মহিলা সমাজ

হারিয়ে যাচ্ছে মধুমাখা সম্পর্কগুলো

জুঁই ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১০-২০১৯ ইং ০১:১২:১১ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত

একটি শিশু পিতা-মাতার হাত ধরেই এই পৃথিবীতে আসে। প্রতিটা মা-ই প্রতিটা শিশুর জন্য প্রথম শিক্ষক, আর পরিবার হলো প্রথম বিদ্যা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বৈচিত্রময় এই পৃথিবীতে শিশুর বয়স চার বা পাঁচ হলেই জ্ঞান অর্জন ও মেধার বিকাশের জন্য আমাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়। যিনি সৃষ্টিশীল কাজে নিয়োজিত কিংবা সৃষ্টিশীল কাজের কারিগর তিনিই শিক্ষক। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে দাতা আর গ্রহিতার সম্পর্ক যেখানে জ্ঞানের লেনদেন হয়। যিনি শিখান তিনি শিক্ষক আর যাকে জ্ঞান দান করা হয় তিনি শিক্ষাথী।
শিক্ষক মানেই হচ্ছে একটি সম্মানীত স্থান। শিক্ষক তার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে গড়ে তোলেন তার শিক্ষার্থীকে। তার মেধা, মনন কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বিকশিত করেন। শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে তিনি জাগিয়ে তোলেন তার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে। তাই শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকের সম্পর্ক যতো বেশি ভালো হবে, সুন্দর হবে, বন্ধুত্বপূর্ণ হবে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে ততো ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসে শিক্ষার্থীরা জীবনকে চিনতে ও বুঝতে শেখে। সব কিছুকে নতুন করে দেখতে শেখে। শিক্ষক শিক্ষার্থীর দেখার চোখ খুলে দেয়, জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়। তাদেরকে জ্ঞানের পথে, আলোর পথে নিয়ে যায়। শিক্ষক জীবন সম্পর্কে যে দর্শন চিন্তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন তার ভিত্তিতেই তারা তাদের জীবনের ব্রত ঠিক করে। একজন ভালো শিক্ষক একজন বখে যাওয়া শিক্ষার্থীকেও সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারেন, তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
আমি মনে করি সুন্দর একটি সম্পর্ক হলো ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক একই সাথে খুবই সাবলীল, মধুর, স্বতঃস্ফূর্ত আবার গাম্ভীর্যপূর্ণ। শিক্ষক প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর ওপর অবিভাবকসুলভ কঠোরতা, শাসন আরোপ করেন। আবার কখনো বা বন্ধুর মতো ভালোবাসেন, পরামর্শ দেন, উৎসাহ যোগান, সব সময়ই পাশে থাকেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে অবিভাবকের মতো সম্মান করে, আদেশ-উপদেশ মেনে চলে, শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। শিক্ষকের সাথে ছাত্রের সম্পর্ক পথ প্রদর্শক আর পথিকের সম্পর্কের মতো। শিক্ষক পথ দেখান, ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনা দেন। আর শিক্ষার্থী সেই দেখানো পথে চলে, নির্দেশনা মেনে চলে। উদারতা স্নেহের, মায়া, ভালোবাসা আর শাসনের মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের ভেতরে স্বপ্নের বীজ বপন করেন। শিক্ষার্থীরা সেই স্বপ্নকে লালন করে। তাই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্বপ্ন স্রষ্টারও।
আমাদের জীবনে প্রাইমারি কিংবা হাই স্কুলের কথা মাঝে মাঝে মনে করতে কার না ভালো লাগে? সেই দুরন্তপনার দিনগুলোর কথা এক সময় না এক সময় অবশ্যই সবার হৃদয়কে পুলকিত কিংবা স্মৃতির গভীরতায় পৌঁছে দেয় এটা খুব সত্য। হাই স্কুল জীবনে কতো না কাহিনী ঘটে আমাদের জীবনে সেগুলো মনে করলে হয়তো বা একা একাই হাসেন সবে, আবার কষ্টের কথা থাকতে পারে কারো না কারো জীবনে। সেই দুরন্ত কিশোর কালের স্মৃতি আমাদের জীবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা ঘটনা মনে হলে মাঝে মাঝে হাসি আসে- সামনের বেঞ্চে বসার জন্য কি-না প্রতিযোগীতা কিংবা ঝগড়া বাঁধাতাম, পেছনের বেঞ্চে বসার অভ্যাস কোনো কালেই ছিলো না। স্কুলে ক্লাস শুরু হতো ৯টায় আমরা ৮টায় চলে যেতাম শুধু মাত্র প্রথম বেঞ্চে বসার তাগিদে। আজও মনে পড়ে মাঝে মাঝে হাসি পায় আমরা ক’জন বান্ধবীর একজনও যদি আগে যেতাম তাহলে খাতা কিংবা বই বিছিয়ে জায়গা দখল রাখতাম যাতে অন্য কেউ এখানে না বসতে পারে। যাতে আমরা সকল বান্ধবীরা মিলে একসাথে বসতে পারি এই জন্য এ ব্যবস্থা। আমি যখন হাই স্কুলে ৬ষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হলাম তখন বাংলা শিক্ষিকা সালমা বাছিত আমাদের বাংলা পড়াতেন। আমরা তখন কিশোরী, তিনি ক্লাসে আমাদের সাথে এমনভাবে মিশতেন মনে হতো কতো আপন। উনার ক্লাস করানোর স্টাইলটা ছিলো মূলত মাতৃত্বসুলভ। প্রতিটি ছাত্রীর নাম তিনি মুখস্ত বলতে পারতেন অনেক ছাত্রীর মাঝেও। তিনি মায়ের মতন আদর করে যে কোনো বিষয়কে বুঝিয়ে দিতেন। শুধু পড়ার মধ্যে সম্পর্কে না উনি প্রতি ছাত্রীর পারিপার্শ্বিক খবর নিতেন, অনেকে আছে পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল না তিনি যতটুকু পারতেন বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করে দিতেন আর পড়ায় ভালো ছাত্রী হলে তো কোনো কথাই ছিলো না। আমাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করে দেন আর সেই সুবাদে আমি ক্লাস টেন পর্যন্ত ফ্রি লেখাপড়া করেছি, শুধু যে বেতন তা না তিনি গরিব অসহায় শিক্ষার্থীদের বইও সংগ্রহ করে দিতেন বিভিন্নভাবে। কেন যে উনাকে এতো ভালো লাগতো। উনার কথা-আচার-ব্যবহার সবই আমাকে মুগ্ধ করতো। ক্লাস সিক্স থেকে টেন এই সময়ের মধ্যে উনাকে যতো সময় পেয়েছি হাসিমাখা ব্যবহার সবার সাথে করতেন দেখেছি। সেই স্কুল জীবনে উনাকে দেখেই ইচ্ছে হতো শিক্ষক হয়ে এই মহান পেশায় নিজেকে জড়িত রাখি। ক্লাস সিক্সে বাংলা ক্লাস ছিল আমাদের প্রথম ক্লাস। প্রথম দিনের ক্লাসেই ম্যাডামের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে। তারপর টানা সিক্স থেকে টেন উনাকে আমরা পেয়েছি বাংলা শিক্ষিকা হিসেবে। আমাদের ম্যাডাম সব সময় আমাকে সামনে বসতে বলতেন, কারণ ছাত্রী হিসাবে খারাপ ছিলাম না আমি। ক্লাস ক্যাপটেন ছিলাম সিক্স থেকে টেন, তাই স্কুলের সকল শিক্ষকসহ ছাত্রীরাও আমাকে চিনতেন বা জানতেন। কতো না আন্তরিক ছিলেন তিনি সকল শিক্ষার্থীর প্রতি তা সত্যি ভাবতে ভালো লাগে। ভাগ্য ভালো থাকায় উনার মতো শিক্ষকের সান্নিধ্য আমি পেয়েছি। যে শিক্ষকের কথা এতো সময় বলেছি তিনি হলেন সালমা বাছিত, বর্তমানে তিনি সিলেট জেলার ভারপ্রাপ্ত মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই তো তিন বা চার মাস আগে সেদিন ম্যাডামকে একটা অনুষ্ঠানে পেয়েযাই হঠাৎ। অনেক দিন পর দেখা উনার সাথে, ভাবলাম ম্যাডামের মনে আছে কি-না আমাকে, কিন্তু না তিনি ঠিক-ই আমাকে চিনে নিলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করেই বলতে লাগলেন সেই জুঁইয়ের সাথে অনেক দিন পর দেখা। তখন সত্যি খুব ভালোলাগার একটা মূহূর্ত ছিলো সেদিন। মনে হলো তিনি সেই আগের মতোই আছেন, বন্ধুসুলভ ব্যবহারের কোনো কমতি নেই উনার মধ্যে এখনো।
শুধু সালমা ম্যাডাম কেনো সকল শিক্ষকই আমাদের চিনতেন জানতেন, শিক্ষকদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় এখনো কোনো শিক্ষককে বাইরে কোথাও পেলে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে কমতি হয় না। আগেকার সময়ে শিক্ষকরা বেত্রাঘাত কিংবা বকা ঝকা করেন নি তা নয়। অবশ্যই কঠোর শাসন ছিলো তবে সেটা ছিলো ভালোবাসার শাসন। না হয় দেশে এতো বড় বড় ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষক তাদের মেধার যোগ্যতা দিয়ে এ পদে আসতেন না। ওরা শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন সবসময় আর শিক্ষকরাও ছিলেন আন্তরিক।
অনেকেই বলেছেন, বিশ-ত্রিশ বছর বা তারও আগে শিক্ষকরা ছিলেন শিক্ষাদানে নিবেদিতপ্রাণ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের মতো। যে ভক্তি নিয়ে শিক্ষককে সমীহ করতেন, শিক্ষকরাও সেই মর্যাদাকে ধরে রাখতেন। নিজেদের সেই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পড়াশোনা করতেন যথেষ্ট পরিমাণে, আদর্শ চরিত্র গঠনে তারা সচেষ্ট ছিলেন। কীভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান সঞ্চারিত করা যায়, এ ধারণাই ছিলো তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা। শিক্ষকরাও ছিলেন এক একজন চলন্ত পাঠাগার এবং জ্ঞানের ভান্ডার যেখান থেকে বিদ্যার্থীরা সরাসরি জ্ঞান আহরণ করে তৃপ্ত হতো। শিশু মনের অগ্রগতির ধারার সঙ্গে ছিলেন তারা একান্তভাবে পরিচিত। আর এভাবে পরিচিত থাকতেন বলেই তাঁরা বিবিধ প্রকৃতির শিক্ষার্থীদের যথার্থ পরিচালিত করতে সমর্থ ছিলেন। আজকাল বিদ্যালয়ের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি শিক্ষার মান অনেক কমে গেছে, সাথে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কগুলোতে শকুনের ছোঁয়া পড়েছে। এই জন্য তো প্রায় দেখা যায় শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীর লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা। মেয়ের সমান কিংবা নাতনির সমান শিক্ষার্থীর দেখা যায় শিক্ষককে নিয়ে কেলেংকারি কিংবা ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আগেকার দিনের মতো শ্রদ্ধা ও মান্যতা পাচ্ছেন না বলে প্রায়ই শোনা যায়। যদিও আগের চেয়ে উন্নত প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়ে উন্নত পাঠ্যক্রম চালু হয়েছে। সরকার নানাভাবে শিক্ষার খাত বাড়িয়ে প্রতি বছর শিক্ষার মান বাড়াতে চেষ্টায় রত। কিন্তু দিন দিন শিক্ষক আর শিক্ষাথীর সম্পর্ক পাংসে হয়ে যাচ্ছে অতি আধুনিকতার কারণে। এই আধুনিক যুগে বলা হয় শিক্ষক হবে বন্ধুর মতো, এই বাণীর সাথে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিশে গেছেন বলেই হয়তো বা শিক্ষকের সম্মান হ্রাস পাচ্ছে মনে হয়। বন্ধুত্বের সাথে কড়া শাসন ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে যতœশীলতা কম থাকায় আগের মতো করে শিক্ষকের সেই সম্মান দিন দিন ম্লান হওয়ার এটিও একটি কারণ; যেমন আমাদের আধুনিকতা। আবার দেখা যায় শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মধ্যে বর্তমানে টাকার লেনদেনের মাধ্যমে মেধা বিক্রি। শিক্ষক নোট কিংবা জ্ঞানদান টাকার মাধ্যমে করেন, আন্তরিকতা নেই, এই সম্পর্কগুলোর ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী যোগান পাচ্ছে না। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এখন অনেক দূরত্ব। এমনও অনেক শিক্ষক আছেন যিনি তার স্কুলের কিংবা কলেজের শিক্ষার্থীকে চিনেন না, আবার ছাত্ররাও শিক্ষকদের চিনেন না। আগের মতো শিক্ষকরা যেমন সম্মান পাচ্ছেন না তেমনি শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছে থেকে ¯েœহ, মায়া, মমতা, ঠিকমতো পাচ্ছে না। বলা যায়, দু’সম্পর্কের মধ্যে অনেকটা আন্তরিকতার অভাব দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণেই এমনটা ঘটছে দিনে দিনে। শিক্ষা যখন থেকেই বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে তখন থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে বলে তাদের মন্তব্য।
সত্যিকার্থে আমাদের শিক্ষকদের সমস্যা হচ্ছে তারা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার বাইরেও তাদের সঠিক বিচার করে সঠিক পথ দেখানোর যে দায়িত্ব সেখানেও অবহেলা করে থাকেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরে তাদের মেধা যাচাই করে দিকনির্দেশা দিতেও কৃপণতা থেকে যায় একজন শিক্ষকের। ক্লাসে একজন শিক্ষার্থী কেনো অনুপস্থিত সে খবর নেওয়া শিক্ষকের দায়িত্ব কিন্তু সেখানেও দেখা যায় উদাসিনতা। শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার খবরাখবর আদান প্রদানের জন্য তাদের অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করা আবার অভিভাবকদেরও উচিৎ শিক্ষকদের সাথে বা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ রাখা। শ্রেণি কার্যক্রমে মনোযোগ সহকারে ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করছে কিনা তা তলিয়ে দেখেন না। শুধুমাত্র ক্লাস করিয়ে দায়িত্ব পালন শেষ মনে করেন আমাদের শিক্ষকরা।
বলা যায়, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে এখন প্রবেশ করেছে কৃত্রিমতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর লাভের হিসেব। একটা সময় ছিলো যখন ছাত্ররা নিজ হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিতো। আজ সেই হাতে তারা শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে। আবার শিক্ষক যে হাত দিয়ে আশীর্বাদ, উৎসাহ, শুভকামনায় ছাত্রের মাথায় হাত রাখেন, সেই হাতে তারা কোমলমতি শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করছেন। শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষককে ব্যবহার করতে চায় অসদুপায়ে ভালো ফল লাভের আশায়। অন্য দিকে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার করে অর্থ লাভের হাতিয়ার হিসেবে। আগে যেখানে শিক্ষকতা মহান পেশা ছিলো এখন তা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন স্বার্থের সম্পর্ক বিদ্যমান। ছাত্র শিক্ষক উভয়ই এখন শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতিতে যুক্ত। ফলে সেখানেও তাদের মধ্যে রয়েছে আপোসের সম্পর্ক। তবে প্রতিটি ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক এমন নয়, এখনও সৎ শিক্ষক ও ভালো ছাত্ররা আছে। তবে তাদের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
পিতা-মাতার পরই যেখানে বলা হয় শিক্ষকের স্থান। শিশু মনন গঠনে বিদ্যালয় থেকে পারিবারিক শিক্ষাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক সুশিক্ষার অভাবেও কিছু সংখ্যক শিশু হয়ে উঠে সমাজে দুর্বিনীত, বেপরোয়া। ডিজিটালের হাওয়ায় দিন দিন আমাদের ছাত্র সমাজ অতি আধুনিকায়ন হচ্ছে। যার ফলে এমনও দেখা যায় শিক্ষককে সামনে পেলেও ঠিক মতো সালামটাও দিতে তারা জানে না কিংবা না দেখার ভান করে পাশ কেটে যায়। এই ভদ্রতাটুকু যদি একজন শিক্ষার্থী না শেখে তাহলে সে স্কুল কলেজে যাওয়ার দরকার কি? এই জন্য শুধু শিক্ষক দায়ী তা না আমাদের পরিবারগুলোও দায়ী। একটি শিশুকে প্রথমে আচার-ব্যবহার শিখাতে হয় তার পরিবার, তারপর শিক্ষক। এই শহরের একজন শিক্ষক সেদিন গল্প বলার সুরে বললেন- ঐ শিক্ষককে নাকি কয়েক দিন আগে হঠাৎ কয়েকটা ছিনতাইকারী ধরে মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় সন্ধ্যা রাতে, তিনি রাস্তায় একা থাকায় কিছু করতে পারেনি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলেন আর জায়গাটা অন্ধাকার থাকায় তাদের তিনি চিনেনও নাই। ছিনতাই হওয়ার কিছুক্ষণ পর মোটরসাইকেল আবার পথরোধ করে দাঁড়ায়। এখন দেখেন উল্টো কাহিনী একটা ছেলে সালাম দিয়ে বলছে এই নিন স্যার আপনার মোবাইল ও মানিব্যাগ। শিক্ষক তো অবাক ছিনতাই হওয়ার জিনিষ কি পাওয়া যায়? ছেলেটিই বলছে স্যার আমি আপনার ছাত্র- আপনাকে চিনতে পারিনি। এই বলেই মোটরসাইকেলটি ছেড়ে চলে গেলো। শিক্ষক মনে মনে ভাবলেন যাইহোক এই ছেলেটাকে পরিবার পুরো শিক্ষা না দিতে পারলেও কিছু মনে হয় দিতে পেরেছে। এই যে ছিনতাইকারী হয়েও শিক্ষককে সম্মান এটা পরিবার ও বিদ্যালয়ের অবদান হলেও বখাটেদের পাল্লায় পড়ে, কিংবা অভাবের তাড়নায় ছিনতাই করছে হয়তোবা। ইদানিং এক বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী কিন্তু অসন্তোষজনক পারিবারিক পরিবেশ থেকেই বেরিয়ে আসছে এবং তাদের প্রভাব গোটা ছাত্র সমাজকে কলুষিত করে দিচ্ছে দিন দিন। গৃহ সমাজকে কলুষিত করে দিচ্ছে। গৃহে যদি তারা শ্রদ্ধাভক্তি, বিনয়, মান্যতা, শৃঙ্খলাবোধ, বিনম্র ব্যবহার প্রভৃতির পাঠ থেকে বঞ্চিত থাকে, তা হলে কীভাবে তারা শিক্ষক বা অন্য গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে? আমাদের অভিভাবকদের এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, পারিবারিক শিক্ষা দিয়ে শিশুর মনকে জাগাতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও উচিত বাবা-মায়ের পর শিক্ষককে সম্মানের স্থানে রাখা ও মেনে চলা।
সেদিন অনলাইনে চোখে পড়লো এই স্ট্যাটাসটি- ভারতীয় নাগরিক পশ্চিমবঙ্গের নিরুপমা রায় ফেসবুকে লিখেছেন, তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময় হাতে কিছু পয়েন্ট লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিক্ষকের হাতে তিনি ধরা পড়েন। তাকে অধ্যক্ষের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। খাতা মিলিয়ে দেখা হয় সেই পয়েন্টগুলো তিনি খাতায় লিখেছেন। অধ্যক্ষ কোনো বকাঝকা না করে তাকে নতুন খাতা দিয়ে বললেন, আবার লেখো। এত সুন্দর সহজ সমাধান যে হতে পারে, আমাদের স্কুলের শিক্ষক, প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট- যারা গার্ড দেন পরীক্ষা কেন্দ্রে তারা মনে হয় কল্পনাও করতে পারেন না। নকল করাকে কেউ সমর্থন করছে না। কিন্তু এই বয়সটাই ভালোমন্দ না বুঝে পদক্ষেপ নেওয়ার বয়স। সেই বয়সের শিশু-কিশোরের যে কোনো পদক্ষেপকে তাই শিক্ষক ও অভিভাবককে সহমর্মিতার সঙ্গে দেখতে হবে।
¯েœহ, মায়া, মমতা, আন্তরিকতা আগের মতো শিক্ষকদেরও যেমন কমে যাচ্ছে তেমনি শিক্ষার্থীদেরও। পালা বদলের নিয়মে সেই সুসম্পর্কগুলো বিলুপ্তির পথে। তারপরও আশাবাদ ও সম্মান নিয়ে বলতে পারি- একজন ভালো শিক্ষক একজন ছাত্রের জীবন আমূল বদলে দিতে পারেন। তাকে নবজন্ম দিতে পারেন। সম্ভাবনা আর সাফল্যের দুয়ারে পৌঁছে দিতে পারেন। তাই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত ও দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। ¯েœহ-ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা-সম্মানে যে সম্পর্ক রচিত হয় সেই সম্পর্ক যেন সর্বদাই অটুট থাকে। ছাত্র-শিক্ষকের পবিত্র সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখা সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব।
ফিরে আসুক সেই মধুমাখা সম্পর্ক সম্মান আর ভালোবাসায় ভরে উঠুক আমাদের শিক্ষক আর শিক্ষার্থ

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT