ধর্ম ও জীবন

তাসাওউফ, মুরাকাবাহ

আখতার হোসাইন প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১০-২০১৯ ইং ০১:১২:১৬ | সংবাদটি ১১৭ বার পঠিত

আধ্যাত্মিকতা অর্জনের হাতিয়ার ‘মুরাকাবাহ বা ধ্যান’ এর প্রথম প্রাপ্তি প্রশান্তি। প্রশান্তি বিনয়, ন¤্রতা, স্বচ্ছতা সর্বোপরি কল্যাণের অনুধাবন ক্ষমতা সৃষ্টি করে। মেডিটেশন লেভেলে, প্রশান্ত চিত্তে মানুষ বুঝতে পারে তার একজন নিয়ন্ত্রক বা সৃষ্টিকর্তা আছেন। প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়ে তিনি তাকে এ ধরণীতে পাঠিয়েছেন। সুতরাং ¯্রষ্টা হিসেবে তিনি তার সব কিছু দেখছেন, শুনছেন, জানছেন, পর্যবেক্ষণ এবং নিরীক্ষণ করছেন। সৃষ্ঠিকর্তা তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন : (১) সে কি জানেনা যে,আল্লাহ তা‘য়ালা সবকিছু দেখছেন? (সূরা আলাক্ব-১৪) (২) জেনে রাখ! নিশ্চয় তিনি তোমাদের প্রতিটি কর্ম পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা-০১) আর কিয়ামাত দিবসে তোমাদের ছোট-বড়, ভাল-মন্দ যাবতীয় পাপ-পুণ্যের হিসাব তিনি নিবেন। তখন কারো প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবেনা। কারণ তিনি স্বয়ং নিজে সেদিন হিসাব-নিকাশ গ্রহণ করবেন। (সূরা : আম্বিয়া-৪৭)
এজন্যে আল্লাহ তা’আলা বিশ^াসীদেরকে হিসাব-নিকাশের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করে বলছেন: হে বিশ^াসীরা! তোমরা তোমাদের সৃষ্ঠিকর্তা সম্পর্কে সচেতন হও। আর প্রত্যেহ তোমাদের মুরাকাবাহ, মুহাসাবাহ, তাফাক্কুর বা গভীর মনোযোগ ও চিন্তা-ভাবনা করে ভেবে দেখা উচিত যে, পরকালের কর্মগুলো একান্ত তোমাদের সৃষ্ঠিকর্তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হচ্ছে কিনা? জেনে রাখ! লোক দেখানো বা মনগড়া কোন কর্ম পরকালের আদালতে গ্রহণযোগ্য হবেনা। সে কারণে আবারো বলছি, স্রষ্টা সম্পর্কে তোমরা সচেতন থাক। কারণ তোমরা যা করছো তার প্রত্যেকটা ব্যাপারে তিনি সচেতন রয়েছেন এবং খবর রাখছেন। (সূরা : হাশর-১৮)
বিশিষ্ট মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: যে কর্ম একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্ঠির উদ্দেশ্যে এবং তার রাসুলের সুন্নাহ বা নিয়ম অনুযায়ী করা হয়, আল্লাহ তা’আলা সে কর্মই কবুল করেন। (মাদারিজুস সালিকীন,২/৯৫,নাদরাতুন নাঈম,২য় খন্ড,পৃষ্ঠা-১৬৯) এ কারণে কোন কাজই যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে বা মনগড়া করার কোন সুযোগ তো নাই; বরং প্রত্যেকটি কর্ম সৃষ্টিকর্তাকে রাজি-খুশি করার জন্য হচ্ছে কিনা, তাঁর প্রেরিত জীবন বিধান অনুযায়ী হচ্ছে কি না? প্রতিনিয়ত এ ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। এবং প্রত্যেকটা কর্ম সম্পাদন করার পূর্বে মুরাকাবাহ-মুহাসাবাহ এবং ইস্তেখারা করা বাঞ্ছনীয়। এ জন্যে আমিরূল মু‘মিনিন হযরত উমর বলতেন, কিয়ামাত দিবসে তোমাদের হিসাব-নিকাশ গ্রহণের পূর্বেই তোমরা নিজেরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ করো। দেখে নাও কার কর্ম কি অবস্থায় আছে। এবং সাথে সাথে তা পরিশুদ্ধ করে নাও। তিনি আরো বলতেন, মরার আগে মরে গেছ, এ ভান করে দেখ কেউ তোমাকে মর্যাদা দিচ্ছে কিনা? এবং সে আলোকে নিজেকে সাজিয়ে নাও। (ক্বিমিয়ায়ে সা’আদাত, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২১৮)
বরেণ্য মুফাস্সির আল্লামা মুফতি শাফি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কিয়ামাত দু’প্রকার। (১) সমগ্র বিশে^র কিয়ামাত (২) ব্যক্তি বিশেষের কিয়ামাত। তিনি বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির দুনিয়া হল তার বয়সের বছর এবং দিনগুলো। ব্যক্তি বিশেষের কিয়ামাত তার মৃত্যুর সাথে সাথে শুরু হয়ে যায়। তাই বলা হয়েছেÑ কবর জগৎ এটা দুনিয়ার ‘ওয়েটিং রুম বা বিশ্রাম ঘরের মত। এ বিশ্রামাগার থেকেই প্রত্যেক ব্যক্তির স্থর ও মর্যাদা নির্ধারিত হয়ে যায়। ফার্স্টক্লাস যাত্রীদের ওয়েটিং রুম হবে জান্নাতি আবেশে সজ্জিত বালাখানা। আর পাপি ও অপরাধীদের ওয়েটিং রুম হবে হাজত ও জেলখানার মত নিকৃষ্ঠ এবং কষ্ঠদায়ক। এ কারণে প্রতিটি কর্মের ব্যাপারে শয়তানের কুমন্ত্রনার প্রভাব থেকে সর্বদা আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। (তাফসিরে মা’রিফুল কুরআন, পৃষ্ঠা-১৩৫৭)
আমাদের রুহ বা আত্মা হচ্ছে মুসাফির বা প্রবাসী। দুনিয়ার যে কোন জায়গায় এমনকি গভীর সমুদ্রে থাকলেও মূলের সাথে যদি সংযোগ থাকে,তাহলে গভীর সমুদ্রে থাকলেও কোন টেনশন থাকেনা। মোবাইল ফোন বা যে কোন মাধ্যমে বাবা-মা বা পরিবার পরিজনের সাথে যোগাযোগ থাকলে যে কোন প্রান্তে থাকলেও তারা ভাল আছেন জেনে প্রশান্তিতে থাকা যায়। একইভাবে ¯্রষ্টায় সমর্পিত থাকলে, তাঁর দেয়া বিধান পূর্ণরূপে মেনে চললে,তাঁর সাথে যোগাযোগ থাকলে সৃষ্টির বা বান্দার কোন টেনশন থাকেনা। আর সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের একমাত্র পথ হল প্রশান্ত স্তরে উন্নীত হওয়া। আধ্যাত্মিকতা, ফিকাহ এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের উপর যত পড়াশুনা আর ডিগ্রি নেয়া হোকনা কেন? ধ্যানের স্থরে উন্নীত না হলে প্রশান্ত স্থরে পৌঁছা যায়না। প্রশান্ত স্তরে উন্নীত হওয়ার একমাত্র রাজপথ হল তাসাওউফ বা আধ্যাত্মিকতা অর্জনের সাধনা ‘মুরাক্বাবাহ বা ধ্যান।’
ইমাম গাজালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর প্রিয় শিক্ষক ছিলেন ইমামুল হারামাইনের ভিসি। প্রিয় শিক্ষক এর ইন্তেকালের পর তিনি হলেন এর ভিসি। টানা দশ বছর এ দায়িত্ব পালনের পর হঠাৎ তিনি এ দায়িত্ব ছেড়ে দামেস্ক এবং জেরুজালেম চলে আসেন। এ স্থান ছেড়ে চলে এসে তিনি বুঝালেন যে, দলীল-প্রমাণ বা যুক্তি দিয়ে অন্যকে বুঝানো যায়। কিন্তু নিজেকে বা নিজের অন্তরাত্মাকে পরিতৃপ্ত করা যায়না। অর্থাৎ-রুটি রুটি বললে তৃপ্তি মিটেনা,যতক্ষণ না সে রুটি খাওয়া হয়েছে। আঠার বছর বয়সে ধ্যান ও উপলব্দির স্থরে পৌঁছে (১) ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দীন (২) কিমিয়ায়ে সা’আদাত এ দু’টি কিতাব লিখে তিনি বুঝালেন যে, তাজকিয়ায়ে নাফস বা আত্মশুদ্ধির জন্য তাসাওউফ এর সাধনা ‘মুরাকাবাহ বা ধ্যান’ প্রয়োজন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT