উপ সম্পাদকীয়

কোন সভ্যতায় আমরা!

শফিকুল ইসলাম খোকন প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১০-২০১৯ ইং ০১:০৭:৪১ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

সুকান্ত ভট্টাচার্যের বোধন কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে এ লেখাটি শুরু করতে হলো। কারণ কবিতার এ কয়েক লাইনের সঙ্গে হয়তো এ সমাজের কিছু ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। কবিতাটির লাইন হলোÑ ‘হে মহামানব, একবার এসো ফিরে শুধু একবার চোখ মেলো এ গ্রাম-নগরের ভিড়ে, এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার; লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।’ বর্তমান সময়ের একটি বড় প্রশ্ন, মানুষ কেন অস্বাভাবিক আচরণ করছে? এ মানুষ যে শুধু অশিক্ষিত বা অভব্য গোষ্ঠীর তা নয়, শিক্ষিত ও সভ্য গোষ্ঠীর মানুষও এখন কী অবলীলায় অস্বাভাবিক ও কুৎসিত আচরণ করে ফেলছেন। তাই সচেতন মানুষের মনে প্রশ্ন, এ কোন সভ্যতায় আমরা?
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারের নির্মম হত্যা নিয়ে যখন সারা দেশে তোলপাড়া, দেশের গণমাধ্যমসহ বিদেশি গণমাধ্যমে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, আবরারের ঘটনা যেতে না যেতেই ১৪ অক্টোবর সোমবার ঘটে গেল আরেক নির্মম ঘটনা, ৫ বছরের তুহিন নামে এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পেটে একটি নয়, বরং দুটি ছুরি ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছে তুহিন নামে এক শিশুকে। বর্বরতার এখানেই শেষ নয়। তার দুই কান ও জননাঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে। পরে পাঁচ বছর বয়সি ওই শিশুর নিথর দেহ ঝুলিয়ে রাখা হয় কদম গাছের ডালে। নির্মম এ হত্যাকান্ডের ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রামে।
একটু চোখ বুঝে বা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, যদি আপনার কোনো সন্তান বা ভাই অথবা নিকটাত্মীয় ৫ বছরের শিশুকে গলা কেটে, কান কেটে, পেটে দুই ছুরি ঢুকিয়ে এবং জননাঙ্গ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে তাহলে কেমন লাগবে? ভাবতে পারেন? একটু ভেবে দেখুন তো...। সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষ আমার মনে হয় এটি সহ্য করতে পারবেন না। তুহিনের ঘটনা দেখামাত্র আমার ফেইসবুক ওয়ালে ছবিসহ স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। তখন আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু এবং ফেইসবুক বন্ধু কমেন্ট বক্সে লিখেছেন এটি সহ্য করা যায় না, এ ছবিটি দেওয়া ঠিক হয়নি। আমি বিশ্বাস করি এ ছবিটি পোস্ট করা ঠিক হয়নি; কিন্তু যে ঘটনা ঘটছে সেটি কি সহ্য করতে পারবে কেউ? না পারবে না। সহ্য করা যাবেও না।
কি ঘটেছিল ওইদিন? কি কারণে নির্মমভাবে হত্যা হয়েছিল তুহিনকে? কেনইবা তার বাবা-মাকে সন্তানহারা করা হলো, কি অপরাধ ছিল ওর...? এ প্রশ্ন শুধু আমার নয়; গোটা জাতির। হত্যা করেই প্রতিহিংসা, ক্ষোভ আর রাগ শেষ হয়ে যায়? না, আমি বিশ্বাস করি না। একজনের প্রতি ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থাকলে তাকে হত্যা করলেই শেষ হয়ে যায় না। বরং এ থেকে আরও তিক্ততা, শত্রুতা বাড়ে। ক্রমেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বা পড়তে হয়। তুহিনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে ঘুম ভাঙলে দেখা যায় ঘরের দরজা খোলা এবং বিছানায় তুহিন নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ভোরে বাড়ির পাশের একটি গাছে কান, লিঙ্গ ও গলাকাটা অবস্থায় তুহিনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাতে কৌশলে শিশুটিকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। হত্যায় ব্যবহৃত দুটি ছুরি তার পেটের মধ্যে গেঁথে রেখেও যায় পাষ- হত্যাকারীরা।
পুলিশের ভাষ্যমতে, তাদের দীর্ঘসময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সন্ধ্যায় তাদের মধ্যে কয়েকজন এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেন। সন্দেহ করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এ হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। আরও অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু বের করা হবে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা যাবে না। জানা যায়, তুহিনের পেটে যে দুটি ছুরি বিদ্ধ ছিল, তার বাঁটে কলম দিয়ে একই গ্রামের বাসিন্দা ছালাতুল ও সোলেমানের নাম লেখা দেখা যায়। এ দুজন তুহিনের বাবা আবদুল বাছিরের প্রতিপক্ষ সাবেক মেম্বার আনোয়ার হোসেনের লোক বলে পরিচিত। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরির মধ্যে কীভাবে নাম লেখা হয়েছে বা কারা এটি সাজিয়েছে তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, তদন্ত শেষ হলে সাংবাদিকদের সবকিছু বলা হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঘটনা কাউকে ফাঁসানোর জন্য করুক অথবা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে করুক কাজটি কি ঠিক হয়েছে? প্রতিহিংসা আর ফাঁসানোর জন্য কি এ পথ অবল¤¦ন না করলে হতো না?
এটা কি সভ্যতা...? না অন্য কিছু, এটা সত্যতা বলা যাবে না। আসলে আমরা কোন সভ্য সমাজে বাস করছি। তুহিন নামে ৫ বছরের এ শিশুর কি অপরাধ ছিল? না ওর বাবামা অথবা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ ছিল? যতই বিরোধ থাকুক অথবা ৫ বছরের অবুঝ শিশুর যত বড় অন্যায়ই থাকুক এর এটাই কি পরিণাম? না এটি হতে পারে না। যেমনটি হয়নি আবরারের বেলায়। ধিক্কার... এ রকমের সমাজের, ধিক্কার এ রকমের মনুষ্যত্বের, ধিক্কার জানাই এ রকমের পাষ- মানসিকতাকে। বিচার কি হবে? আমি মনে করি, এ রকমের ঘটনার আগে সামাজিক অপরাধ প্রতিহত করা উচিত। এ রকম অপরাধ সমাজে হয়ে থাকে, তেমনি এ রকমের সামাজিক অপরাধ সামাজিকভাবেই প্রতিহত করতে হবে। আমি মনে করি সব বিচার আইন দিয়ে করা যায় না বা সব অপরাধ আইনের চোখেও দেখা যায় না। এসব অপরাধ সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে এবং এ রকমের অপরাধ সমাজের মানুষদেরই ঘটনা পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে বা আইন দিয়ে সব অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
এমন নির্মমতা যুগ যুগ ধরে ঘটে চলেছে। কিন্তু তুহিনের মতো ঘটনা...। আমার বয়সে এ প্রথম দেখেছি এমনটা বললে মনে হয় ভুল হবে না। আমরা রাজন, রবিউলের মতো ঘটনাও দেখেছি। প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছেই। হত্যাকা-, পাশবিক নির্যাতন, একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যখন ঘটছে, তখন সামগ্রিক এ পরিস্থিতি আমলে নেওয়ার বিকল্প নেই। অনেকের মতো আমারও প্রশ্ন দেশে হচ্ছেটা কি? এ দেশে কি আইনের শাসন নেই? এ দেশের মানুষ এত ভয়ংকর কেন? এ দেশের মানুষের মনুষ্যত্ব এত অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়েছে কেন? তাহলে প্রশ্ন করতে পারি না যে, এখন কোন সভ্যতায় আছি আমরা, আসলে এটি সভ্য সমাজ বলা যাবে? না অসভ্য সমাজ বলা অন্যায় হবে?
এ নৃশংস ও নৈরাজ্য থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। আমাদের সবার সজাগ থাকতে হবে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর সরকারের প্রতি ভরসা রাখলেই হবে না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, শুধু সতর্কতা জারি করে সুফল পাওয়া কঠিন। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় নেওয়া যেতে পারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি। মনে রাখতে হবে, যে কোনো অপরাধই আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার জন্য কলঙ্কজনক। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিশ্চিত হোক, এমনটি কাম্য। আমাদের মানবিকতা, মানসিকতা আর মনুষ্যত্বের পরিবর্তন আনতে হবে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, মানবতার প্রতি সম্মান রাখতে হবে, জীবনের প্রতি মায়া থাকতে হবে। তাহলেই আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে দাবি করতে পারব আর স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারব। বিশ্বের কাছে সুনাগরিক বা একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গর্বিত হবো।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT