উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : মদ-জুয়া ও সুদ

মো. রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১১-২০১৯ ইং ০১:১৬:১১ | সংবাদটি ৬৭ বার পঠিত

মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি ইসলামী আইনে যেমন হারাম, তেমনি আমাদের দেশের প্রচলিত আইনেও এগুলো নিষিদ্ধ। মদখোর, জুয়াখোর, সুদখোর, ঘুষখোর-এসব লোক সমাজে ঘৃণার পাত্র। এসব লোককে কেউ ভালবাসেনা। বরং সবাই তাদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদের বিরূপ সমালোচনা করে। মদখোর, জুয়াখোর, সুদখোর, ঘুষখোর শব্দগুলো অনেকটা গালির মত। এ কারণে মদখোরকে কেউ মদখোর বললে, জুয়াখোরকে কেউ জুয়াখোর বললে এবং সুদখোরকে কেউ সুদখোর বললে সে ব্যক্তি রাগান্বিত হয়। যদিও সে মদ খায়, জুয়া খেলে অথবা সুদ খায়। কারণ, মদখোর, জুয়াখোর এবং ঘুষখোর ব্যক্তি ভাল করেই জানে যে, মদ খাওয়া, জুয়া খেলা এবং ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি হারাম এবং অন্যায় কাজ। তারপরও সে স্বভাব দোষে এবং ধন-সম্পদের মোহে এসব অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের বর্তমান সমাজে মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি হারাম এবং অন্যায় কাজ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে আমাদের সমাজে নানা প্রকার অপরাধ যেমন-সন্ত্রাস, খুন-রাহাজানী, ছিনতাই, ধর্ষণ ইত্যাদি জঘন্য অপকর্ম কেবলই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মদ তথা মাদকদ্রব্য হচ্ছে সকল অপরাধ ও অপকর্মের মূল। এ কারণে পবিত্র কোরআনে মাদককে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। মাদক সেবন করলে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা-তখন সে যা ইচ্ছা তাই করে। মাদক সেবনের পর এমন কোন অপরাধ নেই, যেটা মানুষ করতে পারে না। আমাদের সমাজের অপরাধীরা মাদক সেবন করেই নানা প্রকার অপরাধে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে খুন, রাহাজানী, ছিনতাই, ধর্ষণের ন্যায় জঘন্য অপরাধ মাতালদের দ্বারা সংঘটিত হয়। মাদক মানুষকে নানা প্রকার অপরাধের প্রতি প্ররোচিত করে। যে সমাজে মাদকসেবীদের সংখ্যা যত বেশী বৃদ্ধি পাবে, সে সমাজে অপরাধ প্রবণতাও তত বেশী বৃদ্ধি পাবে। আমাদের সমাজে দিন দিন মাদকসেবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের তরুণ ও যুব সমাজ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এমন কি বর্তমানে সমাজের নারীরাও মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের তরুণ ও যুবকরা মাদকসেবক করে বিপথগামী হচ্ছে এবং নানা প্রকার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন ছাত্রও মাদকসেবন করে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করছে এবং নিজের জীবনকে ধ্বংস করছে। অনেক তরুণ ও যুবক মাদকের টাকা যোগাড় করার জন্য ছিনতাই, রাহাজানী ও খুন খারাবী করছে। অধিকন্তু কোন কোন তরুণ-যুবক মাদকের টাকার জন্য তাদের মা-বাবাকে মারধর এমন কি হত্যা পর্যন্ত করছে। আমাদের দেশে ধর্ষণ-নারী অপহরণ ইত্যাদির বৃদ্ধি পাওয়ার মূলে রয়েছে মাদক। মাদকসেবন করেই মাতাল হয়ে অপরাধীরা নারী ও শিশুদের ধর্ষণ করছে। সর্বনাশা মাদক সেবন করে মানুষ দিশেহারা হয়ে যা ইচ্ছা তাই করে। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। মাদকসেবী এবং মাদক কারবারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর জন্যে সরকারকে অশেষ ধন্যবাদ দিচ্ছি। মাদক বিরোধী অভিযান আরো জোরদার করতে হবে। মাদক আমদানীকারী, মাদক প্রস্তুতকারী এবং মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশকে মাদকমুক্ত করতে হবে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। ইসলামে মাদকসেবন করা হারাম। মুসলমান হিসাবে আমাদের উচিত মাদক থেকে দূরে থাকা এবং আমাদের সন্তানদেরকেও মাদক থেকে বিরত রাখা। তাহলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব।
জুয়া আরেকটি জঘন্য অপরাধ। আমাদের দেশের গ্রামে-গঞ্জে শহরে-বন্দরে সর্বত্রই জুয়ার প্রচলন আছে এবং জুয়ার আসর বসে। আমাদের সমাজের তরুণ ও যুবকরা জুয়া খেলার প্রতি আসক্ত হয়ে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের সমাজে জুয়া খেলে বহুলোক ভিটে-মাটি বিক্রি করে সর্বহারা হয়ে যাচ্ছে। প্রবাদ আছে ‘জুয়ায় পুয়া, তাসে নাশ।’ জুয়া খেলে শতকরা ৯৮/৯৯ ভাগ মানুষ সর্বহারা হয় এবং শতকরা ১/২ জন মানুষ লাভবান হয়। এ কারণে ইসলামে জুয়া সম্পূর্ণ রূপে হারাম। আমাদের দেশে যে লটারীর প্রচলন আছে, এটাও এক প্রকার জুয়া এবং হারাম। কারণ লটারীর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে দু/চার জন লোক আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়। সরল বিশ্বাসে সাধারণ মানুষ লটারীর টিকেট কিনে প্রতারিত হয়। কাজেই লটারীর নামে জুয়া খেলা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে আমাদের দেশের শহর এলাকায় ক্যাসিনো নামক আধুনিক জুয়া খেলার রমরমা ব্যবসা চলছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে দীর্ঘদিন যাবৎ রমরমা ক্যাসিনো ব্যবসা চলে আসছে। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই ব্যবসার সাথে জড়িত। একদল অপরাধী চক্র ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিয়ে ঢাকার ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো নামক আধুনিক পদ্ধতির জুয়া খেলা, মাদক সেবন ও গান-বাজনা ইত্যাদি চালিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকারের নির্দেশে পুলিশ ও র‌্যাব এসব ক্লাবে অভিযান চালিয়ে শত শত কোটি টাকা উদ্ধার করেছে এবং ক্যাসিনোর সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ ও জুয়াখোরকে গ্রেফতার করেছে। এসব অপরাধীরা ক্যাসিনো ব্যবসা করে অর্থাৎ জুয়া খেলে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তারা এসব অবৈধ টাকা বিদেশে পাচার করছে এবং এ টাকায় দেশেও নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। ক্যাসিনো নামক জুয়া খেলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কোন কোন পুলিশও সহযোগিতা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্যাসিনোর সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ সহ সকল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন দুর্নীতিবাজরা সরকারী দলের হলেও তাদেরকে ছাড় দেওয়া যাবেনা। তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা ইতিবাচক।
সুদখোররা হচ্ছে শোষক। তারা গরিবের রক্ত চুষে খায়। তারা সুদের ব্যবসা করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। তারা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদখোর। গ্রামের দরিদ্র অসহায় মানুষ সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। সুদখোরেরা বড়ই নিষ্ঠুর। দরিদ্র অসহায় মানুষ যদি সময় মত সুদে-আসলে তাদের টাকা পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে তারা দরিদ্র অসহায় মানুষের সহায় সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে নেয়। ইসলামে সুদ হারাম। আল্লাহতালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন-‘আল্লাহতালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। তাই মুসলমানদের উচিত সুদ থেকে বিরত থাকা। পরকালে সুদখোরদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
ইসলামে ঘুষ খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। রসুল উল্লাহ (দঃ) বলেছেন-‘ঘুষদাতা এবং ঘুষ গ্রহণকারী উভয়ই জাহান্নামী।’ আমাদের দেশের অধিকাংশ সরকারী কর্মচারী ঘুষ-দুর্নীতির সাথে জড়িত। সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও তারা ঘুষ-দুর্নীতি পরিত্যাগ করতে পারেননি। ঘুষ-দুর্নীতির কারণে জনগণ সরকারী অফিস-আদালতে গিয়ে উপযুক্ত সেবা পাননা। অধিকাংশ সরকারী কর্মচারী ঘুষ ছাড়া জনগণের কাজ করেন না এবং ঘুষ ছাড়া ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে যায় না। তাই সরকারের উচিত সরকারী অফিস-আদালতকে ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত করা এবং দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।
মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি ইসলামে হারাম। মুসলমান হিসাবে আমাদের সকলের উচিত এসব কাজ থেকে বিরত থাকা। সরকারের উচিত দেশে মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা এবং মদখোর, জুয়াখোর, সুদখোর ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT