পাঁচ মিশালী

জন্মভূমির টানে

সুপ্রিয় ব্যানার্জি শান্ত প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১১-২০১৯ ইং ০০:৪৯:০১ | সংবাদটি ১১৬ বার পঠিত



(পূর্ব প্রকাশের পর)
১ মার্চ ২০১৯খ্রিষ্টাব্দ ১৬ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ শুক্রবার সকাল ১০টায় আত্মশুদ্ধিতে তৃপ্ত হয়ে বাসা থেকে বের হলাম। শ্রীশ্রী প্রভুজগদ্বন্ধ¦ুসুন্দর ধাম, সৈকত-৮, জামতলা সিলেট সকাল সাড়ে ১০টা ‘ভক্তসঙ্গে মিলন ও দরিদ্রনারায়ণ সেবা’ অনুষ্ঠান পর্বে নিজে আত্মসমর্পণ করলাম। ছেলে মেয়ে, মাতাপিতা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, অগণিত ভক্তবৃন্দ পরিপূর্ণ ‘ধামালয়। সুযোগ খুজছি কিভাবে ‘নামেই মানুষ আমি’ আমার কাব্য গ্রন্থখানা ‘বাবাকে দেয়া এবং বাবাকে নিয়ে প্রকৌশলী শ্রী মনোজ বিকাশ দেবরায় সম্পাদিত ‘স্বামী শিবানন্দ : শতাব্দীর বিস্ময়’ গ্রন্থে বাবার অটোগ্রাফ নেয়া। এক পর্যায়ে দুইশত টাকা দক্ষিণা দিয়ে শর্ত সাপেক্ষে একখানা বই ক্রয় করলাম। শর্ত হলো, ‘দুপুরে প্রসাদ খেতে হবে।’ ১১টা বাবা (শিবানন্দ) উৎসব স্থল ত্যাগ করলেন। বই থেকে জেনে নিলাম দেয়াল ঘেষে বসা ভদ্রলোকই শ্রদ্ধেয় শ্রী মনোজ বিকাশ দেবরায়। আলাপচারিতায় বাবার ফেরার সময় ১২টা জানা গেলো। এলেই বই দেয়ার ও অটোগ্রাফের ব্যবস্থা করে দেবেন। চলে আসলাম রিকাবীবাজার রেস্টুরেন্ট ও পিঠা ঘর ফাতেমায়। চিনি ছাড়া চা পান শেষ করতে না করতেই কাকাতো ভাই জয়ন্ত ফোন করলো। বিশ্বের বয়ঃজ্যেষ্ঠ ১২৩ বৎসর বয়স্ক বাবার খবরটা জানিয়ে দিলাম। সাথে সাথে বড় বোন গৌরী (ফুলদি)কেও জানালাম। আজ বিকালেই ৫টায় বৃহৎ শুভানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন, শ্রীশ্রী শিবানন্দ বাবার কৃপাদর্শন পাওয়া যাবে। ১১টা ৪৫মিনিটের সময় ধাম প্রাঙ্গণে আবারও উপস্থিত হলাম। ১২টার সময় বাবা নির্ধারিত স্থানে আসন গ্রহণ করলেন। আমি শ্রদ্ধেয় মনোজ বিকাশ দেবরায়কে সবিনয়ে জানান দিলাম আমি এসেছি। তিনি উত্তর দিলেন, ‘সামাজিক কাজগুলো সেরে নেই, অপেক্ষা করুন। ভক্তগণের ভিড় বাড়ছেই বাড়ছে। বেশিক্ষণ বসবেন বলে মনে হলো না। তাই নিজেই সৎসাহসে সুযোগের সিদ্ধান্ত নেই। ভগবানের অশেষ কৃপায় মিনিট কয়েক পরেই সুযোগটা পাই। ইতিপূর্বেই সংগ্রহকৃত ‘শ্রীমদ্ভাগবত অভিধান’ সংকলক প্রফেসর নন্দলাল শর্মা এবং ‘স্বামী শিবানন্দ : শতাব্দীর বিস্ময়’ সংকলক প্রকৌশলী শ্রী মনোজ বিকাশ দেবরায় গ্রন্থদ্বয় বাবার শ্রীহস্তে দিয়ে লিখিত আশীর্বাদ প্রার্থনা করি। সাথে আমার ‘নামেই মানুষ আমি’ কাব্য গ্রন্থখানা ভক্তি উপহার স্বরূপ বাবার পুণ্য হস্তে তুলে দেই। মহাত্মা শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ বাবা দু’টি গ্রন্থেই আমার নামের আগে ‘কবি প্রবর বিশেষণে বিশেষায়িত করে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেন। তৎসঙ্গে আশীর্বাদ স্বরূপ বাবা স্বহস্তে একটি ফুল ও হরিতকী প্রদান করেন। বাবাকে (শিবানন্দ) সঙ্গে নিয়ে ধাম প্রাঙ্গণে ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি করেন