সাহিত্য

জীবনানন্দ দাশের জীবনবোধ

জেবা আমাতুল হান্না প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১০-২০১৯ ইং ০১:০৩:০৯ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

‘রূপসী বাংলার’ কবি জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতাসেন’ এর কবি জীবনানন্দ দাশ। সমসাময়িক আরও অনেকের মতই যার সচেতন প্রয়াস ছিল রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত কাব্যচর্চা। ‘নীলিমা’ ‘পিরামিড’ ও ‘সেদিন এ ধরনীতে’ ব্যতীত আর কোনো কবিতাতে রবীন্দ্র প্রভাব তেমন চোখে পড়ে না।
বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশের আগমন পূর্বসূরি কবিদের হাত ধরে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যধ্যান থাকলেও মূলত: ছন্দ প্রতিধ্বনিতে আছেন সতেন্দ্রনাথ-মোহিত লাল আর তাঁর বক্তব্যে যে অপবাদ এবং শব্দ ব্যবহার যে মিশ্র সংস্কৃতির বাস্তবতার স্বীকৃতি, সেখানে লক্ষ্য করা যায় প্রেমিক ও মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতি।
‘আমি কবি, সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি’ হেরি ঝরা পালকের ছবি।’
.........
স্বপন সুরার ঘোরে
আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি- দিওয়ানা করে জনম ভরিয়া সে কোন হেঁয়ালি হলো না আমার সাধা, পায় পার নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় বাঁধা।
-নিমেষে পাসরি, এই বসুধার নিয়তি মানার বাধা সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভরে। ‘আমি কবি, সেই কবি, কাব্য সম্ভার জীবনানন্দ দাশের প্রস্তুতি পর্বের কবিতার উপসংহারে শোনা যায় মানবের জয়গানের উচ্চারণ
‘....
গাহি মানবের জয়
-কোটি কোটি বুকে কোটি ভগবান আঁখি মেলে জেগে রয়!
সবার প্রাণের অশ্রুবেদনা মোদের বুকে লাগে
কোটি বুকে কোটি দেউটি জ্বলিছে, কোটি কোটি শিখা জাগে,
প্রদীপ নিভায়ে মানব-দেবের দেউল যাহারা ভাঙে,
আমরা তাদের শস্ত্র, শাসন, আসন কবির ক্ষয়।
-জয় মানবের জয়।
(কাব্য সম্ভার, পৃ: ৩৫৯-৬০)
জীবনানন্দ দাশের কাছে মনুষ্য সৃষ্ট সভ্যতা ঠুনকো।
‘পৃথিবীর সব গল্প বেঁচে রবে চিরকাল;
এশিরিয়া ধুলো আজ, বেবিলন ছাই হয়ে আছে।
(কাব্য সম্ভার পৃ: ১০৯)
অথচ সুপ্রিয় ভবিষ্যতের আকাক্সক্ষা পৃথিবীতে প্রকৃতিতে চিরকালীন; ব্যক্তি মানুষ যেখানে মুখ্য নয়-
‘আমি চলে যাব বলে
চালতা ফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে।
শান্ত সমাহিত ছিল না জীবনানন্দের কালের বাংলাদেশের পরিবেশ। ‘রূপসী বাংলায়’ যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা তাঁর সমকালের বাংলাদেশ নয়, তাঁর কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ।
‘তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও-
-আমি এই বাংলায় পারে
র’য়ে যাব’
(তোমরা যেখানে সাধ, কাব্যসম্ভার- ১০৯)
তিনি কোনো মানবিক কর্মচাঞ্চল্য দেখার প্রত্যাশী নন, ‘দেখিব কাঁঠাল পাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে,
দেখিব খয়েরী ডানা শালিখের সন্ধ্যার হিম হয়ে আসে।’ প্রকৃতি বিনাশী সভ্যতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি সংলগ্ন জীবনের আকাক্সক্ষা করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ।
আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে।’
(‘আবার আসিব ফিরে’- কাব্য সম্ভার ১১৭)
যে কিশোর রূপসার ঘোলা জলে ছেঁড়া পালে ভিঙা বায় কবি সে কিশোর হয়ে আসতে চান, যে কিশোরকে জাগতিক প্রতিযোগিতা তখনও গ্রাস করেনি। কবি কিশোরীর হাঁস হয়ে আসতে চান, যে কিশোরীর ভালোবাসা জাগতিক চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে। যে কারণে সে ভালোবেসে হাঁসটির পায়ে ঘুঙুর পরায়।
কবি জীবনানন্দ দাশ নিভৃতচারী কবি। সমালোচকরা যে কবির স্বতস্ফূর্ত চলার পথের অন্তরায়, তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। সমালোচকরা তার কাছে ‘হাঙর’ যে হাঙরের তোলপাড় মীনকূলের শান্তির চলাফেরার অন্তরায় ‘বরং নিজেই তুমি লেখনাকো একটি কবিতা-
বলিলাম ম্লান হেসে, ছায়াপিন্ড দিলো না উত্তর;
বুঝিলাম সে তো কবি না- সে যে আরূঢ় ভনিতা-
পান্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের পর
বসে আছে সিংহাসনে- কবি নয়- অজর অক্ষর
অধ্যাপক, দাঁত নেই- চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি
বেতন হাজার টাকা মাসে- আর হাজার দেড়েক
পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি;
যদিও সে সব কবি ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক
চেয়েছিলো- হাঙরের ঢেউয়ে খেয়েছিলো লুটোপুটি।’
(সমারূঢ়)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT