সাহিত্য

নিয়তি

কবির কাঞ্চন প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১০-২০১৯ ইং ০০:৫৭:১২ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত

খাটের ওপর উল্টোভাবে শুয়ে হাত দু’টো দু’দিকে সটান রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে মালেক। তার চোখ থেকে অঝরে পানি ধরছে। সময় যতোই গড়াচ্ছে ততোই তার কান্নার আওয়াজ বড় হচ্ছে। একসময় ফ্লোরে বসে পড়তে থাকা মিলনের কানেও সেই শব্দ পৌঁছে যায়। মিলন হাত থেকে বইখানা রেখে খাটে ওঠে আসে। মালেকের মাথার কাছে মুখটা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-কি হয়েছে, মালেক? এমন করছিস কেন?
কান্নাজড়িত কন্ঠে মালেক বলল,
- মিলন, তুই তো জানিস, আমার বাবা প্রতি মাসের দশ তারিখের মধ্যে আমার খরচের জন্য দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু আজ মাত্র সাত হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। এখন তুইই বল, আমি এই সাত হাজার টাকা দিয়ে পুরো একমাস কিভাবে চলবো?
- ওহ্! এই কথা। এ নিয়ে একদম মন খারাপ করিসনা। তোর বাবা তো প্রতি মাসেই পাঠান। এ মাসে একটু কম পাঠিয়েছেন। হয়তো সমস্যার মধ্যে আছেন। বাবা-মা খুব সমস্যায় না পড়লে সন্তানের চাহিদা পূরণ না করে ঘুমাতে পারেন না। এমনও হতে পারে তোর কাছে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে না পেরে তাঁরাও টেনশনে আছেন। এ নিয়ে শুধু শুধু টেনশন করবি না। যা পাঠিয়েছেন তা দিয়ে আপাতত চলার চেষ্টা কর। দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।
মালেক চোখ দুটো মুছতে মুছতে বলল,
- মিলন, তুইও একথা বলছিস!
- হ্যাঁ, তুই কিছু মনে না করলে আমি আরো কিছু কথা বলতে চাই।
- বল, আমি কিছু মনে করবো না।
- দেখ, তোর বাবা তোর মাসিক খরচের জন্য সাত হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। হয়তো তাঁদের মনেও অনেক স্বপ্ন আছে। আমার বাবা-মা'র মতো। কিন্তু তাঁদের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তুই কি ঠিকমতো পড়াশুনা করছিস?
মালেক ঘাঁড় নাড়তে নাড়তে বলল,
- না, দোস্ত।
- আমি যতোটুকু জানি তুই তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত কোনমতে পাস করেছিস। আর মাত্র কয়েকদিন পর আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে। এখনও ঠিকমতো পড়াশুনায় মন দিচ্ছিস না। আল্লাহ না করুক রেজাল্ট খারাপ হলে তখন বাড়িতে কী জবাব দিবি? নিজের জীবনটাও তখন বরবাদ হয়ে যাবে। আমি বলি কি এখন থেকে বন্ধুদের সাথে আড্ডা কমিয়ে পড়াশুনায় মন দে।
- তুই ঠিকই বলেছিস, বন্ধু। আমাকে আরো বেশি করে পড়ায় মন দিতে হবে। যদিও আমার পরীক্ষার টেনশনটা একটু কম। তুই তো আছিস!
- তারপরও। এবার যদি একসাথে সীট না পড়ে।
- তিন বছর যখন পড়েছে এবারও পড়বে। ইনশাল্লাহ।
মালেক নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,
- দোস্ত, এবার বল, তোর কি খবর?
- কোন বিষয়ে?
- বাড়ির খবর।
- ওহ্! এই তো কিছুক্ষণ আগে বাড়ি থেকে মা ফোন করেছেন। এ মাসে দুই হাজার টাকা বেশি করে পাঠাতে বলেছেন।
- কি বলিস!
- হ্যাঁ, আগামী মাসে আমার ছোটবোনের শ্বশুর বাড়িতে কিছু জিনিস পাঠাতে হবে।
- কিভাবে ম্যানেজ করবি?
- কোন সমস্যা নেই। আমি টিউশনি করে তো প্রায় দশ হাজার টাকার মতো পাই। তারমধ্যে ছয় হাজার টাকা প্রতিমাসে বাড়ির জন্য পাঠাই। বাকি টাকায় আমার মেস ভাড়া, খাওয়া খরচ ও টুকিটাকি খরচ হয়। তাছাড়া টিউশন বাসায় প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে যাবো। তাহলে কিছু টাকা বেঁচে যাবে।
- তোর টিউশন বাসাগুলো তো অনেক দূরে। পায়ে হেঁটে কীভাবে যাবি?
- ওটা কোন সমস্যা নয়। হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম।
- তা ঠিক। তবু---------।
এরই মধ্যে নামাজের সময় হলে মিলন কথা বলতে বলতে নামাজের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলো। মালেককে শুয়ে থাকতে দেখে বলল,
- দোস্ত, এখনও শুয়ে আছিস! ওঠ, নামাজ পড়তে যেতে হবে।
- মিলন, তুই যা। আমি আজ যাবো না। মনটা ভালো নারে, দোস্ত। তারওপর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
- তাই বলে শুক্রবারের জুমা’র নামাজ মিস করবি? আমার সাথে চল। নামাজ পড়লে মনে শান্তি আসবে। শরীরও ভালো বোধ করবি।
মালেক ইতস্তত করে বলল,
- আচ্ছা, রেড়ি হচ্ছি।
এরপর মিলন ও মালেক নামাজ আদায় করতে মসজিদের দিকে চলে যায়।
মিলন ও মালেক শহরের একটি মেসে থাকে। দুজনেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে। ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে মিলন টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। আর মালেক তার বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে থাকে।
জীবন চলার পথে নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দুজনেই অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেছে।
শক্ত করে সংসারের হাল ধরতে মিলন প্রতিনিয়ত চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার মতো গরীবের জন্য একটি চাকরি যেন সোনার হরিণ। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেও শেষের দিকে মৌখিক পরীক্ষা নামক সাজানো পদ্ধতির কাছে বারবার হেরে যায় সে।
একদিন একটি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসে মিলন। পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেই সে মালেকের দেখা পায়। অনেকদিন পর একে অন্যকে দেখে একে অন্যের সাথে আলিঙ্গন করে। কিছুক্ষণ পর কক্ষ পরিদর্শক হলে প্রবেশ করেন। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু হয়। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে মিলন ভালোভাবে পুরো প্রশ্নে একবার চোখ বুলায়। আর মনে মনে ভাবে-এবার যদি চাকরিটা হয়। তার মনে হয়, যে ধরনের প্রশ্ন হয়েছে তাতে সে হয়তো একশো'য় একশো পেয়ে যাবে।
এরপর বিসমিল্লাহ বলে সে লেখা শুরু করে।
ওদিকে প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর থেকে মালেকের মন খারাপ হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে- উনি তো বলেছিলেন, কমপক্ষে তেত্রিশ নম্বর হলেও পেতে হবে। নইলে উনি কিছুই করতে পারবেন না। এখন কি করা যায়!
এইসব ভাবতে ভাবতে লেখা শুরু করে সে। এরপর এদিকসেদিক তাকিয়ে আরো কিছু লেখে নেয়।
ঘন্টা বাজার সাথে সাথে পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে যায়। একে একে সবাই কক্ষ ত্যাগ করে।
অনেকদিন পর মিলনকে কাছে পেয়ে মালেক তার খুব খাতির যত্ন করে। মিলনসহ স্কুলের সামনের ক্যান্টিনে এসে দুজনে মুখোমুখি বসে। মিলনকে উদ্দেশ্য করে মালেক বলল,
- তো কী খবর, দোস্ত?
- আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তোর কি খবর?
- আমিও ভালো আছি। ভেবেছিলাম চাকরি-বাকরি করবো না। আব্বু একটা ব্যবসা ধরিয়ে দেবেন। কিন্তু আব্বু তার এক বন্ধুর সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমি নাকি পরীক্ষায় অংশ নিলেই চাকরি হয়ে যাবে। বাকি সব তিনি দেখবেন। তাই পরীক্ষা দিতে আসলাম। আমার পরীক্ষা তেমন ভালো হয়নি। মনে হয় ত্রিশ কি পঁয়ত্রিশ পাবো। তোর কেমন হয়েছে?
- আমার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। আমি নব্বইয়ের ওপরে পাবো। ইনশাল্লাহ।
- চাকরির ইন্টারভিউতে নব্বইয়ের ওপরে পাওয়া মানে নিশ্চিত চাকরি।
কিন্তু দোস্ত, পেপারে তো দেখেছি মাত্র দুইজন নেবে। তাহলে----------। (আস্তে করে বলে মালেক)
- দোস্ত, আবার কিছু বললি?
- না, কিছু না।
- আচ্ছা, লিখিত পরীক্ষার রেজাল্ট কবে দেবে?
- কেন বাইরে নোটিশ দেখিসনি। রেজাল্ট ও ভাইভা আগামিকালই হবে। এখন কোথায় থাকবি?
- ভাবছি, আশপাশের কোন হোটেলে থাকবো। আর তুই?
- আমি তো আমার সেই আঙ্কেলের বাসায় উঠেছি।
- ওহ্।
এরপর ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যে যার গন্তব্যে চলে গেল।
পরদিন সকাল দশটায় নোটিশ বোর্ডে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। মিলনের নামের পাশে নিজের নাম দেখতে পেয়ে মালেক তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
- দোস্ত, আমাদের দুজনের নাম আছে।
মিলন মনে মনে ভাবতে লাগলো- লোক নিবে মাত্র দুইজন। অথচ ভাইভার জন্য পঞ্চাশজনের নাম দিয়েছে!
- আবার কি ভাবছিস?
- না, কিছু না। চল, ভাইভার জন্য হালকা প্রস্তুতি নিই।
- হ্যাঁ, চল।
দুপুর তিনটা। ভাইভা শুরু হয়ে গেছে। একজন একজন করে ভাইভা নিচ্ছে। মিলনের পরপরই মালেকের ডাক আসে। মালেকের ভাইভাও শেষ হয়। এভাবে সবার ভাইভা শেষ হলো। কিছুক্ষণ পর অফিসের ভিতর থেকে কয়েকজন লোক বের হয়ে এসে গেইটের সামনে দাঁড়ালেন। তাদের মধ্য থেকে একজন হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা করতে থাকেন,
"প্রিয় ক্যান্ডিডেইট ভাই ও বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম। আর মাত্র এক ঘন্টার মধ্যেই আপনাদের চূড়ান্ত ফলাফল জানিয়ে দেয়া হবে। আপনারা সবাই ধৈর্য ধরে বাইরে অপেক্ষা করুন। এক ঘন্টা পর নোটিশ বোর্ডে চূড়ান্ত ক্যান্ডিডেইটদের নাম দেয়া হবে।"
এই ঘোষণা দিয়ে তারা আবার অফিসের ভিতরের দিকে চলে গেলেন।
মিলন ও মালেক অন্যান্য ক্যান্ডিডেইটদের সাথে গল্প করে সময় কাটাতে লাগলো।
এরি মধ্যে কয়েকজন ক্যান্ডিডেইটকে নোটিশ বোর্ডের দিকে ছুটতে দেখে মিলনরাও তাদের পিছেপিছে ছুটে আসে।
সামনের ভীড় অতিক্রম করে মিলনের চোখ নোটিশ বোর্ডে পড়তেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। দুঃখ ভরা মন নিয়ে নাম দুটো কোনমতে মুখস্থ করে আবার ভীড় থেকে বেরিয়ে আসে সে। ফলাফল নিয়ে মালেকের তেমন কোন আগ্রহ না দেখে মিলন মনে মনে নিয়তিকে দোষ দেয়। সে ভাবে-কারো চাকরি খুব দরকার। পরীক্ষায় খুব ভালো করেও সে চাকরি পায় না। আর কারো চাকরির জরুরি দরকার নেই। অথচ পরীক্ষা নামের প্রহসনে তার চাকরি হয়ে যায়। এই আমাদের স্বদেশ!
মিলনকে চিন্তামগ্ন দেখে মালেক এগিয়ে এসে বলল,
- কি খবর, দোস্ত? মুখ বেজার কেন? তোর নাম আসেনি?
মিলন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জবাব দিল,
- না, আমার হয়নি।
- তাহলে কার কার চাকরি হয়েছে?
- তোর নামের পাশে আরেকজনের নাম দেখলাম। তাকে চিনি না।
মালেক চোখ কপালে তুলে বলল,
- একি কথা! এতো ভালো পরীক্ষা দিয়েও তোর চাকরিটা হলো না। তাছাড়া তোর রেজাল্টও অনেক ভালো। মন খারাপ করিস না, বন্ধু।
মালেকের মুখের দিকে অসহায়ের মতো করে তাকিয়ে আছে মিলন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT