সাহিত্য

লালনের জীবনতৃষ্ণা

ফরিদ আহমদ দুলাল প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১০-২০১৯ ইং ০১:০০:৪৬ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত

বাউল লালন শাহর জীবনকাল (১৭৭৪-১৭ অক্টোবর ১৮৯০) এমন কোনো অতীতের ঘটনা নয়, কিন্তু তারপরও আমাদের কাছে তাঁর জীবনী সম্পূর্ণ উদঘাটিত নয়। কারণ লালনের যে সামাজিক অবস্থান, তাঁর যে পারিবারিক পরিচয় (যদিও তা সর্বজনস্বীকৃত নয়), তাতে তাঁর সর্বসমক্ষে পরিচিত হয় উঠবার সুযোগ নিতান্ত কম; যাপিতজীবনে লালন প্রচারালোকের বাইরেই ছিলেন, যদিও ভক্তদের কাছে লালনের গান খুবই প্রিয় ছিল; লালনের অগণন অনুসারী নিজের কণ্ঠে লালনের গান ধারণ করে মানুষের মাঝে গেয়ে বেড়াতেন এবং এভাবেই লালনের গান রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ লালনের গান শুনে কেবল মুগ্ধ নন প্রভাবিতও হয়েছিলেন; রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাউল আঙ্গিকের যে সুরের সাক্ষাৎ আমরা পাই, তাও তিনি গ্রহণ করেছিলেন প্রধানত বাউল লালন ফকিরের গান থেকে। আজকের কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতে লালনের যে সমাধি এবং আখড়ার ব্যাপ্তি, সেখানেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লালনের কবরের ওপর ১৩১১ বঙ্গাব্দে প্রথম একটি পাকা মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবী মহল ও সাধারণে লালনের পরিচিতি এবং গ্রহণীয় হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গদ্যে লালনের প্রসঙ্গে আলোচনা করেন এবং এভাবেই লালন মৃত্যুর বহু বছর পর মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন, অবশ্য কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে লালনের গানের বাণীসম্পদ আর লোকসুরের শক্তিও নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। লালন-সৃষ্টির নিজস্ব সামর্থ্য না থাকলে, কেবল রবীন্দ্রনাথ কেন, সমস্ত প্রচারমাধ্যম সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেও তা টিকে থাকতে পারতো না কিছুতেই। লালন তাঁর গানে যে কাব্যশৈলীর সাক্ষর রাখেন, যা তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ অতিক্রান্ত হবার পর আজো মলিন হয়ে যায়নি; বরং আজো লালন বিকশিত-আলোকিত-আলোচিত হচ্ছেন প্রতিদিন।
জন্মসূত্রে লালনের পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প-িতদের ভিন্নমত থাকলেও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা ভিন্নমত দেখিনি; লালন হিন্দু কায়স্থ বাড়িতে জন্মেছিলেন; পরবর্তীতে মুসলমান পরিবারে আশ্রয় পাবার কারণে স্বগোত্রীয়দের কাছে অপমানিত-লাঞ্ছিত-পরিত্যাজ্য হলে বাধ্য হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। পরবর্তীতে ফকির সিরাজ সাঁইয়ের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণের পর লালন ‘বাউলধর্ম’ অথবা ‘মানবধর্মে’ নিজেকে সমর্পণ করেন। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে গুরু সিরাজ সাঁইয়ের মৃত্যুর পর লালন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ওঠেন যোগ্যতাবলেই। লালন নিজে তাঁর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ধর্মবিশ্বাস নিয়ে নিজস্ব চিন্তার কথা তাঁর গানে উচ্চারণ করেছেন এভাবে-
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/ লালন বলে জাতের কীরূপ দেখলাম না দুই নজরে।/ সুন্নত দিলে হয় মুসলমান নারী জাতির কী হয় বিধান/ বামুন চিনি পৈতা প্রমাণ বামনি চিনি কী করে।’
সমাজে জাত্যাভিজাত্য আর জাতিভেদের কারণে নানান অনাচারে অতিষ্ঠ লালনকে আমরা যেমন অভিমান করে গাইতে শুনি- “আর আমায় মারিস নে মা/ বলি তোর চরণ ধরে ননী চুরি আর করবো না।/ ননীর জন্যে তুই আমারে মারলি যে বেঁধে ধরে/ দয়া নাই মা তোর অন্তরে তেদার ঘরে মা আর থাকবো না।” তেমনি আবার তীব্র প্রতিবাদ করতেও দেখি, যে প্রতিবাদের সাথে মিশে থাকে প্রবল ঘৃণা-
‘জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা/ সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সব দেখি তানানানা।/ আসবার কালে কী জাত ছিলে এসে তুমি কী জাত নিলে/ কী জাত হবা যাবার কালে সে কথা ভেবে বল না।/ ব্রাহ্মণ চ-াল চামার মুচি সবই তো এক জলে শূচি/ দেখে শুনে হয় না রুচি জমে তো কারে ছাড়বে না।/ গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায় তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়/ লালন বলে জাত কারে কয় সে ভ্রম তো আর গেল না।’
মানবধর্ম নিয়ে লালন তাঁর গানে মৌলিক যে প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, সে প্রশ্ন মীমাংসার অনুসন্ধান লালন শাহ সারাজীবন ধরে করে গেছেন। যদিও লালনের ধর্মজিজ্ঞাসার চেয়ে প্রবল হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা; আর এ জীবনজিজ্ঞাসা থেকেই সৃষ্টি লালনের জীবনতৃষ্ণা। সমগ্র জীবনব্যাপী লালনের সে জীবনতৃষ্ণা বন্ধ হয়নি। লালন জীবদ্দশায় তাঁর অনুগামী এবং ভক্তদের কাছে নিজের জীবনদর্শন-জীবনজিজ্ঞাসা-জীবনতৃষ্ণা বা জীবনাদর্শের কথা কী বলে গেছেন, তার কোনো রূপরেখা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়; কোনো সূত্র-উপাত্তও আমাদের হাতে নেই। আমাদের সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ, ধর্মান্ধতায় বুঁদ পরিপার্শ্ব লালনকে কখনো মর্যাদার আসনে রেখে বিবেচনাই করেনি; যে কারণে লালনের জীবনদর্শন আমাদের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে। লালনের যা আমাদের হাতে আছে, তা তাঁর গান। ভক্তদের মুখে মুখে প্রচারিত গানগুলোই আজ আমাদের সম্পদ; যদিও লালনের প্রয়াণের এত বছর পর লোকমুখে উচ্চারিত এবং সংগৃহীত গানগুলোর সবই লালনের রচনা কিনা অথবা এর বাইরে লালনের অন্য কোনো গান আছে কিনা সে সিদ্ধান্তকে আমরা চূড়ান্ত বলতে পারি না। হয়তো এ যাবৎ সংগৃহীত গানের বাইরেও লালনের কিছু গান রয়ে গেছে, অথবা হয়তো সংগৃহীত গানের কোনো কোনোটি আদৌ লালনের গান-ই নয়। তারপরও আমরা লালনকে যতটা উদ্ধার করতে পেরেছি, তাতে এ সিদ্ধান্তে সহজেই উপনীত হতে পারি, লালন তাঁর সময়ের এক অবিস্মরণীয় প্রতিভা; কেবল তাঁর সময়ের নয় সর্বকালেই লালন এক অনন্য প্রতিভার নাম। এবং লালন প্রতিভার সবচেয়ে বড় দিক তাঁর আত্মানুসন্ধান। আত্মানুসন্ধান মানে তাঁর ধর্মবিশ্বাস অনুসন্ধান নয়, বরং লালনের আত্মানুসন্ধান নিজের ভেতরের মানুষ লালনকে খোঁজা; তাই লালনের গানে আমরা শুনি-
‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি/ ভেদ পরিচয় দেয় না আমায়/ সেই খেদে ঝরে আঁখি॥’
গানে লালন যখন বলেন, “পাখির বুলি শুনতে পাই রূপ কেমন দেখি না ভাই”; তখন অনায়াসে বুঝতে পারি তিনি নিজের ভেতর কেবল নিজেকেই নয়; বরং নিজের মধ্যে ঈশ্বরকেও খুঁজে ফেরেন। লালনের এই আত্মানুসন্ধান এতটাই বিচিত্র এবং সর্বব্যাপী, যা তাঁর শ্রোতা আর পাঠককুলকে অনুভবের এক অন্য জগতে পৌঁছে দিতে চায়; শ্রোতার বুকে নিমিষেই জীবনজিজ্ঞাসার আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তোলে; আমরা তাঁর অন্য একটি গানের কথা স্মরণ করি-
‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না/ একবার আপনারে চিনতে পারলে রে/ যাবে অচেনারে চেনা॥/ ও সাঁই নিকট থেকে দূরে দেখা/ যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায় দেখ না/ ফকির লালন মরলো জলপিপাসায় রে/ কাছে থাকতে নদী মেঘনা॥’
লালন তাঁর যাপিত জীবনে বারবার ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিদ্বেষজনিত হানাহানি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং নিজে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে কূপম-ুকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন; কিন্তু জীবনবোধের গভীরতায় তিনি নিজে এবং সতীর্থদের নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করে গেছেন। লালনের সেই সংগ্রামের কথা উচ্চারিত হয়েছে, তেমন একটি গানের কথা স্মরণ করছি-
‘জলের উপর পানি না পানির উপর জল/ বল খোদা বল খোদা বল॥/ আলীর উপর কালি না কালির উপর আলী॥/ জমিন তলায় আসমান উপর/ না-কি আসমান জমিন সব বরাবর॥/ হিঁদুর পোড়া শ্মশান না মিয়ার গোরস্তান/ কার থিকা কে ছোট কহ কার কী অবস্থান॥’
সাধক লালনকে নিয়ে আমাদের গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; সে গবেষণা যেন লোক দেখানো কার্যক্রম না হয়ে যায়; প্রয়োজনে এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে গবেষণা কাজে সহযোগিতা এবং পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা আবশ্যক
লালন তাঁর যাপিত জীবনে সহ¯্রাধিক গান রচনা করেছেন জানা যায়; লালনের জীবনদর্শন-জীবনতৃষ্ণা নিয়ে ভাবতে বসে মনে হয়, লালন-আবিষ্কারের জন্য তাঁর প্রতিটি গানের বাণী আলোচিত হবার দাবি রাখে; কিন্তু সে আয়োজনের জন্য লালন বিষয়ে সন্দর্ভ রচনা করা প্রয়োজন; কিন্তু সে সুযোগ আমার নেই, আমি কেবল আমার পাঠককে তার আবশ্যিকতার কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে পারি। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথার উল্লেখ করতে চাই, আমি জানি না, লালন ফকিরকে নিয়ে গবেষণা কাজ ক’টি হয়েছে, প্রফেসর আবুল আহসান চৌধুরী সে বিষয়ে ভালো বলবেন। আমি কেবল স্মৃতি থেকে বলতে পারি আসকার ইবনে শাইখ এবং কল্যাণ মিত্র দুজনেই ‘লালন ফকির’ নামে দুটি নাটক লিখেছেন। লালন ফকিরের জীবনীনির্ভর তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশে। প্রথমটি ‘লালন ফকির’ নামে ১৯৭০-৭২-এ সম্ভবত সৈয়দ হাসান ইমাম নির্মাণ করেন; সে ছবিতে লালনের ভূমিকায় অভিনয় করেন উজ্জ্বল, সাথে কবরী ছিলেন; ছবিটি ফিল্ম আর্কাইভে পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় ছবি ‘লালন’ নির্মাণ করেন তানভীর মোকাম্মেল নব্বইয়ের দশকে। সে ছবিতে লালন চরিত্রে অভিনয় করেন রাইসুল ইসলাম আসাদ; সাথে ছিলেন শমী কায়সার এবং অন্যান্য; এবং তৃতীয় ছবি ‘মনের মানুষ’ নির্মিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায়, যার পরিচালনায় ছিলেন ভারতের গৌতম ঘোষ; লালন চরিত্রে অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়; অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন চঞ্চল চৌধুরী, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পাওলি দাম প্রমুখ। এসব নাটক বা চলচ্চিত্রের একটিতেও বাউল লালনের দর্শন বা ইতিহাসনিষ্ঠতা বজায় থাকেনি। তানভীর মোকাম্মেলের ছবিতে কিছুটা থাকলেও সে ছবিতে চলচ্চিত্রের ভাষা বিপন্ন হয়েছে বারবার। যারা লালন গবেষণা করেন, লালনের নাম ভাঙিয়ে আখের গুছিয়ে নিতে সচেষ্ট থাকেন; এ দায় তাদের সবার।
আমরা যদি গভীর অভিনিবেশন দিয়ে লালনের গান অনুসন্ধান করি; তাহলে দেখবো প্রচলিত অর্থে আমরা যাদের বাউল বলে চিহ্নিত করি, তাদের গানের সাথে লালনের গানের মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে। শরিয়তি-মারিফতি-মুর্শিদী ইত্যাদি আঙ্গিকের গানের সীমানা পেরিয়ে লালন দেহতত্ত্ব-ধর্মীয়তত্ত্ব-গুরুতত্ত্ব-সৃষ্টিতত্ত্ব-আধ্যাত্মবাদ-আত্মতত্ত্ব-হাদিস-কোরান-রামায়ণ-মহাভারত-ধর্মীয় পুরাণ ইত্যাদি এতটাই যোগ্যতার সাথে স্পর্শ করেছে; যাতে করে লালন শাহকেই সুফিতত্ত্বের সফল রূপকার হিসেবে উল্লেখ করা যায়। যে কারণে লালনের একটি দেহতত্ত্বের গানও ভিন্ন মাত্রা পেয়ে যায়। আসুন আমরা তাঁর বহুল প্রচারিত একটা গানের কথা স্মরণ করি-
‘ধন্য ধন্য বলি তারে।/ বেঁধেছে এমনও ঘর শূন্যের উপর পচতা করে।/ সবে মাত্র একটি খুঁটি খুঁটির গোড়ায় নেইকো মাটি।/ কী-সে ঘর হবে খাঁটি ঝড় তুফান এলে পরে।/ মূল আঁধার কুঠুরি নয়টা তার উপরে চিলে কোঠা/ তাতে এক পাগলা বেটা (২) বসে একা একেশ্বরে।/ উপর নিচে সারি সারি সাড়ে নয় দরোজা তারি/ লালন কয় যেতে পারি (২) কোন দরোজা খুলে ঘরে।’
লালনের জীবনতৃষ্ণার সন্ধান যদি আমরা করতে চাই, সহজেই আমরা নিচের গানটির প্রতি দৃষ্টি দিতে পারি; কী গভীর আকাক্সক্ষায় লালন পারের দিশা অনুসন্ধান করেন এ গানে-
‘আমি অপার হয়ে বসে আছি ও হে দয়াময়/ পারে লয়ে যাও আমায়।/ আমি একা রইলাম ঘাটে ভানু সে বসিলো পাটে।/ দয়াল তোমা বিনে ঘোর সংকটে কী আর ঠিক উপায়।/ নাই যে আমার ভজন সাধন চিরদিন কুপথে গমন।/ আমি নাম শুনেছি পতিতপাবন ডাকতে দিও হায়।/ অকূলের না দিলে গতি ঐ নামের হবে অখ্যাতি/ ফকির লালন কয় অকূলের পতি কে বলবে তোমায়॥’
‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’, ‘কে কথা কয় রে দেখা দেয় না’, ‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’, ‘আপন ঘরের খবর নে না’, ‘আশা পূর্ণ হলো না আমার মনের বাসনা’ ইত্যাদি অসংখ্য গানে আমরা লালনের জীবনতৃষ্ণার সন্ধান করতে পারি। কিন্তু আমরা যদি তাঁর জীবন দর্শনের সন্ধান করতে চাই, তাহলে স্মরণ করতে পারি-
‘যেখানে সাঁইর বারামখানা (২)/ শুনিলে প্রাণ চমকে ওঠে দেখতে যেমন ভুজঙ্গনা।/ যা ছুঁইলে প্রাণ মজে/ বুঝেও তো বুঝতে নারি কীর্তিকর্মার কী কারখানা।/ আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে দিব্যজ্ঞানী সেই হয়েছে/ কুবৃক্ষে সু-ফল পেয়েছে/ আমার মনের ঘোর গেল না।’
লালন তাঁর সমস্ত সাধন-ভজন, আত্মানুসন্ধানের পরও মানুষের কথা বিস্মৃত হয়ে যাননি। লালনকে বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে লালন তাঁর সময়ে এক নিজস্ব জগৎ তৈরি করে নিয়েছিলেন; তাঁর সে ভুবনে সমাজের সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়েছিলেন; এবং তাদের সবাইকে নিয়েই লালন বাউলতত্ত্বকে স্বতন্ত্র একটা বিশ্বাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছিলেন। সেখানেও লালন মানুষকে তাঁর আরাধ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন-
‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি/ মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি।/ মানুষে মানুষ গাঁথা দেখ যেমন আলোকলতা/ জেনে শুনে মুড়াও মাথা যা আছে করবি।/ হৃদয়ে মিনারে সোনার মানুষ উজ্জ্বলে/ মানুষ গুরুর কৃপা হইলে সেই ধন পাবি।/ মানুষ ছাড়া মন রে আমার দেখবি ভবে সব শূন্যতার/ লালন বলে মানুষ আকার ভজলে পাবি।’
বাউল কবি আত্মনির্ভর; স্বশাসিত; কবি কখনো তাই নত হতে জানে না। কবি নত হয় তার নিজের কাছে; আত্মসমর্পণ করেন তার ভেতরে যে সাঁই বসত করেন তার কাছে; অতঃপর যেন নিজেরই সাথে পুনর্মিলন হয় মহাসিন্ধুতে। যে মহামিলনের জন্য কবির বুকে নিত্য আর্তি-
‘মিলন হবে কতদিনে আমার মনের মানুষের সনে।/ চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী/ হবো বলে চরণ দাসী (২) ও তা হয় না কপাল গুণে/ মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন লুকালে না পাই অন্বেষণ।/ কালারে হারায়ে যেমন (২) ওই রূপ হেরি দর্পণে।’
সাধক লালনকে নিয়ে আমাদের গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; সে গবেষণা যেন লোক দেখানো কার্যক্রম না হয়ে যায়; প্রয়োজনে এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে গবেষণা কাজে সহযোগিতা এবং পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা আবশ্যক এবং আমি বিশ্বাস করি এ প্রয়োজন বাঙালির গৌরব চিহ্নিতকরণের জন্যই অত্যাবশ্যক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT