উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান

ফয়জুর রহমান ফয়েজ প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১০-২০১৯ ইং ০০:০৬:০১ | সংবাদটি ১৫২ বার পঠিত

দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর হয়ে গেলো আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এর পাঁচ বছর আগে আম্মাকেও হারিয়েছিলাম। দুনিয়ায় মা বাবা হারানোর অভাব অপূরণীয়। আজ আব্বাকে নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে। আমার আব্বা আতিকুর রহমান, তিনি মূলত পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা, ইতিহাস, রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করতেন। তাঁর বিভিন্ন গবেষণাধর্মী বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় ও দৈনিক পত্রিকায় প্রায়শ তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ ও কলাম ছাপা হত।
রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে আমাদের পার্বত্য অঞ্চল গঠিত। আব্বার ভাষ্যমতে বাংলাদেশের এই পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্র বিদ্যমান। সেখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তিন পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা উপরোক্ত এলাকাগুলোকে তাদের নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে এবং কেউ কেউ পার্বত্য অঞ্চলকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করারও স্বপ্ন দেখে। এরই অংশ হিসেবে প্রায়ই বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর উপর চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি জানান দেয়। পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে সঠিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের অভাবে এই দেশদ্রোহী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সুযোগ নেয়। আব্বা উনার জীবনের একটি দীর্ঘ সময় রাঙ্গামাটিতে বসবাস করার কারণে এইসব সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এবং পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে বিভিন্ন গবেষণামূলক বই লেখার মাধ্যমে সঠিক ও ঐতিহাসিক তথ্য দেশবাসীর কাছে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। আব্বার গবেষণা ও লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশর অখ-তা। পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিপরীতে দেশবাসীকে সচেতন করা। এই লেখালেখি করতে গিয়ে আব্বাকে জীবনের বেশিরভাগ সময় অর্থ, পরিশ্রম, ইত্যাদি বিষয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। বৃদ্ধ বয়সেও পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এমনকি জীবনের উপর অনেকবার হুমকিও এসেছে। তবুও আব্বা থেমে থাকেননি। এইসব কিছুর পেছনে আব্বার একটাই উদ্দেশ্য ছিল আর তা হল দেশপ্রেম, কারণ আব্বা যে বিষয়ের উপর গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন সেগুলোর তেমন কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিলনা বা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ারও তেমন কোন সুযোগ ছিলনা। এই প্রকার বইয়ের পাঠকও ছিল খুবই সীমিত কিন্তু তারপরও আব্বা থেমে থাকেননি। আব্বা উনার সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্য সত্ত্বেও নিয়মিত গবেষণা চালিয়ে গেছেন ও বই আকারে ছাপিয়ে দেশবাসীর কাছে সেগুলো উপস্থাপন করার সকল চেষ্টা করেছেন। দেশের প্রতি তাঁর যে ভালবাসা ছিল সেটাকে তিনি দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে আব্বা খুবই ধার্মিক, সৎ, অমায়িক, হাসিখুশি, উদার, শিশুসুলভ, মানবিক ও আশাবাদী মানুষ ছিলেন। আব্বার সাথে যারা চলাফেরা করেছেন তাঁরা সবাই আব্বার উপরোক্ত গুণের সাথে কিছু না কিছু অবগত আছেন। তিনি সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তাঁর ভেতরে কোনপ্রকার অহংকার ছিলনা। সকলের সাথে তিনি সমানভাবে হাসিখুশি ব্যবহার করতেন। তিনি প্রচ- আত্মবিশ্বাসী ও আশাবাদী ছিলেন, স্বপ্ন দেখতে ভালবাসতেন। তিনি প্রায় ৮৭ বছর বয়সে অসুস্থ অবস্থায় মারা যান কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পূর্বে এই বয়সেও তিনি বিভিন্ন রকম স্বপ্ন দেখতেন। আমি অবশ্য এ নিয়ে মাঝে মাঝে উনাকে বলতাম “আব্বা এত বছরেও যা হয়নি তা আর না ভাবাই ভালো” আব্বা শুধু বলতেন হবে হবে। উনার মনের এই প্রচ- ইচ্ছাশক্তি দেখে আমি অবাকই হতাম।
আব্বার এই লেখালেখি ও গবেষণা কাজে পরোক্ষভাবে আরও একজনের বিশেষ অবদান রয়েছে যার কথা উল্লেখ না করলেই নয় তিনি হচ্ছেন আমার আম্মা। কারণ লেখালেখির জন্য আব্বাকে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে রাঙ্গামাটি ও ঢাকায় অবস্থান করতে হতো। আমরা ছিলাম ৬ ভাইবোন। আমাদের অবস্থান ছিল সিলেটে। আব্বা কিছুদিন পরপর সুযোগ পেলেই সিলেটে আসলেও সপ্তাহ দশদিনের বেশি একসাথে থাকা হতোনা। লেখালেখির যে নেশা অথবা দায়িত্ববোধ তা আব্বাকে থাকতে দিতনা আর সংসারের মধ্যে থেকে সাংসারিক বিভিন্ন বিষয়ে মনোযোগ দিতে গিয়ে আব্বা লেখালেখিতে মনোনিবেশ করতে পারতেন না। তাই আম্মার হাতে সংসারের সব দায়িত্ব দিয়ে আব্বা লেখালেখি আর গবেষণা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সংসারের সকল দায়িত্ব আম্মা একাই সামাল দিতেন। আমাদের ছয় ভাইবোনদের মানুষ করা, লেখাপড়ার খেয়াল রাখা, বিয়ে দেওয়া, আত্মীয়তা রক্ষা করা ইত্যাদি আম্মা একাই সামাল দিতেন। আম্মা যদি সংসারের বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ হাতে হাল না ধরতেন তাহলে আব্বার পক্ষে লেখালেখি ও গবেষণার কাজে মনোনিবেশ করা কষ্টকর হয়ে যেত। আব্বার পেশাগত অবস্থানের কারণে আমাদের ভাইবোনদের ছোটবেলা কেটেছে রাঙ্গামাটি শহরে। সেই সুবাদে আমাদেরও পার্বত্য সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন তান্ডব স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমার মনে পড়ে আশির দশকের শেষের দিকে আমি যখন ৯/১০ বছরের হবো তখন শান্তিবাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় টাইম বোমা পুতে রেখে যেত এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর চোরাগোপ্তা হামলা করতো। নিরীহ লোকজনও এতে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতো। নিরাপত্তার অভাবে আব্বা একসময় আমাদের সবাইকে দেশের বাড়ী সিলেটে পাঠিয়ে দেন কিন্তু আব্বা জীবনের হুমকী সত্ত্বেও নিজে সেখানে থেকে যান এবং তাঁর লেখালেখি ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যান। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় সে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো প্রায়ই পত্রপত্রিকার মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার খবর পাওয়া যায়।
আব্বা দেশকে ভালোবেসে দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে যে বইগুলো লিখে গেছেন তা যদি দেশের উপকারে আসে তাহলে সেটাই হবে আব্বার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া এবং সার্থকতা। এই ছোট্ট লেখার মাধ্যমে একজন মানুষের পুরো জীবনকে চিত্রায়িত করা সম্ভব নয়। আমার চেষ্টা ছিল আব্বার লেখক জীবন নিয়ে কিছু লেখার। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। আল্লহপাক আমার আব্বার কাজগুলোকে কবুল করুন এবং আমার পিতামাতাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন এই দোয়া করি। “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাযিযানি সাগিরা” আমিন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT