পাঁচ মিশালী

‘মিঠে কড়া’ আহমেদুর রহমান

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১১-২০১৯ ইং ০০:৪২:৩০ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

কায়রোর বিমান দুর্ঘটনার কথা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। ভুলবারই কথা। সে তো ৪৫ বছর আগে ঘটেছিলো। সেদিন ছিলো বৃহস্পতিবার। ২০ মে, ১৯৬৫ সাল। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইন্সের ওই বিমানের যাত্রী ছিলেন ১২৮ জন। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১২২ জন নিহত হন এবং ৫ জন গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
ফ্লাইটটি ছিলো করাচি থেকে দাহরাইন, কায়রো ও জেনেভা হয়ে লন্ডন গমনের উদ্দেশ্যে বিমান পথের উদ্বোধনী যাত্রা। কায়রো বিমানবন্দরে অবতরণ করার মাত্র দুই মিনিট পূর্বে বিমানটি সুয়েজ-কায়রো সড়কের ৪ মাইল দূরে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এই বিমান দুর্ঘটনা পাকিস্তানের ইতিহাসে বৃহত্তম বিমান দুর্ঘটনা এবং এটি পি আই এর প্রথম বোয়িং দুর্ঘটনা। দেশের ২৬ জন খ্যাতিমান সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশার নামিদামি ১২২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদে সেদিন সাংবাদিক সমাজ ও দেশবাসী শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন।
কায়রোর এই বিমান দুর্ঘটনা পাকিস্তানের বিশেষ করে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিকতা জগতে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছিলো। মুহূর্তের ব্যবধানে মৃত্যু আমাদের দেশের খ্যাতিমান ও প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দকে চিরতরে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মাতৃভূমি থেকে অনেক দূরে মিসরের বালুময় মরুভূমিতে অন্তিম শয্যা নিয়েছেন তারা। দেশের মাটি থেকে বহুদূরে বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে যারা অকালে অসময়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারালেন, তাদের মধ্যে ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর আহমেদুর রহমান, প্রতিষ্ঠাবান প্রবীন সাংবাদিক মর্নিং নিউজ-এর আব্দুল হান্নান, দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হক, পাকিস্তান অবজারভার-এর সহ সম্পাদক ফরিদুদ্দিন আহমদ, চট্টগ্রামের দৈনিক ইউনিটি’র সম্পাদক জনাব মবিন, জাতীয় প্রেস ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হায়া উদ্দিন এবং দৈনিক পয়গাম-এর জেনারেল ম্যানেজার আখতারুজ্জামান খান বাচ্চু।
কায়রো বিমান দুর্ঘটনায় যে সব সাংবাদিককে আমরা হারিয়েছি তাঁরা সবাই দেশের প্রথম সারির সাংবাদিক। সাংবাদিকতা পেশায় তারা ছিলেন সাহসী ও নিবেদিত। সেকালে সাংবাদিকতা পেশা এত প্রসারিত ছিলো না। নানা সীমাবদ্ধতা এবং একই সাথে সরকারি বৈরিতা ও দমননীতির মোকাবিলা করেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করতে হতো। তখন ছিলো আইয়ুব দুঃশাসনের যুগ। গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন সহ বিভিন্ন দাবি প্রতিষ্ঠার চলমান সংগ্রাম আন্দোলনে দেশের সচেতন সাংবাদিক সমাজও দেশবাসীর পাশে ছিলেন। কায়রো দুর্ঘটনায় নিহত সাংবাদিকদের অবর্তমানে দেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কায়রো থেকে যারা স্বদেশে ফিরে আসেননি তাদের মধ্যে আছেন দেশের সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক আহমেদুর রহমান। দেশের গণতান্ত্রিক ও ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে আহমেদুর রহমানের। দেশের লড়াকু ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু)-এর দায়িত্বশীল কর্মী ছিলেন আহমেদুর রহমান। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কৃতি সংসদের কোষাধ্যক্ষ। এছাড়া দেশের পুরোধা সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। আহমেদুর রহমান একজন শক্তিশালী লেখক ও সংগঠক ছিলেন। ১৯৬২ সালে স্বৈরশাসক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এই হুলিয়ার খড়গ মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস ব্যাপী তিনি ঢাকায় ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেন।
আহমেদুর রহমান সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন না। তিনি স্কুলের ছাত্রাবস্থায় (৯ম শ্রেণি) তাঁর পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুর কারণে তাঁর জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। পড়ালেখা ও জীবন ধারণের জন্য তখন তাঁকে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাত-এ যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিক জীবনের শুরু। ১৯৫৯ সালে মিল্লাত বন্ধ হওয়া পর্যন্ত তিনি মিল্লাতের সহকারী সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ওই বছরই তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার দৈনিক ইত্তেফাক-এ যোগদান করেন। আজীবন ইত্তেফাকের সঙ্গে আহমেদুর রহমানের গাঁটছড়া ছিলো। মানিক মিয়ার সান্নিধ্যে ইত্তেফাকের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিক জীবন সাফল্য ও উজ্জ্বলতার প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। মানিক মিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বি কলাম ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’র পাশাপাশি আহমেদুর রহমানের কলাম ‘মিঠে কড়া’ও অবিশ্বাস্যরূপে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। তিনি লিখতেন ‘ভীমরুল’ ছদ্মনামে। ষাটের দশকে আইয়ুবী দুঃসময়ে এদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ইত্তেফাকের ওই দুটি কলামের অবদান কোনোভাবেই বিস্মৃত হবার নয়। তাঁর লেখায় নির্মোহভাবে সত্য ও স্পষ্টবাদিতার বিরল সাক্ষাৎ পাওয়া যেতো। যে কোনো বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন আলাদা মাত্রা নিয়ে পাঠকদের বিষয়ের গভীরে নিয়ে যেতো। ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিলের মৃত্যুর র মাসিক ‘পৃথিবী’র ফেব্রুয়ারি ’৬৫ সংখ্যায় আহমেদুর রহমান একটি ব্যতিক্রমধর্মী সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখেছিলেন। চার্চিলের মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও বাংলা একাডেমীর মতো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সত্যের মাথা খেয়ে চাটুক্তি করে যে শোকবাণী দিয়েছিলো, তাতে তিনি উৎপীড়িত বোধ করেন। চার্চিলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি নির্দয় কিছু সত্য উচ্চারণ করেন। তিনি লিখেছিলেন এক. জীবনে ও মৃত্যুতে স্যার উইনস্টন চার্চিলের যেটা বড় পরিচয় তা হোল, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের শেষ প্রহরী। তার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত দুটো- এক ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যকে অক্ষুণœ রাখা; দুই. কম্যুনিজমকে ধ্বংস করা। পাক-ভারত উপমহাদেশের ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের তিন মাস পরেও তিনি সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন- I have not become the king’s first minister to presi de over the liquidation of the British Empire.
(২) বলা যায়, আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি কার্যকলাপের উদ্যোক্তা ছিলেন স্যার উইনস্টন চার্চিল কম্যুনিজমের প্রতি তার মজ্জাগত বিদ্বেষই তাকে ইউরোপে ফ্যাসিজমের সবচেয়ে বড় সহায়ক বস্তুতে পরিণত করেছিলো। একবার ইতালিতে বেড়াতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, তিনি ইতালির অধিবাসী হলে কায়মনোবাক্যে মুসোলিনীর নেতৃত্ব মেনে নিতেন। কিন্তু চার্চিলের ইচ্ছা এবং অভিলাষের বিরুদ্ধেই ইতিহাসের গতি অগ্রবর্তী হয়েছে।
(৩).... তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন একজন হতাশ্বাস নিস্ফল ব্যক্তিরূপে। মানবজাতির ইতিহাসের অগ্রগতিতে তার অবদান প্রায় একটি শূন্য ছাড়া আর কিছুই নয়। তবুও অবশ্য তার মৃত্যুতে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। কেননা, মৃত্যুতে শোক প্রকাশই প্রচলিত রীতি।’
আহমেদুর রহমানের আর একটি অগ্নিক্ষরা প্রবন্ধ ‘যুদ্ধ নয় শান্তি’। তিনি লেখাটি তৈরি করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু) কেন্দ্রীয় সম্মেলন ও কাউন্সিল ১৯৬৫ উপলক্ষে। প্রদেশের সকল জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত বিপুল সংখ্যক ছাত্রকর্মী ও সুধীজনের উপস্থিতিতে ২ এপ্রিল ’৬৫ সম্মেলনের আলোচনা অধিবেশনে আহমেদুর রহমান প্রবন্ধটি পাঠ করেন। পাঠ শেষে সম্মেলনস্থলেই লেখক বিপুলভাবে অভিনন্দিত হন। সমকালীন উত্তেজনাপূর্ণ বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট লেখার বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বাগ্র অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৪ এপ্রিল প্রবন্ধটি হুবহু দৈনিক সংবাদ-এ ছাপা হয়। ওই বছর ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের ৬ দিন ব্যাপী (১০-১৫ জুলাই) অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের অধিবেশনকে সামনে রেখে দেশের একজন বিশিষ্ট শান্তি-সংগ্রামীর বক্তব্য হিসেবে সংবাদ কর্তৃপক্ষ দৈনিক সংবাদের মাধ্যমে পুনরায় লেখাটি জনসমক্ষে তুলে ধরেন। বস্তুত আমাদের শান্তি আন্দোলন গড়ে তোলার পথনির্দেশ হিসেবে প্রবন্ধটি বিবেচিত হয়েছিলো। আহমেদুর রহমানের প্রবন্ধ পাঠ আমি তন্ময় হয়ে শুনেছিলাম। বিমোহিত হয়েছিলাম তাঁর বাচনভঙ্গি ও যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য শ্রবণে। তাঁর চোখের চাহনিতে তীব্র একটা আকর্ষণী শক্তি ছিলো। সে আকর্ষণ আমাকে টেনে নিয়েছিলো তাঁর কাছে। মফস্বলের ভয়ভীতি ও পিছুটান তখনো কাটে নাই। তবুও নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে কথা বলে পরিচিত হলাম। বেশি কথা হয়নি, সে সুযোগও ছিলো না। তবুও দরদভরা কন্ঠে বলেছিলেন, ঢাকা এলে দেখা করবেন ইত্তেফাকে। সে সময় আর ঢাকা যাওয়া হয়নি, ইত্তেফাকে দেখাও হয়নি। পরে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন প্রায়ই মনে পড়তো প্রিয় সাংবাদিক প্রিয় কলাম রেখক আহমেদুর রহমানকে। স্বল্প দেখায় এবং ক্ষণিকের পরিচয়ে আমার মনে হয়েছে তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর প্রিয়, নিরভিমান ও স্বল্পভাষী। অল্পতেই তিনি সন্তুষ্টি ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বেশির প্রতি লোভ ছিলো না তাঁর।
আহমেদুর রহমানের জন্ম ১৯৩৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার সরাইলে। তাঁর পিতা আবদুর রহমান এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। মেট্রিক পাশের পর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে পড়ালেখা চালাতে হয়েছে। তিনি ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে মাস্টার করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা তাঁকে অকালে হারালাম। তিনি মাত্র ৩২ বছর বেঁচেছিলেন।
সম্ভাবনাময় জীবনে আঁচল ভরা সাফল্যের হাতছানি ছিলো দেশের সংবাদপত্র মহলের উজ্জ্বলরতœ আহমেদুর রহমানের প্রতি। কল্যাণমুখী কাজ নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তিনি। লেখালেখি, রাজনীতি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নিয়ে ডুবে থাকতেন তিনি। বিশ্রাম নেওয়ার সময় ছিলো না তাঁর। অন্য পাঁচটা কর্তব্য কর্মের মতো ¯œানাহারও একটা কাজ ছিলো তাঁর কাছে। এত ব্যস্ততার মধ্যে (নিজের জন্য কোনো ব্যস্ততা ছিলো না) জরুরি কাজ ফেলে, পূর্ব নির্দারিত সূচিগুলো স্থগিত করে মরুময় মিশরের হাতছানিতে তিনি পি আই এ’র বিমানে আরোহী হয়েছিলেন। এরপর কোনো জরুরি কাজ আর তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি। সব ফেলে রেখে, সব কর্মসূচি, সব তাগিদ পিছনে ফেলে তিনি চিরতরে হারিয়ে গেছেন এই সুন্দর পৃথিবী থেকে।
কায়রোতে বিমান দুর্ঘটনার পর কবি শামসুর রাহমান ‘একটি দুর্ঘটনার স্মরণে’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর কবিতার শেষ চার লাইন উদ্ধৃত করে হারিয়ে যাওয়া সাংবাদিকদের স্মরণ করছি:
‘যেহেতু পাই না খুঁজে চেনা দেশে স্বজনের গোর,
দীর্ণ হৃদয়কে তাই করেছি কবর; সেখানেই
দাঁড়াই নোয়াই মাথা, ফুল রাখি, মুছি ক্লান্ত চোখ,
জমে যায় রক্ত মাংস, মুহূর্তেই হয়ে যাই শোক।’

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT