পাঁচ মিশালী

গল্প নয়

মো. আজিজুর রহমান লস্কর প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১০-২০১৯ ইং ০০:০৭:৫৩ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত

এখানকার সবাই জানেন, সমগ্র শীত ব্যাপী নিউইয়র্কে, তুষারপাত হয় না। শীতকালে কেবল মাঝে মধ্যে তুষারপাত ঘটে। তবে পেঁজা তুলার মতো শ্বেতশুভ্র তুষার পতনের মনভুলানো দৃশ্য সবার নজর কাড়ে। তা অবলোকন করে শিশু-কিশোর-যুবাদের হৃদয়ে অনাবিল আনন্দের ঢেউ খেয়ে যায়; তা থেকে বুড়োরাও বাদ যান না।
সে রাতে ভীষণ তুষারপাত হয়েছিল। রাজপথ, অলিগলি, বাড়ির ছাদ ও আঙ্গিনায় ধবধবে সাদা তুষারে ছেয়ে গিয়েছিল। কাউকে না জানিয়ে তাপমাত্রা হঠাৎ নেমে গিয়েছিল শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে! তখন মানুষের কী দুর্ভোগ!
রাজপথের ফল বিক্রেতা মুক্তা চৌধুরীর ডিউটি ভোর সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। পুরো বারো ঘন্টা! অথচ দেশে সরকারি চাকুরিতে নিয়োজিত থাকাকালে কখনো সকাল ন’টার আগে অফিসে যেতে হয়নি। তা দীর্ঘনিশ্বাস জড়িত এক স্মৃতি! পারিবারিক সূত্রে বৈধভাবে আমেরিকা আসার সুযোগ পেয়ে দেশের সরকারি চাকুরি ছেড়ে সপরিবারে স্বপ্নের রাজ্য নিউ ওয়ার্লডে পাড়ি দিয়েছিলেন। এরকম অসংখ্য উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি দেশের মর্যাদাপূর্ণ পদ বিসর্জন দিয়ে আমেরিকায় অতি সাধারণ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের সান্ত¦না, এখানে আইন-শৃঙ্খলার মাঝে আছি, সচ্ছল আছি এবং সন্তানরা অর্থপূর্ণ লেখাপড়া করছে। যাক সে কথা। এ কাজে আয় দিনের ডিউটিতে একশত বিশ ডলার এবং রাতের ডিউটিতে আশি ডলার, কারণ রাতে ক্রেতা কম, তাই কাজেও চাপ কম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ রোজগারে ইনকাম ট্যাক্স নেই। সে বিবেচনায় আয় মন্দ নয়। এ কাজের জন্য মুক্তা চৌধুরীকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ‘ফুড-ভেন্ডার লাইসেন্স’ অর্জন করতে হয়েছিল। তিনশত পঞ্চাশ ডলার লাইসেন্স ফি জমা দিয়ে দুই দিনের ট্রেনিং ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর তিনি এ লাইসেন্স লাভ করেছিলেন। লাইসেন্স সজীব রাখার জন্য প্রতি বছর ষাট ডলার নবায়ন ফি জমা দিতে হয়। উল্লেখ্য কর্মস্থলে লাইসেন্সখানা মালার ন্যায় গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হয়। নইলে নির্ঘাত অর্থদ-।
ফল ভেন্ডারের দোকান দিবারাত চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে। বারো ঘন্টা অন্তর দু’ব্যক্তি পর্যায়ক্রমে কাজ করে থাকেন। দোকানের মালিক একজন বাংলাদেশী। তাঁর একাধিক দোকান রয়েছে। উল্লেখ্য, নিউইয়র্কের অধিকাংশ ফল ভেন্ডার বাংলাদেশী। প্রত্যেক দোকান হচ্ছে ছোট চাকাযুক্ত একটি ভ্যান গাড়ি বই কিছু নয়। চার চাকা বিশিষ্ট দোকান প্রয়োজনে যে কোন স্থানে সরিয়ে নেয়া যায়। বর্তমানে দোকানের অবস্থান স্থল হচ্ছে ম্যানহ্যাটনের ছিয়াশি নম্বর স্ট্রিটে। কোন এক স্থানে দোকান কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে থাকতে পারে। দোকানে প্রধানত আপেল, আঙ্গুর, কমলা, মাল্টা ইত্যাদি নানা রকমের ফল ছাড়াও কিছু টমেটো, গাজর ইত্যাদি সবজি বিক্রির জন্য মজুদ থাকে। দোকানে খুচরা বিক্রয়ের ফল সমূহ ফ্রিজযুক্ত বিরাট আকারের ভ্যান দিনের শুরুতে অর্থাৎ প্রত্যুষে দোকানে পৌঁছে দিয়ে যায়। মাল সরবরাহারী ডেলিভারী ভ্যানের একক ব্যক্তি ভ্যান ড্রাইভ করেন ও মাল সরবরাহ করে থাকেন। ফল বিক্রেতাদের কাছে সে ‘ডেলিভারি গাই’ (উবষরাবৎু মুঁ) নামে পরিচিত। ফলপূর্ণ কাটুন ডেলিভারি গাই দোকানের কাছে ফুটপাতে রেখেই উধাও হয়ে যান। তিনি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ।
তুষারপাত ও প্রচ- ঠান্ডার কারণে সেদিন দোকানে পৌঁছতে মুক্তা চৌধুরীর পাক্কা আধ ঘন্টা দেরী হয়েছিল। তিনি পৌঁছেই দেখেন বারো ঘন্টা নাইট ডিউটি সম্পন্ন করে, পূর্বতন ব্যক্তি ক্লান্ত দেহ নিয়ে তাঁর অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসে আছেন। ফান্ড ও চেঞ্জমানি যথারীতি মুক্তা চৌধুরীকে বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্বে নিয়োজিত পূর্বতন ব্যক্তি ক্ষণিকের মধ্যে বিদায় নিলেন। এখানে দায়িত্ব হস্তান্তরের কাজ মৌখিকভাবে সম্পন্ন হয়। কারণ সদ্য দায়িত্বমুক্ত ব্যক্তি বারো ঘন্টা পরই আল্লাহর ইচ্ছায় পুনরায় কাজে এসে যোগদান করবেন। তবে ভুলে যাবার আশঙ্কায় কেউ কেউ ডলারের পরিমাণ ছোট্ট একটু কাগজে লিখে ডলারের সাথে রাখেন। এখানে ফান্ড হচ্ছে বিক্রিত ফলের মূল্য বাবত নগদ অর্থ সমুদয় এবং চেঞ্জমানি হচ্ছে এক ডলার মূল্য মানের মোট বিশ বা পঁচিশ ডলার অর্থ। ক্রেতা প্রদত্ত বড় মানের নোটের বিপরীতে ফেরত দেবার কাজে চেঞ্জমানি ব্যবহৃত হয়। উল্লেখ্য, দোকানের মালিক দিনে কোনো এক সময়ে এসে দোকান দেখাশুনা করেন এবং ফান্ডের অর্থ গ্রহণ করে থাকেন। দিবানিশি প্রতিদিন গড়ে বারো শত ডলার ফান্ডে জমা হয়ে থাকে।
প্রত্যুষে দায়িত্ব গ্রহণ করেই মুক্তা চৌধুরী দেখতে পেলেন ডেলিভারি গাই ফল ভর্তি কার্টুনগুলো ফুটপাতে রেখে চলে গেছে। ফুটপাত জনসাধারণ চলাচলের জায়গা। তা সব সময় উন্মুক্ত থাকা চাই। মুক্তা চৌধুরী ফলের কার্টুনগুলো তাড়াতাড়ি খোলে ফলগুলো দোকানের বিভিন্ন তাকে সাজিয়ে রাখলেন। ঠান্ডায় তাঁর হাত-পা অবশ হবার উপক্রম।
তখনই যম অর্থাৎ স্বাস্থ্য বিভাগের ইন্সপেক্টরের আগমন ঘটলো। ইন্সপেক্টরদেরকে ফল বিক্রেতারা যমের ন্যায় ভয় করে থাকেন। কারণ অত্যন্ত তুচ্ছ কারণেও তারা জরিমানা করে বসেন। মুক্তা চৌধুরীর কাছে এসে ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করল, ‘তোমার কি লাইসেন্স নাই?’
-‘অবশ্যই আছে! কিন্তু তুষারপাত ও অত্যধিক ঠান্ডার কারণে দোকানে আসতে সামান্য বিলম্ব হয়েছিল। তাছাড়া দোকানে এসেই বরফ পরিস্কার ও অন্যান্য কাজে জড়িয়ে পড়ি। তাই লাইসেন্সখানা গলায় ঝুলিয়ে রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ভুলের জন্য অত্যন্ত দুঃখিত!’ এতটুকু বলেই তিনি ব্যাগ থেকে লাইসেন্সখানা বের করে ইন্সপেক্টরের হাতে তুলে দিলেন।
এ ভুলের পশ্চাতে মুক্তা চৌধুরীর অনুকূলে যতই যুক্তি থাকুক না কেন, আমেরিকার আইনে তা অপরাধই এবং এ জন্য তাঁকে শাস্তি পেতেই হবে। তবে আদালত যদি ক্ষমা করে দেন, তা ভিন্ন কথা।
ইন্সপেক্টর তাঁর সঙ্গে থাকা অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে অল্প সময়ের মধ্যে প্রিন্ট করে একখানা নোটিশ মুক্তা চৌধুরীর হাতে ধরে দিলেন। নিউইয়র্কের ফল বিক্রেতা ও অন্যান্যরা এটিকে টিকেট বলে অভিহিত করে থাকেন। টিকেট মানেই জরিমানা। এতে লেখা ছিল লাইসেন্স গলায় ঝুলানো না থাকায় পঞ্চাশ ডলার জরিমানা এবং তা অন-লাইনে পরিশোধ করতে হবে অথবা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোর্টে হাজির হতে হবে। কোর্টে হাজির হবার তারিখ ও সময় নোটিশে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
মুক্তা চৌধুরী আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোর্টে উপস্থিত হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইতোমধ্যে তিনি বন্ধু ও শুভাকাক্সক্ষীদের কাছ থেকে জানতে পারলেন যে, আমেরিকার আদালত কামনা করে সুবিচার প্রার্থীগণ যেন পরিপাটি পোষাকে সুসজ্জিত হয়ে কোর্টে উপস্থিত হন। তাই মুক্তা চৌধুরী নির্দিষ্ট দিনে উৎকৃষ্ট পোষাক ও কোর্ট-টাই পরে আদালতে হাজির হলেন।
এখানকার আদালত ভবন ও পরিবেশের সাথে আমাদের দেশের আদালতের বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য নেই। এখানে নেই মানুষের ভীড়। নেই হৈ চৈ ও ছোটাছুটি। নেই ফেরিওয়ালা, ভিক্ষুক ও পকেটমারদের জ্বালাতন। প্রবেশপথে নিরাপত্তারক্ষী মুক্তা চৌধুরীর নোটিশ দেখল এবং ভদ্রভাবে দেহ তল্লাশীর দায়িত্ব পালন করল। অতঃপর সম্মুখে এগুতেই বিরাট একখানা হলঘর; অনেকগুলো চেয়ার সুশৃঙ্খলভাবে রাখা। সুবিচার প্রত্যাশী ব্যক্তিগণ নিশ্চুপ বসে অপেক্ষা করছেন। নিরাপত্তা রক্ষীর পরামর্শে মুক্তা চৌধুরী আরো এগিয়ে একটি কক্ষে উপবিষ্ট রিসেপশোনিস্টের নিকট নোটিশখানা তুলে ধরলেন। লোকটি নোটিশ থেকে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য টুকে নিল এবং মুক্ত চৌধুরীকে হলঘরে বসে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করল। সুবোধ বালকের মতো মুক্তা চৌধুরী তা-ই করলেন।
অল্প কিছুক্ষণ পর একজন বিচারক তাঁর কামরা থেকে নিজে বেরিয়ে এসে উপস্থিত সবাইকে লক্ষ করে ‘মি. চৌধুরী মুক্তা, মি. চৌধুরী মুক্তা বলে ক’বার নাম উচ্চারণ করলেন। সাথে সাথে মুক্তা চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন। বিচারক মুক্তা চৌধুরীর দিকে এগিয়ে এসে স্মিতমুখে, ‘গুড মর্নিং’ বলে তাঁর সাথে হ্যান্ডশ্যাক করলেন এবং বললেন, ‘আই এ্যাম ডেভিড! ইউ, প্লিজ ফলো মি।’
অতঃপর মুক্তা চৌধুরী বিচারকের পেছন পেছন হেঁটে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করলেন। বিচারক নিজ আসন গ্রহণ করে সম্মুখের খালি চেয়ারের প্রতি ইঙ্গিত করে মুক্তা চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘প্লিজ সিট ডাউন।’ মুক্তা চৌধুরী, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’ বলে চেয়ারে বসে পড়লেন। বসে বসে মুক্তা চৌধুরী লক্ষ করলেন, কাঁচের দেয়াল ঘেরা এরকম অনেক কক্ষে বিচারকবৃন্দ নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন কারো সাথে কোনো পিওন বা আর্দালি নেই।
বিচারক জানতে চাইলেন যে, মুক্তা চৌধুরীর দোভাষী দরকার আছে কিনা। জবাবে তিনি জানালেন যে, দোভাষীর দরকার নেই।
অতঃপর বিচারক মুক্তা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ইংরেজিতে পাঠ করলেন। মূল অভিযোগ হচ্ছে, সেদিন তাঁর গলায় ‘ফুড ভেন্ডার লাইসেন্স’ ঝুলানো ছিল না। অভিযোগ পাঠ শেষে বিচারক বললেন, ‘এ ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি?’
-‘আমি আমেরিকায় নতুন এবং এ কাজেও নতুন। তাছাড়া সেদিন প্রচন্ড তুষারপাত হয়েছিল। তাপমাত্রা মাইনাসের অনেক নিচে ছিল। এসব কারণে কর্মস্থলে পৌঁছতে বেশ বিলম্ব হয়েছিল। পৌঁছেই দেখি ডেলিভারি গাই ফলের কার্টুনগুলো ফুটপাতে রেখে গেছেন। তৎক্ষণাৎ আমি কাজে মনোনিবেশ করি। গলায় লাইসেন্স ঝুলাতে একদম ভুলে যাই! আমাকে দয়া করে ক্ষমা করা হউক।’
বিচারক গভীর মনোযোগের সাথে মুক্তা চৌধুরীর বক্তব্য শুনার পর বললেন, ‘আদালত তোমার বক্তব্য শুনল। আদালতের আদেশ ডাকযোগে তোমার কাছে পৌঁছবে।’
তিন-চার দিনের মধ্যেই সাধারণ ডাকযোগে মুক্তা চৌধুরী কোর্টের আদেশ পেয়েছিলেন। আদেশের মূল বিষয় ছিল, তুমি এখানে নতুন। তাই প্রথম বারের মতো তোমাকে ক্ষমা করা হলো। ভবিষ্যতে যেন এরকম না ঘটে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT