পাঁচ মিশালী

স্মৃতির আকাশে উজ্জ্বল তারা

রাজিয়া নীলুফার আজাদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১০-২০১৯ ইং ০০:১৫:৫১ | সংবাদটি ১৩৫ বার পঠিত

নিখিলের এত শোভা এত রূপ এত হাসি গান/ ছাড়িয়া মরিতে মোর কভু নাহি চাহে মন প্রাণ।
কবি গোলাম মস্তফার লিখা কবিতার লাইন দুটি আমার মত অসংখ্য পাঠকের হৃদয়কে হয়তো নাড়া দেয় বারবার। কেননা এত গভীর ভালোবাসার বাঁধন ছিন্ন করে মানুষকে চিরতরে চলে যেতে হয় মাটির নীচের এক অদেখা জগতে। সেখানে কারো মন যেতে চায় না, তবুও তাকে যেতে হয়। স্বজনদেরও অশ্রুসিক্ত নয়নে হৃদয়ে হাহাকার রেখে দ্রুত শোয়ানোর ব্যবস্থা করতে হয় মাত্র সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে। পেছনে রেখে যাওয়া স্মৃতি দুঃসহ বেদনার ঝড় হয়ে প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে লন্ডভন্ড করে দেয় প্রিয়জনের হৃদয়ের অলিগলি রাজপথ। মৃত্যু স্বাভাবিক। জন্ম মৃত্যু এই নিয়েই জীবনের পথ চলা। তবুও মৃত্যু আতঙ্কের। মৃত্যু বড় করুণ। স্বজনের চির বিদায়ের সময়টা বড় এলোমেলো ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ হয়ে ধরা দেয়। স্মৃতিগুলো বুকের পাঁজর ভাঙ্গা কষ্টের বোঝা হয়। এমনি আজ দুঃসহ স্মৃতি হয়ে গেলেন মাওলানা ফজলুল করীম আজাদ।
এশিয়ার সর্ববৃহত্তর গ্রাম হচ্ছে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং। এই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা আলহাজ্ব মাওলানা শেখ মোঃ ইসমাঈল। স্থানীয় সরকারি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সমাজ সচেতন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী। একজন আদর্শ শিক্ষক এবং জনপ্রিয় ইমাম হিসাবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল বিশাল এই গ্রামজুড়ে। সবাই তাঁদের শ্রদ্ধা করতো। অসহায় মানবতার পাশে তিনি সবসময় থাকতেন। তিনি একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যেমন মানুষকে সংগঠিত করতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। যে কারণে পাকবাহিনীর বন্দীশালায় থেকে তাঁকে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। শৈশবে মাতৃহারা হয়ে আদর্শ পিতার ¯েœহ সংস্পর্শে তিনি বড় হয়ে থাকেন পিতার জীবনকে অনুসরণ করে। কর্মজীবনে তিনিও শিক্ষকতার পেশাকে বেছে নেন। একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কীভাবে আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তোলা যায় সেই চেষ্টায় তিনি ব্যস্ত থাকতেন। কাছের মানুষ হিসেবে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি তাঁর চিন্তা ও চেতনাকে। তিনি খেয়াল রাখতেন কোন ছাত্রের দুর্বলতা কোথায়। তিনি অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করতে ছুটে যেতেন ছাত্রদের বাসায়। শিক্ষার্থীর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে অভিভাবকদের পাশে থেকে তিনিও সহযোগিতা করতেন। বাসার আশ পাশে যে সব শিক্ষার্থী বসবাস করতো তাদেরকে অবসর সময়ে ঘরে ডেকে এনে পড়ার খোঁজ খবর নিতেন। বড় হবার, প্রতিষ্ঠিত মানুষ হবার স্বপ্ন দেখাতেন। এভাবেই তিনি ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের নিকট প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেন। নি¤œবিত্তদের মাঝে যাদের সন্তান পড়াশুনায় ভালো কিন্তু অর্থাভাবে পরীক্ষার ফিস দিতে পারছে না বা ব্যয় বহন করতে পারছে না তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতেন।
ঠিক তেমনি গরীব জটিল রোগিদের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে তাদেরকে অনেক চেষ্টা তদবির করে হলেও অনুদানের ব্যবস্থা করে দিতেন। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে দরিদ্র মানুষ উপকৃত হত।
মানুষ নানা রকম সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে আসত তিনিও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে রাখতেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখে গেছেন। মানুষের কল্যাণ করাই যার ধর্ম তাঁকে কোন বাঁধা থামাতে পারে না। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি করে যেতেন তাঁর কাজ। কিডনী ও উচ্চ রক্তচাপ সমস্যায় আক্রান্ত হবার পর চলাফেরা তাঁর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কিন্তু তাঁকে কাজ থেকে দমানো যেত না। নামের সাথে তাঁর জীবনের মিল ছিল। তিনি ছিলেন স্বাধীন চেতা। তাঁর উপর মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও তাঁর মৃত্যুর মুহূর্তে বুঝতে পেরেছি তাঁর সব কাজ সঠিক ছিল।
মানুষ তথা সমাজের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মানুষের পুরস্কার মহান আল্লাহ মৃত্যুর মুহূর্তেই দিয়ে দেন। তার জীবন থেকে শিক্ষা পেয়েছি হিংসা স্বার্থপরতা নয়, লোভ লালসার উর্ধ্বে থেকে মানুষের কল্যাণে সামর্থ্য মত কাজ করতে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দানকারী এই সুন্দর মনের মানুষটি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। উর্দু, ফার্সি ও আরবী ভাষায় ছিল তাঁর দক্ষতা। এসব ভাষায় বিভিন্ন কবিদের লিখা কবিতা তিনি আমাদের আবৃত্তি করে শুনাতেন সাথে বাংলা অর্থও বুঝাতেন। বই পড়া ও সংগ্রহ করা ছিল তাঁর নেশা। তিনি ছিলেন বই পত্রিকার পোকা। দর্পণ প্রকাশনি নামক তাঁর নিজস্ব একটি পকাশনী সংস্থা ছিল। এবং মহানগর দর্পণ নামে একটি অনিয়মিত গবেষণামূলক সমৃদ্ধ ম্যাগাজিনের সম্পাদক তিনি ছিলেন। তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের কার্যকরি পরিষদের সদস্য। তিনি ছিলেন ভ্রমণ পিপাসু। সময় সুযোগ পেলে স্বপরিবারে বেড়াতে যেতেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত বিভিন্ন জায়গায়। মনে পড়ে প্রথম যখন বানিয়াচং গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম তিনি সুপারি বাগানে দাঁড়িয়ে গ্রামের সবুজ সুবিশাল প্রান্তরে রূপালী আঁচল বিছানো অপরূপ জোসনা আমাকে দেখিয়েছিলেন। আরো দেখিয়েছিলেন শেষ বিকেলের গায়ের বুক চিড়ে বয়ে চলা গড়া খালের ওপারে উদাসী হাওয়ায় দুলে উঠা ধানের মাঠের শেষপ্রান্তে লাল আভা ছড়ানো সূর্যাস্তের দৃশ্য। শহরের ইটের খাঁচায় বন্দী থেকে মুক্ত প্রান্তরের প্রকৃতি যে এত সুন্দর আর মোহনীয়তার আবেগ মিশানো আগে তা অনুভব করতে পারিনি কখনও। জোসনা রাতে শাপলা ফোটা অথৈ জলে নৌকা ভ্রমণের স্মৃতি আজও আমায় আনমনা করে।
কক্সবাজারের সৈকতে লাল কাঁকড়া ধরতে গিয়ে চঞ্চল বালকের মত তিনি আনন্দে উল্লাসিত হয়েছিলেন। রাতের জোয়ারের জলে ভেসে আসা ঝিনুক রাশি ভোরের নরম আলোয় কত বেশি কুড়াতে পারি এমন প্রতিযোগিতামূলক মনভাব নিয়ে দু’জনে কুঁড়িয়ে ছিলাম সেই আনন্দময় দিনগুলো আজ শুধু দুঃসহ বেদনার স্মৃতি। আমি লিখতাম বলেই তিনি আমাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতেন। প্রকৃতি থেকে উপাদান এনে লিখার জমিনকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে তিনি আমাকে উৎসাহিত করতেন। অনন্ত নীলিমায় শেষ বিকেরের সূর্যাস্তের মত তিনিও হারিয়ে গেলেন। আর আমার চারপাশ ঘিরে নেমে এল ঘন অন্ধকার। ধু-ধু মরুর বুকে ঘন আঁধারে আমি এক একাকী যাত্রী। ভাবতাম তিনি তো কবি কিংবা সাহিত্যিক নন। রাজনীতির রুক্ষ অঙ্গনের লোকের মনও কী প্রকৃতির গভীরে গিয়ে এমন সৌন্দর্য খুঁজতে পারে। পরে বুঝলাম সত্যিকার অর্থেই তিনি সুন্দরের পূজারী। সুন্দর সুনসান সাজানো গৃহকোণ। পরিচ্ছন্ন পোষাকে নিজকে পরিপাটি রাখা, মানুষের সাথে হাসি মুখে সুন্দর করে কথা বলা ছিল তাঁর অভ্যাস।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল। ভুল ত্রুটি সহজেই তিনি ক্ষমা করে দিতেন। ভালো খাবার খেতে এবং অন্যকে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। রাস্তার ভিক্ষুকদের ডেকে এনে তিনি তাদেরকে নিয়ে একসাথে খাবার টেবিলে বসে খেতেন।
সংসারের কাজেও তিনি আমাকে হাসি মুখে সাহায্য করতেন। সন্তানদের কাছে শুধু পরম শ্রদ্ধেয় পিতা নয় একজন ভালো বন্ধুও ছিলেন তিনি। অবসর সময়গুলো ওদের সাথে গল্প কথায় মাতিয়ে রাখতেন তিনি। তবে অন্যায়ের কাছে ছিলেন তিনি কঠোর।
আনন্দ হতাশায় সংমিশ্রণে মানুষের জীবন। জীবন কখনও প্রাপ্তির আনন্দে ঝলোমলো করে আবার কখনও হতাশার কালো মেঘে ছেয়ে যায়। কিন্তু তাঁকে হতাশায় ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি কখনও। তিনি আল্লাহর উপরে সব সময় ভরসা রেখে সাহসী থাকতেন। আমাদেরকেও শিক্ষা দিতেন, ¯্রষ্টার উপর ভরসা রেখে সাহসী হতে। রোগাক্রান্ত হবার পর যখন সব চিকিৎসা ব্যর্থ হচ্ছিল তখনও তাঁকে হতাশায় বিমর্ষ দেখিনি। মহান ¯্রষ্টার ডাকে চলে যেতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তবে আল্লাহ যেন তাঁর প্রতি ক্ষমাশীল থাকেন আর নূতন যে জগৎ তাঁকে হাতছানি দিচ্ছিল সেই জগৎ যেন শান্তিময় হয় সর্বশক্তিমানের কাছে সেই প্রার্থনায় তিনি মগ্ন থাকতেন।
সুন্দরের আয়োজনে জীবন অতিবাহিত করে তিনি সংসারের মায়াজাল ছিন্ন করে ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবী ছেড়ে ২২ আগস্ট ২০১৯ সালে চির বিদায় নেন পৃথিবী হতে।
ঘর জুড়ে আজ অসীম শূন্যতা বিরাজ করছে। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় তিনি আসবেন, দরজার কড়া নাড়বেন, চিরচেনা প্রিয় কন্ঠে নাম ধরে ডাকবেন। প্রিয় নাতি, নাতনীরা তাঁকে নিয়ে আবার হাসি কথায় ভরিয়ে তুলবে চাঁদের হাট।
কিন্তু পরকালীন জীবনে যে চলে যায় সে তো আর ফিরে আসে না। স্মৃতি শুধু বিড়ম্বনা করে। পরম শান্তির আবেশে ভরা থাকুক তাঁর পরকালীন জীবন। রোগ যন্ত্রণা থেকে তিনি মুক্ত এখন। শান্তিময় হোক তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT