পাঁচ মিশালী

বাবা

মো.শামসুল ইসলাম সাদিক প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৩:২৫ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

বৃক্ষ ছাড়া যেমন ফলের আশা করা যায় না তেমনি মা-বাবা ছাড়া সন্তানের অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না। কিন্তু কেউ কেউ জন্মের পর মমতাময়ী মা অথবা বাবাকে হারিয়ে ফেলি। আবার কেউ আছি দু’জনকেই হারিয়ে অনাথ হয়ে যাই। আবার অনেকের দু’জনই থাকেন। তবে আমরা দু’জনকে পেয়েও তাদের মর্যাদা দিতে পারি না। ২০০৯ সালের ১লা নভেম্বর আজ থেকে ১০ বছর আগে বাবাকে হারিয়ে বুঝেছিলাম, তিনি তাঁর ব্যক্তি জীবনে বেদনা, কষ্ট ও হতাশা লুকিয়ে সদা হাসিমুখে থাকতেন। দিন বয়ে যায় কালের গহ্বরে সময়কে যায়না বাধা নিজের মত করে, এই দিন আসে বছরে একবার ঘুরে তোমার মায়া ভরা ঐমুখখানি বড় মনে পড়ে, তুমি যখন ছিলে আমাদের মাঝে কর্মচঞ্চলতা উদ্দীপনা ছিল সকাল সাঝে। বার বার মনে করি আজ আবার ঐ মায়া ভরা মুখ, নতুন করে। আমাদের সুখি দেখতে সর্বক্ষণ আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি শোনাতেন। সন্তান হয়ে নিজেদের একান্ত সমস্যা মোকাবেলা করে তাকে আশ্বস্ত রাখতে পারিনি। পারিনি সন্তান হয়ে নির্ভর নির্ভীক একটি পৃথিবী উপহার দিতে। হয়তো মায়ের প্রতি যতটুকু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান দেখাই ততটুকু বাবার প্রতি দেখাতে পারি না।
মানবজীবনে বাবার অবদান-গুরুত্ব অপরিসীম। বাবা শুধু একজন মানুষ নন, স্রেফ একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা বলার সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো বয়সী সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার অনুভূতি জাগ্রত হয়। বাবা সন্তানের জন্য কতভাবে অবদান রাখেন, হিসেব করে কেউ বের করতে পারবেন না। বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সংসারের এতো দায়ভার বয়ে বেড়ান। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতোটা পথ অল্প সময়ে কি করে পাড়ি দেন, শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন। বাবার ছায়া বটগাছের ছায়ার চাইতেও বড়। আমরা বাবাকে নিয়ে কেউই এমন ভাবি না। শুধু আমাদের বাবা, শত সাধারণের মাঝেও অসাধারণ হয়ে ওঠা, যাবতীয় প্রয়োজনে তাঁর সবটুকু অর্জন উজাড় করে দেন শুধু সন্তানের জন্য। সবকিছু উজাড় করে দেয়ার পরও তাঁকে কোনোভাবে নিঃস্ব মনে হয় না। মনে হয় তিনি পরম তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানকে তিলে তিলে বড় করেন তার মঙ্গলের জন্য। বাবা তাঁর দায়িত্ব ঠিকই সন্তানের জন্য পালন করে যাচ্ছেন, কিন্তু সন্তান হয়ে আমরা বাবার প্রতি যে দায়িত্ব আছে তা পালন করছি না। বাবার দায়িত্বটাই শুধু দায়িত্ব মনে হয়, আমাদেরটা কোনো দায়িত্ব না। আমরা সেই বাবাকেই কষ্ট দেই। বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সারাজীবন পরিশ্রম করে তাঁর সাধ্য মতো আমাদের গড়ে তুলেন মানুষের মতো মানুষ। আমরাই একদিন অমানুষের মতো আচরণ করে তাঁকে দূরে সরিয়ে দেই। বাবা সন্তানকে সারাজীবন পরিশ্রম করে বড় করে তুলেছেন, আজ সেই সন্তান তার বাবাকে আঘাত দিচ্ছে, ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে। কারণ আজ তার হয়তো বাবার প্রয়োজন নেই, আমরা হয়তো তা বুঝতে পারি না। তবুও বাবা চায় তাঁর সন্তান ভালো থাকুক, সুখে থাকুক।
আমরা কি কখনো পেরেছি বাবার মুখে হাসি ফুটাতে? আমরা কি কখনো জানতে বা বুঝতে চেয়েছি বাবা কিসে সুখি বা খুশি হন? আমরা যদি জেনে বুঝে বাবাকে খুশি করতে না পারি তবে সেটা হবে চরম ভুল ও অন্যায়। বাবা সেই ভুল বা অপরাধ মনে করেন না, তিনি আমাদের কাছ থেকে জানতে চান আমরা কিসে খুশি হব। আমাদের বাবা তাঁর সাধ্য মতো সব কিনে দেন। তবে বাবার বেলায় থাকে সব পুরোনোগুলো। যদিও তিনি কিনেন তবে আমাদের চারভাগের একভাগ টাকা দিয়ে। বাবা তাতেই খুশি থাকেন। কারণ আমরা খুশি থাকলেই তিনি খুশি। বাবাকে আমরা পেয়েও কিছু দিতে পারি না এমনকি চেষ্টাও করিনা। মা-বাবা যদি সন্তানদের একইভাবে ভালোবাসতে পারেন, তবে সন্তান হিসেবে কেন পার্থক্য করব। বাবা কি সন্তানের জন্য কিছুই করেন না। তিনি কি ভালোবাসার অযোগ্য? তাঁকে কি ভালোবাসা যায়না? বাবাতো শুধু চান সন্তানদের সুখ আর শান্তি। তাঁর আনন্দ সন্তানের আনন্দ। তাঁর চিন্তা শুধু পরিবার আর সন্তান। বাবার সেই চিন্তার ভাগ নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। সব চিন্তার ভার তাঁকে একাই বয়ে বেড়াতে হয়। আমরা সেই বাবাকে ভালোবাসতে জানি না, দেখাতে পারি না তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান।
বাবার কথা সন্তান হিসেবে ভাবতে হবে। তাঁর আবেগ অনুভূতি আর পরিণত বয়সের চাওয়া পাওয়াগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। জীবনের ঘানি টানতে টানতে বাবা এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হন, বার্ধক্য তাকে গ্রাস করে। তখন তিনি হয়ে পড়েন অনেকটা অসহায়, দুর্বল। রোগব্যাধি তাকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। তখন তিনি চান সন্তান যেন তাঁর পাশে থাকে। সব সময় যেমন তিনি ছিলেন সন্তানের পাশে, যখন সন্তান ছিল শিশু অবস্থায়। বার্ধক্য অবস্থায় সন্তানের কাছ থেকে যদি অবহেলা অথবা দুর্ব্যবহার পান, তখন বাবার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা সীমাহীন। সম্রাট বাবর নিজের সন্তান হুমায়ূনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু অনেক সন্তান রয়েছেন, যারা মা-বাবার দেখাশোনার প্রতি খুব অমনোযোগী। আমাদের সবার উচিত বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। বৃদ্ধ বয়সে তাঁরা কোনোভাবে অবহেলার শিকার না হন সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের আচরণে যেন তাদের মনে আঘাত করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সময় থাকতে মা-বাবার প্রতি যথার্থ সম্মান-মর্যাদা প্রদান একান্ত কর্তব্য।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT