ধর্ম ও জীবন

প্রাণীকুলের অধিকার ও নিরাপত্তা

মাওলানা আব্দুল গফুর শরিষপুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১০-২০১৯ ইং ০১:২৬:১৫ | সংবাদটি ১৬৭ বার পঠিত

এ নশ্বর জগতে অনুভূতি সম্পন্ন প্রাণীকুল চার শ্রেণীতে বিভক্ত।
এক : জীবজন্তু। পর্যবেক্ষণের পর দেখা গেছে যে,সমগ্র বিশ্বজুড়ে এমন এক শ্রেণীর জীবজন্তু রয়েছে যারা বিরাট বিশাল আকৃতির। পক্ষান্তরে আরো এক শ্রেণীর জীবজন্তু রয়েছে যারা খর্বাকৃতির। যেমন : উট, গরু, ঘোড়া, সিংহ, বাঘ, হাতি, ভেড়া, ছাগল, হরিণ, বিড়াল, কুকুর, শিয়াল, তোতা, ময়না, চড়ুই, কবুতর, চিল, কাক, মোরগ ইত্যাদি। এছাড়া ক্ষুদ্র আকৃতির আরো এক শ্রেণীর জীবজন্ত রয়েছে। যারা ভূ-স্থলে ও তাহার ভেতর ও বাইরে বাস করে। যেমন : পিঁপড়া, সাপ-বিচ্ছু, কীট-পতঙ্গ, কীড়া, মাকড় ইত্যাদি।
দুই : জ্বীন জাতি। জ্বীন সম্প্রদায় অপ্রত্যক্ষ জীব হওয়ায়, আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না। তবে তাদের নিজস্ব কিছু আলামত থাকায় আমরা তা দিয়ে আন্দাজ করি। তারা বংশ পরিক্রমায় ভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভাজিত।
তিন : ফেরেশতাগণ আল্লাহ তায়ালার অত্যন্ত অনুগামী বান্দা। তারা অতি সুক্ষ্ম দেহের অধিকারী বিধায় তারা আমাদের চক্ষুর অগোচরে থাকেন। তবে বিভিন্ন নির্দশন দ্বারা আমরা তাদের অনুমান করি। তারা নারী পুরুষ এবং বংশ পরম্পরা থেকে উর্ধ্বে।
চার : মানবজাতি। মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে কুল মাখলুকাতের সেরা জাতি হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। সে হিসাবে মানব জাতি সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বসতি স্থাপন করে নিজ নিজ কাজ কর্মে ব্যস্ত আছে।
ঐ চার শ্রেণীর প্রাণীকুল পৃথিবী নামের অট্টালিকার সদস্য ও বাসিন্দা এবং তাতে সকলের ন্যায্য অধিকার ও বৈধ উত্তরাধিকারত্বের হিস্যাও পওনা রয়েছে। এ অধিকার ও উত্তরাধিকারত্বের বৈধতার ঘোষণা খোদ আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। খাদ্য, বাসস্থান এবং সব ধরনের স্বাধীনতার বেলায় সকলের শ্রেণীমতো অধিকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যে-ই তাতে বাধা সৃষ্টি করবে, সে-ই অপরাধী ও শাস্তির উপযুক্ত হবে। শুধু মানব মন্ডলীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত জোর তাগিদ দেয় নি, বরং গৃহপালিত ও বন্য জীবজন্তুর অধিকার রক্ষার বেলায় পবিত্র ইসলাম পক্ষ পাতিত্ব করছে। এ বিষয়ে শরিয়তের ধারক বাহক মহানবী (সা.) কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা নি¤œরূপ :
মহানবী (সা.) এর দরবারে এক উট হাজির হয়ে তার মালিকের বিরুদ্ধে নালিশ করার কথা পবিত্র হাদিসে বিদ্যমান আছে। তখন তার চক্কুদ্বয় থেকে কান্নার অশ্রু ঝরছিল। মহানবী (সা.) তার মালিককে তলব করে এনে শাসালেন এবং বললেন, ‘তোমার উট তোমার বিরুদ্ধে শেকায়ত করেছে। সে বলছে, তুমি তাকে খাবার দেও না এবং কাজ বেশি লও।’ মালিক বলল হুজুর, ‘তার অভিযোগ সত্য। আমি অপরাধী। আমি তওবা করছি, আর জীবনে এমনটা করব না’। একজন সাহাবী চড়ুই পাখির কয়েকটি বাচ্চা তার মার কোল থেকে কেড়ে এনেছিলেন। তখন চড়ুই পাখি তার মাথার উপর পেরেশান হয়ে উড়াউড়ি করছিল। মহানবী (সা.) সাহাবাকে বাচ্চাগুলি অতি দ্রুত ছেড়ে দিতে আদেশ করলেন এবং বললেন, ‘তুমি কেন তাদের স্বাধীনতায় বাধা দিচ্ছ? এবং তাদের মাকে কষ্ট দিচ্ছ ?’
গর্ত, ছিদ্র ও কীট পতঙ্গের বাসায় পেশাব করতে বৃক্ষাদির ডাল, পাতা, নষ্ট করতে মহানবী (সা.) নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন। কারণ গর্তে পেশাব করলে সাপ বিচ্ছু কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতির আশংকা আছে এবং জীবজন্তু মারা যাওয়ার বা কষ্ট পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
মহানবী (সা.) একদিন মদীনার বাইরে তাশরীফ নিয়েছিলেন। তখন একজন গ্রাম্য ব্যক্তির বাড়িতে একটি হরিণ বাঁধা দেখলেন। হরিণটি তাঁকে দেখে চিৎকার করে বলতে শুরু করল, হে আল্লাহর রসূল! এ গ্রাম্য লোক আমাকে বন্দি করেছে, আর সামনে জঙ্গলায় আমার বাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রনায় ছটফট করছে। আপনি আমাকে মুক্ত করে দেন। আমি বাচ্চাদেরকে দুধ পান করিয়ে আবার ফিরে আসব। মহানবী (সাল্লাল্লাহু.) বললেন, ‘সত্যি! তুমি কী আবার ফিরে আসবে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। মহানবী (সা.) তাকে মুক্ত করে দিলেন। সে দুধ পান করে ওয়াদা মতো ফিরে আসল। মহানবী (সা.) তাকে পুনরায় বন্দী করলেন। অতঃপর তিনি গ্রাম্য ব্যক্তিকে ঘটনা শুনালেন এবং বললেন, তুমি হরিণটিকে মুক্ত করে দাও। সে হরিণটিকে মুক্ত করে দিল তখন হরিণ আনন্দের সহিত বিদায় নেয় এবং দোয়া করতে থাকে।
আলোচ্য হাদিস দ্বারা একথা প্রতীয়মান হয় যে, জীবজন্তুর অধিকার রক্ষা করা ইসলামের বিধান সমূহের মধ্যে অন্যতম এক বিধান। ফিকাহ শাস্ত্রবীদগণ বলেন, গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ার সমূহ এবং ব্যবহার্যের প্রাণী সমূহের জন্য শহর, নগর ও গ্রামের নিকটে কিছু খাস জায়গা উন্মোক্ত রাখা দরকার। যেখানে প্রাণীরা স্বধীনভাবে চরতে থাকবে এবং ঘাস, খড় ও পানি পান করতে থাকবে।
নিষ্টাবান ও সৎলোক সব সময় প্রাণী সমূহের অধিকার রক্ষায় যতœবান ছিলেন। কারণ কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেয়া বা অহেতুক বন্দি বা প্রাণী হওয়ার কারণে অবহেলা করে মারধর করা বা পা ও কোমর ভেঙ্গে ফেলা সম্পূর্ণ নাযায়েজ ও হারাম। একজন নিষ্টাবান ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে কারণ, সে একটি বিড়ালকে বন্দী করে পিপাষার্ত অবস্থায় মেরেছিল এবং একজন বেশ্যা নারীকে শুধু এজন্যে জান্নাত দান করা হয়েছে যে, সে পিপাষার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিল। এর দ্বারা একথা বোঝা যায় যে উট, গাভী, ভেড়া, ছাগল, বিড়াল, কুকুর প্রভৃতি প্রাণীকে কষ্ট দেয়া মহা অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির কারণ। সুতরাং রাস্তায় রাস্তায় কুকুর বিড়ালকে তুচ্চ প্রাণী মনে করে গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যা করা, হোটেল, রেস্তোরাঁ বা রান্নাঘরে গরম পানি ঢেলে পুড়িয়ে মারা বা লাঠিসোটা দিয়ে পা ও কোমর ভেঙ্গে ফেলা তা সম্পূর্ণ অমানবিক ও পৈশাচিক কর্মকান্ড। যারা এমনটা করেন, তারা একটু ভেবে চিন্তে দেখা উচিত। সঙ্গত কারণেই ইসলামী শরিয়ত জবাইকৃত জীবজন্তুর সামনে অন্য জীবন্ত জীবকে জবাই করতে নিষেধ করা হয়েছে।এক কথায় মানবজাতি, জ্বীনজাতি ও জন্ত-জানোয়ারদেরকে এ নশ্বর জগতের একটি সদস্য হিসাবে স্বাধীনভাবে বসবাস করা ও আহার করার আধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বিষাক্ত কষ্টদায়ক ও আতœঘাতি প্রাণীকে বন্দি করা অথবা মেরে ফেলার অবশ্যই অধিকার দেয়া হয়েছে। এ বিধান শুধু কষ্টদায়ক জীবজন্তর বেলায় নয়, বরং মানুষের মধ্যেও যারা দুষ্ট-দুষ্কৃতিকারী তাদের বেলায়ও এ দন্ড প্রযোজ্য। নিরপরাধ মানুষ হত্যাকারীকে পাল্টা হত্যা, যিনা, ব্যভিচারীকে পস্তরাঘাত করে হত্যা, চোর ডাকাতকে হাত পা কাটা এবং অন্যান্য অপরাধীকে জেল হাজত ও কয়েদ বন্দি করার বিধান ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত আছে। দুষ্ট-দুষ্কৃতিকারীকে কাবা গৃহের আশেপাশে পাওয়া গেলে তাদের গ্রেফতার করতে বলা হয়েছে। ঠিক তদ্রুপ বিষাক্ত সাপ, বাঘ, সিংহ মক্কা নগরীর অভ্যন্তরে পাওয়া গেলে তাকে হত্যা করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, প্রাণী সমূহের মধ্যে আরো একটি প্রাণী জ্বীনজাতি। এরাও পৃথিবীর বাসিন্দা। পৃথিবীতে এদেরও অধিকার রয়েছে। খাদ্য বাসস্থান ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেভাবে মরুভূমি ও বন জঙ্গলায় তাদের বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়েছে ঠিক তদ্রুপ মানুষের ঘরবাড়িতে তারা বসবাস করে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। কিন্ত আমরা তা আনুমান ও আন্দাজ করতে পারি না। অধিক সময় তারা আমাদের সাহায্য করে। কিন্তু দুষ্ট ও অধার্মিক জ্বীন মানুষকে কষ্ট দেয়। যেভাবে দুষ্ট ও অধার্মিক মানুষ মানুষকে কষ্ট দেয়। মানুষ শত্রুর সাথে আইনি লড়াই বা যুদ্ধ করার নিয়মানুসারে জ্বীন শত্রুর সাথেও লড়াই বা যুদ্ধ করার বৈধতা আছে।কিন্ত অহেতুক কোনো মানুষ কোনো জ্বীনকে কষ্ট দেওয়া বৈধ নয়। জ্বীন জাতিকে কষ্ট দেওয়ার মানে হচ্ছে তাদের খাদ্য নষ্ট করা। সেজন্যে হাড় অথবা কেঁচো মাটি দিয়ে ঢেলা ব্যবহার করতে হাদিসে নিষেধ এসেছে।
ফেরশতাদের কষ্ট দেওয়ার মানে হচ্ছে তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে বিতাড়িত করা। উপমাস্বরূপ মনে করেন, ফেরেশতারা দুর্গন্ধকে নফরত করেন এবং খোশবোকে ভালোবাসেন। সেজন্য ঐসব স্থান যেখানে ফেরেশতারা সমবেত হন সেস্থানকে দুর্গন্ধযুক্ত করা যায়েজ নয়। যেমন : মসজিদসমূহ ফেরেশতাদের বৈঠক খানা। সেখানে খুশবো রাখা উত্তম এবং দুর্গন্ধ থেকে পরিষ্কার রাখা জরুরি। মসজিদ সমূহে খুশবো জাতীয় দ্রব্যাদি জ্বলানো অপরিহার্য এতে ফেরেশতাদের আরাম লাগে পিঁয়াজ সেবন অথবা সিগারেট পানের পর মুখ পরিষ্কার না করে মসজিদে যাতায়াত করা মাকরূহ। এতে ফেরেশতাদের কষ্ট হয়। হাদিসে উল্লেখ আছে , মসজিদে অবস্থানরত মুসল্লিদের জন্য ফেরেশতারা ক্ষমা পার্থনা করেন সেপর্যন্ত মুসল্লিরা গুহ্য দারদিয়ে বাতাস না ছাঁড়ে অথবা ওযু ভঙ্গ না করে। বাতাস ছাড়া বা ওযু ভঙ্গের সাথে সাথে তারা ক্ষমা পার্থনা বন্ধ করে দেন। এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দুঃখিত হয়ে তারা দূরে চলে যান। অপর এক হাদিসে উল্লেখিত আছেÑ মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে তখন তার মুখ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধ পয়দা হয় যার কারণে ফেরেশতাগণ সেখান থেকে অনেক দূরে চলে যান। এতে প্রমাণ হল যে, আমাদের দুর্ব্যহারের করণে ফেরেশতারা নিজ কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করেতে বাধ্য হন। বস্তুত; ফেরেশতাদের অধিকার মানুষ ও জ্বীন জাতির অধিকারের মত। তা নষ্ট করা আমাদের জন্য কোন অবস্থায় ঠিক নয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT