ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটে উর্দু চর্চা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১০-২০১৯ ইং ০০:১৫:৫৭ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত



এ উপমহাদেশে সুপরিচিত ভাষাসমূহের মধ্যে উর্দু অন্যতম। ইংরেজি, আরবি, ফারসি পুরোপুরি বিদেশী ভাষা। কিন্তু বাংলা, হিন্দি, উর্দু এ উপমহাদেশের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। উর্দু এখনো বাংলাদেশে টিকে আছে। বিদেশী ভাষাচর্চার তালিকায় ইংরেজি, উর্দু ও আরবি এদেশে প্রধান। সিলেটে উর্দুর ভিত্তি এখনো মজবুত।
উর্দুর জন্ম ও বিকাশ সম্পর্কে গবেষকদের একাধিক মতামত আছে। সাধারণভাবে গৃহিত মতানুযায়ী উর্দুর জন্ম মোগল আমলে। বিভিন্ন অঞ্চলের লোক নিয়ে গঠিত হয় মোগল সৈন্য বাহিনী। তাদের অনেকেই নিজস্ব আঞ্চলিক উপভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানতেন না। তাই তাদের পরস্পর যোগাযোগের এবং ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে একটি নতুন ভাষা। উর্দুকে এ জন্য ফওজী ভাষা বলা হয়। উর্দু শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ফওজী ছাউনি। মুসলিম আমলে উদ্ভূত উর্দুর নিকট-সম্পর্ক রয়েছে আরবি ও ফারসির সাথে । লিপি ও লিখন পদ্ধতিতে যেমন, মূল প্রাণরসেও তেমনি ইসলামী চেতনা মিশ্রিত। এ ভাষার প্রধান কবি সাহিত্যিক প্রতিভাধর ব্যক্তিবর্গও ছিলেন মুসলমান। তাই মুসলমানী আমেজ নিয়ে উর্দু বিকাশ ও বিস্তার লাভ করে। ফারসি রাজভাষা হলেও উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমান জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য উর্দুকে আশ্রয় করেছিলেন। পরে ইংরেজ শাসন চেপে বসলে মুসলমানদের অখ- সত্তার চেতনা তীব্র হয় এবং সেই সাথে উর্দুর গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। আন্তঃ উপমহাদেশীয় পর্যায়ে মুসলমানদের যোগাযোগ ও যোগসূত্রের বাহন ও অবলম্বন হওয়াতে স্বল্প সময়ে গড়ে ওঠে উর্দুর বিশাল সাহিত্য ভা-ার। বিভিন্ন ভাষাভাষী মুসলমান কবি সাহিত্যিক চিন্তাবিদ এ ভাষাতে নানা বিষয়ে গ্রন্থাদি রচনা করেন। এ স্রোতধারায় সিলেট অঞ্চলের গুণীজনও মিশে যান। কাব্য এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উর্দুতে রচনা করেন গ্রন্থ। এ ভাষার ব্যাপক চর্চা শুরু হয় সিলেটে। দেওবন্দ, কলকাতা মাদরাসা এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিলেটের শিক্ষার্থীদের একটি ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল। ঐ সময়ের বাস্তবতায় তাদের কাছে উর্দু ছিল শীর্ষস্থানীয় ভাষা। সিলেটের সামাজিক ও শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের প্রভাব ছিল প্রবল। দেশ ও জাতির খেদমতের জন্য উর্দুকে তারা উদারভাবে গ্রহণ করেছিলেন।
উর্দু ভাষায় সিলেটীরা সংবাদপত্রও বের করেছেন। ফারসি, আরবির তুলনায় উর্দুতে রচিত গ্রন্থাদির সংখ্যাধিক্য থেকে অনুমান করা যায় যে, ভাষাটি পাকিস্তান সৃষ্টির অনেক আগেই শক্ত শিকড় গেড়ে বসেছিল। ১৯৪৭ খ্রী. পূর্ববর্তী উর্দুচর্চায় রাজনৈতিক মটিভ নয় সাংস্কৃতিক চেতনাই ছিল প্রধান। সিলেটে অন্যান্য ভাষার মতই উর্দুও সমাদৃত হয়েছে। পাকিস্তান আমলে বাংলার প্রতিপক্ষ হিসাবে উর্দুকে দাঁড় করানো হয়। এর প্রেক্ষাপট ছিল সাংস্কৃতিক কিন্তু মটিভ ছিল রাজনৈতিক। তাই প্রথমেই সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে প্রতিবাদ ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান হয়। ভাষা আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি পায়। কিন্তু এর পরও মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে উর্দু টিকে থাকে। এ ছাড়া আলেম উলেমাদের অনেকে লেখালেখির বেলায় বাংলার চেয়ে উর্দুতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। ফলে উর্দুতে পুস্তক রচনার ধারা এখনো টিকে আছে। আলেমদের অনেকেও আবার বাংলার চেয়ে উর্দু আরবি, ফারসিতে অধিক দক্ষতা সত্বেও বাংলাতে লেখালেখি করেছেন। ভাষা আন্দোলনের আগে থেকেই বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু উর্দুচর্চার প্রতি বিরাগ প্রকাশ করেননি। আনজুমানে তরক্কীয়ে উর্দু নামক একটি প্রতিষ্ঠান সিলেটে গড়ে উঠেছিলো। ভাষা আন্দোলনের পরও এর কার্যক্রম চলেছে।
উর্দু সমগ্র বাংলাদেশেই অভিজাত শ্রেণির ভাষা হয়ে উঠেছিল। এ যুগে ইংরেজি ভাষার সাথে যেমন শ্রেষ্ঠত্ববোধের একটি অঘোষিত সম্পর্ক আছে তেমনি সে যুগে আভিজাত্য বোধের সাথে উর্দুর একটি সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছিলেন সমাজের স্বচ্ছল ও অগ্রসর লোকজন। সর্বভারতীয় যোগাযোগের কাজে উর্দু ভাষা বাংলার তুলনায় অধিকতর গ্রহণযোগ্য ছিল। এ সব কারণেও উর্দুর প্রতি অনুরাগ ছিল অনেকের। ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসেন সিলেটে। এ উপলক্ষে গঠিত অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন আসামের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া। রবীন্দ্রনাথকে প্রদত্ত সম্বর্ধনা সভায় কাপ্তান মিয়া বক্তৃতা করেন উর্দুতে। কবি নাকি সিলেটের প্রধান ভাষা সম্পর্কে সংশয়ে পড়ে যান এবং জানতে চান কোন ভাষায় বক্তৃতা করবেন। কাপ্তান মিয়ার উর্দুতে ভাষণ দান থেকে সিলেটের শিক্ষিত শ্রেণির তৎকালীন দৃষ্টিভঙ্গি অনুমান করা যায়। কবিকে যোগ্য সম্মান দানের জন্যই হয়তো কাপ্তান মিয়া উর্দুর আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানে আরেকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। সেটি হচ্ছে সিলেট ছিল আসামের সাথে, বাংলাদেশ থেকে প্রশাসনিকভাবে বিচ্ছিন্ন। তাই উর্দুকে একটু আলাদাভাবে এখানে গণ্য করা হয়েছে। ১৯৪৮ বা ১৯৫২ পরবর্তী দৃষ্টিভঙ্গিতে পূর্ববর্তী গুণীজনের উর্দুপ্রীতি ও চর্চার ব্যাপারকে বিচার করা সমীচীন নয়। উর্দু আরবিতে সুপ-িত অনেকে ভাষা আন্দোলনে বাংলার পক্ষে ছিলেন। আবার উর্দু অনভিজ্ঞ অনেক ব্যক্তিও উর্দুর পক্ষে ছিলেন।
উর্দুকে কেউ কেউ পাকিস্তানের ভাষা মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতে উর্দু চর্চার ঐতিহ্য অধিক সমৃদ্ধ। হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি ভারতের সর্বত্র চলে। সেই সাথে আছে আঞ্চলিক অন্যান্য ভাষা। উর্দু সাহিত্যে অমুসলিম লেখকদের অবদান বিশাল। কৃষন চন্দর, মুন্সী প্রেম চাঁদ প্রমুখ কথাশিল্পিদের নাম বাংলা ভাষাভাষীদের অত্যন্ত পরিচিত। ভাষাটি সংস্কৃতের মত মৃত ভাষার তালিকায় যায়নি। এখনো ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে চর্চিত হচ্ছে। বর্তমানে পাকিস্তানে উর্দুর চর্চা ব্যাপক হলেও দিল্লী ও লক্ষ্মৌকে কেন্দ্র করে এর বিকাশ ও প্রসার ঘটেছে। ভারতের উত্তর প্রদেশের সরকারি ভাষা উর্দু। সিলেটে এ ভাষার চর্চা বিদেশী ভাষা হিসেবেই চলছে।
সিলেটে কওমী মাদরাসার সংখ্যা বেশি। এগুলোতে শিক্ষার মাধ্যম উর্দু। শিক্ষকরা ক্লাসে উর্দুতে কথা বলেন। ছাত্ররা উর্দুতেই নোট রাখেন। বাংলা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হলেও উর্দুর প্রাধান্য থাকায় দেখা যায় দশ এগার বছরের বালকও উর্দু লিখতে পড়তে ও বলতে পারে।
অদূর অতীতে এমনকি ষাটের দশকেও সিলেটের ঘরে ঘরে উর্দুর চর্চা ছিল। মোটামুটি স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারেও মহিলারা উর্দু জানতেন। মাওলানা থানভীর বেহেশতী জেওর, মাওলানা সাঈদ আহমদ খানের রাহে নাজাত প্রভৃতি গ্রন্থাদি পঠিত হতো। বাল্যকালে ঘরে এবং মসজিদে ছেলেমেয়েরা উস্তাদের কাছে আরবির বর্ণ পরিচয় ও পঠন শেখার সাথে সাথে উর্দু শিখতেন। বিয়ের সময় বর পক্ষ খোঁজ নিতেন মেয়ে উর্দু এবং মাসলা মাসায়েলের কিতাবাদি কতটুকু পড়তে পারে। কনে দেখার সময় কেউ কেউ ইমতিহানও নিতেন। এতে অনেকের উর্দু শেখার শুরু হতো মা’র কাছেই। এখনো সিলেটে প্রবীণ অনেক মহিলা আছেন যারা বাংলার চেয়ে উর্দু ভালো জানেন। এর পরই নাগরীর সাথে ছিল তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তখনকার পরিবেশে এটাই ছিল বনেদী পরিবারের রীতি ও পরিচয়। সুদীর্ঘকাল এখানে উর্দুচর্চার এবং এখানকার সামাজিক জীবনের সাথে উর্দুর মাখামাখির ফলে নিরক্ষর লোকও ভাষাটি বুঝতে পারেন। বহিরাগত আলেম উলেমা সিলেটে এসে বিভিন্ন মাহফিলে ও বৈঠকে উর্দুতে বক্তব্য রাখেন। এর অনুবাদ করতে হয়না।
বিদেশী ভাষা শেখা এবং তাতে পুস্তক রচনা করা এক কথা নয়। তাই বিদেশী ভাষায় সাহিত্য রচনা করে অথবা পুস্তক লিখে ঐ ভাষাভাষীর স্বীকৃতি লাভ খুব কঠিন। ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় সিলেটে। এখানকার প্রতিভাধর ব্যক্তিরা বিশুদ্ধ আরবি, ফারসি এবং উর্দু ভাষায় গ্রন্থ রচনা করে যশস্বী হয়েছেন। বাংলার বাইরেও তাদের কোনো কোনো গ্রন্থ পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়েছে।
উর্দু ভাষায় সংবাদপত্র সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রেও সিলেটের বিদগ্ধজন নজীর রেখেছেন। সিলেটের জালালপুরের মাওলানা আবু সখি মোহাম্মদ বশীর শিলং থেকে ‘বজমে খেয়াল’ নামে একখানা উন্নতমানের মাসিক পত্রিকা বের করেন। এটি প্রায় দু’বছর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ থেকে মাসিক মুনাদী’ সম্পাদনা করেন নবীগঞ্জ দিনারপুরের মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • Developed by: Sparkle IT