মহিলা সমাজ

পুকুরের আত্মকথা

শাহিদা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১০-২০১৯ ইং ০১:১০:৪২ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

আমি পুকুর। আমাকে চিনে না এমন বাঙালি পাওয়া কঠিন। অবশ্য বর্তমানে ইংরেজির কবলে পড়ে আমি ‘পন্ড’ থেকে শিশুদের কাছে ‘পুল’ হয়ে গেছি। আর বড়োরাও আমাকে ভুলতে শুরু করেছে। তাই তো আজ গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’।
আমাকে ছাড়া কোনো মানুষ বাঁচতে পারতো না। কারণ পানিই জীবন। আর আমি পুকুরই মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম ছিলাম। আমার পানি মানুষ পান করতো, আমাতে গোসল করতো, বউ-ঝিরা বাসনকোসনও এককুণে ধুয়ে নিতো। আমি সবই হজম করে নিতাম। আজকাল টাকা দিয়ে পানি ফিল্টার করে মানুষ পান করে, আর আমি আল্লাহর শিখানো নিয়মে সবই ফিল্টার করে নিতাম। এখন কেন পারছি না? তা-ই বলতে চাই।
পুকুর নাই এমন বাড়ি এদেশে বিরল ছিলো। পুকুরে বউ-ঝিরা যখন গোসল করে কাপড় ছাড়তো তাও বাইরে থেকে দেখা যেতো না। কারণ পুকুরের চতুর্দিকে মাটির উঁচু দেওয়াল থাকে। ভূমি থেকে অন্তত দুই হাত উঁচু সে দেওয়াল। ঐ দেওয়ালে ওড়হর গাছ লাগানো যেতো। অন্য কোনো গাছ বা সব্জি লাগানোর কোনো কথা নয়। কারণ ওটা দেওয়াল, ওখানে বেশি উঠা-নামা করলে পুকুরের দেওয়াল ভেঙ্গে যায়। এই দেওয়াল কতোটা প্রয়োজনীয় তা আজ আমার বক্তব্যের মূল বিষয়। ঐ দেওয়াল চুয়ে বৃষ্টির পানি পুকুরে আসুক এটাই আল্লাহর ফিল্টার ব্যবস্থা। পুকুরের আশপাশের পানি সরাসরি পুকুরে পড়লে সে পানি আর নদীর বা খালের পানিতে কোনো পার্থক্য থাকে না। পুকুরে যাতে বাইরের পানি প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য মাটির দেওয়ালের ব্যবস্থা করতে হয়। সেটা আবার পাঁকা ইটের তৈরি করলেও হবে না। চাই মাটির দেওয়াল। আঠালো মাটির তৈরি সে দেওয়াল শক্ত মজবুত হয়।
আজকাল কিছু বড়লোক সখের বশে পুকুর খনন করান। বেশ মাটিও পেয়ে গেলেন। চতুর্কোণ একটা গর্ত করে চারপাশে গাছপালা ইত্যাদি লাগিয়ে ঝক্্ঝকে পুকুরের মালিক হয়ে যান। মাছ চাষ করেন শান বাঁধানো ঘাট তৈরি করে বিনোদনের ব্যবস্থাও করে ফেলেন। বছর যেতে না যেতে পানিতে গন্ধ দেখা দেয়, তীর ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। মালিক ভাবেন পুকুরের পরিচর্যা করতে হবে। মানুষ ডেকে খনন কাজ শুরু করেন। আমি আরো রেগে যাই, তাই তো গতবারের চেয়ে এবার আরো বেশি ভেঙে পড়ি। পুকুরের সৌন্দর্য আর থাকে না। আমি তো আর ‘পুল’ নই। আপনারা আমাকে ‘পুল’ ভেবে ভুল করেন। আমি পুকুর। মাটির তৈরি ফিল্টার। আমাকে শাসন করা যাবে না ঐ ভাবে। আমার মতো করে আমাকে শাসন করতে হবে। কয়েক বছর পর পর সামান্য যতœ নিলেই হবে। অর্থাৎ একেবারে তলদেশ সামান্য খনন করে দিলেই হবে। অর্থাৎ আমাকে আমার মতো তৈরি করুন, আমিও আপনাদের খেদমত করবো। হ্যাঁ আপনারা অনেক বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ পেয়ে গেছেন। আমার পানি নাইবা খেলেন, সাঁতার তো কাটতে পারবেন, মাছও খেতে পারবেন, বিনোদনও পাবেন। আমাতে আর পুলে ফারাক রাখুন। পুলের চতুর্দিকে পাঁকা দেওয়াল তুলে নীচ পর্যন্ত পাঁকা করে কৃত্রিমভাবে পানি সরবরাহ করে যে আনন্দ পাবেন তা আমি দিতে পারবো না। তাই আমাকে নিয়ে শহরে টানাটানি করবেন না। পুল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুন। আমাকে হারিয়ে যেতে দিন। আমার সময় ক্রমে ঘনিয়ে এসেছে। মানুষ প্রতি ইঞ্চি জমি কাজে লাগাতে চায়। তাইতো আমি মজা পুকুর অথবা মাছ চাষের জায়গা। আমি ভালো আছি না খারাপ আছি তা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। অথচ এক সময় আমি কতো আদরের ছিলাম। যার যতো বড় পুকুর তার বাড়িতে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য বউ ঝিরা লাইন ফেলে দিতো। সবই এখন স্মৃতি। আমাকে সবাই ভুলতে বসেছে। মানুষ টাকা চায়। আমাকে ভরাট করে বহুতল দালান নির্মাণ করছে। তাইতো বলিÑআমাকে আমার মতো থাকতে দাও, নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT