ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটে উর্দু চর্চা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১০-২০১৯ ইং ০০:৪৩:৫০ | সংবাদটি ১৩৬ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
সিলেটে উর্দু ভাষায় লেখকের সংখ্যা অনেক। এখনো উর্দুতে কেউ কেউ লিখছেন। এর উপর সন্ধানী এবং বিস্তারিত লেখালেখি প্রায় হয়নি। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের গ্রন্থাগারিক নাসির উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে তথ্যাদি সংগ্রহ করেছিলেন। সিরাজ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সুর’ পত্রিকায় তার ধারাবাহিক লেখার কয়েক কিস্তি প্রকাশিত হয়। সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য সন্ধানে নিবেদিতপ্রাণ অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলী এ বিষয়ে একটি পা-ুলিপি তৈরী করেছেন। এতে তিনি শতাধিক সিলেটী উর্দু লেখকের নাম এবং তাদের গ্রন্থের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। অনেকের প্রকাশিত গ্রন্থ নেই। তবে মুখে মুখে তাদের কবিতা পঠিত ও গীত হয়।
অনেকের পা-ুলিপি আছে। প্রকাশিত হয়নি। কেউ কেউ একই পুস্তকে একাধিক ভাষা অর্থাৎ উর্দু আরবি ফারসি ব্যবহার করেছেন। এ সব পুস্তকের বিষয়ে বৈচিত্র আছে। ধর্ম, রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস, ব্যাকরণ, চিকিৎসা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, যুক্তিবিদ্যা, তজবিদ, অভিধান, ফেকাহ, আকাইদ এবং কবিতা কোনো কিছুই বাদ যায়নি। তবে নিরেট সাহিত্য বলতে যা বোঝায় তেমন গ্রন্থ নেই বললেই চলে। প্রকাশিত গ্রন্থাদির প্রায় সবই একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রণীত। মৌলিক গল্প উপন্যাসের সন্ধান এ যাবৎ পাওয়া যায়নি। কবিতা বা কসিদা প্রচুর রচিত হয়েছে। শায়দা, শওক, জওক, মস্ত প্রভৃতি ছদ্মনামে সৃজনশীল আলেমগণ কসিদা রচনা করেছেন। তাদের রচনার প্রায় সবই হামদ ও নাত এবং গজল। বিভিন্ন মাদ্রাসা আয়োজিত ওয়াজ মাহফিল এবং সিরাত মাহফিলগুলোতেও এখনো সুর করে তাদের কসিদা গাওয়া হয়। সিলেটের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নির্মাণে এবং চেতনার বিকাশে উর্দু ভাষার বিরামহীন চর্চা বিপুল অবদান রাখছে।
সিলেটে রচিত কসিদার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিখ্যাত কবিদের মধ্যে মাওলানা আনজব আলী শওক অন্যতম। শওক তাঁর কবি বা ছদ্মনাম। শওক খেলাফত আন্দোলনের জন্য কারাবরণ করেছিলেন। তাঁর জন্ম ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে কানাইঘাট থানার বানীগ্রামে। তিনি বিয়ানীবাজার ও বাহাদুরপুর মাদ্রাসা এবং সবশেষে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। গাছবাড়ী এবং গোয়াইনঘাট মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন প্রথম। সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসায় ২১ বছর শিক্ষকতা করে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে অবসর নেন। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
শওক এর প্রায় পঞ্চাশটি কসিদার একটি সংকলন ‘গুলদাস্তায়ে শওক’ নামে ষাটের দশকে প্রকাশিত হয় তার ইনতেকালের পর। মাওলানা ফজলে হক ও মাওলানা আতাউর রহমানের প্রচেষ্টায় প্রকাশিত এ সংকলনে কসিদাগুলো হামদ ও নাত। এর ভূমিকা লিখেছেন মাওলানা ইদ্রিস আহমদ সেবনগরী। শওক এর কসিদা সিলেট অঞ্চলে খুব জনপ্রিয় ছিল। প্রায় সকল জলসায় ছাত্ররা মিষ্টি সুরে তার কসিদা গাইতেন- শ্রোতারা তাতে মুগ্ধ হতেন। নমুনা স্বরূপ দুটি কসিদা :
এক. আয় খোদায়ে পাক দরিয়া ক্যায়সে হোঙ্গে পার হাম/ মওজ হ্যায় দরিয়া মে হরদম আওর হ্যায় বেইয়ার হাম।/ পুরখতর হ্যায় রাহে মনজিল জুরমকা আম্বার হ্যায়/ আয় খোদা কিউকর চলে সরপর লিয়ে ইয়ে বার হাম।/ পয়রবী মে নফসকে গুজরী হ্যায় সারে জিন্দেগী।/ শামতে আ’মাল হ্যায় বেহদ হুয়ে হ্যায় খার হাম।/ হুশ মে আয়ে হ্যায় লেকিন দিন গুজর জানে কে বা’দ/ রাত দিন করতে হ্যাঁয় আপনে জুরমকা ইকরার হাম।/ লেকে কশকু লে গদায়ী আয়ে হ্যায় দরপর তেরে।/ তুড়তে থে গরচে তওবা ক্বাবল আর্জি স’ বার হাম।/ কুচ নাহি সামান ইয়া রব নামায়ে আমাল মে।/ হাঁ ফকত ইয়ে হ্যায় গুলামে সইইদে আবরার হাম।/ হদ্ সে গুজরি হ্যায় মেরি তুগইয়ানিয়া গুমরাহিয়াঁ।/ নাম হ্যায় গফফার তেরা গরচে হ্যায় বদকার হাম।/ এক তরফ উমিদে দিল হ্যায় ফজলে রব হ্যায় এক তরফ/ রোজে মাহশর আয় খোদা হরগিজ না হোঙ্গে খার হাম।/ করদিয়া বেহদ্ হেরাসাঁ শওক কো ইস্ ফিকির নে/ হাত খালি ক্যায়সে হোঙ্গে হাজিরে দরবার হাম।
দুই. আয় বাদে ছাবা তুজসে ইয়ে ফরিয়াদ হ্যায় হরদম/ লে জা মুজে এক পলমে জাহা শাহে দু’আলম।/ দিশওয়ার হ্যায় সহনা মেরা আব দিল কা তাড়পনা/ কুচ ইনকো সুনাওঙ্গা মেরা কিসসায়ে পুরগম।/ ফির হাল বয়ান করকে ইহি আরজ করোঙ্গা।/ ফরমায়ে মুজপর নজর আয় হাদিয়ে আজম।/ রুখতে হো কিউ মুজে তুম আয় মেরে ইয়ারো/ বেকার নেহি হ্যায় ইয়ে মেরা নালা ও মাতম।/ রুতে হি রহোঙ্গা মুজে রুনে মে মজা হ্যায়/ আয় কাশ হো মনজুর মেরা নালায়ে পয়হম।/ জাতে হ্যায় আবাস দেখনে দরিয়া কা তামাশা/ দরিয়া তো বাহাতি হ্যায় মেরি দিদায়ে পুরনম।/ উঠতি হ্যায় সদা দিল মে মেরে মওজে তামান্না/ একবার বুলানা মুজে আয় মুফখখরে আদম।/ ধমকাতে হো ইয়ারো মুঝে তুম জওরে ফলক সে/ হরগিজ নেহি দিল মে মেরে উমিদে লিকা কম।/ আয় শওক পরিশান না হো চমকে গা মকদ্দর/ জিস রোজ বুলায়েঙ্গে তুঝে শাহে দু’আলম।
মাওলানা মো. হরমুজ উল্লা শায়দার জন্ম সিলেট সদর থানার তুড়–কখলা গ্রামে। ১৯০০ থেকে ১৯৯০-তার জীবনকাল। তিনি সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা ও পরে কলিকাতা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা, ঢাকা ও সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পাঠ্য গ্রন্থাদির পরিপূরক সহায়ক গ্রন্থ বা শরাহ রচনা করেন। তবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ছিল কাসিদার জন্য। জানা যায় তাঁর কসিদার সংকলন বের হয়েছিল। তবে অনেক সন্ধান করেও তা পাওয়া যায়নি। শায়দার কসিদার আংশিক নমুনা :
এক. মুমিন কে ছওয়া হামদ ও ছানা কৌন করেগা।/ তওকিরে মুহম্মদ কি সাজা কৌন করেগা।/ তাহমিদে সাজাওয়ার খুদা কৌন করেগা।/ সিজদা ভি আদা সুবহ ও মাসা কৌন করেগা।
দুই. মউতে আলিম মউতে আলম হো গায়ি/ চশমে দুনিয়া গম সে পুরনম হো গায়ি।/ আহ হোসাইন আহমদ কি ওফাতে পুরমলাল/ বায়িছে এক আম মাতম হো গায়ি।/ ছুপ গায়া হ্যায় আফতাবে ইলমে ফন/ হোগায়ি তারিক সারি আনজুমন।/ জিনকা ফয়জে খাস কি শুহরতে আম/ জিন কো মানা হ্যায় জমানে নে ইমাম।
এছাড়া মাওলানা আব্দুল লতিফ ফুলতলীর কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। মাওলানা আব্দুল লতিফ চৌধুরী বর্তমান জকিগঞ্জ থানার মানিকপুর ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামে ১৩২১ বঙ্গাব্দে (১৯১৪ খ্রি.) জন্মগ্রহণ করেন। ক্বারী সুবক্তা মাওলানা ফুলতলীর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে নালায়ে কলন্দর। এটি প্রকাশ করেছেন তাঁর পুত্র লেখক অনুবাদক মাওলানা মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দিন ফুলতলী। কুড়িটি পৃথক পৃথক শিরোনামে প্রকাশিত হামদ, নাত, দোয়ার সাথে হযরত শাহ মোহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরীর মুনাজাতও নালায়ে কলন্দরে ঠাই পেয়েছে। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে সংকলনটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। নাদামত শীর্ষক কবিতাটি নমুনা স্বরূপ উদ্ধৃত করা হলো :
শরম সারি হ্যায় হামারি জুরম কে আম্বার পর/ হাঁস রহা শয়তান হামারি খুইয়ে বদকিরদার পর।/ জিন্দেগী বরবাদ মেরী শামতে আমাল পর।/ বদনসিবী চাহা গায়ি হ্যায় জুরমকে আসরার পর।/ হ্যায় জওয়ানী উমর কো ম্যয় বেখবর বরবাদ কী/ হায় মেরা শরমসারি য়াহাদ কি এক্বরার পর।/ কুওতে উমরে জওয়ানী খু গায়ি দওলত মেরি/ সর পে লি বারে গুনা হাজির হুয়া দরবার পর।/ রহমতে আলম কে খাতির মেরা বেড়া পার কর/ মওজে দরিয়া মে তালাতুম কশতি হ্যায় উতার পর।/ পারসায়ি হ্যায় হামারি বায়িসে শরমিনদেগী।/ দিল লাগি হরগিজ নেহি দিল দাদা ও দিলদার পর।/ আয় কলন্দর কিয়া তুজে আনজাম কা কুচ হায় খবর।/ সামনে সকরাত তেরা ফের ঠিকানা হ্যায় কবর।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জল শতবর্ষ
  • পুরান পাথরের যুগ থেকে
  • সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ বছর
  • চৌধূরী শব্দ ও প্রথার ইতিবৃত্ত
  • ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ
  • ১৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেট স্টেশন ক্লাব
  • একাত্তরের শরণার্থী জীবন
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মণিপুরী সম্প্রদায় ও তাদের সংস্কৃতি
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • মোকাম বাড়ি ও হযরত ইসমাইল শাহ (রহ.)
  • সিলেটে উর্দু চর্চা
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • Developed by: Sparkle IT