ধামের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ বন্ধুপ্রীতম ব্রহ্মচারী। দরিদ্র নারায়ণ সেবা শুরু হলো দুপুর ১টায়। ভক্ত সকলের সাথে প্রসাদ গ্রহণ করে বাসায় চলে আসি। আবার বিকাল ৫টায় গ্রন্থ প্রকাশনা উৎসবে সহোৎসাহে ভক্তগণের সহিত মিলিত হই। অনুষ্ঠানের মুকুটমণি শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ বেনারস, ভারত, প্রফেসর নন্দলাল শর্মার সংকলিত ‘শ্রীমদ্ভাগবত অভিধান’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন সম্মানিত অতিথি শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ কৃষ্ণমূর্তি মাননীয় সহকারি হাই কমিশনার, ভারতীয় হাই কমিশন সিলেট-এর উপস্থিতিতে। প্রফেসর নিখিল ভট্টাচার্য্য, অবঃ প্রকৌশলী মনোজ বিকাশ দেবরায়, প-িত গোবিন্দলাল গোস্বামী বিজ্ঞ আলোচকবৃন্দ একবাক্যে স্বীকার করলেন যে, শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ বাবার কৃপা ভিন্ন এতো অল্প সময়ে ‘শ্রীমদ্ভাগবত অভিধান’ গ্রন্থ সংকলন করা ছিল অসম্ভব; যা ইতিপূর্বে কেউ করে উঠার সাহস করতে পারেননি। বাবু নন্দলাল শর্মা এজন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ বাবার জন্মস্থান; শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর ও বৃহত্তম সিলেট বলেই সিলেটেই সিলেটের সুলেখক ও গবেষক এর হাতে পবিত্র কাজটি সম্পন্ন হয়। শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধুসুন্দর ধাম, সৈকত-৮, জামতলা, সিলেট এ শ্রীহট্টের ভক্তবৃন্দ ‘স্বারস্বত সাধনার অন্যতম-পথিকৃৎ, গবেষক ও লেখক প্রফেসর নন্দলাল শর্মা ভক্তিকুমুদ-কে নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলি’- শিরোনামে মানপত্র প্রদান করে অনন্য সম্মানে সম্মানিত করা হয়। সভাপতি ডা. সত্যরঞ্জন দেব-এর মূল্যবান ভাষণ শ্রবণ করে সকলের সাথে আমারও প্রস্থান হলো।
৩ মার্চ ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ ১৮ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ রবিবার অফিস থেকে বের হয়ে ফোরস্ট্রোকে পুলের মুখ (ক্বীন ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে) নেমে হেঁটে ব্রীজ পার হয়ে দেখলাম সময় ৬টা। একটু দম নিলাম। কারণ শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত পাঠ সন্ধ্যা ৭ টায়। হেঁটে ধামে এসে দেখি কীর্তন চলমান। জিজ্ঞাসা করে জানলাম শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত পাঠ হচ্ছে। রাস্তায় বাতি জ্বলছে না। বাসাবাড়ির আলোর ঝলকানিতে রাস্তায় চলা যায়। এদিক, ওদিক ঘুরাঘুরি করছি; খুঁজে পাচ্ছি না। প্রবল ইচ্ছা পাঠ শুনবো। কীর্তনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু কোথায় নির্দিষ্ট করতে পারছি না। অনেকটা ব্যর্থ হয়ে গাড়ি চলার বড় রাস্তার দিকে আসতে শুরু করছি। কিছু অগ্রসর হয়ে থমকে দাঁড়ালাম। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি অনেকটা দূরে বাবার (শিবানন্দ) মতো লাগছে। দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবা (শিবানন্দ), বন্ধু প্রীতম ব্রহ্মচারী ও মহিলা একজন আসছেন। পাড়ার রাস্তায় আমি ছাড়া আর কেউ নেই। ভাবলাম- দু’হাত তোলে আটকিয়ে সামনে দাঁড়ায়ে কথা বলবো, পরক্ষণেই আবার ভাবলাম না, বেয়াদবি হবে। উনি মহামানব। সিলেটের বদনাম হবে। মনকে স্থির করলাম। অতি কাছে গিয়ে বাবা সহ সকলকে নমস্কার জানালাম। নয়ন স্বার্থক হলো, মনের অস্থিরতা দূর হলো। দূর থেকে দেখলাম বাবা ফোরস্ট্রোকে উঠে বসলেন। তারপর কার গাড়ীর পাশে দাড়ানো যুবককে জিজ্ঞাসা করলাম একটু আগে যে তিনজন লোক ঐ দিকে গেলেন, তারা কোন বাসা থেকে বের হলেন- বলতে পারবেন? ভদ্রলোক বাসাটি দেখিয়ে দিলেন। আমি কীর্তন শব্দ শুনে শুনে পৌঁছে গেলাম একটি রুমে। দরজার পাশে বসা ছেলের কাছ থেকে জানতে চাইলাম ইহাই কি শ্রীচৈতন্য গবেষণা কেন্দ্র? হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে আমাকে বসতে বললো। আমি একটু ভিতরে আসরে বসলাম। কীর্তনে অঙ্গ মেলালাম। বুঝে নিলাম শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত পাঠ ইতিপূর্বে শেষ। কীর্তন শেষ হলো প্রসাদ গ্রহণ করে প্রশান্তি নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
৪ মার্চ ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ ১৯ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ সোমবার অফিসে যাওয়ার সময় আমার সম্পাদিত ‘বিশদ-সরল ¯œানাঙ্গ তর্পন বিধি ও বারুণী’ গ্রন্থখানা প্রকাশনা অনুষ্ঠানের ‘শ্রীমদ্ভাগবতে পঞ্চপ্রসঙ্গ’ গ্রন্থের সংকলক, সম্পাদক- শ্রীচৈতন্য গবেষণা কেন্দ্র, সিলেট বহুগ্রন্থপ্রণেতা ও অবঃপ্রকৌশলী সর্বজন শ্রদ্ধেয় মনোজ বিকাশ দেব রায়কে শ্রদ্ধার্ঘ দিতে নিয়ে যাই। বিকাল ৫টা গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময়। আমি সভাস্থল শ্রীশ্রী প্রভুজগদ্বন্ধু সুন্দর ধাম উপস্থিত হতে সাড়ে ৫টা বেজে যাওয়ায় নিজেকে অপরাধী মনে হলো। ‘শ্রীমদ্ভাগবত পঞ্চপ্রসঙ্গ’ গ্রন্থখানা সংগ্রহ করে সংকলক শ্রী মনোজ বিকাশ দেবরায়কে মঞ্চে দেখতে না পেয়ে মনানন্দ ফিকে হয়ে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে অবশেষে সম্মুখ সারিতে আবিষ্কার করলাম। সভাশেষ না, এখনই, শ্রদ্ধার্ঘ ও অটোগ্রাফের কাজ সেরে নিবো, ভাবছি। শেষ দিন। সভা শেষে ভিড় জমে যাবে। তাই সাহস করে আমার গ্রন্থখানা শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে উনার হাতে তুলে সেই এবং উনার গ্রন্থখানায় অটোগ্রাফ নেই। কবি বিশেষণটা এবারেও আমার ভাগ্যে জোটে। ফটোসেশনও হলো। ধর্মসভার স্বাদ আস্বাদনে মনোযোগী হলাম। আজকের গ্রন্থালোচকবৃন্দ প্রফেসর নিখিল ভট্টাচার্য্য, সভাপতি শ্রীচৈতন্য গবেষণা কেন্দ্র সিলেট, প্রফেসর নন্দলাল শর্মা মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট, শ্রী বিনীত কুমার চক্রবর্তী, আচার্য্য, শ্রী গীতা মন্দির, পুরানলেন, সিলেট, শ্রী সমরেন্দ্র লাল দেব, সহ সম্পাদক, শ্রীচৈতন্য গবেষণা কেন্দ্র সিলেট এর আলোচনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। হঠাৎ শ্রীমৎ স্বামী শিবানন্দ বাবাকে কাছ থেকে (চোখ-মন এক করে) দেখার ভাব উদয় হলো। (চলবে)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT