ধর্ম ও জীবন

ইসলামী বিবাহ : তাৎপর্য ও বিধান

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-১১-২০১৯ ইং ০০:৫৫:৩২ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

মানবজীবনের পরিপূর্ণতার জন্য যা কিছু অতি প্রয়োজন তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিবাহ। বিবাহ কারো জন্য সুন্নত, কারো জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ আবার কারো জন্য ওয়াজিব হয়ে থাকে। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাই হচ্ছে মানুষের ধর্ম। এর জন্য প্রয়োজন পরিণত বয়সে যুগল জীবনে পদার্পন করা। যার মাধ্যমে সমাজবদ্ধতার পূর্ণতা আসে। ইসলাম নারী-পুরুষের মধে সুন্দর ও পবিত জীবনযাপনের জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিবাহের মাধ্যমে পরিবারিক জীবনে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পরস্পরের মধ্যে অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের অপরিহার্যতা আরোপিত হয়। বিবাহ না করে বৈরাগ্য জীবনযাপন ইসলাম সমর্থন করে না। প্রজনন ও বংশ বিস্তারের প্রথম ও প্রধান সোঁপান হচ্ছে বিবাহ। দৈহিক ও মানসিক প্রশান্তির জন্য মহান আল্লাহ প্রদত্ত এক অনন্য মহৌষধ হচ্ছে বিবাহ। বিবাহ ইসলামের শাশ্বত বিধান, অকাট্য বিধান। এ বিধান পালনে মানুষ লাভ করে যৌবনের স্বাদ, মনের প্রশান্তি এবং ঈমানের পূর্ণতা। তাই মানবজীবনে বিবাহের গুরুত্ব অপরিসীম। বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। বিবাহের গুরুত্ব বর্ণনা করে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-‘তাঁর নিদর্শনাবলীর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্যে হতেই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সংগিনীদেরকে যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা : রুম, আয়াত : ২১)
উত্তম স্বামী বা স্ত্রী পাবার জন্য আল্লাহ পাক হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর মাধ্যমে একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছে- ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে চক্ষু শীতলকারী স্ত্রী সন্তান দান কর’ (সূরা ফুরকান: আয়াত-৭৪)। হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) এর মধ্যে মানব সৃষ্টির ইতিহাসের প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়। স্বয়ং মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহপাক হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) এর শাদী মোবারকের খুতবা পাঠ করেন। খুতবা পাঠের সাথে সাথে ফেরেস্তারা আনন্দ উৎসব করেন এবং পরস্পরকে মোবারকবাদ জানিয়ে অলংকারাদি ও হীরা-জহরত উৎসর্গ করতে থাকেন। হযরত আদম (আ:) বিবি হাওয়া (আ:) এর সাথে দৈহিক মিলনে প্রবৃত্ত হতে চাইলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আওয়াজ এল- হে আদম! যতক্ষণ পর্যন্ত হাওয়ার মহর আদায় না করছ, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তোমার জন্য হালাল নয়। এ সতর্কবাণী পেয়ে হযরত আদম (আ:) নিবেদন করলেন- হে আল্লাহ! আমি কেমন করে হাওয়ার মহর আদায় করব? আল্লাহপাক আদেশ করলেন- আমার হাবীব হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি দশবার দুরূদ পাঠ কর, তাতেই হাওয়ার মহর পরিশোধ হয়ে যাবে। রাসূল (সা:) এর সম্মানিত ও পবিত্র নাম শুনতেই হযরত আদম (আ:) তাঁর দর্শন লাভের প্রত্যাশী হলেন। আল্লাহপাক আদেশ করলেন- তুমি তোমার হাতের নখের প্রতি দৃষ্টি দাও। হযরত (আ:) তাঁর হাতের নখের প্রতি দৃষ্টি দিতেই হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর আকৃতি তাঁর নজর কেড়ে নিল। ফলে হযরত আদম (আ:) খুবই আগ্রহ সহকারে হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর প্রতি দশবার দুরূদ শরীফ পাঠ করেন। তখন আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- হে আদম! তুমি যে দুরূদ পাঠ করেছ, তার মর্যাদা এতই বেশি যে, যার কল্যাণে আমি তোমার জন্য হাওয়াকে হালাল করে দিলাম। এভাবেই মানব সৃষ্টির ইতিহাসের প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়।
অগণিত হাদীসে বিবাহের গুরুত্ব ও বিধিবিধান বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন- ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা, বিবাহ চক্ষুকে অবনত করে এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষা করে। আর যে সামর্থ্য রাখেনা সে যেন রোজা রাখে। রোজা হল তার জন্য খোজা হওয়া’ (বুখারী ও মুসলিম)। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন-‘চারটি কাজ রাসূলগণের সুন্নত- (১) লজ্জা, (২) সুগন্ধি, (৩) মিসওয়াক, (৪) বিবাহ। (তিরমিজী ১ম খন্ড : পৃষ্ঠা-২০৬)
হযরত আয়শা (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (রা:) ইরশাদ করেন- ‘বিবাহ আমার সুন্নত। যে সার্মথ্য থাকার পরও এই সুন্নত পালন থেকে বিরত থাকবে সে আমার দলভুক্ত নহে’। (ইবনে মাজাহ: পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৩)
হযরত আনাস (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন-‘যখন বান্দা বিবাহ করল, নিশ্চয়ই সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করল এবং বাকী অর্ধেক সম্পর্কে সে আল্লাহকে ভয় করবে’। (বায়হাকী, মিশকাত: পৃষ্ঠা-২৬৮)
ইসলাম পুরুষকে যেমন পাত্রী নির্বাচনের অধিকার দিয়েছে তেমনি নারীকে তার পছন্দমত পাত্র নির্বাচনের অধিকার দিয়েছে। তবে যে কাউকে বিবাহ করলে সংসার সুখের হবে না। বিবাহে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ধার্মিকতার বিষয়টিকে অতি গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, ‘নারীকে বিবাহ করা হয় চার কারণে- (১) ধনের কারণে, (২) বংশ মর্যাদার কারণে, (৩) সৌন্দর্যের কারণে। (৪) ধার্মিকতার কারণে। সুতরাং ধার্মিক নারী লাভ করতে চেষ্টা করবে। ধার্মিকতা ছাড়া অন্য নারী বিবাহ করলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।’ (বুখারী ও মুসলিম)। ধার্মিক ও সৎ নারীর মহিমা বর্ণনা করে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন- ‘গোটা দুনিয়াটাই হল সম্পদ। আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল সতী সাধ্বী নারী’ (মুসলিম, মিশকাত : পৃষ্ঠা-২৬৭)।
বিবাহে কনেকে মোহর প্রদান করা ফরজ। ইরশাদ হচ্ছে- ‘তোমরা নারীদেরকে খুশি মনে মোহর প্রদান কর’। (সূরা নিসা: আয়াত-৪)
স্বামীর সাধ্য অনুযায়ী মোহর নির্ধারিত হবে। মোহরের সর্বনি¤œ পরিমাণ দশ দিরহাম। এটা প্রায় পৌণে তিন তোলা রূপার সমান। স্বামী সম্পদশালী হলে মোহরে ফাতেমী ধার্য করা সুন্নত। মোহরে ফাতেমী হলো ১৫০ তোলা রূপার মূল্য সমান। আমাদের সমাজে অনেকে নিজেদের বড়ত্ব দেখানোর জন্য মোটা অংকের টাকা মোহর দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। পরে তা আদায় করেন না। এনিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটে থাকে তুলকালাম কান্ড। এটা মোটেই কাম্য নয়। স্বামীর সাধ্য অনুযায়ী মোহর নির্ধারণ করতে হবে। মোহর অবশ্যই সঠিকভাবে আদায় করতে হবে। পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের পূর্বে বা পরে যৌতুক নিয়ে যে দর কষাকষি চলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। হিন্দু সমাজ থেকেই যৌতুকের উৎপত্তি। অথচ সেই যৌতুক নিয়ে আমাদের ইসলামী বিবাহে চলে রীতিমত দর কষাকষি। যৌতুক ছাড়া আমাদের সমাজে কোনো বিয়েই হয় না। দুঃখেরসাথে প্রশ্ন করতে হয়- আমরা মুসলমান। বিবাহ উপলক্ষ্যে আমরা যতটি পর্ব পালন করি, তার কোনো একটি পর্ব কি আমরা ইসলামী রীতিতে পালন করে থাকি? ইসলামী রীতিতে আমরা বিবাহের পর্ব সমূহ পালন করিনা কেন? ইসলামী রীতিতে বিবাহের পর্ব সমূহ পালন করতে অসুবিধা কোথায়? বিবাহের পর ওয়ালীমা করা সুন্নত। ওয়ালীমাই হচ্ছে প্রতিটি বিবাহের মূল আপ্যায়ন। রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন-‘ওয়ালিমা কর একটি বকরি দিয়ে হলেও’। (বুখারী ও মুসলিম)
আমাদের সমাজে বিবাহে অনেকেই ওয়ালীমা করেন না। আর যারা নামে মাত্র ওয়ালীমা করেন তারা কেবল ধনীদেরকে দাওয়াত দেন: গরীবদের ওয়ালীমায় কোনো দাওয়াত দেন না। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন-‘সর্বাপেক্ষা মন্দ খানা হচ্ছে ওয়ালীমার সেই খানা, যাতে ধনীদের দাওয়াত করা হয় আর গরীবদেরকে ত্যাগ করা হয়’ (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-২৭৮)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT