ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১০-২০১৯ ইং ০০:৪০:৪৮ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

গ্রামাঞ্চলের লোক আল্লাহ তা’আলার কোনো ওলি বা বন্ধুর সমাধিকে মোকাম বলতেন। এখনও কোনো কোনো সময় লোকমুখে এরকম বলতে শোনা যায়। মোগলাবাজার থানা ও ইউনিয়নে সুপ্রসিদ্ধ নেগাল গ্রামের পূর্ব দক্ষিণ সীমান্তে সুপ্রসিদ্ধ স্থান মোকাম বাড়ির অবস্থান। কয়েক শতাব্দী জুড়ে লোকমুখে শ্রোত যে, এখানে একজন ওলি বা দরবেশের সমাধী রয়েছে। তবে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সফর সঙ্গী কেহ নয় এটাও নিশ্চিত। এতদঞ্চলের লোক মোকাম বাড়ি বলতে এ স্থানটিকেই জানেন।
চারাভূমি থেকে একটু উচু ভিটা, তার পূর্ব সীমান্তে নি¤œভূমি। এ স্থানটি বা কবরটি ভেঙে যাবার ভয়ে হয়তো কেহ পরবর্তীতে একটি বট বৃক্ষ রোপন করেছিলেন বা প্রাকৃতিকভাবে বৃক্ষটির জন্ম হয়েছিলো। বট বৃক্ষটি বড় হবার পর মনে হতো যে এটি কবরের পূর্ব সীমার দেয়াল। গৃহপালিত পশু এ কবরের উপর দিয়ে যাবার বেলায় হঠাৎ থমকে যেতো। এ দৃশ্যটি মাঝে মধ্যে জনগণের দৃষ্টিগোচর হতো। মনে হতো যেন অজানা কোনো শক্তি তাদের গতিরোধ করছে। মুরুব্বিগণ বলেছেন, একদা পূর্ব দিক থেকে চলে আসা একজন লোক দেখতে মনে হলো সংসার বিরাগীর মতো, নামাজী ফকির বেশি। কিছুক্ষণ এখানে নিরবে দাড়িয়ে যিয়ারত করতে থাকে, যিয়ারতের রেওয়াজ এ কবরটিতে ক্রমানুসারেই চলে আসছে। অনেক প্রবীণদের জানাছিলো যে, এ কবরটি ‘হযরত ইসমাইল শাহ’ নামক একজন ফকির বা দরবেশের। তবে নামটি বেশ প্রচার হয়নি। ঐ পথিক, যিয়ারতের পর রাতভর এখানেই বসে থাকে। অনুরোধের পরও কারো বাড়িতে যায়নি। উনিকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিলো এ সমাধি কার বা কোন ব্যক্তির? সে বলেছিলো ইসমাইল শাহ এর কবর। সকালবেলা ঐ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ নামটি নিয়ে পরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কেহ বলেন ঐ ফকির মুসাফির ব্যক্তিটি তার নাম বলছে ইসমাইল শাহ।
অগ্রহায়ণে ধান কাটা শেষ হবার পর গ্রামের সাধারণ বৈঠকে একটি রাত নির্ধারিত করে বিরাট আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করা হতো। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী এ মাহফিলের জন্য ‘রুট শিন্নি’ ছিলো নির্ধারিত। পাড়া-মহল্লা নির্বিশেষে সকল স্তরের লোক অংশগ্রহণ করতেন এ মাহফিলে। কেরোসিনের মশাল আর হারিকেন হাতে নিয়ে জড়ো হতেন বহুসংখ্যক লোক। সৌখিন শ্রেণির দু’এক জনের হাতে টর্চলাইট দেখা যেতো। কবর সংলগ্ন পূর্ব দিকের আউশ ক্ষেতের ভূমিতে মাহফিল হতো। এ স্থান থেকে একটু দূরে চলছে রুট শিন্নি তৈরির কাজ, রুট শিন্নি মানে অগ্রহায়ণে নতুন ধানের চালকে মেশিনে মিহি করে তার সাথে সকল প্রকার মসলা একত্রিত করে পাত্রে রাখা হয়। অপর দিকে কাঁচা বাঁশ কেটে প্রায় এক ফুট দীর্ঘ পরিমাণ খ- খ- করে তার ভিতরে ভরে দেওয়া হতো ময়দার মিশ্রিত মসলা। পরে খড়কুটের আগুনে পুড়ালেই হয়ে যেতো সুস্বাদু রুট শিন্নি। বাঁশ কেটে বাহির করে টুকরো টুকরো করে বিতরণ করা হতো সবার মধ্যে। শীত মৌসুমে কৌতুহলী জনতা এ মাহফিলের অপেক্ষমান থাকতেন। ছোটবেলা এ মহতি মাহফিলে বড়দের সাথে কয়েকবার অংশগ্রহণ করেছি। ঐতিহ্যবাহী ঐ মাহফিলের আলোচনা এখনও প্রবীণদের মুখে শোনা যায়।
সমাধীর পূর্ব পাশের সেই বট বৃক্ষটি বিশাল আকার ধারণ করে। গ্রামের সব চাইতে উচু ও বৃহৎ গাছ এটাই ছিলো। এ কবরকে কেন্দ্র করে উত্তর-পশ্চিম দিকে গড়ে ওঠেছে পারিবারিক কবরস্থান এবং দক্ষিণ পশ্চিম দিক দিয়ে গড়ে ওঠেছে পঞ্চায়েতি কবরস্থান। ফাঁকে ফাঁকে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়েছিলো বিভিন্ন জাতের বৃক্ষরাজি। বট বৃক্ষের রয়েছে অনেক কাহিনী। মোকাম বাড়ির পশ্চিম দিকে একটু দূরে ছিলো নেগাল পূর্ব পাড়া জামে মসজিদ। বটবৃক্ষের শিখ ডালের চুড়া থেকে যখন সূর্যের আলো গাইব হয়ে যেতো। তখন মুসল্লিরা বুঝতে পারতেন মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গেছে সাথে সাথে আযান দিয়ে নামায পড়তে নিতেন। সূর্যোদয়ের বেলায়ও যখন সূর্যের সোনালী আভা বটবক্ষের শিখ জলগুলোতে পরিলক্ষিত হতো তখন নামাযীরা বুঝতে পারতেন ফযরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে। এ বৃক্ষটির পাশ দিয়ে যাতায়াতের বেলায় অনেকে ভয় পেতেন বিশেষ করে দুপুর ও সন্ধ্যাবেলা। অনেকের ধারণা ছিলো এ বিশাল গাছটিতে রয়েছে দেও-দানব, জিন-পরীর আস্তানা। শীত মৌসুমে এ বটবৃক্ষে আগমন ঘটতো অনেক বিরল প্রজাতি কুলের ঐ মোকাম বাড়ি পাখি শিকার করা নিষিদ্ধ ছিল। শিকারিদের তাড়া খেয়ে পাখিরা এখানেই আশ্রয় নিতো। গ্রামের শেষ প্রান্ত পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বিশাল শাইলকার হাওরে যাতায়াতের সময় বটবৃক্ষের শাখাগুলোতে নানান প্রজাতির পাখি দেখতে অনেকে দাড়িয়ে থাকতেন। পাখ-পাখালির কলরব আর কূজনে এক মনোরম দৃশ্য ফুটে ওঠতো। মোকাম বাড়িতে কবর খুড়তে আসা লোক দেখতে পেতেন অনেক জাতের বিষধর সাপ বৃক্ষরাজির শাখাগুলোতে চর চর করে দৌড়াচ্ছে। কিছু সময়ের মধ্যে সাপগুলো কোথায় যেন গাইব হয়ে যেতো। মোকাম বাড়ির সাপ আর জীবজন্তু কোনো দিন কারো ক্ষতি করেনি বা করবে না এ রকম ধারণা ছিলো এলাকাবাসীর।
গ্রামবাসীর ধারণা এ বৃক্ষসহ অন্যান্য বৃক্ষরাজি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। এগুলো বিশেষ করে বটবৃক্ষটি বিক্রি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কবরের গাছটি কাটাতো সহজ নয়। ভয়ে অনেকের বুকে ধড়ফড় করছে। কয়েক জন মিলে গাছটি ক্রয় করলে গাছটি কাটার লোক এসে গাছটি কাটতে পারবে না বলে চলে যায়। এভাবে দিন, সপ্তাহ যায়। শেষ পর্যন্ত সকল জল্পনা কল্পনার পর গাছটি কাটা হলো। সাথে সাথে কাটা হলো মোকাম বাড়ির বড় বড় সকল বৃক্ষরাজি। মোকাম বাড়ির উত্তরাংশে ছিলো আমাদের বাড়ি। ছোট বেলা রাতে বাড়ির আঙিনায় দক্ষিণ সীমানায় আমরা মাঝে মধ্যে জড়ো হতাম পাখিদের কলরব আর জীব জন্তুর ডাক শোনার জন্য। বটবৃক্ষ ক্রয় ও কাটার কাজে যিনি বেপরোয়া ও অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন কিছু দিন পরে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সিলেট ও ঢাকার অনেক নামীদামী হাসপাতালে ভর্তি করার পরও কোনো রোগ ধরা পড়েনি। কবিরাজিরও শেষ নেই। অবশেষে স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত বালাউটি সাহেবের। সব কিছু খুলে বলার পর বালাউটি সাহেব (রহ.) বললেন, এ রকম একটি উদ্দেশ্যের পূর্বে বিশেষ কোনো ব্যক্তিবর্গের সাথে পরামর্শ করা উচিৎ ছিলো। যা হবার হয়ে গেছে, এখন একটি ভেড়া জবাই করে বিরিয়ানী তৈরি করবেন। কবরের পাশে মিলাদ শরীফের পর শিন্নি বিতরণ করবেন। এটাই শেষ চিকিৎসা। তাও করা হলো। কিছুটা সুস্থ্য হলেও বছর খানেক পর আবার অজানা রোগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এ অবস্থায়ই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বহুযুগ ধরে কবরটি দেয়াল বেষ্টিত ছিলো না। নিশ্চিন্ন হয়ে যাবার ভয়ে অনুমান ভিত্তিক কবরটি দেয়াল বেষ্টিত করা হয়েছে। বালাউটি (রহ.) এসে বলেছিলেন পশ্চিমের দেয়াল ২ ফুট পশ্চিম দিকে এবং উত্তরের দেয়াল ২ ফুট উত্তর দিকে সরিয়ে নিতে হবে। কবরটি সংস্কারের অপেক্ষায়।
বৃক্ষরাজি কাটার পর বিদায় নিয়েছে নানান জাতির পক্ষিকুল ও জীবজন্তু। তখন মনে হতো মোকাম বাড়ি যেন একটি বিরান ভূমি। যে স্থানে বিরাট ধুম ধামে মিলাদ মাহফিল আর রুট শিন্নি’র আয়োজন করা হতো সে ভূমি আজ সবজি ক্ষেতের বাগান। আগের ঐতিহ্য এখন আর নেই। গঠন করা হয়েছে একটি কমিটি। গ্রামবাসির সহযোগিতায় নেগাল পূর্ব পাড়া জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় এ ওলির স্মরণে মিলাদ মাহফিল। এ কমিটিতে যখন যারাই আসবে তাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো এ কবরকে কেন্দ্র করে যাহাতে কোনো কুসংস্কারের জন্ম না হয় সেদিকে কড়া নজরদারী থাকতে হবে। এলাকাবাসির প্রস্তাব স্থান যেহেতু দু’ফুট এদিক সেদিক হয়েছে। নাম নিয়ে আরেকটু তথ্য নেওয়া প্রয়োজন যদিও ‘ইসমাইল শাহ’র মাযার নামে পরিচিত। কমিটির সদস্যবৃন্দ কোন ব্যক্তিবর্গের স্মরণাপন্ন হয়ে তাহা যাচাই করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • Developed by: Sparkle IT