শিশু মেলা গল্প

বৃদ্ধাশ্রম

কামরুল আলম প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-১০-২০১৯ ইং ০০:০৩:৩৩ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত


‘মা, তোমার জন্যে একটা সারপ্রাইজ আছে!’ মায়ের কাছে বসতে বসতে বলল ইমরান আরেফিন।
‘আমার জন্যে সারপ্রাইজ! আর কী সারপ্রাইজ বাকি রেখেছিস আমার জন্যে? বিয়ে করেছিস চাকরিজীবী মহিলাকে, এখন নাতিটাকে আমার কাছে রেখে দুজনে বেরিয়ে যাস প্রতিদিন। সারাটাদিন আমরা দাদি-নাতির কীভাবে কাটে, কোনো খোঁজ রাখিস?’
‘আহ রাগ করো কেন মা, তাওসিফ তো তোমার কাছেই ভালো থাকে।’
‘তা থাকে, কিন্তু তোদের এই পঁচা বাসায় আর আমি থাকতে পারব না। সারাদিন পানি থাকে না; বাসা ভাড়া কার কাছ থেকে নিয়েছিস? কথা বলতে পারিস না?’
‘ওহ মা! এ নিয়ে সাতটি বাসা চেঞ্জ করা হলো। তবু তোমার মনের মতো বাসা তো খুঁজে পেলাম না।’
‘সাতবার বদলেছিস তো কী হয়েছে? এবার আট নাম্বারে একটা বাসা দেখ তো; আমার আর ভাল্লাগে না।’
‘মা, আমাদেরও কি ভাল্লাগে! আসলে ভাড়াটে বাসায় এরকমই হয়। সব সুবিধা একসাথে পাওয়া যায় না। মা, আমি তোমার জন্যে যে সারপ্রাইজটার কথা বললাম, তা জানতে ইচ্ছে করছে না?’
‘না, তোর এসব সারপ্রাইজ-টারপ্রাইজ দিয়ে আমি কী করব? কী এনেছিস দেয় দেখি।’
‘আনিনি মা; এবার তোমাকে নিয়ে যাব সেখানে।’
‘আমি পারব না, এই চারতলা বাসা থেকে নামতে উঠতে আমার কষ্ট হয়।’
‘চিন্তা করো না মা, তোমাকে দরকার হলে হুইলচেয়ার দিয়েই নামাব।’
‘তা কোথায় নিয়ে যাবি, সেটা তো বলবি।’
‘তুমি যেখানে যাওয়ার কথা বলো; এমনি এমনি বলো না, রাগ করে বলো।’
‘মানে, তুই কি আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে যাবি?’
ইমরানের মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বুকের ব্যথাটা বাড়ছে তাঁর। কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। চুপ করে বসে আছেন।
‘আব্বু আব্বু, দাদুকে তুমি কোথায় নিয়ে যাবে?’ তাওসিফ এসে দাঁড়াল ইমরান আরেফিনের পাশে। দরজার ওপাশে দাঁড়ানো তাওসিফের মা মাসুদা।
‘বাবা তাওসিফ, আব্বু ঠিক করেছি তোমার দাদুকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসব।’
‘আর আমাকে কোথায় রেখে আসবে?’
‘তোমাকে? তোমাকে আবার রেখে আসব কেন?’
‘আমি কি তোমাদের সাথেই থাকব?’
‘হ্যাঁ, তুমি তো আমাদের সাথেই থাকবে।’
‘কিন্তু তোমরা তো রোজ অফিসে চলে যাবে, আমি কার কাছে থাকব?’
‘তুমি তো বড় হয়ে গেছো। তোমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবো। তুমি তখন স্কুলেই থাকবে। আর বাসায় একটা কাজের বুয়া রাখব। সে তোমাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসবে। তোমার সাথে খেলবে।’
‘না, আমি দাদুর কাছেই থাকব। তুমি যদি দাদুকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো, তাহলে আমাকেও দাদুর কাছে রেখে আসবে।’
মায়ের মুখের দিকে তাকাল ইমরান। খুব কষ্ট পেয়েছেন ভদ্রমহিলা। ইমরান তাকে ইচ্ছে করে এই কষ্ট দিতে চায়নি। কিন্তু রোজ বকর বকর করেন, সকালের ঘুম নষ্ট করেন। সবসময় মায়ের একটাই কথা, ‘ভালো বাসা যদি খুঁজে না পাও, আমাকে যদি ভালো একটা বাসায় রাখতে না পারো তাহলে বৃদ্ধাশ্রমেই রেখে আসো।’
আজ ইমরান আরেফিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। এবার মায়ের জন্যে অন্তত একটা কাজের মতো কাজ করতে পেরেছে সে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে মুঠোফোন টিপছিল ইমরান। তার মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে মাসুদা বলল, ‘কী গো, তুমি কি সত্যি সত্যি তোমার মাকে আশ্রমে রেখে আসবে?’
‘কেন তুমি খুশি হওনি? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। নাকি ছেলেকে কার কাছে রাখবে সেটা ভেবে খারাপ লাগছে?’
‘ছিঃ এসব কেমন কথা? তবে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালে লোকে তো আমাদেরকে খারাপ ভাববে, তাই নয়কি? তাছাড়া উনার এখন যে বয়স আর শরীরের যে কন্ডিশন; যে কোনো সময় মারা যেতে পারেন। এতদিন কষ্ট করলে, এখন শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোটা কি ঠিক হবে?’
‘হবে, প্রয়োজনে তোমাকেও বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেবো।’
মুখে রাগ তৈরির চেষ্টা করে বলল ইমরান। চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে দ্রুত উঠল ইমরান। একেবারে দ্রুত। ফজরের আজান হওয়ার সাথে সাথে। অযু করে মসজিদে রওয়ানা হলো সে। সপ্তাহে এই একটা দিন পাঁচওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে পড়ার চেষ্টা করে ইমরান। ফজরের নামাজ থেকে এসেই তাওসিফকে ঘুম থেকে উঠাল সে। মাসুদাও ইতোমধ্যে চা রেডি করে ফেলেছে। জানে শুক্রবারে ইমরান হইচই করতে পছন্দ করে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠবে, ছেলের সাথে খেলবে। আজ অবাক হয়ে দেখল, ইমরানের মুখটা বেশ গম্ভীর।
‘কী গো, আজ মুখটাকে এমন বাংলা পাঁচের মতো করে রেখেছো কেন?’ মাসুদা চায়ের কাপটি এগিয়ে দিতে দিতে বলল।
‘না মানে, একটু পরেই তো মাকে নিয়ে বের হব।’
‘মানে কি, আজকেই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেবে মাকে?’
‘হ্যাঁ, আজকেই।’
‘কিন্তু...’।
‘কিন্তু কী? এত কিন্তু কিন্তু করে লাভ নেই। মাকে ডাকো। তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।’
‘উনি উঠেছেন দেখলাম। ইনসুলিন নিচ্ছেন। তার জন্যে নাস্তাও রেডি করে রেখেছি।’
‘নাস্তা খাওয়া শেষ হলেই বের হব। হাসান ড্রাইভারকে আসতে বলেছি।’
মায়ের চোখে অশ্রুর ফোঁটা। টপ টপ করে পড়ছে। ইমরান দাঁড়িয়ে আছে ব্যাগ হাতে। মাকে কী বলে সান্ত¦না দেবে তাই ভাবছে সে।
‘মা, তুমি কাঁদছো কেন? তুমিই তো বলতে তোমাকে যেন বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি। তুমি না চাইলে ক্যানসেল করে দেবো। তুমি কি যেতে চাও না মা?’
টিস্যু দিয়ে চোখ মুছলেন হুমায়রা বেগম। চশমাটা ঠিক করে পরলেন। আর কাঁদবেন না তিনি।
‘চল, তোদেরকে ছেড়ে একা একা থাকতে হবে ভেবেই কষ্ট পাচ্ছিলাম।’
মাকে নিয়ে শাদা রঙের কারে উঠল ইমরান।
‘আব্বু আমাকে নিয়ে যাও।’ তাওসিফ এসে আবদার করে বসল।
‘না বাবা, তুমি তোমার মায়ের কাছেই থাকো।’
‘তাহলে তুমিও তোমার মায়ের কাছে থাকো, এখানে আর ফিরে এসো না। আব্বু তুমি দুষ্টু হয়ে গেছো, কেন দাদুকে বৃদ্ধশ্রমে রেখে আসবে? দাদুর তো কষ্ট হবে সেখানে!’
‘কষ্ট হবে না বাবা, সেখানে তো দাদুর মতো অনেক বৃদ্ধ মহিলা থাকবে। ওদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বেশ ভালোই সময় কাটাতে পারবেন তোমার দাদু। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়ো।’
গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর হুমায়রা বেগম ছেলেকে বললেন, ‘ইমরান আমার ফোনটা ভুলে রেখে এসেছি। গাড়ি ঘুরাতে বল।’
‘থাক না মা, ওখানে তো ফোন ব্যবহার করা নিষেধ। ভালোই হয়েছে। তোমার ফোনটা দিয়ে তাওসিফ গেম খেলবে।’
‘ওখানে ফোন ব্যবহার নিষেধ?’ অবাককণ্ঠে জানতে চাইলেন হুমায়রা বেগম।
‘হ্যাঁ মা, বৃদ্ধাশ্রম অনেকটাই কারাগারের মতো।’
‘তাহলে আমার কোনো অসুবিধা হলে তোদের সাথে যোগাযোগ করব কীভাবে?’
‘ওরাই করবে, ওখানে তো আমাদের নাম্বার থাকবে। কোনো দরকার হলে ওরাই আমাদেরকে জানাবে।’
‘আচ্ছা ইমরান, তোরা কি আমাকে মাঝে মাঝে দেখতে আসবি না?’
‘হ্যাঁ যাবো। ছুটির দিনে দেখার করার সুযোগ আছে। জানো মা, তুমি যে রুমটাতে থাকবে, সেটায় একটা বড় ব্যালকনি আছে। তুমি ওখানে বসে বসে তসবিহ জপতে পারবে। আমরা গেলে নিচের দিকে তাকালেই দেখতে পাবে।’
‘কয়তলায় রুমটা?’
‘দোতলায় মা। তোমার জন্যে দোতলার পশ্চিম কর্নারের রুমটা বুকিং দিয়েছি। তোমার কোনো কষ্ট হবে না। বাথরুমে হাইকমোড-ল’কমোড দুটোই আছে। তোমার যেটা ইচ্ছে ব্যবহার করতে পারবে।’
‘একরুমে কি আমি একাই থাকব, নাকি আরও মহিলারাও থাকবে?’
‘তুমি একাই থাকবে মা। আমি জানি তো অন্যদের সাথে রুম শেয়ারিং তোমার পছন্দ হবে না! তোমার রুমে একটা টেলিভিশনও থাকবে মা, তুমি সময় কাটাতে পারবে।’
‘এতকিছু যখন থাকবে, তাহলে তোরাও চলে আয় না আরেকটা রুম বুকিং দিয়ে। সবাই একসাথে থাকলাম।’
‘মা তা কী করে হয়? এটা তো বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধ মহিলারাই শুধু থাকে।’
‘পুরুষরা থাকে না?’
‘থাকে, তাদের জন্যে আলাদা ইউনিট। তবে মা আজ তুমি রুমটা দেখে চলে আসবে। তোমার যদি পছন্দ হয় তাহলে আগামী মাসেই তোমাকে এখানে রেখে যাব।’
হুমায়রা বেগমের কষ্টটা হালকা হলো। যাক ছেলেটা আজকেই ফেলে যাচ্ছে না তাকে।
একটি চারতলা ভবনের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়ালো। গেট ভেতর থেকে লক করা। গেটের ডানপাশে বড় বড় অক্ষরে লেখাÑ‘হুমায়রা ভিলা’। তার নিচে ছোট করে লেখাÑ‘হুমায়রা বেগম, স্বামী মৃত আরমান আলী।’
হুমায়রা বেগম চোখের চশমাটা খুলে ফেললেন। তাঁর বিশ্বাস হচ্ছে না। চশমার কারণে তিনি কি ভুল দেখছেন? না, চশমা ছাড়াও তো দেখা যাচ্ছে লেখাটি। হুমায়রা ভিলা, এ যে একদম তাঁর নিজের নামেই তৈরি করা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমটি।
চোখ দিয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তাঁর।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT