ধর্ম ও জীবন

এক জুম্মার দিনের অনুভূতি

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১০-২০১৯ ইং ০১:১৩:৪৮ | সংবাদটি ১৬৪ বার পঠিত

জুম্মার দিন সকল দিনের সরদার বা শ্রেষ্ঠ দিন। আল্লাহর নিকট সকল দিনের চেয়ে জুম্মার দিন মর্যাদাবান। কুরবানীর ঈদ ও ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়েও বেশি মর্যাদাশীল জুম্মার দিন। জুম্মার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলা হয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বরের জুম্মার দিনটি আমার জন্য একটি বিশেষ দিন হয়ে এসেছে। দিনটি আমার জন্য অপরিসীম সম্মান ও ইজ্জত নিয়ে হাজির হয়েছে। এদিন আমি একজন আলীম, কুরআনে হাফিজ ও বড় বুজুর্গ মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। তিনি হাফিজ মাওলানা মুহসিন আহমদ। তিনি আল্লামা শায়খ হাফিজ আব্দুল করিম (রহ.) এর সুযোগ্য সন্তান এবং জামেয়া ইসলামিয়া আব্বাসিয়ার কৌড়িয়ার মুহতামিম।
এই জুম্মাবারে আমি আন নূর তাহফিজুল কুরআন একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে উপস্থিত ছিলাম। একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাফিজ ফখরুদ্দিন রুস্তুম বিশেষভাবে দাওয়াত করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানে সান্নিধ্য পেয়েছি আরেকজন বড় মাপের বুজুর্গ শায়খ হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদের। তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতিব।
আন নূর তাহফিজুল কুরআন একাডেমির দু’জন কৃতিমান ছাত্রের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান দর্জিপাড়ায় অবস্থিত একাডেমির হল রুমে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সুন্দর উদ্দীপ্তপূর্ণ বক্তব্য রাখেন হাফিজ মাওলানা শরফুদ্দিন আহমদ চৌধুরী, হাফিজ কারী বজলুল হক সুনামগঞ্জী, একাডেমির অন্যতম সহায়ক মাহবুবুল আলম চৌধুরী সিও, এলাকার মুরুব্বি হিসেবে আমি, কবি আব্দুল হান্নান সেলিম, সভাপতিত্ব করেন একাডেমির পরিচালক হাফিজ ফখরুদ্দিন রুস্তুম। আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দিয়ে আনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তুলেন হাফিজ মাওলানা আবিদ হাসান। বাদ জুম্মা অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দীর্ঘ সময় প্রায় এক ঘণ্টা শায়খ মাওলানা আসজাদ আহমদ সাহেবের সাহচর্য পেয়েছিলেন। হুজুর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছিলেন। তন্ময় হয়ে তার বক্তব্যে শুনেছি। তিনি একাডেমির মেধাবী ছাত্র দু’জনকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন, তোমরা তোমাদের কৃতিত্বের মাধ্যমে মাদরাসার জন্য, অত্র এলাকার জন্য, সারা সিলেটের জন্য সুনাম কুড়িয়ে এনেছো। তোমাদের জন্য তোমাদের মা-বাবা গর্বিত, তোমাদের জন্য তোমাদের ওস্তাদগণ আনন্দিত। মাদরাসায় তোমাদের ছোট ভাইয়েরা তোমাদের সাফল্যে উৎসাহিতবোধ করছে এবং তারাও তোমাদের মতো সাফল্যের জন্য বেশি করে পরিশ্রমে নিবেদিত হবে।
যে দু’জন ছাত্র প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছে তারা হলো (১) হাফিজ মুস্তাকিম বিল্লাহ। সে ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৯৬ পেয়ে যৌথভাবে ২য় হয়েছে এবং (২) মো. আদনান হাসান তামিম সে ২০০ নম্বরের মধ্যে ১৪৫ পেয়ে যৌথভাবে ২য় হয়েছে। তারা সিলেট মৌলভীবাজার জোনে বার্ষিক বোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো। এটা ২০১৯ সালের বোর্ডের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল। বাংলাদেশে এই প্রতিযোগিতার বা পরীক্ষার আয়োজন করেছে হুফ্ফাজুল কুরআন ফাউ-েশন বাংলাদেশ হিফজ শিক্ষাবোর্ড। অনুষ্ঠানে অত্যন্ত সুন্দর ও মূল বক্তব্য প্রদান করেন হাফিজ কারী বজলুল হক সুনামগঞ্জী।
তিনি দু’জন বিজয়ী প্রতিযোগীকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান, মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দকে অভিনন্দন জানিয়ে হুফ্ফাজুল কুরআন ফাউ-েশন বাংলাদেশ হিফজ শিক্ষাবোর্ডের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের সোনার ছেলেরা যেমন দেশের জন্য সম্মান ছিনিয়ে এনেছে, তেমনি আন নূর তাহফিজুল কুরআন একাডেমির দু’জন মেধাবী ছাত্র হিফজ বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান কুড়িয়ে এনেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেটের সোনার ছেলেদের গণভবনে সংবর্ধনা দিচ্ছেন, পুরস্কৃত করছেন। মহানুভব প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদরাসার মেধাবী ছাত্রদের জন্য আমরা কি এ রকম সংবর্ধনা ও পুরস্কার আশা করতে পারি না? উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে এই প্রত্যাশার প্রতি সমর্থন জানান।
একই দিন সন্ধ্যার পর বাদ এশা দীর্ঘ সময় সঙ্গ পেয়েছি হাফিজ মুহসিন আহমদের। তিনি আমার পোটিকো বারান্দায় বসেছিলেন। তিনি এই প্রথম আমার বাসায় এসেছেন। নম্বর খোঁজে খোঁজে ‘শিলকেতন’, রাসোস ২৭/এ (রায়নগর সোনারপাড়া) বের করেন। একটি ছিমছাম পুকুর ও গাছ-গাছালি দেখে তিনি আপ্লুত হন এবং একটু বেশিই প্রশংসা করেন।
মাওলানা মুহসিনের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের পরিচয় হলেও এরকম ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আমরা দীর্ঘ সময় কাটাইনি। তার কোনো তাড়া ছিলো না। আমারও ব্যস্ততা ছিলো না। ছোট্ট একটু কাজ ছিলো তা কয়েক মিনিটেই সেরে নিলাম আমরা। আমার প্রকাশিতব্য গ্রন্থ ‘হাফিজুল কুরআন’ এ তাঁর সম্পর্কে এবং তার পিতা শায়খ আল্লামা আব্দুল করিম (রহ.) শায়খে কৌড়িয়া সম্পর্কে স্মৃতিচারণের অংশটুকু সম্পূর্ণ করাই কাজ। বেশি কথা হয় দ্বীনি বিভিন্ন বিষয়ে এবং আল কুরআন হিফজের আকর্ষণ ও তৃপ্তি নিয়ে। তিনি জানতে চাইলেন তার ওয়ালিদ হুজুরের সঙ্গে আমার পরিচয় কিভাবে, এতো ঘনিষ্ঠতা হলো কেমন করে? আমার জবাব শুনে তিনি আমাকে কাছের মানুষ মনে করলেন, আপন ভাবলেন। আমি বললাম হুজুর বেঁচে থাকলে অথবা তাঁর জীবদ্দশায় আপনার সঙ্গে পরিচয় হলে আজকের এই সম্পর্ক অন্যরকম হতো। তিনি ভাবাবেগে আপ্লুত হলেন এবং যেন বলতে চাইলে আরো আগে আমাদের পরিচয় হলো না কেন?
সেদিন সন্ধ্যায় রাতের প্রথম প্রহরের ঘণ্টা দেড়েক সময় খুব আনন্দে, খুব গর্ব নিয়ে কাটালাম। পরম শান্তি অনুভব করলাম। জীবনটা যদি এ রকম শান্তির সুবাতাসে ভরে উঠতো!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT