সম্পাদকীয়

ওষুধের অপব্যবহার

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১০-২০১৯ ইং ০০:৫৮:২০ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

আমাদের সমাজে একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা হলো ওষুধের অপব্যবহার। ইদানিং এ নিয়ে প্রায়ই লেখালেখি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ এর ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের ফলে অনেক সময় রোগীর হিতে বিপরীত হচ্ছে। এই দৃশ্য শুধু আমাদের দেশেই নয়; ওষুধের যুক্তিহীন ব্যবহার ও প্রয়োগ বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম সমস্যা। ওষুধের নিরাপদ ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সমস্যার উৎস, সমস্যা সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করা এবং তাদের মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য্য। সমস্যা চিহ্নিত না হলে ওষুধের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগ এবং এর প্রকৃত উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। দেশের হাজার হাজার মানুষ কারণে অকারণে নানা ধরনের ওষুধ সেবন করে চলেছেন। যার কুফল সম্বন্ধে তারা অবগত থাকে না অনেক সময়। এক্ষেত্রে তারা নিজেরাই রোগী নিজেই চিকিৎসক।
মূলত গ্রামাঞ্চলের হাতুড়ে এবং অনভিজ্ঞ ডাক্তারদের কারণে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করছে রোগীরা। এই অনভিজ্ঞ ডাক্তাররা বুঝে না বুঝে বেশ কয়েকটি ওষুধ প্রেসক্রাইব করে রোগীদের। রোগ নির্ণয় না করেই এসব ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেয় তারা এ জন্য যে, একাধিক ওষুধের মধ্যে যে কোন একটাও যদি রোগের নিরাময় করে তবে মন্দ কী। এছাড়া, ওষুধের অপব্যবহার এবং অপপ্রয়োগের অন্যান্য উৎস হচ্ছে- ক্লিনিক, হেলথ কমপ্লেক্স, হাসপাতাল। এর পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসকের রোগ নির্ণয়ে ত্রুটি। চিকিৎসক ঠিকমতো রোগ নির্ণয় করে যুক্তিসঙ্গতভাবে ওষুধ প্রদান না করলে রোগী ওষুধের অপব্যবহার জনিত সমস্যার সম্মুখীন হবে, এটাই স্বাভাবিক। অপরদিকে রোগীকে প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরামর্শ প্রদান না করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগীরা। তারা ব্যবহার করছে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ। সর্বোপরি, অতিমাত্রার ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি হচ্ছে অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের একটি অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা রোগীর চাপ সহ্য করতে না পেরে অসতর্কতা ও অবহেলার কারণে রোগীকে অনেক সময়ই সঠিক চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থ হন। এ সময় তারা অনেক অপ্রয়োজনীয় ওষুধও লিখে দেন প্রেসক্রিপশনে। এর পাশাপাশি অনেক চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানীগুলো কর্তৃক প্রভাবান্বিত ও প্রলুব্ধ হয়ে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন। ওষুধ কোম্পানীগুলো ওষুধ বাজারজাত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকে। বিশ্বের ওষুধ কোম্পানীগুলো তাদের উৎপাদিত ওষুধের প্রমোশনে পলিটিক্যাল লবিংয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যয়ভার বহন করতে হয় নিরীহ ক্রেতা ও রোগীদেরই। আর চিকিৎসকের মাধ্যমেই তারা এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানীগুলো লাভবান হচ্ছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগী সাধারণ।
এই প্রবণতা রোধ করতে হলে সজাগ হতে হবে সরকারকেই। যাতে সঠিক রোগ নির্ণয় করে সঠিক ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়, সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে চিকিৎসকদের। সেই সঙ্গে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সীমাবদ্ধ ওষুধের ওপর সর্বোচ্চ জ্ঞান থাকা জরুরি। ওষুধের ফলপ্রসূ ও যুক্তিসঙ্গত প্রয়োগের জন্য কোম্পানী প্রদত্ত নামের পরিবর্তে ওষুধের জেনেটিক নাম ব্যবহারও জরুরি। তাছাড়া, একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং চিকিৎসকদের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইড থাকাও জরুরি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম স্পষ্টাক্ষরে লেখার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ স্পষ্টাক্ষরে লেখা না থাকায় অনেকেই ভুল ওষুধ সেবনে বাধ্য হচ্ছে। ইদানিং এন্টিবায়োটিকের অত্যধিক ব্যবহারের ব্যাপারে চিন্তিত বিশেষজ্ঞগণ। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করায় অনেক এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ওষুধের অপব্যবহার রোধে চিকিৎসক, রোগী, সরকারসহ সকলকেই সতর্ক হতে হবে। সচেতন হতে হবে ওষুধ বিক্রেতাদেরও।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT