সাহিত্য

নোবেলজয়ী দুই লেখক

দুলাল আল মনসুর প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৯ ইং ০০:১৮:৩১ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

১০ অক্টোবর ২০১৮ ও ২০১৯ সালের নোবেল পুরস্কার একসঙ্গে ঘোষণা করা হলো। ২০১৮ সালের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন পোল্যান্ডের কথাসাহিত্যিক ওলগা তোকারচুক। ২০১৮ সালে নোবেল একাডেমির সদস্য ক্যাটারিনা ফ্রসটেনসনের স্বামী জাঁ-ক্লদ আর্নল্টের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সে কারণে ২০১৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার স্থগিত রাখা হয় এবং ঘোষণা দেওয়া হয়, এক বছর পর দেওয়া হবে। ওলগা তোকারচুককে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কারণ হিসেবে নোবেল একাডেমির ভাষ্য হলো, ‘জীবনের বিন্যাস হিসেবে সমন্বিত প্রবল আবেগের সঙ্গে তাঁর আখ্যানমূলক কল্পনা সীমা অতিক্রমের প্রতিনিধিত্ব করে।’ উল্লেখ্য, ২০১৮ সালেই ওলগা তোকারচুক ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কারও পান। তাঁর নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা এক বছর দেরিতে হলেও আসলে তিনি ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল এবং নোবেল পুরস্কার- দুটোই পেলেন একই বছরে- অর্থাৎ ২০১৮ সালে।
২০১৯ সালের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অস্ট্রিয়ার ৭৬ বছর বয়সী নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও কবি পিটার হ্যান্ডকে। তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির যোগ্যতা হিসেবে নোবেল একাডেমি উল্লেখ করে, ‘ভাষাগত উদ্ভাবন কুশলতাসহ তাঁর প্রভাবশালী সাহিত্যকর্ম মনুষ্য অভিজ্ঞতার বাহ্যসীমা এবং সুনির্দিষ্টতা অনুসন্ধান করেছে।’ কুশলী শিল্পী হিসেবে পিটার হ্যান্ডকের যথেষ্ট নাম-পরিচিতি আছে। তবে মানবতার প্রতি তিনি সীমাবদ্ধ দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন কখনো কখনো। সে কারণে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী নোবেল কমিটির প্রতি হতাশার দীর্ঘশ্বাস এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
সংবেদনশীল মনের অধিকারী নিরীক্ষাপ্রিয় লেখক ওলগা তোকারচুক
২০১৮ সালের সাহিত্যের বিলম্বিত নোবেল পুরস্কার এ বছর দেওয়া হয় পোল্যান্ডের কথাসাহিত্যিক ওলগা তোকারচুককে। তিনি পোল্যান্ডের ঘরে ঘরে পরিচিত এবং প্রিয় এক নাম। ইউরোপের মানবতাবাদী প্রধান লেখকদের অন্যতম তিনি। তোকারচুক উপন্যাসে চিন্তাপ্রবাহ এবং প্রবন্ধের বর্ণ মিশিয়ে দেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ওলগা তোকারচুক বলেন, ‘একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে খবর পেলাম, আমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছি। মোটরগাড়িতে মধ্যবর্তী একটা নাম না জানা জায়গায় ছিলাম তখন। আমরা এখন যে জগতে বাস করছি, সেটার পরিচয় দেওয়ার জন্য আর কোনো ভালো রূপক ভাবতে পারি না। এখন আমাদের, মানে লেখকদের আগের চেয়ে আরো বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার পরও সাহিত্য হলো একটা ধীরগতির শিল্প- জগতের ঘটমান বিষয়গুলোকে তাৎক্ষণিক অবস্থায় ধরার কাজটা কঠিন হয়ে যায় লেখার দীর্ঘসূত্রতার কারণে। মাঝেমধ্যে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, জগেক বর্ণনায় ধরাটা কি এখনো সম্ভব? নাকি জগতের ক্রমবর্ধমান তরল অবস্থা, স্থিরবিন্দুর বিলীয়মানতা এবং অপসৃয়মাণ মূল্যবোধের সামনে আমরা এরই মধ্যে অতি মাত্রায় অসহায় হয়ে পড়েছি?
আমার যে সাহিত্যে বিশ্বাস, সে সাহিত্য মানুষকে ঐক্যের বন্ধনে জড়ায় এবং আমাদের সমরূপের মাত্রা দেখিয়ে দেয়। সাহিত্য আমাদের সচেতন করে বুঝিয়ে দেয়, আমরা সবাই সম্পর্কের একটা অদৃশ্য সুতায় বাঁধা। সাহিত্যের জগৎটাকে মনে হয় জীবন্ত; ঐক্যের একটা সামগ্রিক অবস্থা। সাহিত্যের জগৎটা আমাদের চোখের সামনেই অবিরত পূর্ণতার দিকে যেতে থাকে। আমরা এই জগতের খুব ছোট, তবে শক্তিশালী অংশ।

ওলগা তোকারচুক ১৯৯৬ সালে প্রকাশ করেন উপন্যাস ‘প্রাইমেভাল অ্যান্ড আদার টাইমস’। এটি তাঁর তৃতীয় উপন্যাস হলেও লেখক হিসেবে তাঁর প্রথম সফলতা আসে এ উপন্যাসের মাধ্যমে। ছোটবেলায় দাদির কাছে শোনা গল্প তিনি ব্যবহার করেন এখানে। খানিকটা জাদুবাস্তবতার ছোঁয়ায় পোল্যান্ডের এক কাল্পনিক গ্রামের দুটি পরিবারের মানুষদের জীবনের কথা বলে এ উপন্যাস।
পোল্যান্ডের ইতিহাসের বিস্মৃত কোনো অধ্যায়কে তুলে এনে বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন চেহারা দান করা তোকারচুকের কাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে। তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতির পেছনে আছে ষষ্ঠ উপন্যাস ‘ফ্লাইটস’। ২০১৮ সালে এই উপন্যাসের জন্যই তোকারচুক ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পান। সাহিত্যের নির্দিষ্ট শাখা-বিভাজন না মেনে লেখা এই উপন্যাস কথাসাহিত্য, ইতিহাস, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ- সব কিছুকেই এক করে ফেলেছে। ‘ফ্লাইটস’ মূলত চলমানতা বা ভ্রমণের ধারণাসমৃদ্ধ উপন্যাস। এ উপন্যাসের বিভিন্ন অধ্যায় বিশেষ কোনো শব্দ কিংবা কোনো চিত্রকল্পের মাধ্যমে আন্তঃসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। উপন্যাসের গতির সঙ্গে এগিয়ে যেতে যেতে পাঠকও বুঝতে পারেন, তাঁর সংশ্লিষ্টতা বজায় রয়েছে ওই সব চিত্রকল্পের ভেতরে। ‘ফ্লাইটস’ পাঠককে আধুনিকতার ওপরের স্তর থেকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় মানবতার মৌলিক উৎসের কেন্দ্রে। ‘ফ্লাইটস’ উপন্যাসের পটভূমি বাস্তবজগতের মাটি। আগের উপন্যাসগুলোর মতো পুরাণজগতের সুর এখানে অনুপস্থিত।
এ উপন্যাসের পা-ুলিপি জমা দেওয়ার পর প্রকাশনার লোকেরা বিমূঢ় হয়ে যে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন সে সম্পর্কে তোকারচুক বলেন, ‘আমার পা-ুলিপিটা প্রকাশনা সংস্থায় জমা দেওয়ার পর তাঁরা আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, আমার কম্পিউটারের ফাইলগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা গুলিয়ে ফেলেছি কি না। কারণ তাঁরা যা হাতে পেয়েছেন, সেটা তো উপন্যাস নয়।’ এ উপন্যাস পাঠককে ডাব্লিউ জি সেবাল্ড, মিলান কুন্ডেরা, ডানিলো কিস প্রমুখের ঔপন্যাসিকজগৎ এবং শৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে তোকারচুক নিজের মতো করেই আনন্দ উপভোগ করেন উপন্যাসের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে। টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার চিত্র নিয়ে তৈরি উপন্যাসই পোল্যান্ডের কথাসাহিত্যিকের জন্য উপযুক্ত বা মানানসই ঘরানা; তাঁদের দেশের জাতীয় সীমানা শত শত বছর ধরে বারবার বদলেছে। সেখানে নানা জাতের মানুষের দল নিজ নিজ অভিজ্ঞতা আর ভাষার অনৈক্য নিয়ে পাশাপাশি বাস করেছে বহুদিন ধরে। পোলিশ, ইউক্রেনীয়, লিথুয়ানীয়, জার্মান, রুথানীয়, ইহুদি- সবাই যার যার পরিচয় বজায় রেখেই অন্যদের সঙ্গে জীবন যাপন করে গেছে। তোকারচুকের বিশ্বাস, মধ্য-ইউরোপের সাহিত্য সাধারণত চোখের সামনের বাস্তবতা নিয়ে অনবরত প্রশ্ন করে যায়। স্থায়ী যেকোনো বিষয় সম্পর্কেই এখানকার সাহিত্য অবিশ্বাস পোষণ করে থাকে। ‘ফ্লাইটস’-এর এক চরিত্রও তেমনি বলে, ‘ধারাবাহিকতা নয়, সম্মিলিত অবস্থাই সত্য ধারণ করে চলে।’
পোল্যান্ডের ইতিহাসে দেখা বৈচিত্র্য এবং আন্তঃসম্পর্কে একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার বাস্তবতা আসলে একটি রাজনৈতিক ব্যাপার এবং এটি একেবারেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। তবে ২০১৫ সালে এখানে রক্ষণশীল দল ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসনবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তখন থেকেই সরকার মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত শরণার্থীদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এমনকি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাসিদের সঙ্গে পোল্যান্ডের সহযোগিতার কথা আলোচনা করাও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আইন পাস করে। তাঁর দেশের রাজনৈতিক আবহ নিয়ে তোকারচুকের আফসোস আছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে তাঁর অস্বস্তি। যেসব বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছ এবং কঠোর, সেগুলো নিয়ে তিনি নিঃসংকোচে কথা বলেন তাঁর সাহিত্যের ভাষায়। অনেক দিন আগে থেকেই তিন নিরামিষ আহারী। কসাইখানায় এবং কারখানার খামারে প্রাণীদের কষ্টের কথা শুনে তিনি নির্ঘুম রাত পার করেন। তাঁর উপন্যাস ‘ড্রাইভ ইউর প্লাউ ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’ খুনের রহস্য, গুরুগম্ভীর নারীবাদী কমেডি এবং ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেকের প্রতি তাঁর বন্দনার সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছে। ২০০৯ সালে মূল পোলিশ ভাষায় প্রকাশ করা হয় এ উপন্যাসটি এবং অ্যান্টনিয়া লয়েড জোনসের ইংরেজি অনুবাদে ২০১৮ সালে প্রকাশ করা হয়। উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা ‘প্রভার্বস অব হেল’ থেকে নেওয়া হয়েছে এ উপন্যাসের নাম। প্রধান চরিত্র জেনিনা চেক সীমান্তের কাছাকাছি পোল্যান্ডের সেলেসিয়া এলাকার এক গ্রামে বাস করে। জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ে আর উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করে সময় কাটায় সে। একসময় তার দুটি কুকুরের আর সন্ধান পাওয়া যায় না। একদিন দেখা যায়, তার প্রতিবেশী বিগফুট নিজের বাড়িতে মরে পড়ে আছে। বিগফুট মাঝেমধ্যেই বন্য প্রাণী শিকার করত। আরো কয়েকজন মানুষ মারা যায় রহস্যজনকভাবে। বিগফুটের মৃত্যু সম্পর্কে জেনিনা তার নিজের বিশ্বাসের কথা পুলিশকে জানায়, বন্য প্রাণীরা প্রতিশোধ নিতে তাকে মেরে ফেলেছে। পুলিশ নিজেও পশু শিকারি হওয়ার কারণে তার তত্ত্ব বিশ্বাস করে না। পরে দেখা যায়, পুলিশও মারা গেছে। শেষের দিকে জেনিনা স্বীকার করে, পাঁচজনকে সে নিজে হত্যা করেছে। তারা সবাই প্রাণী শিকারি এবং তারাই তার কুকুর দুটিকে মেরেছিল। জেনিনা আরেকজন প্রগতিশীল প্রকৃতিপ্রেমিক বোরোসের সঙ্গে পালিয়ে চেক প্রজাতন্ত্রে চলে যায়।
ওলগা তোকারচুকের আরেক উপন্যাস ‘হাউস অব ডে হাউস অব নাইট’ (১৯৯৮) তাঁকে ভিসুয়াভা সিম্বোর্সকা এবং টোশোয়াভ মিউশের কাতারে নিয়ে আসার মতো একটি রচনা। অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া কাহিনি, জীবনী, কোনো ঘটনার এবং বিষয়ের ওপর পর্যবেক্ষণ, ছোট ছোট আখ্যানের সমষ্টিতে তৈরি হয়েছে এ উপন্যাস। উপস্থাপনার এ রকম নতুনত্বের সঙ্গে যোগ হয়েছে কখনো ট্র্যাজেডি, কখনো কমেডি, কখনো জ্ঞানগর্ভ উপাদান। কাহিনির বয়ানকারী তার স্বামীকে নিয়ে বসবাস করতে আসে পোল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের এক গ্রামে। গ্রামীণ সমাজের গল্প বলে সে; তবে তার বলার মধ্যে বিশেষ কোনো ক্রম থাকে না। তোকারচুকের গদ্য সহজ-সরল, অলংকারহীন। স্বাভাবিক সহজতা নিয়ে বর্ণনা করে যান তাঁর গল্প। সে গল্পের মধ্যেই পাওয়া যায় আশা, শ্রম এবং গল্পে উপস্থাপিত জগতের উদ্ভট বিষয়াদি। কল্পিত জীবনের সঙ্গে মিশে যায় বাস্তবের জীবন, স্বপ্নের সঙ্গে দিবালোক এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমান মিশে যায় যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতায়। অনেক নোংরা ঘটনাও ঘটে, অনেক মানুষ মারা যায়; তবে বয়ানের সুর বিষণœতায় আক্রান্ত হয় না, নিরাবেগ থাকে। লোক-জ্ঞানের মুখপাত্রী মার্তা বলে, ‘মৃত্যু যদি শুধু খারাপই হতো, তাহলে সবাই জানার সঙ্গে সঙ্গেই মরা বাদ দিয়ে দিত।’
তাঁর ২০১৪ সালের উপন্যাস ‘দ্য বুকস অব জ্যাকব’। তোকারচুকের অনুবাদক জেনিফার ক্রফট ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন এখনো। অনেকে মনে করছেন, এটা তাঁর মাস্টারপিস উপন্যাস। এ উপন্যাস পাঠকের কাছে উপভোগ্যও বটে। প্রকাশের পর টানা এক বছর জাতীয় পর্যায়ে বেস্টসেলার ছিল এটি। অষ্টাদশ শতকের পটভূমি ব্যবহার করা হলেও একুশ শতকের চিন্তাচেতনাকেই জাগিয়ে দেয় এ উপন্যাস। এ উপন্যাস পাঠককে তার ইতিহাসের দিকে নতুন করে দৃষ্টি ফেলতে উৎসাহ দেয়। কিভাবে সহনশীলতাকে বজায় রাখা যায়, কিভাবে সহনশীলতার সংজ্ঞা তৈরি করা যায়- এসব বিষয় থেকে আরো এগিয়ে গিয়ে সরাসরি মধ্য-ইউরোপের শরণার্থী প্রবেশের বিষয় পর্যন্ত পৌঁছে যায় এ উপন্যাসের প্রসঙ্গ।
মোটের ওপর তোকারচুক নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বৃহত্তর পরিসরে পাঠকদের সামনের দিনগুলো আরো চমৎকার কথাসাহিত্য উপহার দেবেন, সে বিষয়ে জোরালো আশা পোষণ করা যায় এখন।
ব্যক্তি পিটার হ্যান্ডকের চেয়ে মহান শিল্পী হ্যান্ডকে
২০১৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান অস্ট্রিয়ার নাট্যকার কবি ও কথাসাহিত্যিক পিটার হ্যান্ডকে। তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে সচেতন পাঠকমহলে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তার পেছনে অনেক কারণও রয়েছে। মিলোসেভিসের গণহত্যার পক্ষে পিটার হ্যান্ডকের ক্ষমা প্রার্থনার কারণে ১৯৯৯ সালে সালমান রুশদি ‘বছরের আন্তর্জাতিক জড়ধী ব্যক্তি’র খেতাবের জন্য রানার-আপ মর্যাদা দিয়েছিলেন তাঁকে। এরপর অবশ্য বিচার চলাকালে মিলোসেভিস মারা যাওয়ায় ২০০৬ সালে তাঁর দাফনে অংশ নিয়ে তাঁর পক্ষে ক্ষমা চান হ্যান্ডকে। তাঁর সম্পর্কে হরি কুনজরু বলেন, ‘হ্যান্ডকে চমৎকার অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লেখক, তবে তাঁর নৈতিক দৃষ্টি হতাশাজনকভাবে অন্ধ।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদদের উদাসীনতা এবং নৈরাশ্যবাদী আচরণের সামনে সর্বসাধারণের পক্ষের বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি।’ কথাসাহিত্যিক জেনিফার এগান মন্তব্য করেন, ‘সাহিত্য পুরস্কারের জন্য নোবেল কমিটির পছন্দের বিষয়ে আমরা গভীর পরিতাপ প্রকাশ করছি।’
কোনো কোনো মহল অবশ্য তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির খবরে খুশি হয়েছে। সার্বিয়ার প্রচারমাধ্যম তাঁকে ‘মহান বন্ধু’ বলে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভ্যান ডার বেলেন হ্যান্ডকের কণ্ঠকে সুস্পষ্ট এবং অনন্য বলে তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘পিটার হ্যান্ডকেকে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো অনেক কারণই আছে আমাদের সামনে। আশা করি, তা তিনি জানেন।’
মানুষ হ্যান্ডকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা হতেই পারে। তবে তাঁর লেখার দিকে দৃষ্টি ফেলা মারাত্মক অন্যায় হবে না আশা করি। বিষয়ের অনন্যতা এবং উপস্থাপনের নতুনত্ব পিটার হ্যান্ডকের লেখায় বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করে থাকে। তাঁর নাটকের উপস্থাপনা বেখটের কথা মনে করিয়ে দেয়। নাটককে তিনি বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে আসেন। মনোজগৎ বিশ্লেষণের জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণের অধীনে স্থাপন করা হয় তাঁর চরিত্রদের। উপন্যাসের বিশাল অংশ জুড়ে থাকে চরিত্রদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গমনাগমন। নামহীন ভূখ-ের দৃশ্য খুব স্বাভাবিক চিত্র, অবশ্য ভূখ-ের চেহারায় বাস্তবের কোনো অঞ্চলেরই ছায়া দেখা যায়। আরো একটি সাধারণ বিষয় তাঁর উপন্যাসের মধ্যে জায়গা পেয়ে যায়- সেটি হলো রহস্য। তা ছাড়া সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষকে বেশি হাজির করেন হ্যান্ডকে : খুব পরিচিত বলয় থেকেই তিনি লেখকদের নিয়ে আসেন তাঁর উপন্যাসের কাহিনিতে। তাঁর উপস্থাপনার গুণে উপন্যাসগুলো সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর প্রবন্ধ কথাসাহিত্যের মতো প্রিয় হয়ে ওঠে না।
তাঁর ১৯৬৭ সালের নাটক ‘কাসপার’ সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা দরকার। ভাষা এবং ভাষার অত্যাচারী ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে ‘কাসপার’ নাটকে। ব্যক্তির ওপরে ভাষার বোঝা চাপিয়ে দেয় সমাজ। ব্যক্তি যে সমাজে বাস করে, সে সমাজের চাপে পড়ে সে নিজেকেই অস্বীকার করতে বাধ্য হয়। মঞ্চে কাসপার যেসব অভিজ্ঞতার সামনে পড়ে যায়, তেমন অভিজ্ঞতা অহরহ ঘটে যায় বাস্তব সমাজেও। প্রতিষ্ঠিত রীতি-নীতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং ইচ্ছা, অন্যের কথা এবং কাজ পর্যবেক্ষণ করা ও অনুকরণ করা, নিজের কথা প্রকাশ করা এবং একই সঙ্গে নিজেকে অস্বীকার করা- এগুলো সব সময়কার বাস্তবতা। এ নাটক সম্পর্কে হ্যান্ডকে বলেন, ‘এ নাটক কাসপার হসারের জীবনে সত্যি সত্যি কী কী ঘটনা ঘটে কিংবা ঘটেছিল, সে কথা বলে না। বরং যেকোনো মানুষের জীবনে এ রকম ঘটনা ঘটা সম্ভব, সে কথাই বলে। কথা বলার মাধ্যমে কেউ যে কথা বলতে বাধ্য হতে পারে, সেটাই দেখায় এ নাটক।’ সামাজিকীকরণ এবং সভ্যতা প্রসারের মধ্যে জবরদস্তিও যে থাকতে পারে, তারই এক চমৎকার উদাহরণ ‘কাসপার’।
পিটার হ্যান্ডকের ‘আ সরো বিয়ন্ড ড্রিমস’ মূলত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসিকা। তাঁর মায়ের জীবনের ওপর ভিত্তি করে লেখেন এ উপন্যাস। প্রকাশ করেন ১৯৭২ সালে। দুঃখ-শোকের নিরেট বাকহীনতা পেয়ে বসার আগে লেখক তাঁর মায়ের জীবন সম্পর্কে যা জানেন এবং যা জানেন বলে মনে করেন, সব লিখে ফেলতে বসেন। তার পরও এ উপন্যাসে বাকহীনতার অভিজ্ঞতা ভালোবাসার কষ্টের অবস্থাটাকেই চিহ্নিত করে এবং উপন্যাসের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে। এভাবে এ উপন্যাস

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT