উপ সম্পাদকীয়

দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় বৈষম্য

রতীশচন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১১-২০১৯ ইং ০১:২০:৩৫ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

১৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ছিল আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। এদিন বিশ্বের দেশে দেশে সভা সেমিনারের আয়োজন হয় এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের বিভিন্ন পন্থা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্বের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন। এসব সভা সেমিনার বা আলোচনা অনুষ্ঠান দারিদ্র্য বিমোচনে কতটুকু গতিসঞ্চার করে সেটা অবশ্যই বিতর্ক সাপেক্ষ বিষয়। তবে এসব একেবারে বিফলে যায় তা কিন্তু নয়। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যখন কোন দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয় তখন যত স্বৈরাচারী সরকারই হউক কিছু কিছু জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কারণ প্রত্যেক সরকারের প্রত্যাশা থাকে পরবর্তী নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার। সুতরাং এ তাগিদ থেকেই এ পদক্ষেপগুলো তাদের নিতে হয়। একবিংশ শতাব্দীতে আজ বিশ্ব জ্ঞান বিজ্ঞানে চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। বিজ্ঞানের অবদান আমাদের জীবনকে করেছে গতিময় ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। বিশ্বের অনেক দেশে সম্পদের নহর বয়ে যাচ্ছে। সেসব দেশের জনগণ ভোগবিলাসে জীবন কাটাচ্ছে। অথচ এর বিপরীত পিঠে আছে অন্ধকার, ভীষণ অন্ধকার। কোন কোন স্থানে অন্ধকার এত প্রকট ও গাঢ় যে, সেখানে আলোর শীর্ণ শিখাও প্রবেশের সুযোগ পায় না। ধনাঢ্য দেশগুলো থেকে অবশ্য ছিটেফোঁটা অনুদান পাঠানো হয় তবে এসবও সুষ্ঠুভাবে বন্টন হয় না। যাও কিছু দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, তা দারিদ্র্য বিমোচনে খুব একটা অবদান রাখে না। এসব অনুদান দরিদ্রদের মধ্যে কিভাবে বিতরণ করলে সুফল পাওয়া যায় এ নিয়ে কাজ করেই এ বৎসর অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী এস্তার দুফলো এবং আরেক মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্তার দুফলো ‘পুত্তর ইকনমিক্স’ বইতে দেখিয়েছেন, অনুদান বিতরণের পদ্ধতিতে সামান্য অদলবদল করা গেলে এর কার্যকারিতার বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ নিয়ে কাজ করে তাঁরা হাতে কলমে এর সদর্থক অবদান প্রমাণ করেছেন। তবে তাঁরা এটাও স্বীকার করেছেন যে, অতি দরিদ্রদের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনা খুবই কঠিন। চরম দরিদ্র বলতে তাদেরই বোঝানো হয়, যাদের দৈনিক আয় ১.২৫ ডলার বা ১০৬ টাকার কম। এখনও বিশ্বে বেশ কিছু দেশ আছে যেখানে চরম দরিদ্রের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক বা তারও বেশি। যেমন নাইজেরিয়ার জনসংখ্যা ১৯১ মিলিয়ন যার মধ্যে অতি দরিদ্র প্রায় ৮৭ মিলিয়ন। আফ্রিকার কঙ্গোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে ৭৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি লোক চরম দরিদ্র। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রায় ৫% লোক হতদরিদ্র তবে ১৩০০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সংখ্যা কিন্তু প্রায় ৭১ মিলিয়ন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে দেখা যায় যে আমাদের দেশে এখনও চরম দরিদ্রের সংখ্যা ১১.৩% যা ১৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার হিসেবে প্রায় ১৯ মিলিয়ন। বিশ্বব্যাপি আলো আঁধারের যে ঈড়হঃৎধংঃ, প্রাচুর্য্য-দারিদ্র্যের যে ঈড়হঃৎধংঃ তা নিরসনে উন্নয়ন অর্র্থনীতিবিদরা যতই পন্থা পদ্ধতি উদ্ভাবন করুন না কেন, দূরীকরণের মূল দায়িত্ব যাদের কাঁধে অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের সরকার এ নিয়ে কতটুকু সচেতন ও সচেষ্ট, সেটাই হলো মূল ভাবনার বিষয়।
১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়ে সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে। ১৯৭২ সালে সারা দেশ ছিল বিপর্যস্ত। দেশের রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট সব ছিল বিধ্বস্ত। ১৯৭২ সালে দেশে দরিদ্রের হার ছিল প্রায় ৮২%। সে তুলনায় বিগত ৪৭-৪৮ বছরে দেশ অনেক এগিয়েছে। ইইঝ এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে এখন দারিদ্র্যের হার নেমে হয়েছে ২১.৮%। তবে মোট জনসংখ্যা যদি ১৭০ মিলিয়ন হয় তবে গরীব লোকের সংখ্যা এখনও প্রায় ৩৭ মিলিয়ন বা ৩.৭ কোটি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০% এবং ২০১৬ সালে সে হার নেমে এসেছিল ২৪.৩% এ। আবার ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২১.৮% এ। এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় যে, ২০০৫-২০১৬ সময়কালে দারিদ্র্য বিমোচনের যে হার ছিল, ২০১৬-২০১৮ সময়কালে দারিদ্র্য দূরীকরণের হার অনেকটা শ্লথ। আবার অতি দরিদ্র হ্রাসের ক্ষেত্রেও প্রায় অনুরূপ চিত্রই পাওয়া যায়। ২০০৫ সালে হতদরিদ্র ছিল ২৫.১ শতাংশ, ২০১৬ সালে ছিল ১২.৯ শতাংশ, কিন্তু ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১১.৩ শতাংশে। পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, উপরোক্ত সময়কালে দারিদ্র্য ও অতি দারিদ্র্য বিমোচনের গতি হ্রাস প্রায় সদৃশ হলেও চরম দারিদ্র্য হ্রাসের গতি অপেক্ষাকৃত মন্থর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের সাথে আমাদের দেশের অনেক সাদৃশ্য আছে। ১৯৭১ সালে আমরা যখন পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম, ঠিক তখন ভিয়েতনামীরাও মার্কিন যুদ্ধবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। ভিয়েতনামে কুখ্যাত ‘মাইলাই’ হত্যাকান্ডের ন্যায় বেলুসার গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। আমাদের দেশেও অসংখ্য ‘মাইলাই’ সদৃশ গণহত্যা ঘটেছে এবং ত্রিশ লক্ষ লোক শাহাদাৎ বরণ করেছে। আবার উভয় দেশই বীরোচিত সংগ্রাম করে দখলদার শক্তিকে পরাভূত করেছে। সত্তরের দশকে ভিয়েতনামও ছিল আমাদের মতই বিধ্বস্ত ও পর্র্যুদস্ত একটি দেশ। তবে বর্তমানের ভিয়েতনামের অর্থনীতির সাথে আমাদের অর্থনীতির তুলনা করলে অবশ্য কিছুটা হতাশ হতে হবে। দারিদ্র্যবিমোচন ও মাথাপিছু আয় সব ক্ষেত্রেই তারা আমাদেরকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে। ১৯৯৩ সালে ভিয়েতনামে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮%, কিন্তু ২০১৬ সালে সে হার নেমে এসেছে এক অঙ্কে অর্থাৎ ৯.৮ শতাংশে। যে হারে ভিয়েতনামে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, সে হার বজায় থাকলে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশে নেমে আসার কথা। ভিয়েতনামেরও প্রধান রপ্তানি খাত হলো গার্মেন্ট। তবে গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিতে ভিয়েতনাম কিন্তু আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে।
সরকার দারিদ্র্য বিমোচন করে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জন করার প্রত্যাশা করে, কিন্তু বর্তমানে যে হারে দারিদ্র্র্য হ্রাস পাচ্ছে তা ত্বরান্বিত করা সম্ভব না হলে ঐ সময়ের মধ্যে দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা হবে দুরূহ। বিপুল জনসংখ্যার ভারে ন্যূব্জ এদেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২২ লক্ষ লোক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে কিন্তু সে তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থান করবেন। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অবশ্যই শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। কিন্তু ‘সহজে ব্যবসা করার সূচকে’ আমাদের অবস্থান কিন্তু পিছনের সারিতে। গত বছর থেকে আট ধাপ এগিয়ে আমরা বর্তমানে ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম অবস্থানে আছি, তবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থান ৬৬তম, ভিয়েতনামের ৬৯তম এমনকি পাকিস্তানের অবস্থানও আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ১০৮ এ। দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের আরও অনেক পথ হাঁটতে হবে। এ সূচকে দেশকে অবশ্যই ১০০ এর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম লোক আছেন ৬ কোটি ৪০ লক্ষ যার মধ্যে ৬ কোটি ১৯ লক্ষ মানুষ মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন। তাদের হিসেবে ২১ লাখ লোক বেকার। তবে এ প্রতিবেদনের সাথে অনেক অর্থনীতিবিদই একমত নন। আইএলও এর নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে যারা এক ঘন্টারও কম মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ পান তাদেরই বেকার ধরা হয়। জিইডি এর প্রতিবেদনে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ তরুণ তরুণী আছে যারা পড়াশুনা বা প্রশিক্ষণেও নেই আবার কোন কাজেও নিযুক্ত নয়। এদেরকে বলা হয়েছে ছদ্ম বেকার। এদেরকে হিসেবে ধরলে দেশে বেকার প্রায় ১ কোটি ৪৬ লাখ যা সত্যিই উদ্বেগজনক একটি সংখ্যা। আমাদের দেশে জনসংখ্যা বোনাসের যে অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, এত উচ্চমাত্রার বেকারের সংখ্যার কারণে দেশ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ তিন বছর আগে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে এবং বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫০ ডলার এর উপরে। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রত্যাশা করে। বিশ্বব্যাংকের মতে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ৩ হাজার ৯৯৬ ডলার যা বর্তমান মাথাপিছু আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ৮ জুলাই ২০১৯ প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, টানা দশ বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৭ শতাংশ ধরে রাখা সম্ভব হলে আগামী বারো বছরে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। আগামী বারো বছর ৭% প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং সেই সাথে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এজন্য অবশ্যই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে আরও বেশি অর্থের সংস্থান রাখতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা এ দু’টি দেশ উচ্চমধ্যম আয়ের পর্যায়ে উঠে এসেছে। উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উঠে আসতে শ্রীলঙ্কার লেগেছিল প্রায় ২০ বছর, অথচ আমরা চাচ্ছি ১৫ বছরে সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে গতিধারা তাতে অবশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার হয়ত সম্ভব। কিন্তু এখন যে বিষয়টি অত্যন্ত প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা হলো বৈষম্য। এ বৈষম্য শুধু ধনী-দরিদ্রের মধ্যেই নয়, আঞ্চলিক পর্যায়ে ও এ বৈষম্য অত্যন্ত দৃষ্টিকটু আকারে দৃশ্যমান। বিবিএস ২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সহকারে প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে গরীব প্রায় ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৯ লাখ ৭২ হাজার ২০টি পরিবারের প্রতিমাসের গড় আয় মাত্র ৭৪৬ টাকা। আবার ধনী ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১১০টি পরিবারের গড় আয় ৮৯ হাজার টাকা। ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের গড় আয় দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের গড় আয়ের ১১৯ গুণ। অন্যদিকে দেশের মোট আয়ের ২৮ শতাংশ পেয়ে থাকে ঐ ধনিক শ্রেণীর ৫% পরিবার এবং গরীব ৫% পরিবার পায় মাত্র ০.২৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর প্রতিবেদন থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে দেশে ধনী ও দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে আয় বৈষম্য প্রায় পাহাড়সম। অর্থনীতিতে আয় বৈষম্য নিরূপণ করা হয় গিনি সহগের মাধ্যমে। ২০১০ সালে দেশে গিনি সহগ ছিল ০.৪৫৮ কিন্তু ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ০.৪৮৩। অর্থাৎ আয় বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোন দেশের গিনি সহগ ০.৫০ এর বেশি হলে সে দেশকে উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশ ধরা হয়। আমাদের পাশের দেশ ভারতের গিনি সহগ ০.৩৫১ এবং ২০১৪ সালে ভিয়েতনামের ঐ সূচকের মান ছিল ০.৩৫। ইন্দোনেশিয়ার গিনি সহগ ০.৩৮৮ অন্যদিকে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে আয় বৈষম্যের দেশ মালয়েশিয়ায় এ সূচক হলো ০.৫০। আমাদের দেশের গিনি সূচক যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ইতিমধ্যে এর মান হয়ত ০.৫০ এ পৌঁছে গেছে অর্থাৎ আমরা উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশের প্রান্ত সীমায় পৌঁছে গেছি। এতো গেল ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, কিন্তু ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ ছোট দেশে আঞ্চলিক বৈষম্যও দৃষ্টিকটু রূপ ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ প্রভার্টি এসেসমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের পর থেকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি হ্রাস পেয়েছে, এমনকি রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার ৪২.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭.৩ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগে এ হার ২৯% এ স্থির আছে এবং খুলনা বিভাগে ৩২% থেকে সামান্য কমে ২৮% এ পৌঁছেছে। পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগে ঐ সময়ের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৮% থেকে ১৬% এর কাছাকাছি এসেছে, ঢাকা বিভাগে ৩০.৫% থেকে নেমে এসেছে ২০% এ এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২৬% থেকে ১৮% এ এসে দাঁড়িয়েছে। বরিশাল বিভাগে ৩৯.৪% থেকে সবচেয়ে দ্রুত হারে হ্রাস পেয়ে ২০১৬ সালে ২৬.৪% এ নেমে এসেছে। এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্য হ্রাসের দিক থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে বৈষম্য বেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের সবচেয়ে গরীব জেলা হলো কুড়িগ্রাম। কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার ৭১% অথচ কুড়িগ্রাম থেকে মাত্র ২২৬ মাইল দূরের জেলা নারায়ণগঞ্জের দারিদ্র্যের হার মাত্র ২%। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে শহর ও গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাসের তুলনামূলক একটি চিত্রও ফুটে উঠেছে। ঐ ছয় বছরের মধ্যে শহরাঞ্চলে দারিদ্রের হার ২১.৩% থেকে ১৯.৩% এ নেমেছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে অপেক্ষাকৃত দ্রুত হারে ৩৫.২% থেকে কমে ২৬.৭% এ পৌঁছেছে।
পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য অবশ্য নতুন নয়, বরং বলা যায় অনেক পুরানো। তবে স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল পরও এর সদর্থক পরিবর্তন না ঘটে কোন কোন জায়গায় নেতিবাচক চিত্র দৃশ্যমান হওয়া সত্যিই উদ্বেগজনক এবং দুঃখজনকও বটে। অনেকেরই হয়ত মনে আছে, ১৯৭৪ সালে ভয়াবহ বন্যার সময় কুড়িগ্রামের বাসন্তী নামক এক মহিলার মাছের জাল পরিহিত একটি ছবি ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পরে অবশ্য জানা যায়, এ ছবি প্রকাশের পেছনে ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তবে এটাও অস্বীকার করা যাবে না, এ ছবি পত্রিকায় প্রকাশের ফলে দেশে নেতিবাচক আলোড়ন ঘটেছিল এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুন্ন হয়েছিল। সুতরাং এসব কিছু মাথায় রেখে উচ্চমধ্যম আয়ের পথে অগ্রসরমান দেশের বর্তমান সরকারকে অবশ্যই এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে ধনী-গরীব এবং পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের টেকসই পরিবর্তন ঘটে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এম.সি কলেজ।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মধ্যপ্রাচ্যে নারীশ্রমিক প্রেরণ কেন বন্ধ হবে না?
  • ব্যবসার নামে ডাকাতি বন্ধ করতে হবে
  • কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ
  • বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন
  • সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন ও কিছু কথা
  • শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ মুজাম্মিল আলী
  • আমরা কি সচেতন ভাবেই অচেতন হয়ে পড়ছি?
  • দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি রুখবে কে?
  • আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে
  • শিক্ষার মানোন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন
  • দেওয়ান ফরিদ গাজী
  • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালচাল
  • সিলেটের ছাত্র রাজনীতি : ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রত্যাশা
  • নাসায় মাহজাবীন হক
  • লেবানন : চলমান গণবিক্ষোভের লক্ষ্য ও পরিণতি
  • ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিতর্ক
  • ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা
  • শিক্ষক পেটানোর ‘বিদ্যাচর্চা’
  • অভিযান যেন থেমে না যায়
  • পেঁয়াজ পরিস্থিতি হতাশার
  • Developed by: Sparkle IT