ধর্ম ও জীবন

নারীর চাহিদা পূরণে ইসলাম

আতিকুর রহমান নগরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১০-২০১৯ ইং ০১:২৩:৩৮ | সংবাদটি ১৮৩ বার পঠিত

ইসলাম সর্বজনিন ধর্মের নাম। ইসলাম তার সূচনালগ্ন থেকে সর্বক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে প্রতিটি নির্দেশ বাস্তবায়নের উপর তাগিদ করে আসছে। ব্যক্তি জীবন, দাম্পত্য জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এমনকি রাষ্ট্রিয় জীবনে রয়েছে ইসলামের সুনির্দিষ্ট আর ভারসাম্যতাপূর্ণ আহকামাদি। যা মুসলিম উম্মাহর পালনের সহজার্থে প্রেরণ করেছেন যুগে যুগে অসংখ্য নবি-রাসূল। তাঁরা তাওহিদসহ শরিয়তের প্রতিটি নির্দেশ পৌঁছে দিয়েছেন মানব জাতির কাছে। কেউ মেনে নিয়ে সফল হয়েছে আর কেউবা না মেনে নাকাম হয়েছে।
সমাজে অতি অধুনা কিছু লোক আছেন যারা মনে করে থাকেন যে, ইসলামে নারীদের যৌন চাহিদার কোন মূল্য নেই, বরং এ ব্যাপারে পুরুষকে একতরফা অধিকার দেয়া হয়েছে, পুরুষ যখন ইচ্ছা তখন যৌন চাহিদা পূরণ করবে আর স্ত্রী সে চাহিদা পূরণার্থে সদা প্রস্তুত থাকবে। এটি নিতান্তই ভুল ধারণা। আসুন, ইসলামে নারীদের যৌন চাহিদার কোন স্বীকৃতি আছে কিনা জেনে নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সূরা বাকারার ২২৩ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছে তাদেরকে ব্যবহার কর।’ বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত মহানবি সা. বলেন, ‘কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর বিছানা পরিহার করে রাত কাটায় তবে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকেন। (মুসলিম শরিফ)
উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস দ্বারা অনেকে এটা প্রমাণ করতে চান যে, ইসলাম কেবল পুরুষের যৌন অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছে। আসলেই কি তাই? মদিনার ইহুদি গোষ্ঠির মধ্যে একটা কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকিদা ছিল যে, কেউ যদি তার স্ত্রীর সাথে পেছন দিক থেকে যোনিপথে সঙ্গম করে তবে বিশ্বাস করা হতো যে এর ফলে ট্যারা চোখ বিশিষ্ট সন্তানের জন্ম হবে। মক্কার মুহাজিররা হিজরত করে মদিনায় আসার পর, জনৈক মুহাজির যখন তার আনসার স্ত্রীর সাথে পেছন দিক থেকে সঙ্গম করতে গেলেন, তখন আনসার স্ত্রী এই পদ্ধতিকে ভুল মনে করে জানিয়ে দিলেন নবি সা. এর অনুমতি ব্যতিত এই কাজ তিনি কিছুতেই করবেন না।
তাদের এ ভ্রান্ত আকিদার অবসান ঘটাতে এবং সহিহ আকিদা বাতলে দিতে এ প্রসঙ্গেই কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, যেখানে বুঝানো হয়েছে, ‘সামনে বা পেছনে যেদিক দিয়ে যোনিপথে গমন করা হোক না কেন, তাতে কোন সমস্যা নেই। শস্যক্ষেত্রে যেদিক দিয়ে বা যেভাবেই গমন করা হোক না কেন তাতে শস্য উৎপাদনে যেমন কোন সমস্যা হয় না, তেমনি স্বামী তার স্ত্রীর যোনিপথে যেদিক দিয়েই গমন করুক না কেন তাতে সন্তান উৎপাদনে কোনো সমস্যা হয় না এবং এর সাথে ট্যারা চোখবিশিষ্ট সন্তান হবার কোনো সম্পর্ক নেই। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৩)
কাজেই স্ত্রীর সুবিধা অসুবিধার প্রতি লক্ষ না রেখে যখন তখন অবাধ যৌনাচারের অনুমোদন কিন্তু দেয়া হয়নি বরং স্ত্রীর মর্জি আর খেয়াল খুশির দিকেও স্বামীকে নযর দিতে হবে।
ফেরেশতাদের অভিশাপ সংক্রান্ত হাদিসের বিশ্লেষণ :
উপরোল্লেখিত হাদিসে নারী কর্তৃক স্বামীর ডাকে সাড়া না দেয়ার কারণে স্ত্রীর সমালোচনা করা হলেও পুরুষকে কিন্তু জোর-জবরদস্তি করে নিজ অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। আবার স্ত্রী যদি অসুস্থতা বা অন্য কোন সঙ্গত ওযরের কারণে সঙ্গম হতে বিরত থাকতে চান, তবে তিনি কিছুতেই এই সমালোচনার যোগ্য হবেন না, কেননা ইসলামের একটি সর্বস্বীকৃত নীতি হচ্ছে, ‘আল্লাহপাক কারো ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপান না। (বাকার/২৮৬)
আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পন করি না। [২৩:৬২]
হাদিসের আলোকে স্ত্রীর সাথে সদাচরণের গুরুত্ব :
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ঈমানওয়ালাদের মধ্যে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি, যার আচার-আচরণ উত্তম। আর তোমাদের মাঝে তারাই উত্তম যারা আচার-আচরণে তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম। (তিরমিযি, হাদিস নং ১০৭৯)
হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবি করিম সা. বলেন, মুমিন মুমিনা (স্ত্রী)’র প্রতি বিদ্বেষ রাখবে না। যদি তার একটি অভ্যাস অপছন্দনীয় হয় তবে আরেকটি অভ্যাস তো পছন্দনীয় হবে। (মুসলিম হাদিস নং- ১৪৬৯, ২৬৭২)
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. বর্ণনা করেন, প্রিয়নবি সা. বলেছেন, ঈমানওয়ালাদের মধ্যে পরিপূর্ণ মুমিন সেই ব্যক্তি যার আচার-আচরণ উত্তম এবং নিজ পরিবারের জন্য অনুগ্রহশীল। (তিরমিযি, হাদিস নং- ২৫৫৫)
উপরোক্ত হাদিস দ্বারা বুঝা যায় :
(১) মুমিন পুরুষ তার মুমিনা স্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষ রাখতে পারবে না। (২) সদাচারী এবং স্ত্রী-পরিবারের প্রতি কোমল, নম্র, অনুগ্রহশীল হওয়া ঈমানের পূর্ণতার শর্ত। (৩) কোন পুরুষ যদি উত্তম হতে চায় তাকে অবশ্যই তার স্ত্রীর কাছে উত্তম হতে হবে। একজন মুসলমানের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় হচ্ছে তার ঈমান। যে ঈমানের জন্য সে নিজের প্রাণ বিসর্জন করতেও কুন্ঠিত হয় না। সে ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য স্ত্রীর সাথে সদাচারী, নমনীয় এবং অনুগ্রহশীল হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কোন মুসলিম উত্তম বলে বিবেচিত হতে পারবে না যদি না স্ত্রীর সাথে তার আচার-আচরণ উত্তম হয়।
স্ত্রীর যৌন অধিকারের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনে সতর্কবাণি :
আবু মুসা আশয়ারী রা. থেকে বর্ণিত, হযরত ওসমান ইবনে মাযউন রা. এর স্ত্রী মলিন শরীরে এবং জীর্ণশীর্ণ কাপড়ে নবী করিম সা. এর বিবিদের কাছে এলেন। তাঁরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার এ অবস্থা কেন? কুরাইশদের মাঝে তোমার স্বামী থেকে ধনী কেউ নেই। তিনি বললেন, এতে আমাদের কি হবে? কেননা আমার স্বামীর রাত নামাযে কাটে ও দিন রোযায় কাটে। তারপর নবী করিম সা. নিজ ঘরে প্রবেশ করলে নবিজীর স্ত্রীগণ বিষয়টি তাঁকে অবগত করলেন। অতঃপর হযরত ওসমান ইবনে মাযউন রা. এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি তাকে বললেন, ‘আমার মধ্যে কি তোমার জন্য কোনো আদর্শ নেই?’ হযরত ওসমান রা. বললেন, কী বলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ? আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত! তখন তিনি বললেন, ‘তবে কি তোমার রাত নামাযে আর দিন রোযায় কাটে না? অথচ তোমার উপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে, আর তোমার উপর তোমার শরীরেও হক রয়েছে, তুমি নামাযও পড়বে, আবার ঘুমাবেও, আর রোযাও রাখবে আবার ভাঙ্গবেও’। হাদিসের বর্ণনাকারি বলেন, অন্য আরেকদিন তাঁর স্ত্রী পরিচ্ছন্ন দেহে ও সুভাষিত নতুন পোষাকে এলেন যেন নববধূ। (মাজমায়ে জাওয়ায়েদ, হাদিস নং ৭৬১২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং-৩১৬)
ইসলাম সঙ্গমের পূর্বে স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গতা সৃষ্টির প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করে। স্ত্রীর যৌনাঙ্গকে সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত না করেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া যা স্ত্রীর জন্য খুবই কষ্টদায়ক। ইসলামে ‘পশুর ন্যায় সঙ্গম করা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং সঙ্গমের আগে আবেগপূর্ণ চুম্বন করাকে সুন্নাতে ম্ওুয়াক্কাদাহ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে।
ইমাম দাইলামি রাহ. আনাস বিন মালিক রাহ. এর বরাতে একটি হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন যা নবিয়ে করিম সা. হতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘কেউ যেন পশুর মতো তার স্ত্রী থেকে নিজের যৌন চাহিদা পূরণ না করে, বরং তাদের মধ্যে চুম্বন এবং কথাবার্তার দ্বারা শৃঙ্গার হওয়া উচিত।’ (দাইলামি’র মুসনাদ আল-ফিরদাউস, ২/৫৫)
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রতিয়মান হয় যে, ইসলাম একতরফা পুরুষকে কোনো অধিকার দেয়নি, বরং নারীকেও তার যথাযথ অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে।
পরিশেষে আমি মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন বিশ্বের সকল মুসলিম উম্মাহকে দাম্পত্য জীবনে মহানবি সা. এর মহান সুন্নাত আঁকড়ে ধরে শান্তি-সুখের নীড় গড়ে তোলার তৌফিক দান করেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT