সম্পাদকীয় নেতা কে? বিবেকইতো তোমার নেতা। তোমার কর্তব্যজ্ঞানই তোমার নেতা। -কাজী নজরুল ইসলাম

ভেজাল খাদ্যের আগ্রাসন

প্রকাশিত হয়েছে: ২১-১০-২০১৯ ইং ০০:২২:০৭ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

ভেজাল খাদ্যে আয়ু কমছে মানুষের। খাদ্যে ভেজাল ও ক্যামিকেল মেশানোর ফলে প্রকৃত পক্ষে মানুষের আয়ু কমে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞগণ অভিমত দিয়েছেন। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। দূষিত খাবারের কারণে ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সার পর্যন্ত দু’শ ধরনের রোগ ছড়াচ্ছে মানবদেহে। বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিরাপদ খাদ্যের অভাবে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের প্রকৃত আয়ু কমে যাচ্ছে। শুধু মানুষের আয়ুই কমছে না, বরং তারা নানা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে একদিকে বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মদক্ষতা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে। ভেজাল অনিরাপদ খাদ্যে সয়লাব আমাদের চারপাশ। অনেক সময় জেনেশুনেই আমরা ‘বিষমিশ্রিত’ খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছি। বিশেষ করে জমিতে যে ফসল উৎপন্ন হয়, তা বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আসে খাবারের প্লেটে। আর এই ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবার প্লেট পর্যন্ত পৌঁছতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মিশে যাচ্ছে খাবারের সঙ্গে। প্রথমত জমিতে ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। যার বিষক্রিয়া মিশে যাচ্ছে উৎপাদিত ফসলে। আর তা পর্যায়ক্রমে প্রবেশ করছে মানবদেহে এবং সৃষ্টি করছে নানা ধরনের দূরারোগ্য ব্যাধি। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হচ্ছে, যথাযথ নিয়ম মেনে কীটনাশক ব্যবহার করলে ক্ষতির কিছুই নেই। জাপানের কৃষকেরা বাংলাদেশের চেয়ে সাত গুণ বেশি কীটনাশক ব্যবহার করে। তারপরেও জাপানিরা নিরাপদ খাবার খাচ্ছে। আমাদের দেশে এই সংক্রান্ত জ্ঞানের ঘাটতির কারণেই এই পরিস্থিতি হয়েছে। রাসায়নিক সার ব্যবহারেও জমির উর্বরা শক্তি ধ্বংস হচ্ছে। এতে অপাতদৃষ্টে ফসল উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। আর অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যেও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। এতে মানবদেহে নানা রোগের জন্ম হচ্ছে। অথচ জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করলে জনস্বাস্থ্যের জন্য কোন সমস্যা হয় না। এতে উৎপাদন ব্যয়ও কম হয়। আর কীটনাশক অপকারী পোকা ধ্বংস করার সঙ্গে সঙ্গে উপকারী পোকাও ধ্বংস করে। এই দ্রব্য পানি দূষিত করছে; ক্ষতি করছে মৎস্য সম্পদের। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। আর সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে, এই পোকাগুলোর কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় তারা ক্রমান্বয়ে কীটনাশকের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে এটা বলতেই হয় যে, ধান গম শাকসবজি ইত্যাদি উৎপাদনের সময়ই মিশে যাচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। এই ধারার পরিবর্তন ঘটাতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। আর সেটা হতে হবে জৈবসার ও কীটনাশক ভিত্তিক আদর্শ উৎপাদন পদ্ধতি। এ জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য আইন পাস হয়েছে। গৃহীত হয়েছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্যনীতি। এইসব আইন বা নীতি কার্যকর করতে উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে সচেতনতা সৃষ্টি করা। খাদ্যপণ্যে ভেজাল রোধে আমাদের দেশে গতানুগতিক অভিযান পরিচালনার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এতে বাস্তবে ভেজাল রোধ হয় না। ভেজাল বা বিষাক্ত খাদ্যদ্রব্যের উৎপত্তিস্থল ধ্বংস না হলে সুদূরপ্রসারী কোন লাভ হবে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT