উপ সম্পাদকীয়

ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন

মোঃ মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৯ ইং ০০:১৭:২৮ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

ঘুষ, জুয়া একটি সামাজিক ব্যাধি। যারা এগুলির সাথে যুক্ত থাকে, তারা সকলের ঘৃণার পাত্র। তাদের সামাজিক মর্যাদা থাকেনা। তারা সমাজের মানুষের বহুবিধ ক্ষতি করে থাকে। তাই মানুষ তাদের সম্মানের চোখে দেখেনা।
অফিস পাড়ায় যারা চাকুরী করেন তারা যেন মানুষকে বিপদে ফেলেই দেন। তাদের বাঁকা পথে চলার কারণে অনেক মানুষ তাদেরকে ঘুষ দিয়ে অন্যায়ভাবে অনেক কাজ হাসিল করে থাকে। তারা টাকা পেলে সঠিকটাকে অঠিক করে থাকেন। এতে সাধারণের চরম দুর্ভোগ হয়। অনেক হকদারকে বঞ্চিত করা হয়। ঘুষের টাকা মানুষকে এতো অধঃপতনে নিয়ে যায় যে, ন্যায় অন্যায় কোন কিছু বাছবিচার করেনা। আর জুয়া অন্যের পকেট খালি করে জুয়া আয়োজনকারী নিজে টাকার পাহাড় গড়ে তুলেন। যারা জুয়া খেলেন বা আয়োজন করেন তারা উভয়ই ঘৃণার পাত্র। জুয়া মানুষকে পথে নামিয়ে দেয় আবার কেহ কেহ বিশেষ করে জুয়া আয়োজনকারী অন্যের সম্পদ টোপ দিয়ে কেড়ে নেয়।
আমরা দেখেছি ঘুষখোর কোন অফিসার সহজ সরল মানুষের বিভিন্ন ফাইল আটকে রেখে হয়রানী করেন। তারিখ পরিবর্তন করে পরে আসার জন্য বলে বলে মানুষকে বিরক্ত করেন। বড় স্যার নাই, দস্তখত হয়নি, স্যার ছুটিতে, আপনার কাজ হতে বলে স্যারকে কিছু বকশিস দেন ইত্যাদি বলে টাকা উদ্ধারে চলে নবনব কৌশল। সাধারণ মানুষ টাকা দিতে বাধ্য হন। এক পর্যায়ে ফাইল উদ্ধার হয় তবে অনেক টাকার এবং হাঁটাহাঁটির বিনিময়ে।
ভূমি জরিপ কাজে নামজারী বা মিউটেশনে দেখলাম টাকার বিনিময়ে অনেকের জমি অন্যের নামে রেকর্ড করে দেয়া হয়েছে। কিংবা অন্যের জমির অংশ কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে টাকার বিনিময়ে দেয়া হয়েছে। এই যে দেয়া হলো প্রকৃত মালিক কিংবা জমি সংলগ্ন সবাইকে একটা বড় বিপদে ফেলা হলো। দাগ নং, খতিয়ান নং, জমির পরিমাণ উদ্ধারে সবাই এখন দৌড়ঝাপ শুরু করতে হয়। কারণ জরিপ কর্মকর্তা টাকার বিমিয়ে (ঘুষ খেয়ে) এই হয়রানীর মধ্যে সবাইকে ফেলে দিয়েছে। ঘুষদাতা এবং ঘুষ গ্রহণকারী উভয়ই অপরাধী। এরা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী।
কোন বড় কাজ টেন্ডারের মাধ্যমে করাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। কিন্তু এখানেও বড় বড় কর্মকর্তা ঠিকাদারদের সাথে আতাত করে বেআইনীভাবে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়ে থাকেন। ঠিকাদারি যিনি করেন তিনি বড় অংকে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে টাকা ঘুষ দিয়ে থাকেন। কর্মকর্তাই যখন ঠিকাদারের হাতের মুঠোয় তখন কাজের মান, ধীরগতি ইত্যাদি নিয়ে কে আর জবাব চাইবে। দফায় দফায় বিল বাড়ালেও প্রশ্ন করার কেউ থাকেনা। কারণ কর্মকর্তা ঠিকাদারের হাতের মুঠোয়। এভাবে দেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে আর কিছু লোক টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে। মোট অংকের কমিশনে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অবৈধভাবে যারা বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেন তারা দেশের শত্রু, সমাজের শত্রু। অনেক সময় শোনা যায় অনেক ঠিকাদারের পক্ষে উচ্চ পর্যায়ে তদবির করার জন্য উচ্চ কর্মকর্তা রয়েছেন। কর্মকর্তাদের যখন দুর্নীতিবাজ বলা হয় কর্মকর্তারা যখন ঠিকাদারের হাতের মুঠোয় থাকেন তখন বড়ই লজ্জা হয়। ঠিকাদাররা কিভাবে উচ্চ অফিসে তাদের তদবিরের জন্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন! সঠিকভাবে যাচাই বাছাই না করে তদবির বা ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিলে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
আমাদের অনেক কর্মকর্তার ঠিকাদারের সাথে এতোই দহরম মহরম যে অফিস শেষে ঠিকাদারের অফিসে গিয়ে বসে থাকতে শোনা যায় এবং ঠিকাদার কখনো কখনো টাকার লেনদেন তার অফিসেই সেরে থোকেন। কর্মকর্তা ঘুষের টাকার জন্য ঠিকাদারের অফিসে এসে বসে থাকেন এর চাইতে লজ্জার আর কি হতে পারে। গত বছরের বালিশ কান্ড কার না মনে আছে। এই বালিশ কান্ডে একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের সাহায্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হয়। ঠিকাদারদের নবনব কৌশলে সুবিধা পাইয়ে দিতে পর্দার আড়ালে একটি চক্র সবসময় সক্রিয় থাকে। অনেক ঠিকাদার কাজের টেন্ডার পাওয়ার পর কাজ ফেলে রাখে বা কাজের কিছু অংশ করে বাকি কাজ ফেলে রেখে অহেতুক কয়েক দফা বাড়ানো হয় টেন্ডারমূল্য। এই প্রক্রিয়াকে দাফতরিক ভাষায় বলা হয় ভেরিয়েশন। আমরা শুনেছি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন নির্মাণে ভেরিয়েশনের নামে দুর্নীতি হয়। আট কোটি টাকার এই ভবন নির্মাণের ব্যয় কয়েকবার বাড়িয়ে ৩৫০ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়তি টাকা ঘুষ বাণিজ্যে যারা জড়িত বা দুর্নীতিবাজদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। নির্মাণের নামে দেশের শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।
জুয়া খুবই খারাপ একটি খেলা। এ খেলাতে টাকার ছড়াছড়ি হয় ব্যাপকভাবে। এক পক্ষ অন্যপক্ষের টাকা একদম খালি করে নিয়ে যায়। আগে দেখা যেত শহর, বন্দর রাস্তার ধারে জুয়া খেলা হচ্ছে। পুলিশ এলেই জুয়ার বোর্ড নিয়ে যার যার পথে দৌড়। ঝান্ডুমুন্ডু, চরকি বোর্ড ইত্যাদি দিয়ে পথে প্রান্তে মানুষ জুয়া খেলত। বোর্ড আছে এমন লোক রাস্তার ধারে বসে তার চরকি ঘুরাত এবং পথিকগণ সে চরকিতে একেক ঘরে টাকা ফেলে রাখতেন। চরকি এসে যেখানে থামত শুধু সে ব্যক্তি টাকা পেতেন বাকি সবার টাকা খোঁয়া যেত। যে টাকা পেল তার দেখাদেখি অন্যেরা আবার বোর্ডে টাকা রাখে পাওয়ার আশায় কিন্তু টাকা সে-ই পায় চরকি এসে যার টাকার উপর দাঁড়ায়। সে বোর্ডে দেখা যেত ঘোড়া, হাতি, পাখি ইত্যাদির ছবি থাকত। যতটি ছবি থাকত ততগুণ টাকা দেয়া হত। এখন সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে জুয়ারও ধরণ বদলেছে। এখন পথের ধারে পথিকেরা জুয়া খুব কমই খেলে। নামি নামি ক্লাব, ক্যাসিনোতে বৈঠকের নামে চলে রমরমা জুয়া খেলা। নাচ, গান, আড্ডা, জুয়া পুরো রাত ব্যাপী চলতে থাকে। আর বড় বড় লোক, টাকাওয়ালা লোক এখন জুয়াতে মত্ত। জুয়া এখন অভিজাত পরিবারের খেলা হয়ে গেছে। এ খেলাতে একে অন্যের পকেট খালি করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলেন। এতো টাকা বস্তা ভর্তি করে ঘরের ভিতরও রাখা হয়।
জুয়া খেলা এখন হয়ে গেছে গৌরবের খেলা। যে জুয়াড়ী সে খুব গর্ব করে। আশ্চর্য লাগে জুয়া খেলতে মানুষ বিদেশ পর্যন্ত গিয়ে থাকে। জুয়া খেলতে মাসে ৪ বার, ৫ বার বিদেশ যেতে শোনা যায়। জুয়া খেলা একটি ঘৃণিত খেলা। অন্যকে পথে বসানোর খেলা। নিজে বা কোন ব্যক্তি কিছু টাকা কামাই করলেও অন্যকে কিন্তু ক্ষতির মধ্যে ফেলতে হয় এই জুয়া খেলার মাধ্যমে। সুতরাং ঘুষ এবং জুয়া শক্ত হাতে বন্ধ করে সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT