উপ সম্পাদকীয়

অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৯ ইং ০০:১৭:৫৫ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

ভাবতে ভালো লাগছে ইদানীং সিলেট মহানগরীটির অবয়ব, কাঠামো আর উন্নয়নের ব্যাপারে ক্ষমতাধররা বেশ মাথা ঘামাচ্ছেন। আমাদের বৃহত্তর সিলেট এর একাধিক মন্ত্রীবর্গ রয়েছেন সরকার এবং নীতিনির্ধারক মহলে। এতোদিন মনে হতো এদের কেউই বোধহয় আমাদের এই অঞ্চলটি নিয়ে সবিশেষ চিন্তা ভাবনায় যান নাই বা যেতে প্রবৃত্ত হন নাই। বিগত দিনগুলিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব বা সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী অশীতিপর জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাহেব ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী। তারা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলটি নিয়ে বিস্তর ভাবনা চিন্তা করেছেন। এই এলাকার অধিবাসীদের নানা কষ্টভোগ তাদের পীড়া দিয়েছিলো বলেই তারা এলাকাটিতে উন্নয়ন কর্ম সাধনে মনোযোগী হয়েছিলেন। মরহুম সাইফুর রহমান (সাবেক অর্থমন্ত্রী) এ লক্ষ্যে কাজ করেছেন বিস্তর। এই উন্নয়ন প্রচেষ্টাটি সার্থকতা লাভ করেছিলো। অন্যদিকে মরহুম সাইফুর রহমান সাহেব কৃত উন্নয়ন কর্মসমূহ আবার অনেক ক্ষেত্রে বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছিলো বৃহত্তর সিলেটবাসীদের জন্য। শোনা যায় যখনই বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের উন্নয়ন মানসে কোন প্রকল্প বা পরিকল্পনা যথাস্থানে উপস্থিত হতো বলা হতো মরহুম সাইফুর রহমান এই বিরাট জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়নমূলক যতো কর্মকান্ড করেছেন সেগুলির সুফল ভোগ করা যাবে শতবছর যাবত। আগামি কয়েক বছর এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তায় না গেলেই হবে। সে কারণে সাইফুর রহমান সাহেবের কর্মকাল এর পর সকল উন্নয়ন কর্ম মুখ থুবড়ে পড়ে কোন এক রহস্যজনক কারণে। নিশ্চয়ই কোন একটি সচেতন মহল ব্যাপারটি সাধনে ছিলো সচেষ্ট। বোধহয় ভাবনায় ছিলো অর্ধ লক্ষাধিক বৃহত্তর সিলেটবাসী বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে যাচ্ছেন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সেগুলি কেন্দ্রীয়ভাবে জমা পড়–ক। ফুলে ফেপে উঠুক কেন্দ্রীয় অর্থভান্ডার। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে সেগুলি কাজে লাগবে। মেগা প্রকল্প সমূহে ব্যয়িত হবে সেগুলি আর সিলেটবাসীকে সোনার ডিমপাড়া হাঁস জাতীয় তকমা দিয়ে বশ করা যাবে। আকারে ছোট, জীর্ণ বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নাম দিয়ে চালিয়ে নেয়া যাবে বেশ কিছুকাল। হয়েছে সেটা এতোদিন। এখন চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা আর যুগের আবর্তনে সেটা যেন আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিকে সুপরিসর বিমান পরিচালনা উপযোগী করতে বেশ ভালো অংকের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। কাজ শুরুর প্রাক্কালে আবার সেটিকে কাটছাট করে আরো ছোট করে এনে দায়সারা গোছের একটি বিমানবন্দর বানিয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের অবয়ব দানের চেষ্টা করা হয়। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেটিও যেন আর যুৎসই হচ্ছে না। আমাদের বিজ্ঞ জনপ্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছেন বলেই মনে হয়। মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন সাহেব নাকি এখন বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী বৈঠকে তালিকা ধরে বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়ন কর্ম সাধনে বিভিন্ন মহলকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করা যায় তিনি সফল হবেন। অচিরেই সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরটিকে আমরা সুপরিসর বিমান উড্ডয়ন, অবতরণ ও যাত্রি বান্ধব সুবিধা সম্বলিত একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমান ক্ষেত্র হিসাবে দেখতে পাবো।
আমরা বিস্মিত হয়েছি সর্বস্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সিলেট এর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা দর্শন করে। হররোজ লাইনচ্যুতি, রেল দুর্ঘটনা, বিলম্বিত রেল চলাচল আর বিপজ্জনক রেললাইন সমৃদ্ধ ঢাকা-চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলটি যেন মৃত্যুফাঁদ হিসাবে অবস্থান করছিল। এখনো সেই অবস্থা বিদ্যমান। আমি বহুবার বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের নিমিত্ত লেখালেখি করেছি। ব্রডগেজ ও উভয়মুখী রেললাইন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চরিত্র চালিয়ে গেছি। কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গে নাই। সোনার ডিম পাড়া হাঁস, আধ্যাত্মিক রাজধানী জাতীয় মুখভরা বুলি দিয়ে সবকিছু ঢেকে দেয়া হয়েছে। ইদানীং বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ফিসপ্লেট বিহীন রেললাইন, নাটবল্টু উধাও হয়ে যাওয়া রেলপাত আবার পাথরবিহীন রেলপথ সবকিছুর ছবি আর বিবরণী প্রকাশিত হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের রেল লাইনে আক্ষরিক অর্থেই বাঁশখন্ড দ্বারা রেলপথকে টেস দিয়ে রেলযাত্রা বহাল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিস্ময় জাগে সিলেট থেকে চল্লিশ মাইল দূরেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রেলজংশন। সেখানে রয়েছেন রেল বিভাগের বিরাট বিরাট কর্তাব্যক্তিরা। তারাও কি এ জাতীয় মারণঘাতি রেলব্যবস্থা পর্যবেক্ষণেও আসেন নাই বা হাল হকিকত অনুসারে ব্যবস্থা নিতেও প্রবৃত্ত হন নাই।
সিলেটের ব্যবসায়ীবৃন্দ তাদের সংগঠনের (চেম্বার অব কমার্স) পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আশু উন্নয়নে একটি পরামর্শসূচক প্রস্তাবনা যথাস্থানে পাঠিয়েছেন। আমরা জানি সিলেটের কৃতি সন্তান মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে অবগত আছেন। তিনি এই লাইনকে ব্রডগেজ ও উভয়মুখী করণের সকল ব্যবস্থাই সম্পন্ন করার পদক্ষেপসমূহ নিশ্চিত করবেন চেষ্টা তদবীর আর প্রভাব খাটিয়ে। মনে রাখতে হবে আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব মোমেন সাহেব সিলেট-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যও বটে। তিনি নিজেই আক্ষেপ করে বলেছেন অত্র অঞ্চলের উন্নয়নে দায়িত্বশীলদের গাফিলতি ছিলো। এই কথাটি এতোদিন জনমনে অনুরণিত হতো আজ যথাযথ ব্যক্তিত্বের মুখে উচ্চারিত হয়েছে। নিশ্চয়ই সিলেট-ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক, দ্রুত গতিসম্পন্ন, নিরাপদ আর টিকিট কালোবাজারীমুক্ত একটি আদর্শস্থানীয় অবকাঠামোয় রূপান্তরিত হবে। বৃহত্তর সিলেটবাসীর প্রধানত অত্র অঞ্চলের প্রবাসীদের অবদান অনুসারে এই সুবিধাটুকু নিদেনপক্ষে দাবি করা যেতে পারে। নির্বাচিত সরকার এর দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো গণদাবির বাস্তবায়ন নিশ্চয়তা সহকারে সমাপন করা।
রেল বিভাগ থেকে বলা হয় ব্রডগেজ বা আধুনিক রেল ব্যবস্থা চালু করতে সিলেট অঞ্চলে প্রাকৃতিক বাধা রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা শ্রীলংকায় আরো বেশি বাধাসংকুল অবস্থা কাটিয়ে রেললাইন স্থাপিত হয়েছে শতাধিক বছর আগে। এমনকি গণচীন নামক রাষ্ট্রটি সুউচ্চ হিমালয় পর্বতটির নীচ দিয়ে রেল লাইন বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের কাছে। তিব্বত এর মতো পা-ব বিবর্জিত অঞ্চলে সুদূর বেইজিং থেকে রেল যোগাযোগ স্থাপন করে গণচীন সেটা সাফল্যজনক ভাবে ও নিরাপদে পরিচালনা করছে আজতক। আমাদের ক্ষেত্রে শুধু নাহক বাহানা।
লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে রেল বিভাগের আপত্তি রয়েছে। সেটি যৌক্তিক। কারণে অকারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পশু, প্রাণী চলন্ত ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ছে। এটি অনাকাংখিত আর অবাঞ্চিত। এই দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাটিকে চিহ্নিত করে উড়াল রেললাইন ব্যবস্থা চালু করতে পারলে আর লাউয়াছড়ার বন্য জীবন হুমকীর মুখে পড়বে বলে মনে হয় না। বরমচাল-ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সংযোগকারী রেলসড়ক প্রতিষ্ঠা সময় ও সাশ্রয়ী হবে বলে মনে হয়।
সিলেট-ঢাকা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চারলেন, ছয়লেন সহ কতো প্রকারের ব্যবস্থাবলীর আওতায় আনা হচ্ছে শুনতে পাই। বাস্তবে কিছুই দেখা যায় না। ইদানীং শোনা যায় কাজ শুরু হওয়ার পথে রয়েছে। অনেক প্রাণহানি, অনেক দুর্ঘটনা এই অঞ্চলটিতে সংঘটিত হয়েছে। কারণ আর কিছুই নয় সরু, অপরিকল্পিত, অসংখ্য বাক সমৃদ্ধ একটি সড়ককে মহাসড়ক বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ। আশা করি আমাদের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মন্ত্রীবর্গ সম্মিলিতভাবে এ সকল অসুবিধাগুলির অপনোদন আর নতুনের আবাহন নিশ্চিত করবেন।
আমাদের সিলেট মহানগরী দিন দিন পুষ্ঠ হচ্ছে। অধিক জনভারে ভারাক্রান্ত হচ্ছে আর স্ফীত হচ্ছে যানবাহনের সংখ্যাধিক্যে। শোনা যায় অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে মহানগরীটিকে উপলক্ষ করে। কেন জানি মনে হয় সকল পরিকল্পনাবিদই আগের সেই ছোট্ট প্রাণের বা আয়তনের সিলেট শহরটিকে নিজ চিন্তাধারা থেকে সরাতে পারছেন না এবং তাই যতো কিছুই করা হচ্ছে অপর্যাপ্ত থেকে যাচ্ছে সবকিছু। আশা করবো সিসিক কর্তৃপক্ষ আরো বেশি জনবান্ধব হবে দিন দিন। এগারো নম্বর ওয়ার্ডের লালাদিঘীর পার এলাকায় আর মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় দুটো নাগরিক চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করবেন। সকল জায়গায়ই সিসিক এর অনেক অপদখলীয় জায়গা সম্পত্তি রয়েছে যেগুলি রহস্যজনক কারণে উদ্ধার করা হয় নাই। মির্জাজাঙ্গালে একটি বাড়ির কথা জানি যেটি সকলের মুখে মুখেই উচ্চারিত হয় জবরদখলকৃত বা বেআইনীভাবে ব্যবহৃত আবাসগৃহ হিসাবে। সেটিকে দখলমুক্ত করে একটি চিকিৎসালয় স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। অনুরূপভাবে এগারো নম্বর ওয়ার্ড এর জনপ্রিয় কাউন্সিলর সাহেব এর কাছে অনেকেই অনুযোগ করেন অনুরূপ একটি চিকিৎসালয় স্থাপনের জন্য। নিশ্চয়ই সেটা সম্ভব হবে যদি মাননীয় মেয়র সাহেব সম্মানিত কাউন্সিলার সাহেবের সহযোগিতায় এ জাতীয় মানব কল্যাণমূলক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। এই এলাকায় রয়েছে অসংখ্য দরিদ্র মানুষের বাস। অনেক খাল, ছড়া, নালা জবরদখল হয়ে আছে যেগুলি উদ্ধার করা একান্ত প্রয়োজন। লামাবাজার নয়াপাড়ায় যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে তাতীপাড়া, হাওয়াপাড়া এলাকায়। এগুলির উদ্ধার তৎপরতা এখনই শুরু করা হোক। নগরীর যানজট এড়াতে এখনই ত্রিমুখী উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হোক। ক্বীন ব্রীজ এর সংলগ্ন এলাকায় ত্বরিত ব্যবস্থা হিসাবে দৃষ্টিনন্দন একটি ঝুলন্ত সেতু বানানো হোক। এটি সকল মহলের দাবি আবার ভবিষ্যৎ পর্যটন নগরী হিসাবে সিলেট এর জন্য হবে একটি অলংকার বিশেষ। সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা ও মাঠ, স্কাউট ভবন নবরূপে তৈরি করা হোক। সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে ঘোষণা করে জনদাবির প্রতি সম্মাননা প্রদর্শন করা হোক। সিলেটের সাফারী পার্কটির পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদান করা হোক। সকল ধরনের জীব জন্তুর সমাহার ঘটানো হোক এখানে। মুদ্দয়ী লাখো বুরা চাহে তো, ক্যায়া হোতা হ্যায়।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT