবা বিশাল হাওয়র দেখার চেষ্টা করেছেন। ক্ষুদ্র পরিসরকে অতিক্রম করে তিনি বৃহত্তর পরিসরকে ধারণের কথা ঘোষণা করেছেন। একইভাবে অনেকে নিজেকে নিজ ধর্মে পূর্ণাঙ্গ রেখেও বলতে পারেন আমি গোটা মানুষের অংশ কিংবা আমার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সকল মানুষ। আমি খন্ডিত পরিসরে দাঁড়ালেও খন্ডিত নয় চিন্তা এবং চেতনায়। আমি মাটির মাত্র কিছু অংশে দাঁড়িয়েও দেখি বিশাল আকাশ কিংবা সমুদ্র। আমি মানুষ; ব্শ্বি-মানুষের অংশ।
লেখক : প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • করোনাকালের ঈদোৎসব
  • মহাপূণ্য ও করুণার রাত শবে-কদর
  • মাহে রামাজান: যাকাত আদায়ের উত্তম সময়
  • দারিদ্র দূরীকরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
  • চীন-আমেরিকার শীতল যুদ্ধ
  • চাই আশার বাণী
  • কোভিড-১৯:সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • Image

    Developed by:Sparkle IT